অনুভূতিতে আঘাত না করে সমাজ বদলানো যায় না

অনুভূতিতে আঘাত করতেই হবে, বিশেষ করে ধর্মানুভূতিতে। এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। সমাজকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখলে চলবে না। সমাজ এগোবে না। এগোতে নিলেই প্রশ্ন উঠবে। যারা সমাজটাকে যেমন আছে তেমন রাখতে চায়, তারা কোনওরকম এগিয়ে যাওয়া মানবে না। অন্য কোনও অনুভূতিতে আঘাত লাগলে মানুষ এত বীভৎস বর্বর হয়ে ওঠে না, যত হয়ে ওঠে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে। ধর্মীয় অনুভূতিকে এত গুরুত্ব কেন দেওয়া হচ্ছে! অনেকে বলে, যেহেতু ধার্মিকের সংখ্যাটা দুনিয়াতে বেশি। প্রায়ই শুনি প্রায় দেড় বিলিয়ন লোকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না! এখানে মানুষের সংখ্যাটাকে খুব বড় করে দেখা হচ্ছে। ব্যাপারটা যেন এরকম, সংখ্যায় কম হলে তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়া যায়, সংখ্যায় বেশি হলে দেওয়া যায় না। দেড় বিলিয়ন না হয়ে দেড়শ’ বা দেড়’ হাজার হলে ঠিক ছিল কি?

অনেকে যারা বাংলাদেশের ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে, তারা ব্লগারদের পক্ষ নিতে গিয়ে হামেশাই বলছেন, ব্লগাররা মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেননি। তাহলে কি তারাও ধর্মান্ধদের মতো মনে করেন ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়া অন্যায়? মুশকিলটা ঠিক এই জায়গায়। লক্ষ্য করেছি, এটা মেনে নিতে প্রগতিশীলদেরও অসুবিধে হচ্ছে যে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়াটা অন্যায় নয়। বরং মানুষের এই দাবি অত্যন্ত অন্যায় দাবি যে তারা তাদের অনুভূতিতে কোনওরকম আঘাত ছাড়াই পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান। ন্যায্য কথা হলো, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লাগাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমরা এমন মানুষ কখনও পাবো না, যার কোনও অনুভূতি আজ অবধি আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। মানুষের সঙ্গে ওঠা বসা এবং চলাফেরা করলে আমাদের অনুভূতি সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি শতবার, সহস্রবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এভাবেই আমরা জীবন যাপন করি।
ধরা যাক, ক যদি বলে সে সমাজবাদি দলের আদর্শে বিশ্বাস করে, এবং খ যদি উত্তরে বলে, সমাজবাদি এক নেতার চরিত্রের ঠিক নেই বা সমাজবাদির আদর্শ কোনও আদর্শই নয়, তাহলে কি ক দাবি করবে যে খ তার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে? এবং এই নিয়ে কোর্ট কাচারি করবে, জবাই চাপাতি করবে? ক আসলেই খ এর রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, তাতে হলোটা কি?

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  আছে দুঃখ আছে মৃত্যু

আগেই বলেছি, অন্য কোনও অনুভূতি আঘাত প্রাপ্ত হলে এত অঘটন ঘটে না, যত অঘটন ঘটে ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হলে। ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন আমাদের বিশেষভাবে সমীহ করতে হয়? যেহেতু ধর্মের গল্পগুলো সত্যি নাকি প্রচুর লোক এই ধর্মটাকে ভালোবাসে, তাই? ধর্মের গল্পগুলোকে যারা সত্যি বলে মানে, তাদের অনুভূতি যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে আর সব অনূভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হলে তারা যেভাবে সামাল দেয়, এই অনুভূতিকেও ঠিক এভাবেই সামাল দিতে হবে। অনুভূতির রাজনীতি অনেককাল ধরে চলছে। ধর্মানুভূতির সঙ্গে সংঘাত লাগছে গণতন্ত্রের, শুভবুদ্ধির, জ্ঞানের, বিজ্ঞানের, নারীর অধিকারের, মানবাধিকারের, সমানাধিকারের। এখন দেখতে হবে আমরা কোন পক্ষ চাই। ধর্মানূভুতি রক্ষা করতে চাই নাকি গণতন্ত্র, শুভবুদ্ধি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, নারীর অধিকার, মানবাধিকার, সমানাধিকার ইত্যাদি রক্ষা করতে চাই।

ধর্মানুভূতি নিয়ে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এখন। এর সমাধান কিন্তু ধর্মানুভূতিতে আঘাত না করা নয়। বরং উল্টো। ধর্মানুভূতিতে ক্রমাগত আঘাত করে যেতে হবে। আগের চেয়ে অনেক বেশি। ক্রমাগত আঘাতের ফলেই এই আঘাত গা সওয়া হবে। ধর্মানুভূতিকে নিয়ে ধর্ম-ব্যবসা এক্ষুণি বন্ধ না করলে অসৎ ধর্মব্যবসায়ীরা সমাজের যেটুকু বাকি আছে ধ্বংস হওয়ার, সেটুকুও ধ্বংস করবে।
পৃথিবীর কোথাও নারীবিদ্বেষীদের অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পৃথিবীর কোথাও মানবাধিকারবিরোধী লোকদের অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পৃথিবীর কোথাও গণতন্ত্র বিরোধী লোকদের অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পৃথিবীর কোথাও ধর্মান্ধদের অনুভূতিকে আঘাত না দিয়ে বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পৃথিবীর কোথাও মানুষের ধর্মানুভূতিকে ক্রমাগত আঘাত না দিয়ে ধর্মানুভূতির নামে ধর্ম-ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এইসব পুরোনো পচা নিয়ম দূর করে সমাজ বদলাতে হলে ধর্মানুভূতিতে আঘাত করা অত্যন্ত জরুরি।

ব্লগার বা নাস্তিকদের পক্ষ নিতে চাইলে ওরা কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেনি, এটা বলাটা ঠিক নয়। বরং বলা উচিত, ওরা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে, কারণ আঘাতটা জরুরি ছিল। ধর্মান্ধরা চাইছে নাস্তিক শব্দটিকে এখন গালি হিসেবে ব্যবহার করতে। নাস্তিক শব্দটি যদি গালি হয়, আস্তিকও কিন্তু গালি।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ঘাস

গালি যত ইচ্ছে দাও। কিন্তু ভায়োলেন্স নয়। আইডিওলজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আইিডিওলজি দিয়েই হতে হবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘাত ধর্মের চিরকালের। বিজ্ঞানীরা, বিজ্ঞান যে মানে না, তাদের ধারালো ছুরি শানিয়ে কোপাতে যায় না। কিন্তু ধার্মিকরা ধর্ম যে মানে না তাদের কোপাতে যায়। কোপানোর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে প্রতিবাদ না হলে কোপানো চলতে থাকবে।

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

তসলিমা নাসরীন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Alternative Text