জেনারেল ও নারীরা

fa1f65fecd16da108ec51742ce1e63b0-3তারানা একদিন অসময়ে, কোনো পাস ছাড়াই এসে হাজির পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভবনে।
গার্ড তাঁকে আটকে দেয়।
তারানা বলেন, ‘আমাকে ঢুকতে দাও। আমি চিত্রনায়িকা তারানা।’
‘আপনি তারানা হতে পারেন, কিন্তু বৈধ অনুমতি ছাড়া আমি আপনাকে ঢুকতে দিতে পারি না।’
‘তুমি জানো, আমি কে?’
‘আমি জানি না। জানলেও আমি আপনাকে কাগজ ছাড়া ঢুকতে দিতে পারতাম না। আমার চাকরি চলে যাবে।’
‘আচ্ছা, তুমি ভেতরে খবর দাও। প্রেসিডেন্টের এডিসিকে কল করো।’
গার্ড ফোন দেয় এডিসি সাহেবের নম্বরে। ‘স্যার, একজন ম্যাডাম এসেছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
‘দাও।’
‘হ্যালো, আমি তারানা…’
এডিসি বলেন, ‘দিন, গার্ডকে দিন।’
গার্ড বলে, ‘স্যার…’
‘ওনাকে ঢুকতে দাও।’
তারানা ভেতরে ঢোকেন।
সোজা চলে যান ইয়াহিয়ার কাছে।
ইয়াহিয়া তখন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত। তাঁর সামনে ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পররাষ্ট্রসচিব। তাঁকে বোঝাচ্ছেন ইরান সফরের সময় করণীয় কী।
তারানা বলেন, ‘আগাজি।’
সবাই চমকে ওঠেন।
ইয়াহিয়া সবার সামনে উঠেই তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘আগাজি, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। জরুরি।’
‘বলো।’
‘না। এখানে নয়। আড়ালে।’
তাঁরা ভেতরের ঘরে চলে যান।
‘বলো তোমার গোপন কথা।’
‘দেখো না, আকাশটা আজকে কত নীল। আমার বাগানে লাল রঙের দুটো গোলাপ ফুটেছে। আর তাতে দুটো বুলবুলি খেলা করছে। একজন আরেকজনের ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে আদর করছে। বলো, এমন দিনে কি না এসে পারা যায়।’
দুই ঘণ্টা পর তারানা বেরিয়ে যাচ্ছেন একই গেট দিয়ে।
এবার একই গার্ড তাঁকে বুট ঠুকে স্যালুট করল।
তারানা বললেন, ‘আস্তে স্যালুট মারুন, সিপাইজি। আপনার জুতা ফেটে যাবে। মাটি ব্যথা পাবে। কাউকে ব্যথা দিতে হয় না, সিপাইজি। আচ্ছা বলুন তো তখন আপনি আমার সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করলেন, আর এখন কেন এত ভালো ব্যবহার করছেন?’
গার্ড বলল, ‘তখন আপনি ছিলেন অভিনেত্রী তারানা আর এখন আপনি কাইয়ুমি তারানা (জাতীয় সংগীত)।’

.ইয়াহিয়ার স্ত্রী ফাকরা একদিন তাঁর পিন্ডির বাসা ছেড়ে চলে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট হাউসে। দুই সন্তান আলি আর ইয়াসমিনের বিয়ে হয়ে গেছে। এই মহিলা এখন থাকবে ধর্মকর্ম নিয়ে। না, এসে ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করলেন।
‘কী সমস্যা তোমার? বলা নাই কওয়া নাই তুমি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এসে হাজির।’
‘আপনার নামে লোকজন নানা কথা বলে।’
‘লোকজন? লোকজনের সঙ্গে তোমার দেখা হবে কেন?’
‘লোকজন মানে মহিলারা।’
‘মহিলারাই বা কেন তোমার সঙ্গে এত দেখা করবে?’
‘তারা আমার ভালো চায়। তারা বলে, আপনি অনেক মেয়েমানুষের সাথে মেশেন।’
‘আমি রাষ্ট্রপতি। আমার কাছে নানা ধরনের লোক আসবে। এটাই স্বাভাবিক।’
‘কিন্তু মহিলারা যে আসে?’
‘আমি মেয়েদেরও রাষ্ট্রপতি, ছেলেদেরও রাষ্ট্রপতি।’
‘তারা আপনার সাথে ঘুমায়?’
‘এক চড়ে বত্রিশটা দাঁত ফেলে দেব। আমার বয়স ৫২। দেশের চিন্তায় আমি মারা যাই। আমার ঘুমানোর টাইম আছে?’
‘ঘুমাতে হলে আপনি আমার কাছে আসবেন।’
‘আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আর তোমারই বা এই বয়সে এত ঘুমানোর সাধ হয় কেন? বাজারের মেয়েমানুষ হয়ে যাচ্ছ নাকি। যাও, বাড়ি যাও।’
ফাকরা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান তাঁদের বাড়িতে।
ইয়াহিয়ার পেরেশান লাগছে। তিনি বাঙালি নারীদের কোমর ধরে নাচবেন। ওপরওয়ালা তাঁর ইচ্ছা পূরণ করে দিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে দিলেন প্রবল বন্যা।
ইয়াহিয়া ডাকলেন তাঁর পাত্র-মিত্র, অমাত্যদের।
‘এই সুযোগ, আমি ইলেকশনের ডেট পিছিয়ে দিতে চাই।’
‘একেবারেই পিছিয়ে দিলে ভালো, স্যার।’
‘না, একেবারে পেছানো যাবে না। তিন মাস পেছাব।’
‘তিন মাস পেছালে কী লাভ হবে, জনাব।’
‘তিন মাস পেছালে আওয়ামী লীগ হয়রান হয়ে যাবে। মুজিবের টাকা শেষ হয়ে আসবে। তখন আর সে প্রচার-প্রচারণা করতে পারবে না। আমরা মুসলিম লীগ আর ইসলামি দলগুলোকে সহায়তা করব। তাতে তারা কিছু সিট বেশি পাবে। কেমন ভেবেছি?’
‘খুব ভালো, জনাব। আসলে আপনি যা ভাবতে পারেন না, স্যার! আপনার কোনো তুলনা নাই, স্যার।’
‘আমরা চাই ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। আমরা চাই দলগুলো কুকুরের মতো কামড়াকামড়ি করুক।’
‘আপনার এই বুদ্ধি দারুণ হয়েছে, স্যার।’
‘আমি ঢাকা যাব। বন্যা-উপদ্রুত এলাকায় রিলিফ ওয়ার্ক করব। তারপর মুজিবকে ডেকে চা খাওয়াব। সে তো আবার হুইস্কি খায় না।’
‘হুইস্কিটা স্যার আপনি ভুট্টোকে খাইয়ে যান।’
‘আচ্ছা, সেটাও তো একটা কথা।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  অন্য রকম

পিআইয়ের বিমান স্পর্শ করল ঢাকা বিমানবন্দর তেজগাঁওয়ের রানওয়ে।
বেরিয়ে এলেন প্রেসিডেন্ট। তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রটোকল অনুযায়ী দাঁড়িয়ে আছে সামরিক-বেসামরিক কর্তাদের দীর্ঘ সারি।
ইয়াহিয়া এবার আর কোট প্যান্ট টাই পরেননি। পরেছেন বুশ শার্ট। তাঁর বুকের বোতাম খোলা। সেখান দিয়ে তাঁর গোলাপি বুকের সাদা পশম বেরিয়ে এসেছে। তিনি আজকে কোনো রকমের হাসি-তামাশা করছেন না। একজন সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নির্বাচনের তারিখ কি পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে?’
‘কী? আপনি কী নিয়ে কথা বলছেন? আমরা সবাই ব্যস্ত বন্যা নিয়ে, কীভাবে বন্যার্ত মানুষকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে, আর আপনি আছেন নির্বাচন নিয়ে? এটা নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময়?’
লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। একজন ঢাকার ডিসি। তিনি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি এখানে কী করছেন? আপনার তো এখন থাকার কথা বন্যা-উপদ্রুত এলাকায়। মানুষের সেবা করার কথা। ত্রাণ তৎপরতার দেখভাল করার কথা? আর আপনি এখানে এসেছেন আমাকে সালাম করতে?’
ডিসি সাহেব থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলেন।
ইয়াহিয়া তাঁর শিংয়ের মতো উঁচিয়ে থাকা ভুরু কাঁপিয়ে ভেতরের হাসি দমন করলেন।
ঢাকার রাস্তাতেও পানি উঠে গেছে। ডুবে গেছে শহরের রাজপথও, কোথাও কোথাও।
ইয়াহিয়া একটা হুড খোলা জিপ নিলেন, পাশে বসালেন প্রদেশের গভর্নর আহসানকে। সব প্রটোকল ভেঙে তিনি রাজপথের পানিতে চাকা ডুবিয়ে পানি ছিটিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেখতে লাগলেন মানুষের দুর্ভোগ। গাড়ি চালাতে চালাতেই তিনি বললেন, ‘আহসান, আমি ইলেকশন পিছিয়ে দিতে চাই।’
‘স্যার?’ প্রশ্নবোধক চিহ্ন মুখে তুলে ১৯৭০-এর আগস্টের গরমে ঘামতে ঘামতে বললেন আহসান।
‘তাতে তিন মাস বেশি সময় পাওয়া যাবে। এখানকার ইসলামি দলগুলো প্রচারের সময় পাবে। আর রমজান এসে যাবে। রমজানের পরপরই ভোট হবে। তখন ইসলামি দলগুলো কিছু ভোট বেশি পাবে।’ তিনি তাঁর ফ্লাস্ক বের করে পানি খেলেন। পানি নয়, ভেতরে ছিল কনিয়াক।
ইয়াহিয়া গেলেন কুমিল্লায়। সেখানে তিনি উঠে পড়লেন রিকশায়। জলমগ্ন পথে রিকশা চলছে। জনতা ভিড় করল। কেউ স্লোগান দিয়ে উঠল, ‘আইয়ুব খান, জিন্দাবাদ।’
আইয়ুব খান যে আর ক্ষমতায় নাই, এর বদলে এসেছেন ইয়াহিয়া। এই জনতা তাও জানে না?
ইয়াহিয়া খান আশ্বস্ত বোধ করলেন। এরা এখনো অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষেই আছে। ভোট হোক। অসুবিধা নাই।
ঢাকায় ইয়াহিয়া বসলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে। তাঁকে বললেন, ‘১৬ হাজার ভোটকেন্দ্র, হাজার হাজার পোলিং অফিসার—এই অফিসারদের সবাই ব্যস্ত রিলিফ ওয়ার্ক নিয়ে—এর মধ্যে ভোট করব কীভাবে?’
শেখ মুজিব বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই ভোট পিছিয়ে দেবার কথা ভাবছেন না। ভোট যদি বানচাল হয়ে যায়, সমস্ত বাংলাদেশ অচল করে দেব।’
মনে মনে মুজিব হিসাব কষছেন, তাঁর এখনো কোন কোন এলাকায় যাওয়া বাকি। পূর্ব বাংলায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানে।
মুজিবকে বিদায় দিয়ে ইয়াহিয়া মেতে উঠলেন তাঁর নিয়মিত কৌতুকানন্দে।
নর্তকী এসেছে। নাচের আসর বসবে। মদের বোতল খোলা হচ্ছে সারি সারি। সন্ধ্যা নাগাদ এসে গেল পার্টি-কন্যারা।
বাঙালি নারীদের কোনো তুলনা হয় না। এরা পারেও।
দুই পাশে দুজন নারীকে বসিয়ে তাদের গাল টিপতে টিপতে ভাবলেন তিনি।
চার দিন পর আবার মুজিবের সঙ্গে বসেছেন ইয়াহিয়া। বললেন, ‘শেখ সাহেব, অক্টোবরে নয়, নির্বাচন হবে ডিসেম্বরে।’
মুজিব ইয়াহিয়ার চোখের দিকে তাকালেন। লোকটা কি আমাকে নিয়ে খেলছে? বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি। তাঁর আগের চিন্তা আবার মাথায় এল। নির্বাচন না হলে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। গেরিলাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।
ইয়াহিয়া বললেন, ‘ডিসেম্বরের ৭ তারিখে ভোট হবে।’
মুজিব খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে। ডিসেম্বরের ৭ই সই। কিন্তু এরপর যেন নির্বাচন পেছানো না হয়।’
ইয়াহিয়া তাঁর ভেতরের খুশি ভেতরে আটকে রাখতে পারছিলেন না। তিনি বললেন, ‘মুজিব, তুমি লোকটা ভালো।’
মুজিব বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া নির্দেশ দিলেন, ‘কালকের ওই মহিলাটাকে খবর দাও।’
‘কোনটাকে স্যার?’
‘ওই যে?’
‘লম্বা হিলহিলেটা, স্যার?’
‘না। না।’
‘মোটা করে, বেঁটে করে।’
‘না না।’
‘কালো করে, চিবুকের মাঝখানে কাটা?’
‘না না।’
‘ছেলেদের মতো দেখতে। একটু গোঁফ আছে?’
‘আরে না…’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  মা-শালিকের জন্য শোকগাথা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

আনিসুল হক- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...