স্মৃতি চারন

‘মাইফ্রেন্ড, মাইফ্রেন্ড’

untitled-2_131389ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার , ভাস্কর, গ্রাফিক শিল্পী, রাজনৈতিক প্রবক্তা প্রভৃতি গুন্টার গ্রাসের পরিচয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা জীবনব্যাপী গ্রাস গভীর অভিনিবেশ সহকারে কোনো না কোনো কাজ করেছেন। লেখালেখি বন্ধ থাকছে তো লেগে গেলেন কাদামাটির ভাস্কর্য গড়ার কাজে, কখনও চলছে আঁকাআঁকির কাজ, ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়ে আসছে ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও লক্ষ্যভেদী, তীব্র একেকটি উজ্জ্বল কবিতা কিংবা দিগন্ত ঝলসানো কবিতার পঙ্ক্তি, আবার কখনও বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছত্রাকের খোঁজে, এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা, বক্তৃতা দেশ-বিদেশের কাগজে কাগজে সাক্ষাৎকার পূর্ব বার্লিনের স্বদেশত্যাগী লেখকদের পুনর্বাসন করা প্রভৃতি হাজার রকমের কাজ তো লেগেই আছে অষ্টপ্রহর। সেই সঙ্গে পড়াশোনাও যে চলছে না তাও নয়। আসলে অলস বসে থাকার লোক ছিলেন না গুন্টার গ্রাস।
কী নিয়ে লিখতেন তিনি? এ ব্যাপারে গ্রাস নিজেই এক জায়গায় তার মনোগ্রাফি বর্ণানাকে বিদ্রূপায়িত মহাকাব্যিক কবিতার মসলায় সুশোভিত করে বলেছেন।
লিখি আমি অঢেল প্রাচুর্য বিষয়ে।
অনাহার বিষয়ে এবং কেন পেটুকরা
আবিষ্কার করেছিল অনাহার।
ধনীদের টেবিলের রুটির বাহিরাংশের শক্ত আবরণ নিয়ে
এবং সেগুলোর খাদ্যমূল্য বিষয়ে।
চর্বি আর মল আর নুন আর
নিদারুণ দারিদ্র্য বিষয়
গরমের মণ্ডের স্তূপের মাঝে
নির্দেশিত করি বর্ণনাকে
কীভাবে আত্মা অত তিক্ত হয়
পিত্তের মতো।
আর পেট যায় খুলে।
(র‌্যালফ মানহেইমের ইংরেজি অনুবাদ থেকে মৎকৃত অনুবাদ)
এইভাবে গ্রাস রচিত অস্বাভাবিক এবং সাহসী নকশাগুলো সমকালীন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝড়কে জয় করার অদম্য প্রচেষ্টার ভাষ্য হয়ে ওঠে। বাল্য এবং কৈশোরে নিজের শহর দানৎসিতোর নানারকম বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যোগ দিয়েছিলেন জার্মান সামরিক বাহিনীতে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানে মার্কিন যুদ্ধবন্দি শিবির থেকে ছাড়া পেয়ে প্রথমে কিছুদিন খামার শ্রমিক এবং পটাশ একাডেমি অব ফাইন আর্টসে। এ সময় তিনি শিক্ষানবিশ পাথরমিস্ত্রি হিসেবে সমাধি শিল্প উৎকীর্ণ করার কাজও শেখেন। ক্রমেই তিনি ভাস্কর এবং শিল্পী হিসেবে সুদক্ষ হয়ে উঠে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন।
মধ্য পঞ্চাশের দশকে গ্রাস চলে যান প্যারিতে। প্যারিতে বসবাসের সময় থেকেই গ্রাস কবিতা ও নাটকে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মেতে ওঠেন। লেখক জীবনের প্রথম পর্যায়ে গ্রাসের ওপর ফরাসি অ্যাবসার্ড নাট্যকার আয়োনেস্কা, বেকেট ও জাঁ জেনের প্রভাব পড়েছিল প্রবলভাবে। গ্রাসের নিজের জীবনে নানা আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ফলে তার নাটকগুলোতেও বিশ্ব এবং মানুষকে সম্পূর্ণ উল্টো করে দেখানোর একটা প্রবণতা দেখা যায়, অর্থাৎ অ্যাবসার্ড ব্যাপারটাই গ্রাসের জন্য যেন অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং অসাধারণ যা কিছু তাই সাধারণ হয়ে ওঠে। গ্রাসের কাছে মঞ্চ হয়ে ওঠে একটা বিশাল ক্যানভাস, যেখানে দর্শকদের নিয়ম মাফিক দৈনন্দিন তার বৈপরীত্য দেখে আঁতকে ওঠে, হয়তো এটাই গ্রাসের মূল লক্ষ্য।
তার প্রথমদিকের নাটক প্লাবন (হোখওয়াজার) নাটকটির কথাই ধরা যাক। জলস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি পরিবারের সব লোকজনই একটি বাড়ির নিচতলা থেকে ছাদের উপর উঠে এসেছে। সবকিছুর মধ্যেই একটা বিরাট বিপর্যয়ের ছায়া ঘনীভূত হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্লাবনের ব্যাপারটায় নোয়ার নৌকার আরোহীদের মতো বন্যাকবলিত পরিবারটির সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছের প্রধান থিমটাকে ধরে রাখার জন্যই যেন নাটকটির শেষ হয় একটা গতানুগতিক ধ্বনির ভেতর দিয়ে। যুদ্ধ-উত্তর জার্মানির পরবর্তী প্রজন্মের দ্বিধা-বিভক্তির ব্যাপারটাই যেন এখানে গ্রাসের কাছে প্রধান ব্যাপার।
জল তখন ক্রমে বেড়েই চলছে, খুব তুচ্ছ ব্যাপার : বন্যা যখন হয়েছে জল তো তখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে, এটা তো জানা কথাই। পরিবারটির বয়স্ক সদস্যদের প্রতিনিধি হিসেবে বাবা এবং এক খুড়ি মা চাইছেন সবার আগে বয়স্ক এবং অপ্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্রই উদ্ধার করা হোক। এদিকে তরুণতর প্রজন্মের সদস্যরা যে শিকড়সহ উৎপাটিত হয়ে নির্মূল হতে বসেছে সে ব্যাপারে ওরা দু’জন সম্পূর্ণ নির্বিকার। যেহেতু বাবা এবং ছেলেমেয়েদের মধ্যে যোগাযোগের অভাবটি অত্যন্ত প্রকট, সেহেতু প্লাবনের তীব্রতা কমে আসার মুহূর্তে তারা যে যার ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে। পরিবর্তনের মুখে এই একই যোগাযোগের সমস্যাটাই গ্রাসের রচনার একটা মূল উপাদান। তা নাটকেই হোক আর উপন্যাসের হোক। ধূর্ত বাবুর্চি (ডাই বোসের কোচে) নাটকেও রয়েছে এই একই বিষয়বস্তু। একজন কাউন্ট একটা অসামান্য এবং উপাদেয় স্যুপের প্রস্তুত প্রণালির গোপন সূত্রটি লুকিয়ে রেখেছেন, যেটা প্রকৃতপক্ষে কেবলমাত্র বাঁধাকপির স্যুপের সঙ্গে এক ধরনের ধূসর তরল সারাৎসারের সংমিশ্রণেই তৈরি হয়। বাবুর্চিদের দুটি দল কাউন্টের কাছ থেকে প্রস্তুত প্রণালিটি চুরি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু কাউন্টও হুঁশিয়ার লোক, সামনে তাদের সে প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে যাচ্ছেন। শেষমেষ তিনই ওদের প্রস্তুত প্রণালিটি বেমালুম ভুলে বসে আছেন। কিছুতেই আর মনে করতে পারছেন না। বাবুর্চিরা এই প্রতারণায় দ্বিগুণ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস যে, নাটকের শেষে কাউন্ট আর মার্থাকে আত্মহনন করতে দেখে বাবুর্চিদের দু’দলই বোবা ও অসহায় হয়ে পড়ে বাবুর্চিদের একজন স্বীকার করে যে, প্রস্তুত প্রণালির ব্যাপারটা আসলে ‘একটা ছোটাছুটির নিমিত্তমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এখন কেউই আর সেটা চায় না। আর স্যুপটা তো কোনো ব্যাপারই নয়।’ তাহলে জিনিসটা দাঁড়াচ্ছে শব্দকে নিয়ে, যা হয়তো জীবনের জন্যই কোনো প্রস্তুত প্রক্রিয়া তৈরি করে দিতে পারে। প্রতিশোধের এ নাটকটিতে আগাগোড়া পুনর্কথনের বাবুর্চিদের নিজেদের জন্য পুষ্টিকর কিছু আহরণ করার ব্যর্থতা এবং পরস্পরকে বোঝাপড়ার অভাববোধ_ এই দুই পরিস্থিতির টানাপড়েনে ফেলে অসম্ভব রকমে গড়াগড়ি খাইয়েছেন। ওরা যেন অন্য কারোর শব্দবোধকে নিজেদের মুক্তির চাবি হিসেবে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আর ওই একই কারণে স্যুপের প্রস্তুত প্রণালি পেয়ে ব্যর্থ হয়ে নিজেরা ভয়ভীতি ও আতঙ্কতাড়িত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেছিল।
গ্রাসের বেশির ভাগ রচনাই বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি পাঞ্জা লড়াই করার মতো একটা ব্যাপার। বিশেষ করে জার্মান জাতির অতীতের সঙ্গে। বাস্তবতাকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য যাবতীয় মোহ, বিভ্রমকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার সমস্যা নিয়ে লেখা নাটক ও কবিতা চর্চার মধ্যে গ্রাস এই সময় প্রথম উপন্যাসে মনোনিবেশ করেন এবং পরপর তিন তিনটি অসামান্য উপন্যাস টিন ড্রাম (১৯৫৯), ক্যাট অ্যান্ড মাউজ (১৯৬১), ডগ ইয়ার্স (১৯৬৩), রচনা করেন এবং এই একই সময়ে তিনি প্রবলভাবে রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে ওঠেন। প্যারি থেকে দেশে ফিরে এসে তিনি সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিলেন। পরিণামে তার পরবর্তী সময়ের প্রতিটি লেখাতেই রাজনীতি একটা বিরাট ভূমিকা নিতে থাকে। ঔপন্যাসিক হিসেবে গ্রাসকে সবচেয়ে সক্রিয় বললেও গ্রাসের সক্রিয়তার হয়তো যথার্থ বর্ণনা করা হয় না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মান সাহিত্যকে জার্মান ঐতিহ্যের সঙ্গে গ্রথিত এবং আধুনিক তাৎপর্যে ফর্মের নিত্যনতুন বিস্তার ঘটাতে গ্রাসের নৈপুণ্যের কোনো তুলনা হয় না। টিন ড্রাম, ক্যাট অ্যান্ড মাউজ, ডগ ইয়ার্স_ এই তিনটি উপন্যাস গ্রাসের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার শিল্পচর্চা নয়; অনুভব উপলব্ধি ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া মাত্র। অবশ্য সেই সঙ্গে তার শিল্পরূপের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। গ্রাসের কাছে শিল্পরূপের চর্চা ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিদ্রোহী অর্থাৎ জার্মান জনগণের দুঃখজনক ত্রুটি-বিচ্যুতিই গ্রাসের অনুসন্ধানের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে গ্রাসের নাটক ‘এ জার্মান ট্রাজেডি’র কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এ নাটকে তিনি ১৯৫৩ সালের ১৭ জুনের পূর্ব বার্লিনে বিদ্রোহের সময় ব্রেখটকে ভূমিকা নিয়ে কিছুটা বক্রোক্তি করেছেন খোলাখুলিভাবেই। গ্রাস এ নাটকে ব্রেখটকে শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মোহমুক্ত এবং নন্দনতাত্তি্বক হিসেবে দেখিয়েছেন। বস চরিত্রটির মাধ্যমে শুধু ব্রেখটই নন, শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে যারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং নিজেদের একটা আলাদা কিছু বলে ভাবেন তাদের সবাইকেই বোঝাতে চেয়েছেন গ্রাস। বস চরিত্রটিকে একটি প্রতীক হিসেবেই দেখিয়েছেন তিনি। উৎপীড়নকারী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করার অক্ষমতাকে এবং যারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের সবাইকেই বিশ্বাসঘাতকরা দোষে দোষী সাব্যস্ত করেছেন গ্রাস।
উপন্যাসে এস্টাবি্লশমেন্ট আর অতীতকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা গ্রাসের একটি সহজাত প্রবণতা। যার জন্য গ্রাস কখনো পুরানের পুনর্কথনের সাহায্যও নেন। ভাষার ব্যাপারেও গ্রাস সম্পূর্ণভাবে বিপ্লবী। জার্মানিতে প্রায়শই সংস্কৃতি বলতে বিমূর্ততাকে মহিমান্বিত করা হয় এবং সেই সঙ্গে রয়েছে একটা অভিজাত শৈলীর অভিঘাত। গ্রাস যেন সব সময়ই ভাষার মথা ধরে ঝুকিনি দিয়ে চলেছেন। যে দেশের মানুষ এখনো ‘অতিমানব’ আদর্শবাদের প্রতি_ যিনি বিমূর্ততা ও উচ্চাভিলাষকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে অটলভাবে লড়াই করে চলেছেন এককভাবে।
গ্রাসের এই লড়াইয়ের ফসল, সহায়ক সংশোধনকারী শক্তি এবং সবচেয়ে খ্যাতিমান চরিত্রটি হচ্ছে তার প্রথম উপন্যাস টিম ড্রামের নায়ক বামন অস্কার। থার্ড রাইখের উত্থান ও পতন প্রসঙ্গে যার মারাত্মক হাঁটু-উঁচু দৃষ্টিভঙ্গি আতঙ্কিত ও মুগ্ধ পাঠককে নিবিষ্ট করে রাখে। অস্কারের সঙ্গীতচিৎকার এতই জোরালো যে, কাচ পর্যন্ত চিড় ধরে ভেঙে যায়। তার ম্যাজিক ড্রামটি তাকে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে আনানেওয়া করতে পারে। অস্কারের নানা রকম কৌশল ও চাতুর্যের সর্বোত্তম একটি হচ্ছে টিনের ড্রামের ওপর পাল্টা বোল বাজানো। নিজের লেখা ও জীবনেও যেন গ্রাস এই অস্কারের ভূমিকাতেই মূর্ত হয়ে আছেন।
নানা রকমের প্রবন্ধ বক্তৃতায়ও গ্রাস নিরন্তরভাবে নাজি পার্টির প্রাক্তন সদস্য এবং সমর্থকদের সুযোগ পেলেই তুলোধুনো করে ছাড়েন। যুদ্ধোত্তর জার্মানির নতুন প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে লেখা ক্যাট অ্যান্ড মাউস-এ গ্রাস খোলাখুলিভাবেই আয়রন ক্রশকে নিয়ে প্রচুর রঙ্গ রসিকতা করেছেন। এক জায়গায় আছে নায়ক ক্রশটি তার নিজের শিল্পের সামনে দোলাচ্ছে। সুপার স্টে, সামরিক শক্তিওয়ালাদের বল প্রয়োগের এক ধরনের সাম্যসাধনের আদর্শবাদের উন্মাদ স্বপ্নের অযৌক্তিক দাবি ও সমাজের জন্য অসম্ভ ও অলীক সমস্ত আশাবাদিতা অবশ্যম্ভাবীরূপেই গ্রাসের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে গ্রাস অত্যন্ত সুচতরুভাবে অপরাধবোধের মুদ্রাটিকে এমনভাবে বরণ করেছেন যে নাজি নৈশাতঙ্কের ব্যাপারে যেন প্রতিটি জার্মানবাসীর ছোট ছোট লোভের ওপরই গড়ে উঠেছিল।
বলা যায় হিংস্র, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও রূপকথার মতো ডগ ইয়ার্সে গ্রাস যুদ্ধোত্তর জার্মান তরুণদের এমন একটা ঐন্দ্রজালিক চশমা পরিয়েছেন যার ভেতর দিয়ে তারা যেন পরিষ্কারভাবে তাদের নির্দোষ পূর্বসুরিরা প্রকৃতপক্ষে সেই সময় কী ভূমিকা নিয়েছিল তা দেখতে পায়।
এবার গ্রাসের একটি কবিতার শেষাংশ তুলে দিচ্ছি। কবিতাটি তার ফ্লাউন্ডার উপন্যাস থেকে নেওয়া। কোনো জায়গার বিশেষত্ব লেখায় গ্রাসের জুড়ি নেই। যেমন ‘ক্লেকারবার্গ’ কবিতাটি। কবিতাটি নিয়ে কবিতা কঠিন হলেও অসম্ভব অনুকরণশীল এবং সৌরভমন্ডিত এবং শেষ পঙ্ক্তিটি যেন দ্য ফ্লাউন্ডার এর এপিগ্রাফ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আর যে কবি আন্তরযন্ত্রীয় গোলযোগকেও অমন অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন তা বুঝি একমাত্র গ্রাসের পক্ষেই সম্ভব।
দীক্ষা টীকা শিক্ষা
হয়েছিল অনুমোদিত
বোমার টুকরো ছিল
আমার খেলনা
এইভাবে বেড়ে উঠেছিলাম আমি
অপদেবতা আর হিটলারের
ছবির মাঝে
জাহাজরে ভোঁ প্রতিধ্বনিত হতো আমার কানে
আগলা-ঝোলা বাক্য আর হাওযায় ওড়া চিৎকার,
গির্জা ঘন্টার কিছু ধ্বনি, রাইফেলের গুলি
ছিনিয়ে নিতে বালটিক:ব্লাব্ব্, পফ্ফ্ফ্,
স্স্স…
অশীতিপর বয়সে এসে পেঁয়াজের খোসা যা ছিলকা ছাড়ানো নামের আত্মজৈবনিক লেখাটি লিখেছেন সেটি তাঁর স্বদেশ জার্মানিতে যে তুমুল তর্কবিতর্ক আর শোরগোলের ঝড় উঠেছে সেটা যে কতটা অন্যায় তা বোধ করি গ্রাম পড়ূয়াদের কাছে বিশদ করার অপেক্ষা রাখে না। কারণ তার এই স্মরণালেখটি পড়ার পর মনে হলো অবশ্যই ব্রিটিশ অনুবাদক মাইকেল হেনরি হাইমকৃত ইংরেজিতে, গ্রাসের সবচেয়ে ভালো উপন্যাসের চেয়েও ভালো মনে হয়েছে। তাই এই বইটিতে গ্রাসের আগেকার উচ্চমানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধরন ধারণ ও কৌশলের তুলনায় শুরুর বাক্যাংশের ভেতর যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে হয়তো তার আসল মর্মার্থ বুঝতে ভুল করেছে পাঠকরা বিলক্ষণ।
শুরুতে রয়েছে ‘আজ বিগত বছরগুলিতে যেমন, ছদ্ম-আবরণের প্রলোভনে একজনকে তৃতীয় পুরুষের উপস্থিত করার কায়দায় অতুলনীয়: ওর বয়স তখন ১২, তারপরও সে মাতৃক্রোড়ে বসতে ভালোবাসে…’ স্মৃতি যে পেঁয়াজের গ্রাস শুরুতেই সেটা প্রতিবাদ করেছেন, সুস্পষ্টভাবে আরও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আমার জন্য সংক্ষিপ্ত বইয়ের উৎসর্গলিপিতে লেখা রয়েছে: আমি নীরব থাকছি’_ সঙ্গে আরও বলেছেন, প্ররোচনা একজনের নীরবতার ছাড় হিসেবে এতই বৃহৎ। শৈশবে এবং তরুণ বয়সে তিনি বীরবন্দনায় বিশ্বাসী ছিলেন। স্বীকার করেন গ্রাস। ‘এটা ছিল একটা সমাচার চলচ্চিত্র: তাদের পরিবেশিত সুচারু কালো আর সাদা ‘সত্যে’ সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো লোক ছিলাম আমি।’ এই আত্মজীবনী অতীব বেদনাদায়ক স্বীকারোক্তি।
‘লেখক আর বই বারংবার আমাকে মনে করিয়ে দেয় যৌবনে আমি কত কম বুঝতে পারতাম এবং সাহিত্যের প্রভাব কতটা স্বল্প ছিল। যুদ্ধ শেষে দানৎসিস কেবল ইটপাথর ভাঙা টুকরের গরাদখানায় পরিণত হয়েছিল।’ বর্তমান আত্মজীবনীর প্রথম পরিচ্ছেদগুলির প্রধান ফোকাস ছিল। যে ছেলেটি শহর পরিত্যাগ করেছিল এমন একসময় যখন তার সমস্ত উঁচু ইমারত আর ঢালু ছাদের নিম্নবর্তী অংশসমূহ তখনো অক্ষত অবস্থায় ছিল।
প্রবল বিতর্কের মধ্যে প্রকাশিত গ্রাসের আত্মজীবনী পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর আগে গ্রাসের পঁচিশটি বই আর নোবেল পুরস্কার (১৯৯৯) প্রাপ্তি খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে গ্রাসের বিরুদ্ধে বৈরী মনোভাবের কারণ। গ্রাসের সমালোচকদের কাছে যখন ১৫ বছর বয়সে সাবমেরিন কোরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সেটা গ্রহণযোগ্য আর ১৭ বছর বয়সে এস এস সশস্ত্র বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের ব্যাপারটার উদ্ঘাটন নিতান্তভাবে আপত্তিকর। এরপর তো চূড়ান্ত বছরগুলিতে গ্রাস সেনাবাহিনীর সঙ্গেই কাটালেন। পরবর্তী সময়ে নুরেমবার্গ বিচারে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত হলেন। কেন তিনি এসব কথা জানাতে এতটা দেরি করলেন? তার সমালোচকদের চাঁচাছোলা জিজ্ঞাসা।
প্রত্যুত্তর যাওয়া যাবে পরের কথনগুলিতে।
দ্যা টিন ড্রামের গ্রাসের উপর রুশ সৈন্যরা কতবার ধর্ষণে লিপ্ত হয়েছিল মনে করতেই গ্রাস বলছেন তাঁর নিজের মা কখনো বলেন নি কতবার এবং কোথায় কোথায় রুশদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়েছিলেন। কেবল তাঁর মৃত্যুর পরেই আমি জানতে পেরেছি, তাও আমার বোনের কাছ থেকে_ নিজের কন্যাকে বাঁচানোর জন্য কী করে তিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এরপর কোনও কথা থাকতে পারে না। গ্রাসের বোন প্রথমে নান পরে নার্স এর কাজ নেন।
যুদ্ধশেষে সেনাবাহিনীর হিংস্রতার মুখে হারিয়ে যাওয়া তার শৈশবের বিশ্বাস কী করে পুনরুদ্ধার হতে পারে?
লেখকের বিশ্বাস ফিরে আসে নি। তিনি স্বীকার করে নেন যে ডাফেন এস এস অর্থাৎ সেনাদলে যোগদান সম্পর্কে তির্নি সমাজের বাছাই করা সেরা ইউনিটকে বোঝাতে চাইছিলেন। আবারও তিনি নিজেকে ছদ্ম আবরণে ঢাকা দিয়ে লেখেন, ‘ছেলেটি যখন পূর্ণ যুবক হিসেবে সম্ভবত চাকরির ধরনটা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। সাবমেরিনের কাজ তার কপালে নেই যা আর আজকাল রেডিও বুলেটিনেও আর শোনা যাচ্ছে না, তাহলে কি শেষমেশ সে গোলন্দাজই হবে..।’ গ্রাস তখন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ভাবেন : ‘যুদ্ধশেষে তাহলে কি আমি যৌবনের নির্বোধ অহঙ্কারে পৌনঃপুনিকভাবে লজ্জায় বোধ চেপে যাব। কিন্তু দুর্বিষহ বোঝার ভারটা তো থেকেই যাচ্ছে, সেটাকে তো আর কেউ লাঘব করতে পারবে না।’ কালপঞ্জি অনুযায়ী যুদ্ধে গ্রাসের পরাজয় ঘটলে তিনি আবারও ভাবেন এটা উড়িয়ে দেওয়া তেমন সহজ হবে না। প্রায়শ মনে হবে নিজের কাছে নিজের হারিয়ে যাওয়া। গ্রাসের সমস্ত কিছুই অকপট স্বীকারোক্তি। নতুন শিল্পসত্রের অনুসন্ধিৎসু গ্রাসের লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হলো আঁকা অসাধারণ ছবিগুলো।
তার সমবায়ী শিল্পকর্মে ছবি আর তার লেখালেখিকে আলাদা করে দেয়া সম্ভব নয়। যেন একে অন্যের পরিপূরক।
পেঁয়াজের ছাড়ানো খোসার মতোই পরতে পরতে রয়েছে তার আত্মকখনের মুখরতা। ঢের বেদনা, প্রেম-অপ্রেম, যৌন মিলন, ঢের ঢের ধ্বনি, রঙের খেলা আর সূক্ষ্ম অনুভূতির অনুবাদ। স্বাদ-গন্ধ-বর্ণের এক সমবেতন ঐকতান। প্রেম, প্রীতি, পরিণয়, প্রথম স্ত্রী আর যা কিছু লেখালেখির উপকরণ হতে পারে তার সবকিছুই গ্রাস একে একে বিধৃত করেছেন প্রয়োজনমাফিক কখনো এগিয়ে কখনো পিছিয়ে অনুপমশৈলীতে, কঠিন ও শ্রমসাধ্য প্রথম উপন্যসে। যদিও একজন লেখক শেষাবধি তার সৃষ্ট চরিত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তাদের কৃতকর্ম বা অপকর্ম উভয় ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ভূমিকা থাকতে হয় জবাবদিহিতার। পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর উৎসর্গপত্রে গ্রাস লিখেছেন : ‘যাদের কাছে আমি শিখেছি তাদের প্রত্যেককেই।’ অনেকটা আমাদের বাউলদের গানের মতো ‘আমার আত্মিক গুরু বেথিক গুরু’ জাতীয়। আমার নিজের কথা সত্যিকারের গুন্টার গ্রাস পড়ূয়া প্রত্যেক লেখকই তার কাছে ঋণী। নগণ্য লেখক হিসেবে আমি নিজেও তারই একজন। ঢাকা থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে বুকে জড়িয়ে উষ্ণ আলিঙ্গনের মুহূর্তে ‘মাইফ্রেন্ড, মাইফ্রেন্ড’- এর অস্ফুট সরব আর্য ধ্বনি আজ এত কাল পরেও আমার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বেলাল চৌধুরী
বেলাল চৌধুরী
জন্ম: ১২ নভেম্বর ১৯৩৮। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত একজন আধুনিক বাঙ্গালী কবি যাকে ষাট দশকের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। তিনি সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সম্পাদক হিসাবেও খ্যাতিমান। তাঁর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১২ই নভেম্বর বাংলাদেশের ফেনী উপজেলার অন্তর্গত শর্শদি গ্রামে। তাঁর পিতা রফিকউদ্দিন আহমাদ চৌধুরী ও মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরানী। তিনিঁ দীর্ঘকাল ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস কর্তৃক প্রকাশিত ভারত বিচিত্রা পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।