স্মৃতিময় পথের ধারে

আমার শৈশব এবং কৈশোর দুটোই কেটেছে বরিশালে। আবার কখনও ঢাকার কলতা বাজার, বাবুবাজার এলাকায়। স্মৃতিময় এসব স্থানের বর্ণনা অনেকভাবেই দেওয়া সম্ভব। এ রচনার বিষয়বস্তু যেহেতু আমার দেখা বহুদিন আগেকার পরিচিত পথ, সেহেতু শৈশব এবং কৈশোরের ফেলে আসা সেসব স্থানের পথের কথাই বলব, যা আমার মনের গভীরে আজও গেঁথে আছে স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে।
আমি যখন বরিশালে থাকতাম, তখন আমরা প্রায়ই নদী দেখতে যেতাম। আমাদের বাড়ির ডান পাশ দিয়ে অর্থাৎ দক্ষিণ দিক দিয়ে মাইল দেড়েক গেলে নদীর দেখা মিলত। আরও একটা পথ ছিল নদীতে যাওয়ার। সেটা হলো পূর্ব দিক দিয়ে গেলে গোয়ালগঞ্জ, কালীঘর এসব পেরিয়ে বেশ দূরেই বলা যায়। আব্বার সঙ্গে আমি প্রথম যাই। পালকিতে চড়ে গিয়েছিলাম সেবার, আমার মনে আছে। সেই নদী ভাঙতে ভাঙতে এতই নিকটে চলে এসেছে যে, এখন আমাদের বাড়ির পাশের দীঘির উত্তর-পূর্বে দাঁড়িয়ে জোরে ঢিল ছুড়লে নদীতে গিয়ে পড়ে। নদী দেখতে যাওয়ার সময় যেসব পথ আমি পাড়ি দিয়েছি একসময়, সেই সব পথ এখন নদীর গহ্বরে। আমার পরিচিত সেই সব রাস্তা আমি ভুলিনি। গোয়লগঞ্জ, কালীঘর, পালপাড়া, লাড়ূয়া_ এগুলো কিছুই নেই।
আমাদের বাজারের পশ্চিম দিকের খাল উত্তর-দক্ষিণে চলে গিয়েছে। খালের পুব পাড়ে এখন গার্লস স্কুল, তখন স্কুলের ছিটেফোঁটাও ছিল না। সামনে সামান্য এগোলে বারইদের পানের বরজ। ডানদিকে পুকুর। তারপর আরও সামান্য হাঁটলে বাম পাশে আগে হিন্দু বাড়ি ছিল, এখন খন্দকার বাড়ি। আরও একটু সামনে এগিয়ে জয়নাল, সোবহানদের বাড়ি, এরা আমার স্কুলের সহপাঠী। আরও একটু সামনে এগোলে বাম পাশে মকবুল মাস্টারদের বাড়ি। এরপর কালীখোলা। এই কালীখোলায় একবার ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম, আজ সেই গল্প থাক। কালীখোলার ডান দিকে কফিলউদ্দিন স্যারের বাড়ি, আমার শিক্ষক। তিনি প্রতি সকালে আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে পড়াতেন। ঈদে আমরা তার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। কফিলউদ্দিন স্যারের বাড়ির মুখোমুখি ছিল বিনয়ভূষণ গুহর বাড়ি, আমাদের একসময়কার নায়েব রমণী ভূষণ গুহ, তার ছেলে। চমৎকার নাটক করতেন তিনি। এর বাম দিকে তেঁতুলিয়া। এই তেঁতুলিয়ায় আমাদের বেশি যাওয়া হতো, সাইকেলে। রহমত আলী ডাক্তারের সাইকেল ছিল। তার ছেলে চুন্নু আমার সহপাঠী। আমি আর আমার রহমত মামু, আমরা তেঁতুলিয়ায় যেতাম। বিশেষ করে শনি ও রোববার_ এ দু’দিন আমাদের যাওয়া হতো। রহমত আলী ডাক্তারের বাড়িতে একটা ট্রানজিস্টার ছিল। আমার সেখানে গিয়ে এই দু’দিন কলকাতার আকাশবাণীর অনুরোধের আসর শুনতাম। এভাবে এসব পথ ধরে আমরা গান শুনতে যেতাম। এ ছাড়া তেঁতুলিয়া যাওয়ার অন্য একটা পথ ছিল। আমরা খালের উত্তর পাড় দিয়েও যেতাম মাঝেমধ্যে। খালের পর সাঁকো পার হতে হতো। সাঁকো পেরিয়ে একেবারে বনের মধ্য দিয়ে একটা চিকন রাস্তা দিয়ে সামনে এগোতে হতো। সবার আগে পড়ত দেওয়ান বাড়ি। পাশেই তালুকদার বাড়ি। দেওয়ান বাড়ির সামনের পথ দিয়ে আমরা যেতাম। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই পথগুলোর একটিও আর অবশিষ্ট নেই। নদীতে ভেঙে গিয়েছে। আমি এই পথগুলো ভুলিনি। একটা গান আছে না এরকম_
‘যে পথ দিয়ে চলে এলি/ সে পথ এখন ভুলে গেলি রে’। না, আমি ভুলিনি। পথটা আমাদের ভুলে গিয়েছে। পথটা আমাদের জন্য বেঁচে না থেকে মনের ভুলে নদীতে মিশে গিয়েছে।
আর একটা পথের কথা আমার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। সে পথটার কথা বলব এখন। আমার নানিআম্মা ফয়জুন্নেছা চৌধুরী, তিনি চৌধুরানী লিখতেন। তিনি ভীষণ ধর্মপ্রাণ ছিলেন। যেসব দিনে রোজা রাখা হারাম, এ ছাড়া বাকি প্রায় সব দিনেই তিনি রোজা রাখতেন। আমাদের বাড়ির পেছনেই পুকুর। আর পুকুরের পশ্চিম পাশে আমার নানুবাড়ি। নানু চা খেতেন। বেগম সুফিয়া কামালের মতো গোল পেয়ালায় করে। নানুর একটা গোল বাটি ছিল। তিনি সেটাতে চা-পানি খেতেন। আমরা সাধারণত আসরের পর চা খেতাম। আমি জানতাম নানু রোজা রাখেন। তাই তিনি মাগরিবের পর চা খেতেন। যদি কোনো দিন সন্ধ্যায় আমাদের পড়তে বসতে দেরি হতো, তখন আমি সোজা চলে যেতাম নানুর কাছে তার সঙ্গে চা খাওয়ার জন্য। আমি ঠিক চা খাওয়ার লোভে যেতাম না। নানু মাঝেমধ্যে তার বাবার বাড়ি যেতেন। তার বাবার বাড়ি ছিল দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। ইসহাক চৌধুরীর বাড়ি। তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার বাজারের পর তার বাবার বাড়ি যেতেন, যদি পূর্ণিমা থাকত। পূর্ণিমা ছাড়া আমি তাকে কোনো দিন যেতে দেখিনি। এটার সঙ্গে সুন্নতের কোনো সম্পর্ক আছে কি-না আমি জানি না। আমরা বাজারের ওপর রাস্তা দিয়ে যেতাম না। আমরা যেতাম বাড়ির পেছন দিক দিয়ে পুকুরের পাড় দিয়ে সরু রাস্তা ধরে মারুফ চৌধুরীর বাড়ির পাশ দিয়ে। নানু লম্বা পাড়ের শাড়ি পরতেন। তার শাড়ি দিয়ে বানানো দীর্ঘ চাঁদোয়া পাশ থেকে ধরে থাকত বাড়ির কাজের মেয়েরা। নানু এর ভেতরে পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন। আমি নানুর সঙ্গে প্রায়ই যোগ দিতাম। কারণ নানুর সঙ্গে গেলে বিভিন্ন বাড়িতে ভালো খাবার দিত। বলা যায়, খাবারের লোভেই যেতাম। কিন্তু আমি নানুর সঙ্গে থাকলে নিজেকে কেমন যেন নিরাপদ মনে করতাম। সে কারণেই বেশি বেশি যাওয়া হতো। আর ছিলাম আমার নানার বংশের প্রথম সন্তান। সবার আদরের বড় নাতি। তাই আমাকে সঙ্গে থাকতে দেওয়া হতো। নানুর বাবার বাড়ি যাওয়ার এই রাস্তা আমার মুখস্থ ছিল। অনেক ছোটবেলা থেকেই নানুর সঙ্গে আমি যাওয়া-আসা করতাম। এখন জানি না এই পথ দিয়ে কেউ কি আর যাতায়াত করে? এ রাস্তার আশপাশের বাড়িগুলো এখন খালি। কেউ থাকে না এখানে। আমারও আর যাওয়া হয় না এসব পথগুলোয়।
আমার শৈশবের আরেকটি কথা মনে আসছে এ মুহূর্তে। আমরা তখন ঢাকায় থাকতাম। ঢাকার কলতাবাজারে। আবদুর রউফ স্ট্রিট বা লেন ছিল আমাদের বাসার রাস্তার নাম। আমি ভুলে গিয়েছি। গাফ্ফার ভাই [আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী], তার আবার সব মনে আছে নাম্বার সহকারে। তিনি বেশ কয়েকদিন ছিলেন আমাদের এখানে। আমি বরিশাল থেকে ক্লাস ওয়ানে পরীক্ষা দিয়ে চলে এসেছিলাম। যাই হোক, আব্বা দিলি্ল রয়েল সুইটমিটে আড্ডা দিতেন। মুকুল সিনেমা হলের পাশে, পরে তা আজাদ সিনেমা হল হলো। এখন আছে কি-না আমি জানি না। ডান দিকে গোডাউন ছিল। পাশেই একটা গ্যারেজের মতো ছিল। সেখানে একটা নষ্ট বাস থাকত সবসময়। আমরা ঘুরঘুর করতাম এখানে। তবে আমরা যখন তিন নম্বর আকমল খান রোডে থাকতাম, সেখানকার অনেক কথা আমার মনে আছে। পাশেই ছিল স্টিমার ঘাট। আমি আর সিডনি, [বিখ্যাত অভিনেতা সৈয়দ আহসান আলী সিডনি] বুড়িগঙ্গা নদী থেকে আমরা গামছা দিয়ে মাছ ধরতাম বাবুবাজারের ঘাটের পাশ থেকে। এ নদীর পাশ দিয়ে রাস্তাগুলো আমার অনেক মনে আছে। আমাদের ঘর থেকে বেরিয়েই বিখ্যাত সেই মসজিদ, বাদামতলীর। আমরা আস্তে করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তাম। বাম দিকে হাঁটা শুরু করতাম। ডান দিকে স্টিমার ঘাট। তারপর চালের আড়ত। আরও বামঘেঁষে রাস্তা। এভাবে নানা বাড়িঘর করতে করতে এ রাস্তা একেবারে ইসলামপুরের শেষ মাথায় বাবুবাজারে গিয়ে পেঁৗছেছে।
এখনকার বাবা-মায়েদের মতো আমাদের বাবা-মায়েরা আমাদের ঘরে আটকে রাখতেন না। আমাদের ছেড়ে দিতেন তারা। কারণে-অকারণে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। একদিনকার ঘটনা বলি। আমি ক্লাস ওয়ান শেষ করে ঘরে বসেই ক্লাস টু’র বই পড়ে শেষ করছি। এমনই এক সময়ে আমার মা আমাকে মিষ্টি আনতে পাঠালেন বাইরে। সেখানে সিতারাম ও কালাচাঁদের দুটি মিষ্টির দোকান ছিল বাবুবাজার ফাঁড়ির সঙ্গেই। আমি গেলাম মিষ্টি আনতে। এ রাস্তাটা যে খুব বেশি পরিচিত ছিল, তা কিন্তু নয়। দু’একবার এই রাস্তা ব্যবহার করেছি। মিষ্টি নিয়ে আমি যখন ফিরছি, তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আমি মাথা বাঁচানোর জন্য একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি বলে একটা মেয়ে আমাকে ধমক দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। মেয়ে না বলে মহিলাই বলা ভালো। চমৎকার শাড়ি পরা, বেশ লম্বা শ্যাম বর্ণের দেখতে। এই বৃষ্টিতে বের হয়েছি বলে আমার মা-বাবাকে কিছুক্ষণ বকলেন। হাতের মিষ্টির প্যাকেট টেবিলে রাখলেন। আমার মাথা মুছে দিলেন তার শাড়ির আঁচল দিয়ে। তারপর আমাকে বসতে দিলেন। মুড়ি মেখে দিলেন সরিষার তেল দিয়ে। বললেন_ ‘বৃষ্টি হচ্ছে, তুই এখন কোথায় যাবি? শুয়ে থাক’। আমি অনেকদিন পর জানতে পারলাম, তার পরিচয় কিংবা এই বাড়িতে স্বভাবত কী হয়। এই মহিলা, আমরা বইয়ের ভাষায় যাকে বলি দেহব্যবসায়ী অথবা বেশ্যা; তিনি ছিলেন তাই। আমপট্টি বা এরকম কিছু একটা নাম ছিল এখানকার। এখনও আছে কি-না আমি জানি না। নারী জাতিকে আমি শ্রদ্ধা করতে শিখেছি এই মহিলার কাছ থেকে। এই রাস্তাও আমি ভুলিনি। আরেকবার এ রাস্তা দিয়ে আমি এসেছিলাম। সেটা ছিল মোনায়েম খান-আইয়ুব খানদের শাসনামলে। কী একটা ঝামেলার কারণে আমাদের বের করে দেওয়া হলো হল থেকে। আমি তখন থাকি ঢাকা হলে। হল যখন খুলল, আমি ফিরে এলাম আবার এ পথ ধরেই। রিকশায় ছিলাম। আমার রিকশাওয়ালা হাতে বেলি ফুলের মালা নিয়ে সে সময়কার হিন্দি ছবির গান গাইছে গলা খুলে। আমি আবার তারিফ করছি তার গানের। তো, রিকশাওয়ালা রাস্তা কমানোর জন্য আমপট্টির ভেতর দিয়ে রওনা দিল। আমার সঙ্গে ছিল বিছানা-বালিশ। সেই বাড়ির সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম বোধহয়। একটা অল্প বয়সী মেয়ে আমার রিকশার সামনে এসে হঠাৎ নাচতে-গাইতে লাগল। আমার রিকশাওয়ালা খারাপ ভাষায় গালি দিল মেয়েটিকে। মেয়েটি তখন বলল_ ‘ওরে আমার নাগর, একেবারে কাঁথা-বালিশ নিয়ে চইল্লা আসছে!’ এই পথের কথাও আমি ভুলব না।
পরিচিত পথের শেষে, পথের বাঁকে_ অনেক কথা, অনেক স্মৃতি থাকে। পথ মানুষকে ভুলে যায় কিন্তু মানুষ পথ ভোলে না। প্রতিদিনকার কর্মব্যস্ততা এবং গ্গ্নানির মাঝে আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই। পরিচিত পথে চলার মতো জীবনের পথেও চলতে হয় আমাদের নানা কিছুর মধ্য দিয়ে। জীবন ফুরায় কিন্তু রাস্তা ফুরায় না। নতুন নতুন রাস্তার মধ্য দিয়েই রচিত হয় নতুন কোনো গল্প, নতুন কোনো ইতিহাস।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ছদ্মবেশী রাজকুমার

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

আসাদ চৌধুরী- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...