একটু উষ্ণতার জন্য-১১

২৫-২৬. আমি তৈরি হয়ে

আমি তৈরি হয়ে বাড়ির বাইরে বসেছিলাম।
এখন সকাল আটটা বাজে।
একটা ট্যাকসি আসার কথা আছে। এলে তাতে রাঁচী যাব। ছুটির কাছে। প্যাটও বলেছে সঙ্গে যাবে, ওর নাকি কি দরকার আছে রাঁচিতে।
আমি আজ রাতেই ফিরে আসব শুনে ও বলেছিল ও-ও যাবে।
ট্যাকসিটা এসে গেলে, প্যাটকে তুলে নিয়ে যাব।
সে-রাতে যখন বাঁশী বাজিয়ে, আলো জ্বালিয়ে রাঁচী-হাওড়া এক্সপ্রেসটা রাঁচী স্টেশান ছেড়ে চলে গেল, তখন আমার বুকের মধ্যে থেকেও একটা নিঃশব্দ নরম ট্রেন, যে এতদিন অন্ধকারে সাইডিং-এর অস্পষ্টতার মধ্যে দাঁড়িয়েছিল এবং যে ছিল বলে ইদানীং বুঝতে পর্যন্ত পারতাম না, সেও রমার ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল।
সে এতদিন আমার ছিল বলেই বোধহয় সে যে ছিল এ-কথা কখনও মনে হয়নি। যে-মুহূর্তে সে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল, সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম যে, জীবনে এমন অনেক থাকা থাকে যা থাকাকালীন তাদের অস্তিত্ব বা দাম আমরা বুঝতে পারি না। হয়ত কেউই পারে না। যখন তা আর আমাদের থাকে না, তখনই টুকরো টুকরো কথা, বাসি ফুলের গন্ধের মত চাপা স্মৃতি ফিরে ফিরে মনে আসে। মনে না আসলে, যে-কোনো বিচ্ছেদই অনেক সুখকর হত। কিন্তু আমরা যতই কঠোর স্বার্থপর বা আধুনিক হই না কেন, তবুও তা আসে। স্মৃতির ফেউ কিছুতেই দ্রুতধাবমান অনিশ্চয় বর্তমানের পিছন ছাড়ে না।
এখন এ-দেশেও অসংখ্য বিবাহিত দম্পতির ছাড়াছাড়ি হয়, নানা কারণে। আমি জানি না, যাদের জীবনে এ-অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাঁরা কি বলবেন। কিন্তু আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতায় এইটুকু বলতে পারি যে, খারাপতম সঙ্গী বা সঙ্গিনীকেও হারিয়ে ফেলা নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে দেওয়ার পরও মনে বড় কষ্ট লাগে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, যা কখনও ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলা যায় না। সেই সম্পর্কটা যখন হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, তখন অত্যন্ত নির্দয় মানুষের মনও দারুণভাবে দ্রবীভূত হয়ে পড়ে। অথচ সম্পর্ক যখন শেষ হয় নিজেদের ইচ্ছায়, তখন তা নিয়ে কিছুমাত্র খেদ থাকার কথা নয় কারো মনেই, অথচ আশ্চর্য! তবুও খেদ থাকে। বড় খেদ থাকে।
এক সময় ট্যাকসিটা সত্যি সত্যিই এল। এ্যাটাচিটা তুলে নিয়ে ট্যাকসিতে উঠে বসলাম।
প্যাটের বাড়ির সামনে প্যাট দাঁড়িয়েই ছিল। গায়ে ওর সেই উইন্ড-চিটার, পরনে থাকি ফুল প্যান্ট, হাতে একটা বাজারের থলে। প্যাট ট্যাকসিতে উঠে আমার পাশে বসল। ক্রাচ দুটোকে পায়ের কাছে শুইয়ে রাখল।
ট্যাকসি ছুটে চলল অসমান জঙ্গলের পথ দিয়ে রাঁচীর দিকে। আমরা দুজনেই চুপচাপ বসেছিলাম। কারোরই বোধহয় কথা বলতে ইচ্ছা করছিল
। হঠাৎ প্যাট বলল, লুসিটাকে বোধহয় আর বাঁচানো যাবে না।
শুধোলাম, কেন? ওর ঘা শুকোয়নি?
প্যাট বলল, না, সেজন্যে নয়। ওর মরার সময় হয়েছে বলে। এত বয়স হয়ে গেছে লুসির যে, এমনিই আর বাঁচবে না। কাল থেকে ত কিছু খাচ্ছে না। চুপ করে শুয়ে থাকে। ডাকলে জবাব দেয় না। মাঝে মাঝে শুধু চোখ মেলে চায়, এক মুহূর্তের জন্যে; তারপরই আবার চোখ বুজে ফেলে।
-কোনো ভেটকে কি দেখিয়েছ?
–এখানে আর ভেট কোথায়। তবে ডেকে এনেছিলাম আমার এক বন্ধুকে, সে এসব বিষয়ে জানে শোনে। সেই বলল, কোমা সেট করে গেছে-ও আর বাঁচবে না। ওর অন্তিম সময় এসে গেছে।
–তাহলে?
তাহলে আর কি? ওকে দেখাশোনা করার জন্যে বলে এসেছি। আমি ফিরে আসা অবধি যদি বেঁচে থাকে তাহলেই যথেষ্ট জানব। দেখি কি হয়।
তারপরই প্যাট বলল, একটা আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করলাম জানো?
বললাম, কি?
আশেপাশের বাড়ির যতগুলো মদ্দা কুকুর আছে তারা সবাই লুসি আসার পর পরই লুসির খোঁজ নিতে এসেছিল।
–আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, বল কি? তাই নাকি?

–প্যাট বলল, হ্যাঁ, তাই। তবে কি জানো, কেউ-ই দ্বিতীয়বার আর ফিরে আসেনি।

–কেন? এবার অবাক হয়ে শুধোলাম আমি।

প্যাট একবার আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল, তারপর বলল Because, they are the sons of bitches। এল, দৌড়ে দৌড়ে এল, লুসির চারপাশে ঘুরল। তারপর লুসির কাছ থেকে কিছু পাওয়ার নেই বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কোনো যুবতী কুকুরীর খোঁজে উধাও হয়ে গেল। সব কটা। একসঙ্গে।

আমি চুপ করে রইলাম অনেকক্ষণ। প্যাটও চুপ করে রইল। আমি এবং প্যাট আমরা দুজনে দুদিকের জানালায় তাকিয়ে দুজনের পৃথক পৃথক অনেক ব্যবধানের চিন্তার মাঠে চেয়ে রইলাম।

অনেকক্ষণ পর প্যাট বলল, তোমার কতক্ষণের কাজ রাঁচীতে?

আমি বললাম, আমার জন্যে ভেবো না, তোমার যতক্ষণ লাগবে ততক্ষণই সময় নিতে পারো। আমার জন্যে তাড়া কোরো না। তুমি ত আর রোজ রোজ আসো না রাঁচীতে, তোমার যা কাজকর্ম, তা সব শেষ করে নিও। বিকেলের দিকে ফিরব। ঠিক আছে?

ও বলল, তাহলে ত খুবই ভালো হয়। আমার অনেকের সঙ্গে দেখা করার আছে।

আমি বললাম, আমি ত একদিন না একদিন কোলকাতায় ফিরে যাবই। আজ আর কাল। তুমি একবার কোলকাতা এসো। আমার কাছে থেকে যাবে কদিন। তুমি শেষ কবে কোলকাতায় গেছ?

প্যাট সিগারেটটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে বলল, ওঃ সে অনেক দিনের কথা। যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় দুদিন ছিলাম। তা বছর তিরিশের কাছাকাছি হতে চলল। সেই টমি আর আমেরিকান সাদাকালো সোলজার এবং ওয়াকাই ভরা কলকাতার সঙ্গে আজকের কলকাতার নিশ্চয়ই মিল নেই কোনো।

বললাম, একবার এসো। নিজের চোখেই দেখে যাও।

প্যাট বলল, আসব।

দেখতে দেখতে আমরা চামার মোড়ে এসে পীচ রাস্তায় পড়লাম। সেখান থেকে বিজুপাড়া, মান্দার হয়ে রাঁচী।

ফিরাইলালের চওকএ এসে যখন ট্যাকসি মেইন রোড ধরে ডুরান্ডার দিকে এগোতে লাগল, আমি তখন প্যাটকে বললাম, তোমাকে একটা জিনিস প্রেজেন্ট করতে চাই।

প্যাট অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে। বলল, হঠাৎ অব অল পার্সনস্ আমাকে প্রেজেন্ট? ওসব অভ্যাস আমার বহু দিন হল নষ্ট হয়ে গেছে, কেন আবার ভুলে যাওয়া অভ্যেসকে জাগাবে। বেশ ত আছি এমনি একা একা ভুলে থাকা জীবন নিয়ে।

আমি বললাম, এটা আমার আনন্দের জন্যে করছি, মনে করব। তোমার আনন্দের জন্যে নয়। বল? কি নেবে?

প্যাট একটু ভাবল। তারপর বলল, প্রেজেন্টই যদি দেবে ত পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা প্রেজেন্ট দিও।

সেটা কি?

প্যাট আবার হাসল। বলল, এক বোতল স্কচ্ হুইস্কী। তিরিশ বছর আগে খেয়েছিলাম, তারপর আর খাইনি।

আমি হাসলাম, বললাম, ফেয়ার-এনাফ। তারপর বললাম, কোনো পার্টিকুলার ব্রান্ডের উপর দুর্বলতা আছে?

ও বলল, আরে না না, স্কচ হলেই হল। এমনি স্কচ ইজ গুড এনাফ ফর মি।

ট্যাকসিটা তখন বাজারের কাছে গুপ্ত ব্রাদার্সের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।

ট্যাকসি দাঁড় করিয়ে প্যাটের জন্যে একটা হুইস্কী কিনলাম। শুধু জন হেইগ ছিল দোকানে। জন হেই-ই নিলাম এক বোতল। আর ছুটির জন্যে কিছু ক্যাডবেরীর ক্রিস চকোলেট কিনলাম।

প্যাট বলল, ও এই বাজারেই নেমে যাবে। কথা হল, বিকেল পাঁচটা নাগাদ ফিরাইলালের চওকের সামনে ও দাঁড়িয়ে থাকবে। আমিও ওখানে পৌঁছব। তারপর একটা ট্যাকসি নিয়ে ফেরা যাবে।

ছুটির বাড়ির সামনে ট্যাকসিটাকে যখন ছেড়ে দিলাম, তখন বেলা পৌনে এগারোটা বাজে।

দারোয়ানের সঙ্গে দেখা হল। সে ছুটির বুনে-দেওয়া সোয়েটার গায়ে দিয়ে খাটিয়ায় বসেছিল।

আমি শুধোলাম, দিদিমণি আছেন?

ও বলল, হাঁ আছেন। চলে যান উপরে।

জানি না, কেন, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে আমার ভারী ভয় করছিল। মনের মধ্যে একরাশ ভাবনা ভিড় করে আসছিল।

যেদিন রমাকে তুলে দিতে আসি রাঁচী স্টেশানে, সেদিন ফেরার পথে ট্যাকসি নিয়ে ছুটির বাড়ি অবধি এসেছিলাম। বাড়ির হাতায় অনেক অনেকক্ষণ ট্যাকসি দাঁড় করিয়ে ছুটির দোতলার ঘরের দিকে চেয়ে ট্যাকসির মধ্যেই বসেছিলাম। ওর ঘরের দরজা খোলা ছিল। আলো জ্বলছিল ঘরে। খুব ইচ্ছা করছিল, উঠে গিয়ে যাচাই করে আসি রমা যা বলেছিল তা সত্যি কি না। জেনে আসি নতুন করে যে আমার ছুটি, আমার জন্ম-জন্মের ছুটি শুধু আমার, আমার একারই আছে।

কিন্তু পারলাম না। সেদিন আমার গায়ে এমন জোর ছিল না যে, দোতলায় উঠি।

সে রাতে রমাকে বিদায় দেওয়ার পর আমার মন এমনিতেই এত বিষণ্ণ ও ক্লান্ত ছিল যে, সেদিন নতুন করে আর কোনো ধাক্কা সইত না হয়ত।

সিঁড়ি পেরোতে পেরোতে ভাবছিলাম যে, সেদিন যাইনি ভালোই করেছি, কারণ সেদিন আমার নিজের উপর আর কোনো বিশ্বাস ছিল না। গিয়ে যদি দেখতাম যে রমা যা বলেছে, তা সত্যি, তবে আমি কি করতাম নিজেই জানি না। রমা আমাকে যাই-ই বলুক, আমার সমস্ত মন বার বার বলেছলি যে, সেকথা সত্যি নয়। আমি ত কোনো ক্ষতি করিনি কারো। ভালো ভেবেছি, ভাল করেছি; ভালোবেসেছি। তবে কেন ছুটি আমাকে এমন করে শাস্তি দেবে? আমি যে ভগবান মানি; ভগবান থাকতে এমন কি হতে পারে?

এ কদিন ম্যাকলাকসিগঞ্জে একা একা সকালে-বিকেলে জঙ্গলের পথে হেঁটে নিজেকে বার বার একই প্রশ্ন শুধিয়েছি। এও কি সম্ভব? আমার জীবনের শেষ ও একমাত্র অবলম্বন ছুটিও কি আমাকে এমন ধুলোয় ফেলে যাবে? আকাশের তারাদের জিজ্ঞেস করেছি একা একা। বলেছি, তোমরা বল, তোমরা জবাব দাও আমার জন্মলগ্নে তোমরা কে কে সাক্ষী ছিলে- কোন্ অপয়া তারার সমষ্টি তোমরা? কোন্ ব্যর্থ সর্বনাশা পরিমণ্ডল?

কোনো জবাব মেলেনি তাদের কাছ থেকে।

তবে নীরবতাও একরকমের জবাব। প্রত্যেক নীরবতার মধ্যেই অনেক সশব্দ সাহসী উত্তর চাপা থাকে। সেই উত্তরের মধ্যে আমি জেনেছিলাম যে, আমার মন যা বলছে তা ঠিক। আমার ছুটি কখনও এতখানি খারাপ হতে পারে না। এত বোকা হতে পারে না। কোনো দারুণ অভিমানে ভর করেও সে এমন অভিশাপ আমাকে কখনোই দিতে পারে না যে, সে বিষয়ে আমার মন নিঃসন্দেহ ছিল।

ভাবতে ভাবতে কখন যে ছুটির দরজায় পৌঁছে গেছি বুঝতেই পারিনি।

বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি কড়া নাড়লাম।

ভিতরে কেউ আছে বলে মনে হল না।

অনেকক্ষণ পর ছুটির সেই মহিমাময়ী লোকাল গার্জেন এসে দরজা খুলল। নীরস কণ্ঠে বলল, দিদিমণি কাজে গেছেন। তিনটের সময় ফিরবেন।

তারপরই কি ভেবে সে দয়াপরবশ হয়ে বলল, আপনি কি বসবেন?

আমার যা জানার তা স্পষ্টভাবে জানার কোনো উপায় ছিল না ওর কাছ থেকে।

আমি ঘুরিয়ে বললাম, বাড়িতে আর কেউ নেই?

ও বলল, এ সময় আমি ছাড়া আর কেউ ত থাকে না।

আমি বললাম, ও।

তারপর বললাম, আমি তাহলে বসি একটু।

ও বলল, এখানে বসলে তিনটে অবধি বসতে হবে। আমি ত আজ এক্ষুনি চাবি বন্ধ করে চলে যাব। দিদিমণির কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে, দিদিমণি যখন আসবে তখন ঘর খুলে ঢুকবে। অতক্ষণ কি আপনি বসবেন?

আমি বললাম, না, তাহলে আমি ঘুরেই আসছি। বলেই চলে এলাম।

চলে এলাম বটে কিন্তু আমার এখানে যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। চেনাপরিচিত লোক অনেক ছিল, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে কারো কাছেই যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না আমার।

এগারোটা থেকে বেলা তিনটে অবধি রাঁচী শহরের এই শান্ত নিরিবিলি কোণে আমি ঘুরে বেড়ালাম। সাইকেল রিক্সার ঘণ্টা, ক্কচিৎ মোটরের হর্ন, কিছুই যেন আমার কানে লাগছিল না। পথের ধুলো, পথচারীদের কথাবার্তা, মন্থর গরুর গায়ের গুঁতো এ সমস্ত আমি সেদিন অবলীলায় অগ্রাহ্য করেছিলাম। কার আমি জানতাম এই সমস্ত শীতার্ত ধূলিমলিন নৈর্ব্যক্তিক উদাসীনতার পরই আমি এক দারুণ উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত হব।

আমার এত বয়স হয়েছে, জীবনে কত শত ঝড়ঝাপটার মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে ছোটবেলা থেকে, তবু আজকে আমার মনের যা অবস্থা তার মত কোনো অবস্থায় আগে কখনও পড়িনি। এমন অসহায় কখনও বোধ করিনি। কখনও জানিনি যে, আমাদের সমস্ত সুখ, সমস্ত অস্তিত্ব এত পরনির্ভর। এমন নিশ্চয় করে কোনোদিনও বুঝিনি যে, একজনের নরম হাত এবং ভালোবাসার ঘরের অভয়ারণ্যের ভরসাতেই দিনরাত শিকারীর তাড়া-খাওয়া সম্বরের মত আমরা বেঁচে থাকি। আমরা প্রত্যেকে।

বড়লোকের ছেলে বলতে যা বোঝায় তা আমি কখনও ছিলাম না। তাই অন্য দশজন আত্মসম্মানজ্ঞানী ও আত্মবিশ্বাসী পুরুষমানুষের মত নিজের পায়ে দাঁড়াতে, নিজের অধিকারে এ জীবনে অধিষ্ঠিত হতে প্রতিদিনই অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। সেসব পরীক্ষাকে আমি কখনও ভয় পাইনি। কিন্তু ফেইলিউরস্ আর দি পিলারস্ সব সাকসেস্। এ কথাটা জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সমস্ত প্রার্থিত বস্তুরই কোনো-না-কোনো বিকল্প থাকে। কিন্তু ছুটিকে আমার, চিরদিনের মত আমার করে পাওয়ার যে প্রার্থনা আজকের, তার কোনো বিকল্প আমার জানা নেই। আমার জীবনের একটা বড় অধ্যায়ের শেষ হয়ে গেছে সেদিন রমা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ভালো করেছি কি মন্দ করেছি বুঝিনি, শুধু জেনেছি যে, ছুটির হাত ধরে আমি নিশ্চয়ই এক নতুন তরুণ সুগন্ধী জীবনে প্রবেশ করব। তারপর খুব ভালো লিখব আমি। যারা আমার লেখা পড়বে, তাদের খুশি মনই হবে আমার সবচেয়ে বড় শিরোপা। লেখার মধ্যে আমি প্রমাণ করব যে, একজন ভালো মেয়ের অকৃত্রিম, আন্তরিক, ভণ্ডামীহীন ভালোবাসা আমার মত একজন সাধারণ লোককেও সত্যিকারের বড় লেখকে পরিণত করতে পারে। তাছাড়া একথা যে আমি চিরদিন বিশ্বাস করে এসেছি, জেনেছি প্রেম একজনকে কি না দিতে পারে। কি না নিতে পারে অন্যজনের কাছ থেকে? ভালোবাসাকেই যে আমার জীবনের একমাত্র সঞ্জীবনী সুধা বলে জেনে এসেছি আমি এতদিন। ভালোবাসার মত এমন অন্য কোনো বোধের প্রতিই ত আমি এমন করে সমর্পিত হইনিবরঞ্চ ভালোবাসার জন্যে অন্যসব বোধকে জলাঞ্জলি দিতে রাজী হয়েছি। চিরদিন; চিরদিন।

এখন সময় বড় ভারী হয়ে বসে আছে আমার ভীরু বুকের উপর। একটা পুরী-তরকারীর দোকানে বসে একটু সময় নষ্ট করলাম। দুটো পুরী-তরকারীও খেলাম।

খেতে খেতে ভাবছিলাম, ছুটি বোধহয় জানে না, ছুটি বোধহয় এখনও জানে নি, ওর উপরে এ জীবনে আমি কতখানি নির্ভর করেছিলাম।

আবার ভাবছিলাম, এতদিনেও এ কথা কি না জেনে ও পারে? ও ত বোকা নয়। আমার সেই সময়-চাওয়া চিঠিটা ত শুধু আমার সুস্থ ভদ্রতাই প্রকাশ করেছিল। ছুটির কাছে যে কোনোরকম মালিন্য নিয়ে আমি পৌঁছতে চাইনি। ও যেমন চিরদিন ওর মনে চিলকার রাজহাঁসের মত নিষ্কলঙ্ক, আমিও যে তাকে তেমনি নিষ্কলঙ্কতার মধ্যেই বুকে পেতে চেয়েছিলাম। কোনোরকম সংশয়, দ্বিধা, কোনোরকম কিন্তু-কিন্তু বোধ যেন আমাদের পরিপুঁতিকে বিঘ্নিত না করে, আমি যে শুধু তাই-ই চেয়েছিলাম।

মুখ ধুয়ে উঠে একটা সিগারেট ধরিয়ে খুচরো পয়সা ফেরত নিতে নিতে নিজের মনেই বলে উঠলাম, না না। এ হতে পারে না। ছুটি কখনও অমন হতে পারে না। এ সম্ভব নয়।

দোকানী অবাক হয়ে বলল, ইতনাই তা হুয়া বাবু। আপসে দাম জাদা নেহি লিয়া।

লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি পয়সা পকেটে ফেলে আবার পথে বেরিয়ে পড়লাম।

আমি যখন ছুটির বন্ধ দরজার সামনে আবার এসে দাঁড়ালাম তখন সোয়া তিনটে বেজেছে।

দরজার কড়া নেড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হল যেন কত যুগ পেরিয়ে গেল।

বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি মনে মনে বলছিলাম, ও ছুটি, ও আমার জন্ম-জন্মের ছুটি, তুমি কি কখনও শুনতে পাও তোমাকে আমি কত ডাকি, কতবার ডাকি। তুমি কি কখনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানলায় এসে দাঁড়াও, জানালায় দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে তুমি কি একবারও জানতে পাও যে একজন হতভাগা লোক তার গোলমেলে রুক্ষ জীবনের মধ্যে এই রাতের জানালায় দাঁড়িয়ে তোমার দিকে, তোমার ধ্রুবতারার মত নীল ও শান্ত সহজ সত্তার দিকে চেয়ে আছে। সে তোমাকে তার জীবনে অনুক্ষণ যেমনভাবে উপলব্ধি করে, তোমার অস্তিত্ব তার সমস্ত মনকে যেমন করে প্রতি মুহূর্ত আচ্ছন্ন করে রাখে, তুমি কি তাকেও তেমনি করে উপলব্ধি কর? নাকি কখনও করো না ছুটি? কখনও বোঝ না, সে তোমাকে এ জীবনে কি দিয়েছিল।

ভাবছিলাম, এ জীবনে সকলের প্রেমের প্রকাশ একরকম নয়। কিন্তু প্রেম প্রেমই। তোমার প্রেমে কোনো দ্বিধা নেই, ধারালো ইস্পাতের মত তোমার মন। কিন্তু তুমিই তাই বলে কি কারো নরম ভালোবাসায় জরজর অন্তর্মুখী নরম মনকে কোনো মুহূর্তের অভিমানে দ্বিখণ্ডিত করতে পারো? তুমি কি এতই নিষ্ঠুর ছুটি?

হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল।

দেখলাম, ছুটি দাঁড়িয়ে আছে। ছুটি হাসছে, ওর সহজ, সরল, সংস্কারহীন হাসি।

ছুটি বলল, সুকুদা। আসুন আসুন। কি ব্যাপার? পথ ভুলে?

ছুটির পিছন পিছন ওর ঘরে ঢুকলাম।

ও তখনও অফিসের জামাকাপড় ছাড়েনি। বোধহয় এক্ষুনি এসেছে।

কি ভেবে ছুটি বলল, বসুন। এক সেকেণ্ড। আমি এক্ষুনি আসছি।

এর আগে কখনও ছুটির কাছে এসে বাইরের লোকের মত আমার বাইরের ঘরে বসে থাকতে হয়নি। এই প্রথম আমি বাইরের ঘরে বসলাম।

দু-এক মিনিট পরেই ছুটি ডাকল, বলল, আসুন এইবার এই ঘরে। একটু বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি।

ছুটি বোধহয় শাড়ি ছাড়ছিল।

ছুটির ঘরে ঢুকে আবার ছুটির ঘরে বসে আমার মন নতুন করে আশ্বস্ত হল, খুশিতে ঝলমল করে উঠল। আমার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, রমা, তুমি একটা সস্তা অবাস্তব মিথ্যে কথা বলে নিজেকেই শুধু আমার কাছে ছোট করলে, ছুটির কাছেই ছোট হয়ে গেলে নিজে। বলতে ইচ্ছে করল, এ ঘরকে ছুটি কেবল আমারই করে রেখেছে; রাখবে চিরদিন। আর সকলে এখানে আসতে পারে যতবার খুশি, বসতে পারে বাইরের ঘরে কিন্তু তাদের সীমা এ ঘরের বাইরের চৌকাঠ পর্যন্ত। তার বেশি নয়।

বারান্দায় টুং-টাং শব্দ হচ্ছিল।

আমি বসেছিলাম।

হঠাৎ আমার চোখে পড়ল বেড সাইড টেবলে একটা বইয়ের উপর। বইটায় পেজমার্ক দেওয়া ছিল। বইটি হাতে তুলে নিয়ে দেখলাম, রবীন্দ্রনাথের বই।

যেখানে চিহ্ন দেওয়া ছিল সে জায়গাটা খুললাম। খুলে পড়তেই দেখলাম ছুটি আন্ডারলাইন করেছে সানাই থেকে।

প্রত্যেক মানুষেই আছে একজন আমি, সেই অপরিমেয় রহস্যের অসীম মূল্য জোগায় ভালোবাসায়। অহংকারের মেকি পয়সা তুচ্ছ হয়ে যায় এর কাছে। ওর নিখিল জগতের মর্মস্থান অধিকার করে আছি আমি, সেজন্যে আমাকে আর কিছু হতে হয়নি সাধারণ জগতের যে-কেউ হাওয়া ছাড়া। সাধারণকেই অসাধারণ করে আবিষ্কার করে ভালোবাসা।

আবার আন্ডারলাইন করেছে,

মনের কথা সে বোঝে না তা নয়; কিন্তু তার বিশ্বাস ও সমস্তই প্রভাতে মেঘডম্বরম, বেলা হলেই যাবে মিলিয়ে। ঐ খানেই আমার মতের অনৈক্য। খিদে মিটতে না দিয়ে মেরে দেওয়া যায় না তা নয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন পাত পড়বে তখন হৃদয়ের রসনায় নবীন ভালোবাসার স্বাদ যাবে মরে। মধ্যাহ্নে ভোরের সুর লাগাতে গেলে আর লাগে না। হায়রে… বিবেচনা করার বয়স ভালোবাসার বয়সের উল্টোপিঠে।

বইটা জায়গায় রেখে দিয়ে আমি মুখ নীচু করে বসে রইলাম।

এমন সময় ছুটি কি যেন বলল বারান্দা থেকে।

আমি শুধোলাম, কি বলছ?

ও বলল, বলছি এখানে আসুন না বারান্দায় এখনও রোদ আছে। এখানেই চা খাব। চলে আসুন।

বারান্দায় পা দিতেই আমার চোখ দুটো চমকে উঠল। দেখলাম বারান্দার দড়িতে ক্লিপ করা অবস্থায় একটা পুরুষের আণ্ডার-ওয়ার ঝুলছে, তার পাশে একটা চকরা-বকরা স্লিপিং-সুট।

ছুটির চোখ পড়েছিল আমার চোখে।

ছুটি মুখ তুলে বলল, কি হলো? বসুন, ক চামচ চিনি দেব বলুন?

আমার কাছ থেকে ছুটি জবাব পেল না। তাই নিজের খুশিমত চিনি দিয়ে চা বানিয়ে, প্লাম কেক কেটে, কাজুবাদাম সাজিয়ে খাবারের প্লেট আর চা এগিয়ে দিল আমার দিকে।

বলল, খান। আর খেতে খেতে গল্প করুন। তারপরেই বলল, কতদিন পরে আপনাকে দেখলাম।

আমি তবুও কোনো কথা বললাম না দেখে ছুটি বলল, আমি জানি আপনি কি ভাবছেন। কিন্তু আপনার ত অবাক হবার কথা নয়। রমাদি আপনাকে সব বলেন নি? আপনার স্ত্রী ত আপনার হয়ে আমার কাছে অনেক ওকালতি করে গেলেন সেদিন। যতভাবে যতখানি অপমান করা যায় করলেন নতুন করে। আপনাকে কোন কুক্ষণে ভালোবেসে ফেলেছিলাম জানি না। যা যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। আপনি ত এই-ই চেয়েছিলেন। তাই না?

তারপর ছুটি বলল, রমাদি বললেন যে, পরদিনই আপনার কাছে যাচ্ছেন। কেন? রমাদি যাননি?

তবুও আমি উত্তর না দেওয়ায় ছুটি অত্যন্ত বিরক্তির গলায় বলল, সুকুদা, চুপ করেই থাকবেন ত এতদূর কষ্ট করে এলেন কেন? আপনার কি কিছুই বলার নেই? যা বলার আছে সব আমি শুনতে রাজী আছি। আপনি বলতে পারেন। বলুন, কথা বলুন।

আমি বললাম, রমা আমাকে বলেছিল।

তবে? তবে আর এত অবাক হওয়া কেন? আপনার ত তৈরী হয়েই আসা উচিত ছিল। কি? তাই না?

বললাম, হ্যাঁ। তাই। তবে আমি কথাটা বিশ্বাস করিনি।

ছুটি হেসে উঠল। বলল, বিশ্বাস করেন নি কেন? আপনার মত লোকের ত স্ত্রীর কথা অবিশ্বাস করা উচিত নয়।

আমি ছুটির মুখের দিকে তাকালাম, কিন্তু আমার মনে হল এ ছুটি নয়; এ অন্য কেউ। একে আমি কোনোদিনও চিনতাম না।

রাগলে ছুটিকে একটুও ভালো দেখায় না।

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম।

তারপরে বললাম, তুমি কি সুখী হয়েছ?

ছুটি বলল, তা জেনে আপনার কি কোনো দরকার আছে সুকুদা? আপনি ত সুখী হয়েছেন। তা হলেই হল। স্বামী-স্ত্রীতে মিলন হয়েছে এর চেয়ে সুখের কি থাকতে পারে। আমার কাছে আপনার একা আসা উচিত হয়নি। আপনার মত গোঁড়া সংস্কারবদ্ধ লোকদের কখনোই উচিত না স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে এমন একা একা দেখা করতে আসা।

আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। অথচ এটুকু আমার বোঝা উচিত ছিল যে, এমন হতেও পারে।

আমি বললাম, তোমার স্বামী কে?

ছুটি এবার হাসল। বলল, আমি বিয়ে করিনি। বিয়ের মত মান্ধাতার আমলের সম্পর্কে আমি কখনও বিশ্বাস করিনি। উই আর লিভিং টুগেদার। দ্যাটস্ অল। যত দিন ভালো লাগে থাকব। যখন ভালো লাগবে না, সুটকেস হাতে করে বেরিয়ে পড়ব।

আর ছেলেমেয়ে? তাদের কি হবে? বললাম আমি।

ছুটি বলল, ছেলেমেয়ে চায় কে? আমি চাই না। আমি আমাকে সবচেয়ে ভালোবাসি। আমার সব সুখকে। আমার শরীরের সুখ, আমার মনের সুখ। অন্য কারো জন্যেই আমি আমার জীবনের কোন আনন্দ নষ্ট করতে রাজী নই। আমি স্বার্থপর।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, তবু, তুমি যার সঙ্গে আছ, সে কে?

ছুটি বলল, এমন কেউ নয় যে নাম করলেই চিনবেন। আপনার মত কেউ নয়। আমারই মত সে। একজন সাধারণ লোক।

আবার বললাম, সে কে?

ছুটি বলল, রুদ্র। রুদ্র রায়। আপনি কি চিনলেন? তাহলে নাম জেনে লাভ কি আপনার? তারপরই ছুটি বলল, বলুন, আপনার কি কি জিজ্ঞাসা আছে?

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, আমাকে আর একটু সময় কি তুমি দিতে পারতে না? তা যদি পারতেই না, তবে এতদিন আমাকে দিলে কেন?

ছুটি হাসল। বলল, সুকুদা, আপনি লেখক মানুষ, এত জানেন, আর এটুকু জানেন না? সময় কেউ কাউকে দিতে পারে না। তারপর একটু থেমে বলল, ভরা নদীতে কি করে ব্রিজের পিলার তৈরী করে দেখেছেন কখনও? চার দিকের জল আগে পাম্প করে তুলে নেয়, তারপর কংক্রিট ঢালে। সময়ও হচ্ছে জলের মত। সময়কে নিজে হাতে শূন্য না করলে জলের মতই সময় চতুর্দিকে গড়িয়ে যায়। সময় কারো জন্যেই বসে থাকে। তাছাড়া আমি সময় দিলেই কি লাভ হত আপনার? রমাদি যা বললেন এবং তাঁকে দেখে যা বুঝলাম তাতে ত মনে হল ভাগ্যিস আমি ঝুপ করে ডিসিশানটা নিয়ে ফেলেছিলাম। নইলে আপনার কাছে আজ মুখ দেখাতাম কি করে? সেদিন আপনার দেওয়া অপমান কি করে সহ্য করতাম?

আমি বললাম, এমন কেন বলছ ছুটি? যা করেছ ত করেছই, কিন্তু অন্য একজন তোমায় কি বলেছে, কি ভেবেছে, তার সমস্ত দায়িত্বটা তুমি আমার উপর চাপাচ্ছ কেন এমন করে? আমি ত তোমাকে খারাপ বলিনি। তুমি বড় হয়েছ, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, নিজের জীবনে নিজের মত করে বাঁচবার ইচ্ছা তোমার আছেই, নিজের বুদ্ধিতে তুমি যা ভালো বুঝেছ করেছ, তার জন্যে আমার কাছে ত তোমার জবাবদিহি করার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া, তোমার কাছে তোমার নিজের জীবনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কৈফিয়ত চাইবার আমি কে? যতদিন জানতাম সে অধিকার আমার আছে, ততদিন অন্য কথা ছিল। আজ যখন জানি যে তা নেই, তখন সে কৈফিয়ত চেয়ে আমি নিজেকে ছোটই বা করব কেন?

একথা ঠিক। আমি আগে বিশ্বাস করিনি। এখন যখন বিশ্বাস করেছি, নিজের চোখে দেখেছি তোমাকে, আমার ছুটির মুখ, ছুটির ভাষা সব কিছু নিজের চোখে বদলে যেতে দেখছি ও শুনছি, তখন ত আর কিছু শুধোবার নেই।

ছুটি অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, রমাদি এখন কোথায়?

কোলকাতায়।

আপনাকে সঙ্গে না নিয়েই চলে গেলেন কেন? বেশ লোক ত উনি।

আমি জবাব দিলাম না। মুখ নীচু করে রইলাম।

ছুটি বলল, পুরোনো স্ত্রীর ভালোবাসা নতুন করে পাচ্ছেন বলে লজ্জিত বুঝি সুকুদা? আরে! তাতে লজ্জার কি? আপনার স্ত্রী ত আর আমার মত একটা সস্তা হ্যাংলা মেয়ে নন।

আমি বললাম, ছুটি, আমি একটু পরেই চলে যাব। তোমার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে জানি না। অন্য কথা বল। এসব কথা ছাড়া যে-কোন কথা।

ছুটি বলল, এখন অন্য কোন কথা আর মনে আসছে না সুকুদা। আচ্ছা বলুন ত? আমার সম্বন্ধে আপনারও মত কি রমাদির মতই? আমি বড় হ্যাংলা, না সুকুদা? যেহেতু আপনাকে ভালোবেসেছিলাম, যেহেতু সেই ভালোবাসার জন্যে সব কিছু ছাড়তে তৈরী ছিলাম, যেহেতু সমাজের মুখে থুথু দিয়েছিলাম, তাই-ই আপনার কাছে বড় সস্তা হয়ে গেছিলাম আমি, না? একথা সত্যিই! ঢঙ করতে না জানলে, ন্যাকামি করতে না জানলে পুরুষদের চোখে মেয়েদের কোন দামই থাকে না। তাই না? তবে এও বলব সুকুদা, আপনারও অন্যায় এটা; ভীষণ অন্যায়। আমি ত একবারও বলি নি যে, আপনি রমাদিকে আমার জন্যে ত্যাগ করুন। রমাদিই আপনাকে ত্যাগ করেছিলেন, আপনার জীবনের সেই-সময়ের কথা আজ আর হয়ত আপনার মনে নেই। আমি নিজের ভালো চাইলে এত দিন অন্য দশটা মেয়ের মতই বহু শতাব্দীর পুরোনো বিয়ে নামক সহজ সুখের জলে জীবনটা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতাম। কখনও জানতে চাইতাম না, জীবনের মানে কি? বেঁচে থাকার মানে কি?

কিন্তু আমি ত তা চাই নি। আমি ত শুধু আপনাকেই চেয়েছিলাম। শুধু লেখক সুকুমার বোসকে। ব্যারিস্টার সুকুমার বোসকেও আমি চাই নি।

যাকগে, এসব কথা। আমি চাই আপনি ও রমাদি সুখী হোন। সুখে থাকুন। ছুটির মত কত সস্তা মেয়ে আসবে আপনার জীবনে। এই গলা জড়িয়ে ধরবে, আবার পরক্ষণেই ঝুপ করে নেমে পড়ে দৌড় লাগাবে। যখনি এমন কোন মেয়ে আসবে, আপনার হয়ত আমার কথা মনে পড়বে। কি? পড়বে না?

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আমি উঠে দাঁড়ালাম।

বেলা পড়ে এসেছিল। রোদটা বারান্দা থেকে সরে এসেছিল। ঘরের মধ্যেও শীত শীত করছিল।

আমি বললাম আমি এবার উঠব ছুটি।

আর একটু বসবেন না?

কাঠ-কাঠ ফর্মালিটির গলায় ছুটি বলল।

আমি বললাম, না। আমার জন্যে প্যাট দাঁড়িয়ে থাকবে।

ছুটি বলল, ও, প্যাট এসেছে বুঝি? তারপরই বলল, ওকে নিয়ে এলেন না কেন?

আমি বললাম, না এনে বোধ হয় ভালোই করেছি।

ছুটি বলল, তা অবশ্য ঠিক।

তারপরই বলল, আমাকে আর কিছু জিগগ্যেস করবেন আপনি?

আমি বললাম না। শুধু জিগগ্যেস করব, তুমি কি সুখী হয়েছ ছুটি? আমার প্রতি তোমার মনোভাব যা তা ত জানলাম, কিন্তু তুমি শুধু আমার চোখের দিকে চেয়ে বল, তুমি কি সুখী হয়েছ? বল ছুটি? সত্যি করে বল?

ছুটি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল। বলল, সুখের কথা কি কাউকে বলা যায়? সুখ থাকে মনে মনে। এত তাড়াতাড়ি কি করে বলব? তবে ধরে নিন, সুখী হয়েছি। যা কিছু করেছিলাম এতদিন, তাও সুখের জন্যেই। রুদ্রকে আমার ঘরে থাকার অনুমতিও দিয়েছি সুখেরই জন্যে। হয়ত দুটো সুখ অন্য রকম। হয়ত সমস্ত সুখেরই রকম বিভিন্ন।

আমি বললাম, সে যাই-ই হোক। সুখী হয়েছ, সুখী থাকবে, একথা জানতে পেলেই হল। তার বেশী কিছু আমার জানার নেই তোমার কাছে।

আমি বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকতে যাব এমন সময় বাইরের দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল।

ছুটি বলল, এক সেকেণ্ড বসুন। বলেই দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল।

কালো ফ্ল্যানেলের সুট পরে একটি হ্যান্ডসাম ছেলে ঘরে ঢুকল, ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল, আরে ছুটি, জোর খবর আছে। রাঁচী ক্লাবে গেছিলাম আমাদের সেলস ম্যানেজারের সঙ্গে। সেখানে কোলকাতার এক ব্যরিস্টারের সঙ্গে আলাপ হল। এখানে এসেছেন হেভী ইঞ্জিনীয়ারিং-এর কি কাজে। বলছিলেন, তোমার প্রিয় লেখক সুকুমার বোসের সঙ্গে নাকি ওঁর স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ওঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে অনেক কথা শুনে এলাম। গরম গরম কথা। বলেই ছেলেটি হাঃ হাঃ করে হাসতে লাগল। নোংরা হাসি।

ছুটি চাপা গলায় বলল, আস্তে, আস্তে; বারান্দায় লোক আছেন। তারপর বিরক্তিতে বলল, তোমার তাতে এত উত্তেজনা কেন?

ইতিমধ্যে আমি উঠে পড়েছিলাম।

ছুটিই রুদ্রকে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিল।

আমি নমস্কার করলাম।

ছুটি বলল, এই যে রুদ্র রায়, আর ইনি আমাদের কলকাতার পাড়ার দাদা; নরেশদা।

আমি চমকে চাইলাম ছুটির চোখের দিকে।

দেখলাম, ছুটির চোখ দুটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একটু আগের ছুটি আর এ ছুটি এক নয়।

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ছুটি রুদ্রকে বলল, নরেশদা একদিনের জন্যে কাজে এসেছিলেন কোলকাতা থেকে, দেখা করতে এসেছিলেন আমার সঙ্গে।

রুদ্র বলল, নরেশদাকে চা-টা খাইয়েছ?

ছুটি বলল, শুধু চা-ই। বসলেন না মোটে। আজই নাকি ফিরে যাবেন।

আমি বললাম, আমি এবার আসি। আমার তাড়া আছে।

রুদ্র সাহেবী কায়দায় ঝুঁকে পড়ে হ্যান্ডসেক করল। বলল, নাইস মীটিং উ্য।

ছুটি বলল, আমি একটু এগিয়ে দিচ্ছি নরেশদাকে, তুমি ততক্ষণ জামা-কাপড় ছাড়ো। আমি আসছি এক্ষুনি।

বারান্দা পেরোতেই আমি বললাম, আমার খুব খারাপ লাগছে, তুমি আমার মিথ্যা পরিচয় দিলে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত?

ছুটি বলল, ওসব কথা পরে হবে। আগে বলুন রমাদির সঙ্গে আপনার মিটমাট হয়ে গেছে কিনা?

আমি ছুটির দিকে তাকালাম। কথা বললাম না কোন।

ছুটি ব্যাকুল গলায় বলল, সুকুদা, কথা বলুন।

আমাকে কোন কথা না বলতে দেখে ছুটি তীক্ষ্ণ চোখে আমার চোখে তাকাল।

ও অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টিতে।

মনে হল, আর কখনও বুঝি ও আমার চোখ থেকে চোখ সরাবে না।

শেষ বিকেলের রোদে বড় বড় গাছগুলোর ছায়া মাঠময় অন্ধকারের মোটা মোটা রেখা টেনে দিয়েছিল। তার মধ্যে সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে একটা লাল-কালো কটকী শাড়ি পরে ছুটি দাঁড়িয়েছিল।

বাড়ির এ দিকটার মাঠে বড় একটা কেউ আসে না–বড় বড় আম কাঁঠালের গাছ। একটা পাতা-পড়া কুয়ো, কমলা-রঙা পিটিস ঝোপ। এই-ই–সব। বাড়ির সামনের দিকের কুয়ো থেকে কে যেন জল তুলছিল। লাটাখাম্বার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল একটানা কান্নার মত।

ছুটি ওর নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল।

আমি কথা না বলে ছুটির দিকে চেয়ে রইলাম।

ওকে কবে আবার এমন নিভৃতে দেখতে পাব জানি না। ও ত এখন পরস্ত্রী; পরের শয্যাসঙ্গিনী।

ছুটি সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রুক্ষ গলায় বলল, আপনি আমাকে কিছু বলবেন না?

আমি মাথা নাড়লাম।

ছুটি আবার বলল, আমাকে তাহলে কিছুই বলার নেই আপনার?

আমি আবারও মাথা নাড়লাম।

আমি বললাম, এবার তুমি উপরে যাও।

ছুটি নড়ল না। যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

মুখ নীচু করে বলল, ঠিক আছে।

তারপর আর কিছু না বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে ও দাঁড়িয়ে পড়ল।

চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছিল। বড় শীত করছিল আমার। ভীষণ শীত।

ছুটি বলল, সুকুদা, আবার কবে আসবেন বলুন, সেদিন আমি একা থাকব। সেদিন আমার ঘরে অন্য কেউ থাকবে না। শুধু আমি আর আপনি। বলুন। কবে আসবেন?

আমার ঘাড়টা শক্ত হয়ে গেছিল। আমি আমার মধ্যে ছিলাম না। আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আর আসব না। আর কখনও আসব না ছুটি।

ছুটি ফুঁসিয়ে উঠে বলল, আসবেন না ত আসবেন না। আমি এই রকমই। আই অ্যাম, হোয়াট আই অ্যাম।

আমি বললাম, তোমাকে আমি ভীষণ দামী ভাবতাম, ভাবতাম তুমি আমারই; আমার একান্ত। ভাবতাম, আমার সমস্ত জীবন দিয়েও তোমার দাম দেবো। তোমার দাম আমার কাছে এত ছিল। তুমি যে এত সস্তা, এত সহজে তোমাকে যে কেউ পেতে পারে, আমি কখনও ভাবিনি।

ছুটি রাগে গনগন করছিল। বলল, তাহলে আসবেন না। এলে মিছিমিছি অপমানিতই হবেন। আমার দরজা আপনার জন্যে চিরদিনের মত বন্ধ হয়ে গেছে। আমি ফেড-আপ। আপনাকে নিয়ে আমি ফেড-আপ।

আমার মাথার মধ্যে একরাশ রক্ত দৌড়ে এল। আমিই বললাম, না অন্য-কেউ বলল, জানি না, আমার মুখ বলল, আসব না আসব না; আসব না। আমি কখনও কোনো সস্তা মেয়ের কাছে এ জীবনে যাইনি, তাদের কাছে আমার কিছু পাওয়ার নেই। তারপরই আমার ব্যথিত, বিক্ষুব্ধ, অশ্রুরুদ্ধ সত্তা তার বুকের মধ্যে থেকে ভাঙা গলায় বলে উঠল, আমি তোমাকে ঘৃণা করি। ঘৃণা করি ছুটি।

এই ঘৃণার কথা ছুটি কি ভাবে নিল জানি না, কিন্তু এ কথা বলে ফেলে আমার নিজের বুক খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল। এতদিন ছুটি যে আমারই বুকের, আমারই জীবনের এক অখণ্ড অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ছিল। ওকে ঘৃণা করা যে আমার অস্তিত্ব, নিজের সমস্ত গর্ব, নিজের সম্মানবোধকেই ঘৃণা করা। ছুটিকে ঘৃণা করতে কি আমি কখনও পারব? ওকে ঘৃণা করে কি বেঁচে থাকতে পারব? ওতে যে আমি একাত্ম হয়েছিলাম। ওর বুকের মধ্যে আমার যে আসন ছিল সে আসন থেকে আমায় ধুলোয় ফেলে ও যে এত অবহেলায় এত সহজে অন্য কাউকে বসাতে পারে তা কি আমি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম? ছুটিও কি শরীরসর্বস্ব?

জানি না।

আমার ছুটিকে তাহলে আমি এতদিন চিনতে পারিনি।

আমি যদি ছুটির চরিত্রের প্রকৃত স্বরূপ না বুঝে থাকি তাহলে হয়ত অন্য কেউও কখনও বুঝবে না। ছুটি কি নিজেকেও চিনেছে? রুদ্রর মত অনেক রুদ্রর শয্যাসঙ্গিনী হয়ে অনেক হাত ঘুরে ছুটি কি তার শেষ জীবনে, শেষের দিনে, আমার সত্যি-আমি-কে চিনে আবার আমার কাছেই ফিরে আসবে, চোখের জলে; তার সমস্ত হৃদয়ের ভালোবাসার শর্তহীন সমর্পণে?

আসবে কি? কোনোদিন?

কিন্তু যদি আসেও বা, তখনও কি আমার বেলা থাকবে? এই ভালোবাসায় জরজর রোম্যান্টিক বোকা অনাবিল সুকুমার বোসটা কি ততদিন বেঁচে থাকবে? বেঁচে কি থাকবে তার শরীর? শরীর যদি থাকেও সে কি এই লোকটাই থাকবে তখনও তার মনে?

ছুটি আর দাঁড়াল না। নিজে কিছু বলল না, আমাকেও আর কিছুমাত্র বলার সুযোগ দিল না।

শেষ বিকেলের একটি বিধুর, ব্যথাতুর অপস্রিয়মান ছায়ার মত সিঁড়িতে মিলিয়ে গেল।

.

২৬.

ফিরাইলালের চওকে প্যাট দাঁড়িয়েছিল এক পায়ে

আমার পৌঁছতে প্রায় পনেরো মিনিট দেরী হয়ে গেছিল।

আমরা দুজনে হেঁটে রাতু বাস স্ট্যান্ডে যেতে যেতে প্যাট অনেক কথা বলছিল। কিছু আমার কানে গেছিল, কিছু যায়নি। আমার মন তখন প্যাটের কথা শোনার জন্যে তৈরী ছিল না।

প্যাটের সব ব্যাপারে খুঁতখুঁতি। বলল, এ ট্যাক্সিটায় যাব না, এর চেহারা ভালো না।

আমি ততক্ষণে উঠে বসেছিলাম।

বললাম, উঠে এসো, চেহারা দিয়ে আর কি হবে? শেষ পর্যন্ত না ডোবালেই ত হল।

ও বলল, আমার মন সায় দিচ্ছে না।

আমার কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না। ওকে বললাম উঠে আসতে।

অনিচ্ছাসহকারে প্যাট ভিতরে উঠে এল।

প্যাটের ঝোলাটা ভর্তি হয়ে গেছিল। নানা টুকিটাকি জিনিস কিনেছে ও। রাঁচী আসা ওর বিশেষ হয়ে ওঠে না। কারণ প্রয়োজন পড়ে না। আর যখন ওর প্রয়োজন পড়ে তখন গঙ্গা বাস চলার প্রয়োজন বোধ করে না।

রাতুর রাজার বাড়ি পেরিয়ে, মান্দার পেরিয়ে, যখন বিজুপাড়ার মোড়ে এসে পৌঁছলাম তখন সাতটা বাজে।

প্যাট বলল, চা খাওয়া যাক।

প্যাট নেমে দোকানে চা ও গরম সিঙ্গাড়া অর্ডার দিয়ে এল।

আমি ট্যাক্সি থেকে নামলামই না।

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দোকানগুলো থেকে বেরোনো আলোর ফালিগুলো সেই অন্ধকারকে আরো গাঢ় করেছে। একটা দোকানের ট্রানজিস্টারে উচ্চগ্রামে হিন্দী গান বাজছে। পানের দোকানের সামনে সাইকেলের জটলা। টায়ার সারানোর দোকানের সামনে আগুন করে গোল হয়ে বসে আছে কয়েকজন লোক।

আজকে শীতটাও বেশি। সারাদিনই কনকনে হাওয়া বইছিল। সন্ধ্যের পর থেকে সে হাওয়ায় যেন বরফ কুচি লেগেছে। কাছেই কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়।

উঁচু সুরের গান, টুকরো-টাকরা কথা চায়ের দোকানে, পেয়ালা-পিরিচের টুং-টাং–ও সমস্ত কিছু ছাপিয়ে আমার কানে ছুটির নীচু গলা বাজছিল শুধু। ছুটির অশ্রুরুদ্ধ নরম গলা– আমাকে তাহলে কিছুই বলার নেই আপনার?

কেন এরকম হল জানি না।

আমার জীবনেই কেন এরকম হল? অন্য অনেকের সঙ্গে আমার তফাত আছে। আমি কখনও তফাতটাকে ভালো করে মনে করিনি। কিন্তু তফাতটা যে আছে, সে কথা জেনেছি। অন্য অনেক পুরুষমানুষই জীবনটা তাঁদের কাজ, তাঁদের জীবিকার গ্লানি, তাঁদের অভাব অথবা তাঁদের প্রাচুর্য নিয়ে কাটিয়ে দেন। কেউ কেউ বা তাঁদের তাস খেলা কি ক্লাব কি হুইস্কির বোতল নিয়েই জীবনটাকে বেশ ফুরিয়ে ফেলেন।

তাঁদের অনেকের জীবনেই কখনও-সখনও কোনো মেয়েমানুষের প্রয়োজন হয়। বিবাহিত স্ত্রীরাও সেই সংজ্ঞার বাইরে পড়েন না তাঁদের কাছে। অন্দরমহলে যাবার প্রয়োজন বা তাগিদ বোধ করলেই তাঁরা অন্দরমহলে যান কখনও। আর বাদবাকী সময় অশান্তি এড়াতে অন্দরমহলের সমস্ত জাগতিক দাবী হয় মিটিয়ে দিয়ে আর মেটাবার সামর্থ্য না থাকলে, ভুলে থাকে, নিজের বন্ধু, নিজের তাস, নিজের সখ নিয়ে আনন্দে সময় কাটান।

আমি কাজের সময় কাজ করেছি চিরদিন, হয়ত বা কাজের সময়ের পরও করেছি, কিন্তু চিরদিনই আমার সমস্ত মন একজন নারী, সবার্থে নারীর জন্যে কেঁদেছে। যে চেহারায়, শরীরের, যে মনে মনে অত্যন্ত মেয়েসুলভ, এমন একজন মেয়ের জন্যে।

আমার মানসীর জন্যে।

রমা বহুবছর হল আমার সে সংজ্ঞাকে তছনছ করে এক প্রচণ্ড পুলিশী প্রভাব বিস্তার করেছে আমার উপর। আর যাই হোক, পুলিশের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা ভাবা যায় না।

এই মরুভূমি, তৃষ্ণা, কাঁটাগাছের জীবনে বহুদিন পর ঘুরতে ঘুরতে খুঁজতে খুঁজতে ছুটিকে পেয়েছিলাম। যার নাম শরীর, যার মিষ্ট ব্যবহার, যার বুদ্ধিমতী লজ্জাবতী মনের মধ্যে একজন সম্পূর্ণ মেয়েকে, আমার মানসীকে, আমার ছায়াঘেরা ওয়েসিসকে আবিষ্কার করেছিলাম। ভেবেছিলাম, জীবনের মধ্য পথে এসে ওর হাত ধরে এক নতুন রাস্তায় আবার চলতে শুরু করব। নতুন করে, দারুণ জীবনন্তভাবে আবার বাঁচতে শুরু করব।

ভেবেছিলাম আমার বিক্ষুব্ধ অশান্ত জীবন ওর সান্নিধ্যে, ওর ভালোবাসায় স্নিগ্ধ হবে।

কিন্তু জানি না, কার অভিশাপে হল, কিন্তু আমার অমৃতর পাত্র ভেঙে গেল। সমস্ত জীবন একটা নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢেকে গেল।

আমি যথেষ্ট শক্ত নই, আমি কারো নরম হাতে হাত না রেখে বাঁচতে চাইনি কখনও; বাঁচতে পারবও না। অথচ আমার ইদানীং দারুণ বাঁচতে ইচ্ছা করত। প্রতিটি মুহূর্ত ভীষণ প্রাণবন্ততার মধ্যে বাঁচতে ইচ্ছা করত।

দোকানের ছোকরা চা ও সিঙ্গাড়া দিয়ে গেল।

চাটা খেলাম, সিঙ্গাড়া ফেরত দিলাম।

প্যাটকে মুখ বাড়িয়ে তাড়া দিলাম। আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে ও সিগারেট খাচ্ছিল।

প্যাট আমার এই তাড়াহুড়ো দেখে বিরক্ত হল।

পয়সা চুকিয়ে ফিরে এসে হালকা গলায় প্যাট বলল, তোমার ভাঙা বাড়িতে কে তোমার প্রতীক্ষায় বসে আছে যে এত তাড়া?

আমার জবাব দেবার কিছু ছিল না। তবু কিছু বলতে হয়। বললাম, আজ বড় ঠাণ্ডা। তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুমোব।

প্যাট আবার হাসল। বলল, তাও যদি বুঝতাম বিছানায় কেউ অপেক্ষা করে আছে।

অন্য সময় বা অন্যদিন হলে কথাটা আমায় এমন করে লাগত না। কিন্তু আমি হঠাৎ চটে উঠলাম, বললাম, সবসময় কি যে ইয়ার্কি কর, ভালো লাগে না প্যাট।

প্যাট অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। মুখে বলল সরী! তারপর বলল, তুমি আজকে ভীষণ আপসেট হয়ে রয়েছে! কিন্তু কেন? কোথায় গেছিলে তুমি রাঁচীতে? কার সঙ্গে দেখা করতে?

আমি বললাম, কোথাও না।

প্যাট আর কথা না বলে ওর উইন্ড-টিচারের বুকপকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালো। তারপর সিগারেটের ধোঁয়ায় ট্যাক্সির মধ্যেটা অন্ধকার করে দিয়ে নিজের মনে ও মাই ডার্লিং ক্লেমেনটাইন গান ধরল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গুনগুনিয়ে পুরোনো গানটা গাইতে লাগল।

ট্যাক্সিটা বেশ জোরে যাচ্ছিল।

বাইরে প্রচণ্ড শীতের রাত। লোকজন গরু বাছুর কিছুই নেই পথে। চামার মোড় অবধি যেতে যেতে একটা কয়লার ট্রাক এবং এ-সি-সি কোম্পানীর একটা প্রাইভেট গাড়ির সঙ্গে শুধু দেখা হল।

চামার মোড়ে আমরা কাঁচা রাস্তায় ঢুকে গেলাম।

আজকে এত ঠাণ্ডা যে গাড়ির উইন্ডস্ক্রীন বৃষ্টির জলের মত শিশিরে ভিজে গেছিল। মাঝে মাঝে ড্রাইভার ওয়াইপার চালিয়ে জল কাটিয়ে নিচ্ছিল।

রামদাগা পেরিয়ে আমরা কিছুদূর এসেছি। এমন সময় একটা পাথুরে জায়গা পেরুনোর পরই পেছনের একটি টায়ার ফেটে গেল।

প্যাট ফিক ফিক করে হাসতে লাগল।

আমি প্যাটের সঙ্গে রাস্তায় নামলাম। শিশির, পাথর, ধুলো পথ সব বয়ফের মত ঠাণ্ডা হয়ে আছে। মনে হল একটু একটু বৃষ্টিও হচ্ছে। পাহাড় ও পাহাড়তলির সমস্ত জঙ্গল একটা মাতাল হাড় কাঁপানো ভিজে হাওয়ায় আকুলি-বিকুলি : উথাল-পাতাল করছে।

ড্রাইভার ও তার হেলপার চাকা বদলাতে লাগল।

প্যাট ততক্ষণ টর্চ ধরে রইল ওদের জন্যে।

আমি অন্ধকারে একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে চুপ করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ভীষণ কান্নাও পাচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল, আমি যদি আজ একা থাকতাম তাহলে এই রাতের জঙ্গলে হু-হু করে কেঁদে আমার মনের এই আশ্চর্য অসহায়তাকে একটু হালকা করতে পারতাম। পুরুষমানুষ যে প্রকৃতিস্থ অবস্থায় অন্যের সামনে কাঁদতে পারে না।

সেই অন্ধকারের মধ্যে আমার বার বার ছুটির মুখের কথা মনে পড়ছিল। ছুটি এখন তার সঙ্গীর সঙ্গে আরামে ঘরের মধ্যে বসে কম্বল গায়ে টেনে গল্প করছে। সে যাকে একদিন অনেক ভালোবাসায় আদর করে সুকুদা বলে ডাকত তার রিনরিনে গলায়, সে যে এমন অন্ধকার হিমের রাতে চিরদিন দাঁড়িয়ে থাকবে আর ছুটির কথা ভাববে সে কথা ছুটির বোধহয় একবারও মনে হবে না।

আমার খুব ইচ্ছে করছিল, আজ প্যাট আমাকে একা ছেড়ে দিক। ছেড়ে দিলে আমি একা একা কাঁদতে কাঁদতে, হাঁটতে হাঁটতে এই উদ্দাম শীতার্ত প্রকৃতির মধ্যে আমার হারিয়ে-যাওয়া ছুটির কথা ভাবতে ভাবতে চলে যেতাম।

আমার আজ ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ইচ্ছা করছে, সকলের কাছ থেকে ছুটি নিতে। রমার কাছে, ছুটির কাছে, আমার ত ছুটি হয়েই গেছে এ জন্মের মত। যে-কেউ আছে, কাছে দূরে; তাদের সকলের কাছে আমার এই নিষ্ফল কর্তব্যের ভার থেকে এই মুহূর্তে আমার ভীষণ ছুটি চাইতে ইচ্ছে করছে। সকলে ছুটি দিলে, আমি দারুণ আরামে চিরদিনের মত ঘুমিয়ে পড়তে পারি। সে ঘুম রমা কি ছুটি কি তাদের মত আর কেউই ভাঙাতে পারবে না। সেই ছুটি, সব কর্তব্য থেকেই ছুটি; চিরদিনের ছুটি। সব যন্ত্রণা, সব জ্বালা থেকে ছুটি; সে বড় আরামের ঘুম।

ট্যাক্সিটা বাসারীয়া বস্তীর কাছাকাছি অবধি বেশ ভালো এল।

তারপর একটা উৎরাই পেরুনোর পরই আলোটা কমে এল, তারপর ধীরে ধীরে গাড়িটা থেমে গেল আবার।

ড্রাইভার নামল। আমরাও নামলাম। গাড়ির বনেট খুলে দেখা গেল গাড়ির ফ্যানবেল্ট ছিঁড়ে গেছে। স্পেয়ার ফ্যানবেল্টও সঙ্গে নেই। অতএব সারা রাতের মত এখানেই থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

ড্রাইভারের হেলপার ছেলেটি, কথাবার্তা না বলে জঙ্গলের মধ্যে টর্চ জ্বেলে কাঠকুটো জড়ো করে আনল এক জায়গায়। তারপর একটা রবারের নল বের করে পেট্রল ট্যাঙ্কে ঢুকিয়ে চুষে পেট্রল বার করে কুলকুচি করে সেই পেট্রোল ফেলল কাঠকুটোর উপর। তারপর দেশলাই জ্বেলে আগুন করল।

কেউই কোনো কথা না বলে আগুনের আশপাশের ছোট-বড় পাথরে বসে আগুনের দিকে পা বাড়িয়ে দিলাম আমরা।

প্যাটকে দেখে মনে হল ও আমার উপর খুব চটেছে, ওর কথা অমান্য করে এই ট্যাক্সিতে এসেছিলাম বলে।

মিনিট দুয়েক পাথরে বসে থাকার পর কথা না বলে প্যাট গাড়ি থেকে হুইস্কির বোতলটা বের করে আনল। তারপর পাথরে বসে এক মোচড়ে বোতলের সীল করা মুখটা খুলে ফেলে ঢকঢক করে অনেকখানি হুইস্কি খেয়ে ফেলল।

আমি বললাম, আগুনের পাশে বসে এমন করে খেও না, চট করে নেশা ধরে যাবে।

প্যাট বলল, তুমি একটা আজব লোক; এত দামী জিনিস খেয়ে যদি নেশাই না হল তবে খেয়ে লাভ কি? তাছাড়া কতগুলো দিন থাকে আত্মবিস্মৃত হবার দিন। নেশা করে নিজেকে ভুলবার ও ভোলাবার দিন। কিছু মনে কোরো না মিস্টার বোস, তোমার আজ কি হয়েছে জানি না, তবে এটুকু জানি যে আজ তোমারও নেশা করার দিন। বলেই প্যাট বোতলটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

বোতলটা হাতে নিয়ে দু-এক মুহূর্ত আমি ভাবলাম।

প্যাট বলল, কি হল?

আমি জবাব না দিয়ে ঢকঢক করে প্যাটের মতই র হুইস্কি মুখে ঢেলে দিলাম। মনে হলো বুক পেট এবং যেখান যেখান দিয়ে ভিতরে তা গড়িয়ে গেল, সব জ্বলে যেতে লাগল।

প্যাট বোতলটা ফেরত নিয়ে বলল, মাঝে মাঝে কি মনে হয় জান?

বললাম, কি?

মাঝে মাঝে মনে হয় সমস্ত জীবনটাকে, জীবনের সুখ-দুঃখ চাওয়া-পাওয়া সব গলিয়ে ফেলে এমনি কোনো বোতলে ঢেলে এমনি ঢকঢুকিয়ে খেতে পারলে কি ভাললাই না হত।

আমি জবাব দিলাম না।

প্যাট টুকিটাকি নানা কথা বলছিল। কথার ফাঁকে অমনি করে হুইস্কি ঢালছিল মুখে আর যতবার নিজে ঢালছিল ততবার আমার দিকেও বোতলটা এগিয়ে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শীত কেটে গিয়ে মাথাটা হালকা হয়ে এল।

মাথাটি হালকা হয়ে যেতেই আমার সব লজ্জা, সব মান অপমান, সব সমাজ সংস্কারের ভয় কেটে গেল। লোকভয় মুছে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমার দু চোখ বেয়ে জলের ধারা বইছে।

আমার জিভটা ভারী হয়ে এল। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। আমি শুধু চোখের জলে যা কিছু বলার ছিল সব বলছিলাম।

আগুনের আলোয় প্যাট ও আমি এখানে আমরা প্রায় এক ঘণ্টা বসেছিলাম। আমরা পরস্পরকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমি বুঝতে পারছিলাম, ট্যাক্সির ড্রাইভার এবং তার হেলপারও আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আমার তাতে কিছু যায় আসে না আর। সকল মানুষই জীবনে এমন কোনো-না-কোনো মুহূর্তের সম্মুখীন হয় যখন তার কিছুতেই আর কিছু মাত্র যায় আসে না।

প্যাট হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে বলল, হে বোস, হোয়াটস্ রং উইথ উ্য?

আমি প্যাটের কথার উত্তর দিলাম না কোনো।

প্যাট আমার কাছে উঠে এল। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে জড়ানো গলায় বলল, আই ডোন্ট নো, হোয়াটস্ রং উইথ স্ট্য। বাট আই অ্যাম অফুলি সরী, আই এ্যাম ভেরী সরী ফর স্ট্য। বিলিভ মী। আই মীন ইট। বাই দা নেম অফ গড, আই মীন ইট।

প্যাটের বিলক্ষণ নেশা হয়ে গেছিল।

আমি হাসবার চেষ্টা করলাম। জানি না, সেই হাসি কেমন দেখালো। আমার জিভ জড়িয়ে গেছিল। আমি জড়িয়ে জড়িয়ে বললাম, লেটস মেক আ মুভ প্যাট। চলো, আমরা যাই।

প্যাট বলল, কোথায়?

আমি বললাম, বাড়ি।

প্যাট হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠল।

বলল, ইট সাউন্ডস ভেরী ফানী। আই মীন দা ওয়ার্ড, হোম। আই ডোন্ট হ্যাড ওয়ান। ডু উ্য হ্যাভ এনি?

তারপর প্যাট একটা হেঁচকি তুলে বলল, ওয়েল, আই ডোন্নো–মে বী, উ হ্যাভ ওয়ান।

ট্যাক্সি ড্রাইভার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমাদের যদি ছুটি করে দেন ত আমরা চলে যাই?

আমি বললাম, কোথায়?

প্যাট মধ্যে থেকে বলল, কোথায় আবার? টু দেয়ার রেসপেক্টিভ হোমস্।

ড্রাইভার বলল, সারা রাত এখানে থাকলে আমরা ঠাণ্ডায় মরে যাব। তাছাড়া জংলী জানোয়ারের ভয় আছে। বাসারীয়া বীতে আমার একজন জানা লোক আছে তার ওখানে রাত কাটাব। ভোরভোর ফিরে আসব। তারপর চামার মোড় থেকে লরী ধরে রাঁচী গিয়ে ফ্যানবেল্ট নিয়ে আসব।

আমি ওদের টাকা মিটিয়ে দিলাম।

ওরা আলোয়ানে ভালো করে গা-মুড়ে, স্টাটার হ্যান্ডেলটা কাঁধে ফেলে বড় রাস্তা ধরে একটু এগিয়েই বাসারীয়া বস্তীর সুঁড়ি পথে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল।

প্যাট বোতলটা আবার আমার দিকে এগিয়ে দিল।

আমি আবার ঢকঢকিয়ে খেলাম।

প্যাট বাকিটা খেয়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর ক্রাচে ভর করে টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে ওর এক পায়ে গাড়িটার বাম্পারে একটা লাথি মারল, সজোরে। বলল, বাস্টার্ড উ্য লেট আস ডাউন।

পরক্ষণেই গাড়িটার ছাদে একটা চুমু খেয়ে বলল, নেভারদিলেস, ঊ্য আর বেটার দ্যান এনি বিচ।

আমি প্যাটের বোঁচকাটা তুলে নিলাম।

প্যাট আগে আগে ক্রাচের উপর টলতে টলতে চলতে লাগল।

আমিও ওর পিছনে পিছনে ঘোরের মধ্যে হাঁটতে লাগলাম।

একটু গিয়েই প্যাট দাঁড়িয়ে পড়ে, খালি বোতলটাকে পথের পাশের খাদে ছুঁড়ে মারল।

ঝনঝনিয়ে বোতলটা পাথরে পড়ে টুকরো হয়ে গেল।

আমি পিছন থেকে বললাম, কি করলে প্যাট?

প্যাট বলল, আই এ্যাম সেলিব্রেটিং। ঊ্য নো হোয়াট?

আমি শুধোলাম, হোয়াটস্ দা অকেশান?

প্যাট আমার দিকে ঘুরে বলল, আই এ্যাম সেলিব্রেটিং মাই লোনলিলে–আমার একাকীত্বর উৎসব। ডোন্ট উ্য লাইক ইট?

প্যাটের খুব নেশা হয়েছিল।

পরক্ষণেই প্যাট আমার দিকে দৌড়ে আসতে গেল।

পড়ে যেতে যেতে কোনোরকমে বেঁচে গিয়ে প্যাট আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাম ব্রাদার, লেটস্ সেলিব্রেট আওয়ার লোনলিনেস।

আমাকে ছেড়ে দিতেই প্যাট ডিগবাজী খেয়ে পাথরের উপর, ভিজে ধুলোর উপর পড়ে গেল।

আমি ওকে তুলতে যেতেই দেখলাম অন্ধকারে ওর নীল চোখ দুটো, গুলি-খাওয়া বাঘিনীর অভিশাপের আগুনে জ্বলছে।

প্যাট শুয়ে শুয়েই দাঁত কড়মড়িয়ে বলল, স্টপ ইট, ড্যাম ইট। ফর গডস সেক, ডোন্ট পিটী মি। আই উইল হিট উ্য, ইফ উ উইল।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওর কথাগুলো আমার কানে ঝমঝম্ করে বাজছিল।

প্যাট ঘৃণার সঙ্গে থুথু ছিটিয়ে আমাকে বলেছিল, খবরদার, আমাকে করুণা কোরো না। কখনো যদি করো, ত মার খাবে।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, প্যাট কি ভাবে মাতাল অবস্থায় মাটিতে, পাথরে গড়িয়ে গড়িয়ে ওর এক পায়ে আবার উঠে দাঁড়াল।

উঠে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে ফিরে মাতালের হাসি হাসল, বলল, লেটস্ গো।

কিছুক্ষণ পাশাপাশি চলার পর প্যাট দাঁড়িয়ে পড়ে আমার দিকে ফিরে বলল, বুঝলে বোস, আমার একটাই পা। তবুও আমি চলতে পারি। জানো, যে সব লোক অন্যের করুণার ভর করে বাঁচে, তারা দশটা পা থাকলেও চলতে পারে না। আই অ্যাম হ্যাপী দ্যাট আই ক্যান ম্যানেজ উইদাউট এনিবডিজ হেল্প।

সামনের ধুলোমাখা অন্ধকার পথটাকে ফিকে সাদা দেখাচ্ছিল। দুপাশে মাথা উঁচু গাছগাছালি। আকাশময় তারা। গভীর খাদ থেকে নাইটজারের গুব গুব গুব গুব আর পেঁচার কিঁচর- কিঁচর – কিঁচর -কিচি-কিচি- কিঁচর ডাক সেই গভীর গম্ভীর ব্যঞ্জনাময় অন্ধকার রাতকে এক অদ্ভুত ভৌতিক মহিমায় ভরে দিয়েছিল।

প্যাটের ক্রাচের শব্দই শুধু শোনা যাচ্ছিল। অন্ধকারে প্রায় বিলুপ্ত-শরীর প্যাটকে শুধু অনুভব করা যাচ্ছিল।

হঠাৎ সামনে একটা আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

কান-খাড়া করে শুনলাম, মাটিতে কিছু পড়ে যাওয়ার এবং তারপর একটা ছটফটানির আওয়াজ। গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে হরিণ যেমন ছটফট করে, তেমনি আওয়াজ।

সামনেই একটা খাড়া উৎরাই।

উৎরাই-এর চূড়ায় দাঁড়িয়ে অন্ধকারেই বুঝতে পেলাম যে, খাড়া উৎরাই নামবার সময় অপ্রকৃতিস্থ প্যাট আবার পড়ে গেছে। পড়ে গিয়ে, উঠবার চেষ্টা করছে। পড়ে যাবার সময় ওর হাতে ক্রাচ দুটো বোধহয় দূরে ছিটকে পড়েছে। মাটিতে শরীর ঘষে ঘষে দাঁতে দাঁত চেপে ও বুঝি অন্ধকারে ওর হাতের ক্রাচ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ঐখানেই অপেক্ষা করলাম আমি অনেকক্ষণ।

প্যাট নিজের পায়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াবার পর আমি উৎরাইটা নামতে শুরু করলাম।

শুনতে পেলাম, সমান রাস্তায় পড়েই প্যাট বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল।

এখন রাত নটা বাজে, এমন শীতের রাতে এই-ই অনেক রাত। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, রমা এখন কি করছে, কোথায় আছে? ও কি সীতেশের সঙ্গে আছে? সীতেশের মধ্যে ও সত্যিই কি কিছু পেয়েছে যা আমার মধ্যে পায়নি? রমা কি সুখী হয়েছে?

ছুটি এখন পর্দা-টানা ঘরে নরম বেড-লাইটের আলোয় রুদ্রর বুকে অশেষ আশ্লেষে ঘুমিয়ে আছে, পরম নিশ্চিন্তিতে; উষ্ণতায়। ছুটি? আমার ছুটিও কি সত্যিই সুখী হয়েছে?

বড় জানতে ইচ্ছে করে।

হঠাৎ দূরে থেকে প্যাটের গলার গান ভেসে আসতে লাগল।

প্রথমে কথাগুলো বুঝতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে পড়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতেই, কথাগুলো পরিষ্কার হল।

ওর ক্রাচ ফেলার শব্দের তালে তালে প্যাট গাইছে ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে জড়ানো গলায়, সেই গানটি–

Show me the way to go home, I am tired and I want to go to bed…

পরের লাইনগুলো এবার পরিষ্কার ভেসে আসতে লাগল সেই নির্জন নিস্তব্ধ রাতের বুক মথিত করে।

I had a little drink about an hour ago which has gone right to my head…

যতই এগোতে লাগলাম, ততই যেন প্যাটের উদাত্ত গলার গান সেই অন্ধকার রাতের প্রতি অণুতে অণুতে ভরে যেতে লাগল। আমার মস্তিষ্কের সমস্ত কোষে কোষে ছড়িয়ে যেতে লাগল। প্রতি গাছে গাছে, পাথরে পাথরে, লতায় পাতায় প্রতিধ্বনিত অনুরণিত হয়ে সে গান ফিরে ফিরে আসতে লাগল।

প্যাট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারে বারে গাইছিল :

Show me the way to go home,
I am tired,
And I want to go to bed;
Show me the way to go home.

একবারও পিছনে না ফিরে প্রতি পদক্ষেপে, এই পৃথিবীর সমস্ত করুণা, করুণার ভিক্ষা ও তার প্রতিশ্রুতিকে তার এক পায়ে লাথি মেরে মেরে স্বনির্ভর ঋজু প্যাট একটা আবছা ছায়ার মত আমার আগে আগে হাঁটতে লাগল।

রাতের বনের অন্ধকারে স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্নবিলাসী একজন অভিশপ্ত একাকী ভঙ্গুর পুরুষমানুষের গায়ের গন্ধ, কোনো বিযুক্ত বড় বাঘের গন্ধের মত শীতের রাতের বনের ভেজা হাওয়ায় আলতো হয়ে ভাসতে লাগল ঘাসে পাতায়।

রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Alternative Textবুদ্ধদেব গুহ- র আরো পোষ্ট দেখুন