কেরানিও দৌড়ে ছিল

৬.
ঘুম এসেছিল কী আসে নাই, নির্ণয় নাই; হস্তিবাড়ির এই কুটির, কুটিরের চালার নিচে তার বাসর, মদিনার সঙ্গে কী এক যুবতীর সঙ্গেই তার ঝাঁপবন্ধ একাকী এই প্রথম রাতটিতে, ঘুম অথবা জাগরণের ভেতরেই স্বপ্ন আসে। স্বপ্নে কোনো ছবি নয়, কেবল একটি কণ্ঠস্বর। আর কার? সেই রুহিতনের! স্বপ্নের ভেতর রুহিতনের খসখসে স্বর, মধুনিস্রাবী স্বর আব্বা রাজি না হইলে আমি জজমিয়া তোমার সাথে পলাইতেও রাজি!
ধ্বনিটা কানে পশার সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে জেগে ওঠে কেরানি। উঠতে গিয়ে স্খলিত একটি হাত তার পাশে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ যেন তাকে আঘাত করে। কোমল মাংস তো নয়, যেন জ্বলন্ত উনোন। বিদ্যুৎ যেন প্রবল ধাক্কা দেয় তাকে, হাত সরিয়ে নেয় সে তৎক্ষণাৎ। কোমল এই দেহটি কার? সেই দেহে তার হাত! আহ, রুহিতনেরই কি?
তার শরীরের ভেতর তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কিসের এক ক্ষুধার্ত উত্থান ঘটে, কিন্তু তার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই তার। বরং তার শরীরের একটি অঙ্গ বিবর সন্ধানে মাথা উঁচু করে ওঠে। মাথার ভেতর সব গোলমাল হয়ে যায়। কেরানি পাশ ফিরে পাশের ওই কোমল শরীরটিকে দখলে আনার জন্য পা তুলে দিয়ে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ চৈতন্য হয় তার। তাকিয়ে দেখে না! রুহিতন তো নয়! মদিনা! গতকালই তো মসজিদে তার বিয়ে হয় মদিনার সঙ্গে। ছায়াছবির মতো দৃশ্যগুলো নেচে ওঠে তার মনের পর্দায়। মসজিদের ঠাণ্ডা সিমেন্টের মেঝে নিতম্ব্বে সে পুনরায় অনুভব করে। তৎক্ষণাৎ ত্রস্ত হয়ে কেরানি উঠে বসে।
ত্রস্ত কিন্তু কৌতূহল হয় তার। মুখখানা দেখার জন্য সে ঝুঁকে পড়ে। আহ, এত রূপও হয় নারীর। মুখখানা জবা ফুলের মতো ফুটে আছে আবছা আলো আঁধারিতে। আর সুগন্ধ। সুগন্ধ সে পায়। জবার সুগন্ধ নাই, কিন্তু মদিনার সর্বশরীর জুড়ে সুবাসের ঢেউ। মদিনা! নবীর শহর! না, তার পক্ষে সম্ভব নয়। পা নামিয়ে নেয় সে দ্রুত। কেরানি চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
ঘরের ভেতর তখনও অন্ধকার। বাইরে ভোরের আলো ভাঙছে। বাইরে কোনো শব্দ নাই। মসৃণ আয়নার মতো স্তব্ধতা ধরে আছে জগৎ। চৌকির ওপর মদিনা এখনও ঘুমে কাতর। কেবল তার নিঃশ্বাস পতনের শব্দ ক্ষীণধারে বইছে। ঘুমের ভেতরেও মানুষ বুঝি টের পায় কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মদিনা ঈষৎ শব্দ করে পাশ ফেরে। মেঝের ওপর দাঁড়ানো কেরানি তখন এক পা আরও পিছিয়ে যায়। তারপর দরজার ঝাঁপ ঠেলে বেরিয়ে আসে।
দাওয়ার ওপর মাকে সে দেখতে পায়। ভূমিতে মা লুটিয়ে পড়ে আছে। যেন কোথা থেকে এক ভিখিরি এসে শুয়ে আছে দোরগোড়ায়। অস্ফুটস্বরে সে ডাক দেয়, মা! কিন্তু সাড়া পায় না। সেই বাজ পড়ার পর থেকে মা যে তার কানে আর শুনতে পায় না, সে ভুলেই গেছে। আবার সে ডাক দেয়, মা! মাও গো! ঝুঁকে পড়ে সে মায়ের কাঁধে হাত রাখে। ঠেলা দেয়। তাতেও ঘুম ভাঙে না মায়ের। ওপাশের ঘর থেকে বড়বুবু বেরিয়ে আসে।
কীরে! ঘুম হইলো? বৌ জাগে নাই?
ভোরের আলোতেও স্পষ্ট দেখা যায় বড়বুবুর মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে আছে। ওই হাসিটুকু জগতে আর কোথাও সে দেখে নাই, পায় নাই। কেরানির বড় মায়া হয়। বড়বুবুর সুখের জন্য জগৎ ভাঙতে পারে কেরানি। কিন্তু কতটুকুই বা তার ক্ষমতা? বড়বুবুর সংসার হয় নাই, আর সে নিজে বিয়ে করে বসে আছে! বড় অপরাধী মনে হয় তার নিজেকে। সদ্য বিয়ে করে উঠে সে অসীম গ্গ্নানি অনুভব করে। একে তো বৌয়ের নাম মদিনা শুনেই সে হিম হয়ে গেছে, তার ওপর বড়বুবুকে এখন ভোরের আলোয় চোখে দেখে উঠে কেরানির সংসার-সাধ উড়ে যায়।
বড়বুবু বলে, মুখখান ভার কেনে তোর?
কিছু নয়।
বৌয়ের সঙ্গে কথাবার্তা হয় নাই?
কেরানি এ কথার উত্তর দেয় না।
বৌ পছন্দ হয় নাই?
তারও কোনো উত্তর নাই। তখন বড়বুবু দাওয়ায় উঠে আসে। কেরানি ভাবে হয়তো সে ঘরের ভেতর মদিনার কাছে যাবে, কিন্তু না, মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায় বুবু। একটা শিশুর মতো পা গুটিয়ে মা শুয়ে আছে দাওয়ায়। শুয়ে আছে কী অঘোর ঘুমে। কেন মা ঘর ছেড়ে উঠে এসেছিল গভীর রাতে ছেলের বাসর ঘরের বাইরে, জননী ভিন্ন আর কারও তা জানা নাই। জগতে জননীই তো সবার আগে প্রথম টের পায় তার সন্তানের মনে কী হয়!
মায়ের গায়ের ওপর শাড়ির আঁচল ভালো করে টেনে দিয়ে বড়বুবু বলে, কখন যে হেথায় আসি শুইছে! বাপজানেও খবর রাখে নাই। একেবারে পাগলির মতো হয়া গেইছে মাও। কোনো বোধ সাড় নাই। তোর যে বিয়া, তারও কোনো সম্বাদ নাই তার। কাইল সারাবেলা কয়, কার বিয়া? কার বিয়া? হুঁশ নাই মোটে! এলা ঘরে তোমার বৌ আসিলো, বৌ যদি যতন করে মার। দ্যাখ না কেনে, আমি ইশকুল নিয়া ব্যস্ত। ভোর হতে বিকাল পজ্জন্ত। ছোটোজনাও হইছে এক হারামজাদি। সাজোন-গোজোন আর তামাম দিন পাড়া বেড়ানি। মাকে তবে দেখিবে কাঁই? সেই কারণে তোকে বিয়া দেওয়া হয়। বৌ যদি মাকে দেখি রাখে!
কেরানি বড় বিভ্রান্ত বোধ করে। হতাশও হয়। ঈষৎ ক্রোধও হয়। তবে তাকে বিয়ে দেওয়ার আসল উদ্দেশ্য মায়ের যত্ন করার মতো একজনকে ঘরে আনা? বড়বুবুর কথাটা তাকে আরও শীতল করে দেয়। মদিনার সঙ্গে আরও দূরত্ব সে অনুভব করে ওঠে।
বাড়িতে ভাবিশ্রেণীর নারী থাকলে বাসর শেষের ভোরে ফরজ গোসল দেওয়ার জন্য কলকল করে আসত। এ কাজ বড় বা ছোটবোনের নয়। তবু বাসর শেষের একটা আচার তো আছেই। অতএব বড়বুবু বাসর ঘরের ভেতর যায়। মদিনাকে এখন সে জাগিয়ে তুলবে, গোসলের কথা বলবে। কিন্তু গোসলের কোনো কারণ ঘটে নাই। মদিনার শরীরের স্বাদ কেরানি নেয় নাই।
নান্না আর হাকিমদ্দি বলেছিল, ভোরেই তারা এসে যাবে। বেলা মাথার ওপর উঠে যায়_ তাদের দেখা নাই। কেরানি সারাবাড়ি ঘুরে বেড়ায়। বড়বুবু মদিনাকে নিয়ে কুয়ার পাড়ে বেড়া ঘেরা স্থানে যায় বৌয়ের গোসল দেওয়াতে। ছোট বোনটি তার সঙ্গে যায়। কুলকুল করে সে মদিনার কাছে জানতে চায় বাসর রাতে কী হয়েছিল। আ, মেয়েটার শরম-লজ্জা বলে কিছু নাই। বৌকে গোসল দেবে কী, মা এসে কুয়ার পাড়ে দাঁড়ায়, বালতি কেড়ে নিয়ে নিজেই নিজের মাথার ওপর ঝপঝপ পানি ঢালে।
আজমতউল্লাহ্ ছেলেকে ডাক দেয়। শান্তির দশা তো চক্ষেই দেখিচ্ছো, বাপ! আয়, কাছে আয়, একদণ্ড বইসেক না কেনে হামার কাছে। বাবার ডাক পেয়ে কেরানি যেন অকূলে একটা গতি পায়। কেরানি বাবার কাছে এসে বসে।
এখন তোকে অনেক দিক ভাবি দেখিতে হইবে। বিয়ার পরে বৌ কি কেবল নিজের ঝইন্যে? পরিবারের সক্কলের। বৌ খালি তোমার নয়, বাড়ির বৌ। হামার সংসার তো উচ্ছন্নে গেইছে। না তোর বড়বুবুর বিয়া হইল, না আর সে কোনোকালে বিয়া করিবে। ছোটোঝনার তো কথায় নাই! কয় বলে দুবাই যাইবে। সে দ্যাশে নাকি বেটিছাওয়ার বিপুল সুযোগ আছে চাকরি করিবার। চেয়ারম্যানের ব্যাটা তাকে আশ্বাস দিয়া রাখিছে। এদিকে গাঁও জুড়িয়া বদনামে কান পচি গেইছে হামার। আর, তোমার মায়ের দশা বয়রা হয়া গেইছে, কানে শোনে না, পাগলিও প্রায়। তোমাকে বিয়া দিলোম, বৌ আসিলো, তবে যদি সংসারে ফির গতি ফিরি আসে অ্যালা।
ঝিম মেরে বাবার সমুখে বসে থাকে কেরানি। সকল কথা তার কানে পশে না।
বাবা বলে, কয়দিনের ছুটি তোমার?
জ্বী? চমকে ওঠে কেরানি। এখান থেকে পালাতে পারলে সে বাঁচে। বলে, ছুটি? ও হ্যাঁ, ছুটি আমার খুব মুশকিলের। লঞ্চের চাকরি। লঞ্চের তো ছুটি নাই, বিরাম নাই। আজ কী কালই আমাকে ঢাকা ফিরে যেতে হবে।
আজমতউল্লাহ্ ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু তিরস্কারের স্বরে বলে, তোমার ভাষাও বদলিয়া গেইছে। বাপ মোর, দ্যাশের বুলি ভুলিয়া যাওয়া ভাল্ কথা নোয়ায়। ভাষা ভুলিলে দ্যাশও ভুুলি যাইতে কতক্ষণ? দ্যাশ ভুলিলে এই সংসারও তো ভুলি যাইবেন। ইয়ারে ঝইন্যে কি তোমাকে বিয়া করানো?
কেরানির ভেতর থেকে অবোধ একটা চিৎকার জেগে ওঠে, কিন্তু ভাষায় তা প্রকাশ পায় না। কেরানির ভেতর দুদ্দাড় করে তার বর্তমান গড়িয়ে পড়তে থাকে ভাঙনের মুখে। দ্রুতপায়ে সে বাবার সমুখ থেকে উঠে যায়। প্রায় দৌড়েই সে বাহির বাড়িতে যায়।
বাড়ির সমুখে দোলা জমিন। বুনো বড়ই, কন্টিকারি আর আগাছায় ভরে আছে জায়গাটা। তারই ভেতর দিয়ে চলার একটা পথ মানুষের পায়ে পায়ে সরু হয়ে ফুটেছে। সেই পথের মুখে ঝাউপাতার গেট বাঁধা হয়েছিল বিয়ে উপলক্ষে, রঙিন কাগজে সাজানো হয়েছিল। রাতের শিশিরে কাগজের মালা ভিজে নেতিয়ে এখন ঝুলছে। তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো কেরানি আগাছার জঙ্গল মাড়িয়ে বিলের দিকে যায়।
বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই বিল। বিলের ওপর ভোরের রাঙা আলো পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে বিলের কাছে এসে দাঁড়াতেই কেরানির মনে পড়ে যায় সদরঘাটের কথা। ভোর বেলা লঞ্চ এসে ভেড়ে। তখনও রাতের আঁধার ভালো করে কাটে নাই। কিন্তু একের পর এক লঞ্চের ঘাটে এসে পেঁৗছবার তৈরিতে জেগে উঠেছে সদরঘাট। কলরবে কোলাহলে মুখর চারদিক। কিন্তু বুড়িগঙ্গা কী নিবিড় প্রশান্ত, তার বুকে ঢেউ নাই, শব্দের আলোড়ন নাই, ভোরের প্রথম সূর্যের লাল আলো মেখে ছবি হয়ে আছে। নদীর ওই ছবিটা কেরানিকে বরাবর খুব শান্তি দেয়। মনে হয়, দীর্ঘ যাত্রার শেষে, অর্থহীন কারণহীন এক ভ্রমণের শেষে সে ফিরে এসেছে তার নিজের ঠিকানায়।
নিজের ঠিকানা! তবে কি ঢাকা তার কাছে এখন নিজের ঠিকানা! আর এই হস্তিবাড়ি তার কাছে কিছু না! জন্মের এই মাটি তবে তার কাছে এখন পর? কখন? কবে থেকে?
আর, এই যে এখন সদ্য কলমা পড়া বৌ মদিনার চেয়ে রুহিতনকে তার অনেক বেশি কাছের মনে হচ্ছে, মদিনাকে বিভ্রম আর রুহিতনকেই বাস্তব মনে হচ্ছে, এটাই বা কী করে?
রুহিতনের বুকে একবারই মাত্র ক্ষণকালের হাত পড়েছিল তার, ওতেই কি এতদূর? আহ, সেই মুহূর্তটা! মনে করতেই তার শরীরে আগুন ধরে ওঠে এখন। আর, সারাটা রাত যুবতী এক নারী তার চৌকিতে, ঘুমের ভেতর শরীর এলিয়ে, তাতেও তার শরীর জাগে নাই! এ কেমন?
বিলের পাড়ে গিয়ে কেরানি একটা মরা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে। বিলের পানি এখন ভোরের অরুণ আলোয় লাল টকটকে। আজ এই প্রথম তার মনে হয়, সূর্য রাঙা পানি তো নয়, লাল বেনারসি কে যেন বিছিয়ে রেখেছে।
আহ, কেরানি এখন কানে স্পষ্ট শুনে ওঠে রুহিতনের সেই রহস্যময় উচ্চারণ_ লাল ব্যানারছি! প্রথমে সে তো বুঝতেই পারে নাই যে মেয়েটা কী বলছে! পরে তার কাছে পরিষ্কার হয়, বিয়ের ফর্দটা চুরি করে পড়েছিল রুহিতন। রুহিতন ধরেই নিয়েছিল তাকে বিয়ে করবার জন্য ফর্দটা আগাম করে রেখেছে কেরানি। ভড়কে সে গিয়েছিল, রাগ করাটাও তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু ভালোও যে লেগেছিল তার!
বিলের রাঙা পানির ওপর চোখ পেতে রেখে স্বপ্নবিভোর হয়ে ওঠে কেরানি। বিয়ে! বিয়েটা যেন মদিনা নয়, রুহিতনের সঙ্গেই গতকাল তার হয়ে যায়। লাল বেনারসিটা জড়িয়ে ছিল মদিনাকে নয়, রুহিতনকেই। তার রাতের চৌকিতে অঘোরে ঘুমিয়ে ছিল মদিনা নয়, রুহিতন!
ছিঃ। এ কী ভাবছে সে! তার অন্তরাত্মা ছি ছি করে ওঠে। সদ্য বিবাহিত সে। মদিনাকে সে কলমা পড়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছে। একদিনও পার হতে পারে নাই, এরই মধ্যে সে রুহিতনকে নিয়ে ভাবছে! মাফ করো গফুরুর রহিম আমাকে মাফ করো।
পেছন থেকে ঘড়ঘড়ে কারও গলার আওয়াজ পাওয়া যায়, কী, বসি আছো হেথায়?
কেরানি ঘাড় ফিরিয়ে নগেন মাস্টারকে দেখতে পায়। ইশকুলের হেড মাস্টার নগেন বর্মণ। ওই ইশকুলেই তো বড়বুবু চাকরি করে।
কেরানি উঠে দাঁড়ায়।
কী দেখিচ্ছো? নাই, সে বিল আর নাই, শুকি যাইচ্ছে। পদ্ম শাপলা ফুটিতো, তাও আর নাই। হাওয়ায় গা জুড়াইতো, এলায় কেবল তপ্ত হাওয়া। দিন বড় মন্দ। _বলতে বলতে নগেন মাস্টার কেরানির কাছে আসে। এত যে দুঃসংবাদ দিলো, কাছে এসে মুগ্ধ চোখে কেরানির দিকে নগেন মাস্টার তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। সে দৃষ্টির সমুখে কেরানি বড় অপ্রতিভ হয়ে পড়ে।
নগেন মাস্টার বলে, তোমার বইনের কাছে বিয়ার সম্বাদ পাই। বড় ভালো টিচার তাঁই। আমাক্ কইছিলো একবার যায়া আশীব্বাদ করিতে। তা বিয়ার সব ভালে ভাল হইছে আশা করি। তোমার বৌ দেখিতে ওবেলা যামো। মালতিকে সাথে নিয়া যামো। আ, মালতির কথা মনে নাই?
মনে আছে। আপনার বেটি তো! ভাল আছে?
আছে, বাচ্চার মা হইছে।
কী কন, কাকা? মালতির বিয়া তো সেইদিন দিলেন! বচ্ছরও ঘোরে নাই।
নগেন মাস্টার হেসে বলে, দেখিও, তোমারও বচ্ছর না ঘুরিবে। বৌয়ের কোলে বাচ্চা আসিবে।
চমকে ওঠে কেরানি। এ সম্ভাবনা তার মনে এখন পর্যন্ত আসে নাই। মদিনা সন্তানবতী হবে? গর্ভে সন্তান আসবে? কিন্তু মদিনার সঙ্গে তার স্বামী-স্বাভাবিক আচরণ তো গতরাতে হয় নাই। কখনও হবে বলেও ভরসা নাই। বাসরের অমন নিরালায় পেয়েও অমন পবিত্র নামের নারীকে নগ্ন করার কথা সে ভাবতে পারে নাই। গতকাল বাদজুম্মা মসজিদে বসে বিয়ের কলমা পড়ার কালে ইমামের মুখে মদিনার নাম উচ্চারিত হওয়ার কালে যেমনটি হয়েছিল, এখন আরেকবার ভেতরটা হিম হয়ে যায় কেরানির।
অতঃপর নগেন মাস্টার লঞ্চের চাকরির বিষয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে কেরানিকে। জীবনে মাস্টার লঞ্চে চড়ে নাই, নদীর বুকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দেয় নাই। নদীর পর নদী, দক্ষিণের সেই দেশ না জানি বা কেমন! নগেন মাস্টারের কৌতুহলের অন্ত নাই। তার হাত থেকে বহু কষ্টে নিজেকে ছাড়াতে পারে কেরানি। তারপর সে গ্রামের দিকে ফেরে। সারাবেলা একটা ঘোরের ভেতর গ্রাম ঘুরে বেড়ায়।
গাছ, মাঠ, কুটির, মানুষজন_ সবই তো তার চেনা, তবু সমস্ত কিছুই কেমন অচেনা আর অবাস্তব মনে হতে থাকে তার। যেন এ জায়গার সঙ্গে তার পূর্বের কোনো পরিচয় নাই। এখানে সে অতিথি একজন এসেছে এবং কেন এসেছে সেটাও তার জানা নাই। আবার নগেন মাস্টার যখন ঢাকার বিষয়ে গল্প তুলেছিল, কেরানির তখন এমনও মনে হতে থাকে_ ঢাকাতেও সে কোনোকালে যায় নাই। তবে, লঞ্চ, ওই নীল সাগর-৩ লঞ্চখানা তার বুকের ভেতরে ভোঁ বাজিয়ে পানি কেটে কেটে অবিরাম চলতে থাকে। নিজেকে সে পৃথিবীর স্থলভাগে নয়, জলভাগে জন্ম থেকে দেখতে পায়।
বেশ বেলা করে বাড়িতে যখন সে ফিরে আসে, বড়বুবু তাকে ধমক দিয়ে ওঠে, এইটা কি তোমার আক্কেল! কোনঠে উধাও হয়া দুফর করিলে! নত্তুন বৌ না খায়া বসি আছে!
কেরানিও ঝংকার দিয়ে ওঠে, তোমরা আছো কী করিতে? তাকে নিয়া জলপান না করিলে কেনে?
বুবু হাসতে হাসতেই আক্ষেপ করে বলে, হা মোর কপাল! জলপান! জলপানের টাইম কখন পার হয়া গেইছে তোর খেয়াল আছে! অ্যালা ভাত খাবার টাইম।
এর মধ্যে নান্না এসে হাজির। এসেই কেরানির হাত ধরে একপাশে টেনে নিয়ে চোখে টুসকি মেরে তার প্রশ্ন, কীরে! কেমন হইলো!
বোঝা যায় বাসর রাতের কথাই সে জিজ্ঞেস করছে।
কেরানির গা শিরশির করে ওঠে। মুখে বলে, ওই যা হয়!
গলায় তার রসের বিন্দুমাত্র আভাস পাওয়া যায় না। বন্ধুর প্রশ্নে স্বাভাবিক ছিল_ পাল্টা সেও চোখে টুসকি মেরে বলবে, গোলপোস্টে বল গেইছে! কিন্তু তার কিচ্ছু না দেখে নান্না বড় বিভ্রান্ত বোধ করে। চনমনে চোখ ফেলে রাখে কেরানির দিকে। না, এ রকম তো হওয়ার কথা নয়। বাসরের পরদিন নতুন বরের চোখেমুখে ঝিলিক থাকার কথা। গলায় ফোটার কথা ঘন দুধের বলক শব্দ।
কথা ঘোরাতে কেরানি বলে, হাকিমদ্দি আসবে বলেছিলো, কই?
আসিবে, আসিবে। একটা কামে গেইছে।
কাজ? কী কাজ?
নান্না একটু চুপ করে থেকে বলে, সে বিত্তান্ত তোমার না শোনাই ভালো।
কৌতূহল হয় কেরানির। না, বলো না কেন? কী এমন কথা যে আমার না শুনলে ভালো?
আজমতউল্লাহ্র মতো নান্নাও বিচলিত হয় কেরানির মুখে দেশের বুলি শুনতে না পেয়ে। হ্যাঁ, তার মনে পড়ে, জলেশ্বরীর ইশকুলে পড়ার কালেই বন্ধুটি এমন শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিল বটে। কিন্তু সে তখন বন্ধুর মুখে ওই ভাষা শুনে মজাই পেতো, এখন ওই ভাষার দরুনই বন্ধুর সঙ্গে অকস্মাৎ এক দূরত্ব বোধ করে ওঠে সে। বিরসমুখে বলে, থাউক ও সকল।
কৌতূহল আরও ঘন হয়ে ওঠে কেরানির। হাকিমদ্দি যে আসে নাই, এটাও তার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ওই রহস্যের সঙ্গে জড়ানো বলে মনে হয়। নান্নাকে চেপে ধরে কেরানি, না তোমাকে বলতেই হবে।
কইলোম তো, থাউক!
না, নয়! থাকিবে না! তোমাক কওয়াই লাগিবে!
হঠাৎ দেশের বুলিতে কথাটা উচ্চারিত হতে শুনেই নান্নার ভেতরটা লঘু হয়ে যায়। তাহলে তার বন্ধু দূরের হয়ে যায় নাই। নান্না বলে, কথাটা বাড়ির মইধ্যে বলা ঠিক নয়। বিয়ার বাড়ি। সকলে হাসিখুশি হয়া আছে।
কথাটা তবে হাসিখুশির নয়?
ঠিক এই সময়ে বড়বুবু এসে আদর করে ডাক দেয়, নান্না আইসো, বন্ধুর সাথে বসি খাইবে। নওলা মাছের ঝোল করা হইছে। নাপা শাকও আছে। আর বুকরঙি মাছের চচ্চড়ি।
নান্নাও হাসতে হাসতে বলে, বিয়ার বাড়ি মাছ দিয়া পার করিবেন, বুবু? গোস্ত হবার নয়?
বিষণ্ন হয়ে বড়বুবু বলে, আবদার না করো, করিলে বড় কষ্ট হয়। বৌ ঝেদিন ফিরুনি যাইবে, মোরোগ জবো দেমো, সেইদিন আসিও। আইজের দিন মাছে তুষ্ট থাকো, নান্না।
[চলবে]

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  একুশের কবিতা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সৈয়দ শামসুল হক- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...