বাঙালি হওয়া সহজ নয়

আজ খাঁটি বাংলা ভাষার যা দশা, স্বাধীন বাংলাদেশে খাঁটি বাঙালিয়ানারও সেই একই দশা। কিন্তু একদিনের জন্য পোশাকে বাঙালি হওয়া সে তো পোশাকি বাঙালিই হওয়া কেবল, সে আমাদের কতদূরই বা নিয়ে যাবে? যত দূরই নিয়ে যাক, সে নিজেই তো যাচ্ছে না। আর তারা? যারা বেশুমার, অগুনতি, তারা ওই পোশাকি বাঙালিই বা হবে কী করে? তাদের তো কোনো পোশাকই নেই গায়ে, জুতো তারা পায়ে দেয়নি কখনো, খেয়ে থাকলেও থাকতে পারে। পাঞ্জাবি-পায়জামা তো মস্ত বিলাসিতা তাদের জন্য, লুঙ্গি-গামছা জোটানোই অসম্ভব যাদের পক্ষে। তাই এই খরা আর চড়ামূল্যের দিনে বাঙালি হওয়া সহজ নয়।
তাদের কথা বাদ থাক। আমরা যারা পোশাক পরি, মাঝেমধ্যে মাছ খাই এবং কালেভদ্রে মিষ্টির দোকানে যাই, তাদের কথাই ধরা যাক। আমরা ভেতরে তেমন আর বাঙালি নই বলেই এমনকি পোশাকে বাঙালি হওয়াটাও কঠিন হয়, হলে কৃত্রিম মনে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে হাসির উদ্রেক করে। কিন্তু ভেতরে বাঙালি_ ওই জিনিসটাই বা কী? বাঙালির বৈশিষ্ট্যটা কোথায়? কোথায় সে স্বতন্ত্র অন্য সব জাতি থেকে?
কর্ণপাত করব না, একটা বড় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেব। ভেতর থেকে, আমাদেরই কেউ যদি ধৃষ্টতা দেখায় এসব কথা বলার,

তাকেও খাঁটি জাতীয় বেইমান বলেই চিহ্নিত করব আমরা। আমরা বলব, বাঙালি কে, সেটা আর আলাদা করে চিনিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, বাঙালিকে চেনা যাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সংযোগ দেখে। সে-ই বাঙালি, বাঙালি ঐতিহ্যের মধ্যে যার অবস্থান। কিন্তু সেই ঐতিহ্যটা কী? কেননা আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যে একদিকে আছে দাসত্ব, অন্যদিকে বিদ্রোহ। সত্য দুটোই। কোনটাকে নেব? বলতে ভালো, বলা সহজ এবং বলা অতি অবশ্যই বাঞ্ছনীয় যে আমরা নেব আলোর দিকটা, আমরা বাঙালি হব সাহসে, প্রতিরোধে, বিদ্রোহে, বিপ্লবে। আমরা আমাদের ঐতিহ্যের সামন্তবাদী সামান্যতা ও সংকীর্ণতার দিকটাকে সযত্নে ও সবলে প্রত্যাখ্যান করে দূরে সরিয়ে তার উষ্ণ গণতান্ত্রিক ও জীবনঘনিষ্ঠতার দিকটাকে নিয়ে যাব এগিয়ে। তাকে বিকশিত করব, কচি ও কাঁচাকে ডাঁটো করে তুলব, পাথেয় করে তুলব ইতিহাসের চড়াই-উৎরাই ভেঙে আমাদের ক্রমান্বয়িত অগ্রযাত্রার।
কিন্তু কেমন করে? আমরা কি পেরেছি? আমরা কি আত্মসমর্পণ করিনি সাম্রাজ্যবাদের কাছে, পুঁজিবাদের কাছে? করেছি বোধ হয়। নইলে কেন এই জরাজীর্ণ, এবড়োথেবড়ো, নাস্তানাবুদ, দুমড়ানো-মচকানো দশা আমাদের? কোথায় মৌলিকত্ব? কোথায় বাংলা ভাষা? এইখানে এসে একটু থামতে হয়। কোথায় বাংলা ভাষা? সত্য বটে বিএ পাস পরীক্ষা থেকে আমরা ইংরেজি তুলে দিয়েছি; সত্য বটে এ একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ; কিন্তু সমাজ থেকে ইংরেজি তুলতে পেরেছি কি, পারব কি তুলতে? বিএ পরীক্ষায় এখন পাস করা যাবে ইংরেজি ছাড়াই; কিন্তু সমাজের পরীক্ষায় কি মিলবে কারও পাস নম্বর, যদি সে পাত্র ইংরেজি না জানে? ব্যবসায় বলি, বাণিজ্যে বলি, বলি চাকরি_ কোথায় উঁচুতে উঠেছে কে কবে ইংরেজি না জেনে? যাঁরা ইংরেজি জানেন না অথচ টাকা করে ফেলেছেন ইতিমধ্যে, তাঁরা পাগল হয়ে টাকা ঢালেন ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখাতে। ইংরেজির পাওনা সুদে-আসলে মিটিয়ে দেবেন। তিন মাস-ছয় মাসে ইংরেজি শিখিয়ে দেবে_ এমন স্কুল এখন অলিতে-গলিতে। ঘষেমেজে মেয়েদের আধুনিকা করে দেব_ এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি কেউ পুরনো ঢাকায়ও ‘হোম’ খোলেন, তবে ছাত্রীর অভাব হবে না। আধুনিকতা ও ইংরেজি জানা আজ যত বেশি সমার্থবোধক, খোদ ইংরেজ আমলেও ততটা ছিল কি-না সন্দেহ। ইংরেজ আমলে আত্মসমর্পণের পাশাপাশি আত্মরক্ষারও একটা উদ্যোগ ছিল বৈকি, যার নাম দেওয়া হয়েছিল জাতীয়তাবাদ। এমনকি পাকিস্তান আমলেও আমরা প্রতিরোধে সবাক হয়েছি, উর্দুকে বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে। এখন সেসব নেই। এখন আত্মসমর্পণেই মনে হয় যথার্থ বীরত্ব।
কতজন বাঙালি আজ আছেন এই বাংলাদেশে, বুকে হাত দিয়ে যাঁরা বলতে পারবেন যে সুযোগ পেলে তাঁরা বিদেশ যাবেন না? বড় মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা আছে আমার। যার জন্য ছেলেমেয়েরা কেমন আছে_ অবস্থাপন্ন বাঙালিকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ভীষণ ভয় হয়। জানি শুনব, ভালোই আছে। কোথায় আছে? এ প্রশ্ন আসবে সঙ্গে সঙ্গে, আর তখনই ভারি বিপদ হবে। জ্বলজ্বল করে উঠবে পিতামাতার মুখ। বলবেন, ছেলে আছে নিউইয়র্কে, মেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায়। বলবেন, কেউ সিঙ্গাপুরে, কেউ বা সৌদি আরবে। ভালো কথা। চমৎকার কথা। উৎফুল্ল হওয়ার মতো খবর। খুবই উৎফুল্ল হতাম আমি, যদি না তাঁরা টাকা নিয়ে আসতেন অনুৎপাদক খাতে লাগাবেন বলে, যদি না দাম বাড়াতেন তরিতরকারি ও মাছ-মাংসের এবং মানুষের ভিটেমাটির এবং যদি না ঈর্ষায় কাতর করতেন অন্য সবাইকে। বিপদ তো ওইখানেই। ওই যে কাতর হওয়া ঈর্ষায়, এটাকে উড়িয়ে দেবেন না, দয়া করে একে সামান্য বিবেচনা করবেন না। এ অত্যন্ত গুরুতর। ঈর্ষা আমাদের যতটা কাবু করতে পারে, জ্বরে বা সর্দি-কাশিতে ততটা কাবু হই না। কবি বলেছেন, হিংসুকের প্রাণ জাহান্নাম। সত্যিই তাই; তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বন্ধু নন, যাঁরা আমাদের এভাবে নিরন্তর ঠেলছেন জাহান্নামের অভিমুখে। আপনারা এত খরচ করবেন, মাছ-মাংস সব কিনে নেবেন, কেড়ে নেবেন জামাকাপড়, আমরা আপনাদের আর কিছু না করতে পারি, হিংসাও করতে পারব না_ এ কেমন কথা? কিন্তু হিংসার মজাটা এই যে, এর গুপ্ত আগুন আপনাকে মোটেই স্পর্শ করতে পারে না, ওদিকে আমাকে ধিকি ধিকি জ্বালিয়ে মারে। জ্বলে-পুড়ে শেষ হই।
অন্যের কেমন লাগে জানি না, আমার কিন্তু খুবই খারাপ লাগে এসব নেতিবাচক কথা বলতে। কেবলি খারাপটা দেখতে। ভালো কি নেই? আছে। নিশ্চয়ই আছে। যেমন প্রতিদিন সকালে দেখি আমি, মাঠে খেলার অনুশীলন চলছে_ ফুটবলের। দেখে ভালো লাগে আমার। এত ভালো জিনিস। কিন্তু এই ভালোই খারাপ হয়ে যায় আমার কাছে, যখন খবর শুনি নামি খেলোয়াড়রা দামি হয়ে বিক্রি হচ্ছেন বাজারে। টিমগুলো করছে দামাদামি, ফেলছে কড়ি। আর তখনই আবার খেয়াল হয় আমার যে এই বাঙালির সব জিনিসই আজ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। সাপ যাচ্ছে, ব্যাঙ যাচ্ছে, যাচ্ছে চামড়া। বাঙালি নিজেও বিক্রি হচ্ছে, পণ্য হয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে। আদম রফতানি ব্যবসা হচ্ছে এখন সবচেয়ে দামি ব্যবসা, পাট রফতানির চেয়ে জমজমাট। দাস ব্যবসা কি অত সহজে উঠে যাবে?
তবে হ্যাঁ, আমাদের শ্রমিকরা পোশাক সেলাই করে, সে পোশাক না তারা গায়ে দেয়, না গায়ে দেয় বাঙালিরা। সরাসরি বিদেশে চলে যায়। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ আমাদের মুখের চা নিচ্ছে কেড়ে, কেড়ে নিচ্ছে গতরের কাপড়। মন তো ইতিমধ্যেই বেদখল হয়ে গেছে, হায় বাঙালিরা এখন দাঁড়াবে কোথায়? আমরা কী দিয়েই বা রক্ষা করব আমাদের বাঙালিত্ব? পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে? পায়ের স্যান্ডেল দেখিয়ে? নাকি বলব যে, আমি ঘৃণা করি অস্ত্রশস্ত্র, নিজেই অস্ত্র হয়ে উঠব হানা দেয় যদি দুর্বৃত্ত? দুর্বৃত্ত কি তাতে ভয় পাবে? হুঙ্কারের এই অস্ত্র এবং জামা-জুতোর ওই ঢাল দেখে? বাঁধব কি তাকে শাড়ির লাল পাড় দিয়ে? কার সঙ্গে লড়ছি আমরা? লড়ছি তোমার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।
বাঙালি বাঙালিকে না বাঁচাইলে কে বাঁচাইবে? এ অত্যন্ত সত্য কথা। খাঁটি কথা। কিন্তু বাঙালি যে বাঙালিকে বাঁচাবে তার ভরসা কোথায়? একটি চাকরি খালি হলে যেখানে প্রার্থী এসে হাজির হয় হাজার হাজার, সেখানে ভরসা করার কি কারণ আছে খুব একটা? প্রত্যেকেই তো মনে হয় শত্রু প্রত্যেকের।
হ্যাঁ, পারবে, অবশ্যই পারবে বাঙালি বাঙালিকে বাঁচাতে, যদি ঐক্যবদ্ধ হয় সে। মুশকিল তো সেইখানেই। ঐক্যবদ্ধ যে হবে, তার ভিত্তিটা কোথায়? পুঁজিবাদ মানুষকে ভাগ করে দিয়েছে শোষক ও শোষিতে। এই শোষক ও শোষিত এখন এক হবে কী করে? কী করেই বা তারা এক ভাষা বলবে, জামাকাপড় পরবে একই ধরনের? ঐক্যের গোড়া তো ওইখানেই কাটা আসলে। আজ এই অনৈক্য বাড়ছে, কেননা ধনবৈষম্য বাড়ছে সমাজে, শোষণ আরো তীব্র হচ্ছে, শোষিত আরো দরিদ্র হচ্ছে। বাঙালিত্বকে রক্ষা করতে হলে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে দেশের সব মানুষকে। আর সেই ঐক্যের জন্য প্রয়োজন হবে নতুন এক সমাজ গঠনের। বাঙালিত্ব রক্ষার লড়াইকে তাই অবশ্যই হতে হবে পুঁজিবাদবিরোধী লড়াই। পুঁজিবাদকে রক্ষা করছে সাম্রাজ্যবাদ। এ লড়াই তাই অতি অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।
বাঙালির নববর্ষ কখনোই সব বাঙালির কাছে একভাবে আসেনি। কারো কাছে এসেছে খরা হয়ে, খাজনা দেওয়ার সময় হিসেবে, মহাজনের সুদরূপে। কারো কাছে এসেছে উৎসব হিসেবে। কেননা ওই যে ধনবৈষম্য ও শোষণ, সে তখনো সত্য ছিল, এখনো তা সত্য। দু’বার স্বাধীন হলাম আমরা; কিন্তু মানুষে মানুষে ব্যবধানটা দূর করতে পারলাম না। এ নিয়ে যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হই, তবে দুশ্চিন্তা করব কী নিয়ে? বাঙালিকে কি শেষ পর্যন্ত কেবল কথাতেই পাওয়া যাবে, খুঁজে পাওয়া যাবে না কাজে?
প্রশ্নের মধ্যেই মনে হয় জবাব আছে। হ

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  জঘন্যতম হিংস্রতা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...