শিকার

image_1677_257414একটা প্রচ- শব্দ।
গুলিটা আমার বন্দুক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দেখলাম দুটো পাখি উড়ে গেল আকাশে। আকাশে ঝলমল করছিল বিকালের সুন্দর রোদ্দুর; আর আরেকটি পাখি খসে পড়া তারার মতো পড়ল নিচে আমার চোখের আড়ালে, যে গাছটায় ওরা বসেছিল, তার নিচে, গাছের নিচে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, কারণ সামনে কয়েকটা ঝোপ চোখের সামনে দেয়াল তুলে আছে।
ছুটে গেল আমার চাপরাশি। হাতে তার ক্যানভাসের ব্যাগ আর ছুরি। আমি শিকার করতে ভালোবাসি। মফস্বলে এলে সরকারি অবসরে বন্দুকটা নিয়ে বের হই। আমার চাপরাশি শিকারের মাংস রান্না করে ভালো। জীবনটা এদিক থেকে একটি চমৎকার সুরে বাঁধা আমার।
কার্তুজের খোলটা বেরিয়ে এলো বন্দুকটা যখন ভাঙলাম; নতুন কার্তুজ নিলাম আরেকটা। আমার চোখ ঘুরতে লাগল ডাল থেকে ডালে। রোদটা মিঠে, তবু ছোট করে নিতে হচ্ছে চোখ। কখনো কখনো পাখিরা পাতা পত্তরে শরীর এমন ঢেকে বসে থাকতে পারে যে, আপনার সাধ্য কি তাদের ঠাহর করেন।
কিন্তু বড্ড দেরি করছে চাপরাশি। আর আমিও কোনো নতুন পাখি দেখছি না যে তাক করব; আমার চোখে ঘুরছে উঁচু ডাল থেকে ডালে, মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠছি। চাপরাশি নিশ্চয়ই পাখিটা ব্যাগে পুরে একটা বিড়ি ধরিয়েছে। তাকে বলতে হবে। বেলা পড়ে আসছে। হাতটা এখনো নিসপিস করছে আরো দু-একটা গুলি ছোড়ার জন্য। যে পাখিটা এই মাত্র আমার গুলিতে বিদ্ধ হয়ে পড়েছে, আমি তাকে স্পষ্ট দেখেছি একটা চমৎকার হরিয়াল।
চাপরাশি ফিরে এলে। বলল, কোথাও সে খুঁজে পেল না হরিয়ালটাকে। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল আমার মাথায়। আস্ত একটা কুড়ের বাদশা হয়েছেন। শহরে ফিরে গিয়ে দু-চার দফা জরিমানা না করলে আর তাকে দিয়ে কোনো কাজই করানো যাবে না। আমার স্ত্রী ঠিকই বলেন, চাপরাশিদের আমি বড্ড মাথায় তুলে রাখি।
আমি একটা বিচ্ছিরি গালি দিলাম, বললাম, চল আমি দেখছি।
সে আমার পেছনে পেছনে আসতে লাগল। যে গাছের ডালে হরিয়ালটা বসেছিল, তিরিশ গজ দূরেও হবে না। আমি আরো খানিকটা বকতে বকতে ঝোপগুলোর ভেতর দিয়ে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পথ করতে করতে এগিয়ে গেলাম। যখন এসে পৌঁছলাম, দেখলাম পাখিটা নেই; এমনকি এক ফোঁটা রক্ত কী একটা ঝরা পালকও চোখে পড়ল না আমার। ভাবলাম, গুলিবিদ্ধ হয়ে টেনেহিঁচড়ে পাখিটা নিজেকে নিয়ে গেছে অদূরের কোথাও! মিথ্যেই আমি তার ডাক শোনার জন্য কান খাড়া করে রইলাম। শোনা গেল না। আমার জেদ চেপে গেল তখন।
একটা কাঁচা কঞ্চির ডগা পড়েছিল। সেইটে দিয়ে পেটাতে লাগলাম লম্বা লম্বা ঘাস আর খাটো ঝোপগুলোর ভেতরে। তবু পাখিটাকে পাওয়া গেল না।
বিরক্তিটা গিয়ে বিস্ময় এসে আমাকে অভিভূত করে ফেলে। গাছের নিচে চারদিকে অন্তত ৫০ গজ জায়গা একেবারে তকতক করছে; অমন একটা আস্ত পাখি কেন, পাই পয়সা পড়ে থাকলেও পেতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। যেন ভোজবাজির মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে পাখিটা। বন্দুকের শব্দে আমি একটা বিভ্রমের মধ্যে দেখেছি একটা পাখিকে পড়তে?
চাপরাশি বলল, সেও দেখেছে পাখিটাকে গুলি খেয়ে পড়তে। আমার আবার রাগ হলো খুব। আমার মনে হলো সে আমায় তোষামোদ করছে আমি তাকে চুপ করে থাকার জন্য ধমক দিলাম, চলে এলাম সেখান থেকে।
এসে দেখি, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি গুলি ছুড়েছিলাম সেখানে আমার ফেলে দেয়া কার্তুজের খোলাটা হাতে নিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটা ছেলে। পরনে তার কিছুই নেই, গায়ে ঢিলেঢালা একটা জামা তার চেয়ে বড় কারো গায়ের; ছিঁড়ে যাওয়ার পর ওকে দিয়ে দিয়েছে হয়তো। মুখটা গোল, ভয়ে ভয়ে দেখছে আমাকে যেন আমি একবার চোখ তুলে তাকালেই সে মরে যাবে। আমি তাকে প্রায় না দেখেই চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম।
আমার চাপরাশি অস্পষ্ট শব্দ উঠল। তাকিয়ে দেখি ছেলেটার বুকের ওপর বাঁদিকে জামায় এক চোপ তাজা টকটকে রক্ত।
এক মুহূর্তের জন্য আমার পিঠ দিয়ে কে যেন একটা ঠা-া ছুরি টেনে নিয়ে গেল। মনে হলো, আমার বন্দুক থেকে গুলিটা যেন ছেলেটার বুকে গিয়ে লেগেছে_ চাপ বেঁধে আছে রক্ত। আমি বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। কিছু দেখতে পাচ্ছি না, শুনতে পাচ্ছি না; কিন্তু তার মধ্যেও দেখতে পাচ্ছি শুধু রক্তের ছোপ আর কানে এক অর্থহীন শব্দ যোজনার মতো শুনতে পাচ্ছি বহু দূরে খেয়া মাঝির ও-হো-হো ডাক।
ছেলেটা দৌড়নোর জন্য সামনে ঝুকল, আর তখন খাপ করে ধরে ফেলল আমার চাপরাশি। বিহ্বলতার ঘোর খান খান হয়ে গেল আমার। আমি চিৎকার করে বললাম, লাগাও ওকে দুটো, পাখিটা বের করে দিক।
বেরুল পাখিটা। খালের পাড়ে ওল্টানো এক চাঙড় মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল ছেলেটা। এখন আমার আর বুঝতে বাকি রইল না, পাখিটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে তুলে নিয়ে বুকের কাছে চেপে ধরে পালিয়েছিল। কিন্তু আমাদের গলার শব্দে ভয় পেয়ে পালাতে পারেনি।
মাথায় একটা চাঁটি মেরে তাকে তাড়ালো আমার চাপরাশি। তাকিয়ে দেখি সূর্যটা যে জায়গায় ছিল সেখানে আর নেই কোথাও নেই_ সন্ধ্যের লাল আলো ক্রমাগত নামছে।
ছেলেটা জামার খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে কুয়াশা পড়া অস্পষ্ট কতগুলো ক্ষেতের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
রাতে চমৎকার রাঁধল আমার চাপরাশি। তাকে জরিমানা করার কথা ভুলে গেছে কখন, বরং এই মুহূর্ত যদি সে বাড়িতে পাঠানোর জন্য কিছু টাকা চাইতো তো দিতাম। সে আমার বিছানাটা তৈরি করে দিল। সাদা সুন্দর চাদরে শরীর রেখে হাই তুলতেই ঘুম এলো আমার।
ছেলেটা এলো। আমি তাকে দেখতে লাগলাম। শ্যামল, করুণ, অস্পষ্ট তার মুখ, চোখ ভয়ার্ত বৃষ্টিভেজা মার্বেলের মতো টলটলে করছে; তার পরনে কিছু নেই; গায়ে একটা ঢিলেঢালা জামা-এক মাপ বড়; সে আমাকে আর ভয় করছে না; সে ক্রমাগত আমার কাছে আসছে_ যেন আর খানিকটা এলেই আমি তাকে একেবারে কোলের কাছে পেয়ে যাব।
চিৎকার করে উঠলাম আমি। তার জামায় বুকের কাছে বাঁদিকে রক্তে ছোট তাজা টকটকে। সে আর কাছে এলো না, দূরে গেল না, ঘুম থেকে উঠে দেখি, চাপরাশি লণ্ঠনটা বড় করে মশারি তুলে আমাকে ডাকছে আমি তাকে ভালো করে চিনতে পারছি না আর। পরদিন শহরে এসে আমি আমার বন্দুকের লাইসেন্সটা ফিরিয়ে দিলাম।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  স্বাদিত রবীন্দ্রনাথ

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সৈয়দ শামসুল হক- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...