অনুজ প্রসঙ্গে অগ্রজ শান্তি আর শিল্পের মানুষ

পঞ্চাশের দশকের কয়েকজন কবি বাংলাদেশের কবিতার নতুন জমি তৈরি করলেন, আবাদ করলেন সেই জমি মেধা ও শ্রমে। এই জমিতে পা রেখেই ষাটের দশকের সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশিষ্টতা অর্জন করেন। তাঁদের আবির্ভাবের পরই সানাউল হক খান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা এবং অকালপ্রয়াত আবুল হাসানের কাব্যশস্য হিলহিলিয়ে ওঠে।
সর্বপ্রথম আবুল হাসানের কবিতা পড়ি ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। সেই বৈশিষ্ট্যহীন কবিতার লেখকের নাম ছিল আবুল হোসেন। তখন আবুল হাসান আবুল হোসেন নামে লিখতেন। বোধ হয় সেটাই ছিল তাঁর পিতৃদত্ত নাম। অল্প দিনের মধ্যেই হাসানের মনে পড়ে যায় যে, চল্লিশের দশকের একজন বিখ্যাত কবির নামও আবুল হোসেন। তাই তিনি হোসেন থেকে হাসান-এ রূপান্তরিত হলেন। এই নাম পরিবর্তনের পর তাঁর কবিতাও বদলে যেতে লাগল। একজন খাঁটি কবির জন্ম হলো। এই কবির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কবিতায় ভরপুর ছিল। যেন হাওয়ায়, ধুলোয়, গাছের পাতায়, পাখির ডানায়, নদীর জলে, দিনের কোলাহলে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় তিনি কবিতা পেয়ে যেতেন অবলীলায়। যিনি সর্বক্ষণ কবিতার ধ্যানে মগ্ন নন তার পক্ষে অসম্ভব এই কবিতা-আহরণ।
আবুল হাসান মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষীণায়ু জন কীটস এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা। জানি না, কত বছর বয়সে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর কবিজীবন দীর্ঘ নয়। তাঁর সংক্ষিপ্ত কাব্যচর্চা আমাদের উপহার দিয়েছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’ এবং ‘পৃথক পালঙ্ক’-এর মতো তিনটি উজ্জ্বল কাব্যগ্রন্থ। তাছাড়া তাঁর অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। আবুল হাসান যেসব কবিতা গ্রন্থভুক্ত করেননি সেগুলোতেও হাসানীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
আবুল হাসান বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে বরিশালের মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক পরিবেশে। সেখানকার গাছগাছালি, নদী-নালাকে তিনি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায়, যেমন করেছেন ঢাকা বাসের অভিজ্ঞতাকে। গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের মিলিত অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতাকে বর্ণাঢ্য, সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কবিতা সহজেই পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। গোড়ার দিকে তাঁর কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এবং আরও কোনো কোনো কবির ছায়া লক্ষ্য করা গেছে। অনুজ কবির উপর অগ্রজ কবির প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ কোনো কবিই ভুঁইফোঁড় কিছু নন। একটি ধারাবাহিকতার অন্তর্গত তিনি; অতীতের কাব্যকৃতি একজন নতুন কবিকে তার শিল্প সৃষ্টির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নতুন কবি তার নিজস্ব এলাকা সৃষ্টি করেন পূর্বসূরিদের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে, তাঁদের কাব্যকলার কাঠামোয় বন্দী হয়ে নয়। নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হয় তাকে। আবুল হাসান তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পান প্রাথমিক অনুশীলনের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই।
আবুল হাসান মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি, কবি ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে বয়ে গেছে কবিতা। তাঁর এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তাঁর কবিতাতেও। এই এলোমেলোমি তাঁর কবিতার দুর্বলতা এবং শক্তি। আবুল হাসানের কবিতার আপাত-অসংলগ্নতা এমনই হৃদয়গ্রাহী যে পাঠক অভিভূত হয়ে পড়েন। তাই, তরুণ কবিদের কাছে তিনি এত প্রিয়। যখন কোনো কোনো তরুণ কবির রচনায় আবুল হাসানের পঙ্্ক্তিমালার ছায়া দেখতে পাই, তখন বিস্মিত হই না। তিনি যৌবনের বিষণœতা, নৈঃসঙ্গ্য এবং দীর্ঘশ্বাসের কবি। তাঁর শিল্প-সৌন্দর্য বোধ যেমন তীক্ষè তেমনি তীব্র মানুষের প্রতি তাঁর মমতা, জীবনের প্রতি ভালোবাসা। কবি-সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল যথার্থই বলেছেন, ‘চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ করলে তাঁর (আবুল হাসানের) ভেতরে মায়া ও মমতা, মানুষের জন্য দুঃখবোধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না।’ একজন সত্যিকারের কবিই তো যীশুখৃষ্টের মতো সকল মানুষের হয়ে দুঃখ পান।
আবুল হাসান তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন, ‘শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না। কাউকে দুঃখ দেয় না।’ সেই একই কবিতায় তিনি লেখেন-
শিল্প তো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃৎপি-, তাই
আমি তার হৃৎপি-ে যাই চিরকাল রক্তে আমি
শান্তি আর শিল্পের মানুষ।
হ্যাঁ, তিনি শান্তি আর শিল্পের মানুষ, সর্বোপরি মানবপ্রেমী প্রকৃত কবি। এজন্যই তাঁর রচনা সমগ্র আমাদের অবশ্যপাঠ্য। একজন কবির মূল্যায়নের জন্য তাঁর প্রধান এবং গৌণ সকল রচনাই পড়া প্রয়োজন। কখনও কখনও গৌণ রচনাতেও কবির কোনো বিশেষ দিক প্রতিফলিত, যা তাঁর পাঠকদের জানা খুবই জরুরী। বাংলাদেশের কাব্য-মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অধিকারী আবুল হাসান তাঁর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। আমরা যারা তাঁর কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠক তারা জানি, তিনি ক্রমশ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই পরিণতির স্বাক্ষর বহন করছে আবুল হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’। এই ‘পৃথক পালঙ্ক’ তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। তিনি চিরদিন ‘পৃথক পালঙ্ক’-এ সমাসীন থাকবেন।
আমার এই ক্ষুদ্র রচনা আবুল হাসানের কবিকৃতির প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। এখানে আমি একজন সতীর্থ হিসেবে তাঁর কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ প্রকাশ করেছি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর যাঁদের কবিতা অমৃত্যু বার বার পড়ব, আবুল হাসান নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  স্বাধীনতার জন্মদিন

(কবি আবুল হাসান রচনা সমগ্রর ভূমিকা থেকে)

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

শামসুর রাহমান- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...