স্মৃতি চারন

একদা ও এখন ॥ উজ্জ্বল স্মৃতি

রুরু ওরফে শারণ্য রায় বললেন, ‘শিবের অসাধ্যি তো বটেই, স্বয়ং জেমস বন্ডও পারবে না বান্দ্রার এই রাস্তা পার হতে, পিক আওয়ারে, মিনিমাম আধঘণ্টা ওয়েট করতে হবে। এ রকম ট্রাফিক দশ বছর আগেও ছিল না। সব গাড়িই পাছায়-পাছায় সেঁটে আছে। ট্রাফিক আইন কেউই মানে না।’ সিএনজি, ট্যাক্সির পেছনে দেখলুম, লেখা, ‘ডোন্ট কিস মি।’ ‘কিপ ডিসটান্স।’ ট্রাক-লরির পেছনে ‘মেরা ভারত মহান। অল ইন্ডিয়া ফাইভ টন।’
হিন্দী বলতে পারি না, পড়তেও। বছর চল্লিশ আগে ভিটি থেকে বান্দ্রা যাচ্ছিলুম, লোকাল ট্রেনে। দাঁড়িয়ে। ভিড় ছিল, গুঁতোগুঁতি নয়। আজকের মতো অশ্লীল নয় তো বটেই। গা ঘেঁষে, পাশেই দাঁড়িয়ে একজন, হাতে ব্যাগ, নতুন এসেছেন হয়ত, হিন্দীতে প্রশ্ন: পরের স্টেশন কোনটি। উত্তর দিলুম হিন্দীতেই ‘জানতা নাহি।’ পরিষ্কার বাংলায়, ভদ্রলোকের কথা : “দাদা, কলকাতা থেকে কবে এসেছেন? ‘জানতা নাহি’ নয়, ‘মালুম নেহি।’ হিন্দী ছবি দেখে নিশ্চয় হিন্দী শিখেছেন। চালিয়ে যান।”
আমার হিন্দী জ্ঞানে বিবি তথা ঋতুপর্ণা রায় রীতিমতন ভিমড়ি খেয়ে হুঁশিয়ারি জারি করলেন, ‘আমার বন্ধুদের সামনে একদম হিন্দী বলবে না। বললে খবর আছে।’
হিন্দী বলার ভয়ে মাতৃভাষাও ভুলে গেলুম। অবশ্য, পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্রাবাসে, ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে চাপাবাজির জন্যে ইংরেজী মোক্ষম ভাষা। ছাত্রাবাসে ছিলুম দিনপাঁচেক। দিন আটেক ভগবান রজনীশের খোঁয়াড়ে, লোকে বলে আশ্রম। হিন্দীর বালাই নেই এখানে। ভগবানের লীলাযজ্ঞে-ভাগাড়ও বলতে পারেন-হুরপরি বা রম্ভা মেনকা উর্বশীর সংখ্যা অগুনতি। শাদা তথা শ্বেতাঙ্গ। মুঘল আমলের হারেম দেখিনি। ভগবানের হারেম দেখে, আট দিনে, গা-গতরে হাওয়া মেখে তৃপ্তি রায়-অশোক রায়ের আস্তানায় ফিরলুম, বান্দ্রায় (মেহবুব স্টুডিও’র পেছনে, ফ্ল্যাটে।) বাকি কেচ্ছা থাক।
স্মৃতি খামচে, টেনেহিঁচড়ে, জোড়া লাগিয়ে তৃপ্তিদি (তৃপ্তি রায়), অশোকদাকে (অশোক রায়) বললুম, বছর ৪০ আগে পুনেয় যখন আসি, ট্রেনে, বোম্বের ভিটি থেকে, স্টেশনে গিয়েই টিকেট কাটি। ঝামেলা হয়নি। এখন, তিনদিন আগেও টিকেট পাওয়া দুষ্কর। এমনকি ব্ল্যাকেও।
দুজনের উত্তর, তখন ভারতে লোকসংখ্যা ছিল ৫০/৬০ কোটি। ২০১৪ সালে দেড় বিলিয়ন।
বললুম, হু, নরনারীর মেলামেশা বেশি হয়। ‘নিরোধ’ বাবুতেও কাজ হচ্ছে না। নিশ্চয় ভেজাল। গোটা দেশটাই দুইনম্বরী। সবকিছুই ফরমালিনে স্ফীত। অপ্রসঙ্গে এও বলি, প্রথমবার পুনে ভ্রমণে, ভিটি থেকে ট্রেনে, বিস্তর বাঁদর দেখেছিলুম নানা স্টেশনে, ঢুকেও পড়ে কামরায়। বানর থেকে মানুষের রূপান্তর, লক্ষ করলুম এবার, কামরা ভর্তি, ঠাসাঠাসি, মনুষ্য প্রজাতি, নানা কিসিমের, নানা চেহারার, নানা পোশাকে। বাঁদর/বানরও ভোল পাল্টেছে। গণতন্ত্রের দেশ। যেমন, পুনেয়, বাইক, মোটরবাইকের চালক, আরোহী মাথায় হেলমেট পরে না। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকারের অছিলায়। সরকারী নির্দেশ থোড়াই কেয়ার করে। বাধা দিলে বাধবে লড়াই। পুনে যেন ভারত থেকে আলাদা। ঠিক যে, পুনের স্বাতন্ত্র্য ভিন্ন। ভিন্ন মেজাজ। ভিন্ন সমাজ। ভিন্ন ঘরানা। ভিন্ন জৌলুস। ভারতীয় নানা কালচারের সমন্বয়ে, নানা মনমানসিকতায়, নানা ব্যক্তির এথনিক ঐতিহ্যে জাগতিকতার স্বরূপ। আবহাওয়ার নিজস্ব চরিত্র আছে, ওই চরিত্রে পুনেবাসীরাও বলীয়ান। লক্ষ করলুম, ‘যৌবনে অন্যায় ব্যয় বয়সে কাঙালি’ সত্ত্বেও আলি সাহেব দারুণ স্ফূর্তিবাজ। তারুণ্যে ভরপুর। বাহারাইনের মুসলিম হলেও পুনেয় পুরুষোত্তম। স্ত্রী শোভা (শোভনা?) প্রৌঢ়ার লাবণ্যে ‘চাঁদ কা টুকরা’। দেহমনে সতেজ। ওঁদের রাঞ্চে বিশাল বাড়ি। এক বিকেলে বাড়ি সরগরম। নানা শ্রেণীর, নানা বয়সের, নানা ধর্মের মানুষ এক পাতে খেয়ে, ঢেঁকুর তুলে বললে, আবার আসিব ফিরে রাঞ্চের এই নীড়ে।Ñতবে, অশোক রায়ের সত্তর দশকের মডেল ফিয়াট ইটপাথর-ভাঙাচোরা রাস্তার ধকল সামলাতে পারবে কিনা, গ্যারান্টির সার্টিফিকেট দরকার। রুরুর কথা, ‘বাবার ফিয়াট ভিনটেজ কার।’ শুনলুম, পুনেয়, পুরোনো ফিয়াটের একটি ক্লাবও আছে।
পুনেয় ক্লাবের ছড়াছড়ি। বিলেতি কালচার। অবশ্য, বিলেতি কালচারের ঢেউ নেই, না থাক, বিলেতি হওয়ার কসরত। রুরু বললেন, ‘পাছা মোটা মেয়েরা নাচতেও জানে না। হাতির মতো চেহারা, হাতির মতো সুরত, হাতির মতো পাছা দোলায়।’ Ñতা দোলাক। পুনে আমার পছন্দ। প্রিয়। ভারতের নানা অঞ্চলে টো টো করেছি। পৃথিবীর নানা দেশও। করতে হয় এখনো।
তৃপ্তিদির বাড়িঘিরে হরেক গাছপালা। সূর্য ওঠার আগেই নানা পাখির কাকলি। কান ঝালপালা। কোকিলের ক্রন্দন। আকুতি। গান। সুর। শাহী বুলবুলি, সিপাহি বুলবুলির পুচ্ছনাচ। শ্যামা, ফিঙে, দোয়েল, টুনটুনি, হরিয়াল, টিয়ে, বউ-কথা-কও, কাকাতুয়া, ময়নার কলতান। আজকের ধোঁয়া-পেট্রল-বিষাক্ত পরমাণু ‘উন্মত্ত পৃথ¦ী’র কোথায়, কোন্ অঞ্চলে এত পাখি আছে? পুনে-প্রেমে দিওয়ানার হেতু আরো গভীর। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।
বাঙালীর মতো হাড়েমজ্জায় খচ্চর, বদমাইশ, কুচক্রী, কূটকাচালি, নিন্দুক পৃথিবীর তলদেশ খুঁজেও পাবেন না।Ñঅভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। পুনেয় তিনটির বেশি বাঙালীর সংঘ। কেউ কারোর নাম শুনলে তেলেজলে ছ্যাতছ্যাতানি। দাদু (অন্নদাশঙ্কর রায়) বলতেন, ‘বিদেশে বাঙালী মানেই রাজনীতিক, ঈর্ষাকাতর।’
পুনের বাঙালী এলিটকুল কোন কিসিমের রাজনীতিক, অজানা। বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিষদের অনুষ্ঠানে বিস্তর ঝলমলে নারী, ‘চিত্ত আমার দোদুল্য।’ ওঁরা প্রাকৃতিক। ওঁরা সাংস্কৃতিক। ওঁরা বাংলার প্রেমে মানবিক। বৈশ্বিক। ওঁদের বৈশ্বিকতায় ধর্মাধর্ম ‘সবার উপরে মানুষ সত্য।’ শ্রীমতী মিত্র বললেন, “সবচেয়ে সত্য আমরা বাঙালী। রক্তেমাংসে রবীন্দ্রনাথ। রক্তমাংশে রবীন্দ্রনাথই হিন্দু-মুসলিম বাঙালীর জীবন, মিলন।”
রবীন্দ্রনাথই বাংলার, বঙ্গীয় ঘরোয়া, আত্মিক, আপন, দেহময়, হাড়েমজ্জায় টের পাই বিদেশে, পরবাসে। পালবাবুর ভাষণ, চক্রবর্তী, দাসের কবিতা পাঠ, চলোমির গান (লোকগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত) শেখ মুজিবকে নিয়ে লেখা গান) শুনে কোন পরবাসী (বিদেশে) ভাববে আমি বিদেশী? সূর্য সেনগুপ্তর ফ্ল্যাটে, ডিনারে (ওঁর স্ত্রী চমৎকার রাঁধুনী। রেস্তরাঁ খুললে বাকি ‘বাঙালী রেস্তরাঁয়’ মাছি উড়বে।) বললেন, “বাংলা সংস্কৃতি চারিয়ে দেব পুনের জলহাওয়ায়। ইতোমধ্যেই দোলায়িত।” সূর্য সেনগুপ্ত, অশোক রায়রা পারবেন। ওঁদের রক্তমাংসে বাংলাভাষা-সংস্কৃতি, একুশে ফেব্রুয়ারি।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪
বার্লিন, জার্মানি।

দাউদ হায়দার
দাউদ হায়দার
একজন বাংলাদেশী বাঙ্গালী কবি, লেখক ও সাংবাদিক, যিনি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে দেশ থেকে নির্বাসনের পর বর্তমানে জার্মানীতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তিনি বর্তমানে একজন ব্রডকাস্টিং সাংবাদিক।তিনি একজন আধুনিক কবি যিনি সত্তর দশকের কবি হিসাবে চিহ্নিত। তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যের নাম "জন্মই আমার আজন্ম পাপ"। == কর্মজীবন == সত্তর দশকের শুরুর দিকে দাউদ হায়দার দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩ সালে লন্ডন সোসাইটি ফর পোয়েট্রি দাউদ হায়দারের কোন এক কবিতাকে “দ্যা বেস্ট পোয়েম অব এশিয়া” সম্মানে ভুষিত করেছিল। সংবাদের সাহিত্যপাতায় 'কালো সূর্যের কালো জ্যোৎসায় কালো বন্যায়' নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। ধারণা করা হয়ে থাকে, তিনি ঐ কবিতাতে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ), যিশুখ্রীষ্ট এবংগৌতম বুদ্ধ সম্পর্কিত অবমাননাকর উক্তি ছিল যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিল। তাঁর ''সংস্‌ অব ডেস্পায়ার'' বইতে এই কবিতাটি সঙ্কলিত আছে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদ শুরু করে।ঢাকার এক কলেজ-শিক্ষক ঢাকার একটি আদালতে এই ঘটনায় দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। == দেশত্যাগ == তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর সরকার দাউদ হায়দারকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ সরকার তখন চায়নি আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম সরকারদের সাহায্য হারাতে। ১৯৭৩ সালে কবিকে নিরাপত্তামূলক কাস্টডিতে নেয়া হয়। ১৯৭৪ এর ২০ মে সন্ধ্যায় তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং ২১শে মে সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ বিমানের একটা রেগুলার ফ্লাইটে করে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়। ওই ফ্লাইটে তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিল না। তাঁর কাছে সে সময় ছিল মাত্র ৬০ পয়সা এবং কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগ ব্যাগে ছিল কবিতার বই, দু'জোড়া শার্ট, প্যান্ট, স্লিপার আর টুথব্রাশ। কবির ভাষায়--আমার কোন উপায় ছিল না। মৌলবাদীরা আমাকে মেরেই ফেলত। সরকারও হয়ত আমার মৃত্যু কামনা করছিল। == জার্মানীতে == জার্মানীর নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গুন্টারগ্রাসের সহযোগিতায় ২২ শে জুলাই ১৯৮৭ সালে তিনি জার্মানীর বার্লিন শহরে যান এবং তারপর থেকে সেখানেই আছেন। উল্লেখ্য তিনি বার্লিন যাত্রায় পাসপোর্টের পরিবর্তে জাতিসংঘের বিশেষ ট্র্যাভেল পাস ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে তখন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় কর্মরত শামসুল বারী তাঁকে অনেক সাহায্য করেন। দাউদ হায়দার পরে এই জাতিসংঘের ট্র্যাভেল পাস ব্যবহার করে বহু দেশ ঘুরেছেন। ১৯৮৯ সালে তিনি জার্মানীতে সাংবাদিক হিসেবে চাকুরী শুরু করেন। তিনি প্রায় ৩০টির মতো বই লিখেছেন জার্মান, হিন্দি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জাপানিজ ও স্প্যানিশ ভাষায়।