নিঃসঙ্গ দুপুর(শেষাংশ)

মাকে গাছের নিচে এগোতে দেখলে বাবা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বাবার হাত থেকে পানির বোতল পড়ে যায়। আমাদের বাবা ভ্যাবলাকান্ত হয়ে যায়। বাবার জন্য আমার খুব মায়া হয়। একবার ভাবি যে মাকে বলি, আম্মা, বাড়ি চলেন। কিন্তু বলতে পারি না। মা ততক্ষণে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বাজানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। গিয়েই বলে, শোন মেয়ে হয়েছে বলেই বদমাশ লোকটা মেয়েটাকে এসিড খাইয়ে মারতে চেয়েছিল। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর যে তুমি তেমন বাপ না। আমাকে তালাক দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছিলে। আল্লাহ তোমাকে হাজার বছরের আয়ু দিক। তুমি শান্তিতে থাক। আর আমার মেয়েগুলো বটগাছের ছায়ায় থাকুক।
মা কথা শেষ করে আমার হাত ছেড়ে দেয়। বলে, যা তুই বাড়ি যা। তোর বাজানকে নিয়ে যা।
বাজান তখনও হাঁ করে দাঁড়িয়েছিল। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছিল। বাজান মায়ের মুখের দিকে সরাসরি তাকায়নি।
একবারও না?
না, একবারও না। মা যতক্ষণ কথা বলেছে মাথা নিচু করে রেখেছিল। আর মা হাঁটতে শুরু করলে আর একদিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি আস্তে করে বলি, বাজান বাড়ি চলেন?
বাজান আমার দিকে তাকায়। দম ফেলে। তারপর জিজ্ঞেস করে, তোর মা যেন তোকে কি বলেছে রে? তোকে টুনটুনি ডেকেছে? তুই হওয়ার পরে তোর মা আমাকে বলতো এইটা আমাদের টুনটুনি। শিউলিকে ডাকতো বাকবাকুম কবুতর। আর বকুলকে দোয়েল। বুঝলি তোরা তোর মায়ের কাছে ছিলি পাখি আর ফুল। একটু থেমে আবার বলে, হ্যাঁরে, তোর মা যেন তোকে কি বলেছে?
বলেছে, তোর বাজানকে নিয়ে বাড়ি যা।
শয়তান বলে নাই?
আমি অবাক হয়ে বলি, না তো। মা আপনাকে শয়তান বলে নাই।
আমি যে শুনলাম বলেছে, শয়তানটাকে নিয়ে বাড়ি যা।
বাজান, আপনি এইসব কি বলেন?
বাজান পড়ে যাওয়া পানির বোতল নিচু হয়ে তুলে নেয়। আমি বাজানের হাড়ভাঙা মেরুদণ্ড দেখি। জামার ওপর দিয়েও মেরুদণ্ডের হাড় গোনা যায় মনে হয়। বাজান আবার জিজ্ঞেস করে, তোর মা কি বাড়িতে ঢুকেছে।
আমি তাকিয়ে দেখে বলি, না বাড়িতে ঢুকে নাই। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা যতক্ষণ এখানে থাকব, সেও দাঁড়িয়ে থাকবে।
তাহলে চলেন যাই। সারাদিনে মায়ের অনেক কষ্ট হয়েছে।
কষ্ট? অনেক কষ্ট? পরের বাচ্চার জন্য তোর মায়ের কষ্ট হবে কেন?
মা-তো ধাত্রী মা। বাচ্চাদের নাড়ি কাটে। চলেন বাজান।
বাজান আর আমি হাঁটতে শুরু করি। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মা বাড়িতে ঢুকেছে। বাজান পেছনে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোর মা বাড়িতে ঢুকেছে?
হ্যাঁ, ঢুকেছে।
মানুষটা এমনই ছিল। কাজ শেষ না করে ভাত খেতো না কখনো।
বাজান আপনি তো কখনো বলেননি যে মা আমাকে টুনটুনি ডাকতো!
ভুলে গিয়েছিলাম। আর দরকার কি এইসব কথা মনে করার।
তাইতো, দরকার কি। আমরাও মায়ের কথা ছাইচাপা দিয়ে রাখব।
বাবা ঘুরে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে শাসিয়ে বলেছিল, খামোশ! এই কথা যেন আর না শুনি।
বাবা রেগে ভূত হয়ে গিয়েছিল। বাবার চেহারা দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, বাজান এমন কথা আর বলব না।
বাবা আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাড়িতে এসেছে। বাবার সঙ্গে হেঁটেতো আমি পারি না। কখনো দৌড়াই সারা রাস্তা কোথাও না থেমে আসার জন্য আমার বুকে হাঁফ ধরে যায়।
হাস্নাহেনা থামলে পাথর খণ্ডরা আবার নড়েচড়ে বসে। একসময় পাথরের ফাঁকে ঝরণা বয়। হাসতে হাসতে বকুল বলে, বাজান এখনও মায়েরে ভালোবাসে। পরে স্বপ্ন দেখে। ঘুমের ঘোরে তার নাম জপে।
পদ্ম আকস্মিকভাবে চেঁচিয়ে বলে, বাজান কই?
তাইতো বাজান কই গেলো?
বাজান বোধহয় রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছে।
এতকথা না বলে চল বাজানরে খুঁজি। আগে বাড়িতে খুঁজব, তারপর রাস্তায়।
পাঁচ রেবান উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের পেছনে আসতেই দেখতে পায় জয়নুল মিয়াকে। বালতির ওপর উপুড় হয়ে আছে।
হায়, হায় বাজান, বাজান গো-
পাঁচ বোন জয়নুল মিয়াকে ধরে তুলতেই টের পায় জয়নুল মিয়ার জ্ঞান নাই। পাঁচ বোন ধরাধরি করে বাবাকে নিয়ে এসে বারান্দায় শুইয়ে দেয়। বাতাস করে। ভেজা গামছা দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়। কাঁথা এনে শরীরে জড়ায়। নিঃশ্বাসের ওঠানামা দেখে। বুকের ওপর কানপেতে ধুকপুক ধ্বনি শোনে।
ওদের মনে হয় বাড়িজুড়ে চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে বাবার কণ্ঠস্বর। বাবা একটু পরে দু’পাশে মাথা নাড়ায়। একটা বোকা ছেলের মতো মাথা নাড়ানোর ভঙ্গি তার শরীরে ফুটে ওঠে। অস্ফুট স্বরে কি কি সব বলে। বলতে বলতে হঠাৎ করে চোখ খোলে আবার বন্ধ করে। নিঃশ্বাস পড়া দ্রুত হয়। একসময় স্থির হয় মাথা। মৃদুস্বরে বলে, শিউলির মা-। আবার বিড়বিড় ধ্বনি। আবার থেমে যাওয়া। তুমি কোথায় শিউলির মা? আমার হাত ধরো। একবার তোমাকে নিয়ে মেলায় গিয়েছিলাম। তখন মেয়েরা কেউ হয়নি। ভিড়ে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে।
আবার থেমে যায় কণ্ঠ। মেয়েরা কান পেতে বাবার কথা শোনে। শুনতে পায় কণ্ঠস্বর, তোমাকে যখন খুঁজে পেলাম, তুমি বললে, আমার হাত ছেড়ে দিয়েছ কেন? অ্যাঁ-। তুমি খুব রাগ করেছিলে। আমি তো তোমার হাত ছাড়তে চাইনি রাশিদুন। কেমন করে যেন ছুটে গিয়েছিল। কেমন করে যে ছুটে গেল- আমার দিকে তাকিয়ে তুমি ফিক করে হেসেছিলে। আমি তোমাকে হাতভরা লাল চুড়ি কিনে দিয়েছিলাম। দুইজনে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ফিরেছিলাম।
জয়নুল মিয়ার ঘাড় কাত হয়ে যায়। চোখ বন্ধ। দু’হাত বারবার ওঠায়। কাউকে যেন খোঁজে, কিন্তু খুঁজে পায় না। বলতে থাকে, আমি তো তোমার হাত ছাড়তে চাইনি রাশিদুন। খোদার কসম, তুমি আমাকে বিশ্বাস কর। আমি তোমার হাত ছাড়তে চাইনি- আল্লাহর কসম, একদম ছাড়তে চাইনি। কি যে হলো- কি যে-।
জয়নুল মিয়া বুকের ওপর দু’হাত জড়ো করে। মেয়েরা জলভরা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। অপেক্ষা করে, তার জ্ঞান ফেরার জন্য।
৫.
পদ্মর বাজান-বাজান ডাকার পরও জয়নাল মাথা তুলে তাকায় না। চোখ ওঠায় না। বরং মাথা নেমে যায় বুকের কাছাকাছি। এগিয়ে আসা মানুষগুলোর কথা-হাসি শুনতে পায় না ও। বরং দূর থেকে ভেসে আসা মুন্সী বয়াতীর গান শুনতে পায় ও। এই গান কতবার শুনেছে বয়াতীর কণ্ঠে। যখন ও গায়- ভানুমতী দুধের স্বর/ কেমনে করবি পরের ঘর/পরের বেটা মারবি, … বইসা কান্দবি- তখন ও রাগ করেছে। বলেছে, কি গান গাও বয়াতী? মনতো জুড়ায় না। ভালো গান গাইতে পার না? বয়াতী হেসে বলে ভালো গান কারে কয়? যেমন ধর- পার কর দুনিয়াদারী মাবুদরে-। হা হা করে হাসতে হাসতে বয়াতী বলে, এই দিয়ে দুঃখ ভুলবা? দুঃখ তোমার টানতে হবে সারাজীবন, মাবুদরে-
পদ্ম বাবার মুখোমুখি বসে মাথা সোজা করে দিয়ে বলে, বাজান মায়েরে দেখেন।
তুমি দেখো মাগো। তোমার ফুলের গন্ধ নদীর ঢেউ তোমার আকাশ-বাতাস তুমি দেখো মাগো।
পদ্ম মায়ের দিকে তাকালে দেখতে পায় ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। জায়গাটা শূন্য। কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওর মা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছে। পদ্ম বুঝে যায় যে মা দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? মা তো আর বাবার অপেক্ষা করে না। ওর মন খারাপ হয়ে যায়। নিজেকেই বলে, যাক যা হবার তাতো হয়েছে। বেঁচে থাকুক বাবা-মা। টিকে থাকুক খেলার মাঠ। স্কুল। বেঁচে থাকুক আমাদের হেডমাস্টার।
পদ্ম বাবাকে আস্তে করে বলে, ক্ষিদে লাগছে আপনার বাজান।
না মাগো। চিড়া-গুড় খেয়েছি না। পানিও খেয়েছি।
আমরা আপনার জন্য পোলাও মাংস এনেছি।
কে রান্না করেছে?
আমাদের মামী।
ভালো থাকুক তোমাদের মামী। সংসার আলো করে থাকুক।
কার জন্য দোয়া করলেন বাজান। মামীর জন্য না আমাদের মায়ের জন্য।
এ প্রশ্নের উত্তর জয়নুলকে দিতে হয় না। ছোটখাটো দলটি তার কাছে পৌঁছে গেছে। পদ্মের সবচেয়ে ছোট মামা বলে, কেমন আছেন দুলাভাই।
শ্যালক আযমের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে জয়নুল। তারপর ঘাড় কাত করে কিছু একটা বোঝাতে চায়। ভালো-মন্দের মাঝামাঝি কিছু। যার অর্থ কারো কাছে তেমন পরিষ্কার নয়। সবাই তাকে ঘিরে বসে।
ডাব খাবেন দুলাভাই?
জয়নুল সজোরে মাথা নেড়ে বলে, না।
শিউলি কাটা ডাবটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, বাজান আমরা জানি বেলা মাথার উপর গেলে আপনের পিপাসা পায়। আপনি ডাবটা খান বাজান।
শিউলির দিকে এক পলক তাকিয়ে জয়নুল ডাবটা নিয়ে মুখে লাগিয়ে এক চুমুকে শেষ করে। মনে হয় শুধু বুক শুকিয়ে নেই, পুরো শরীরটা শুকিয়ে আছে। হাজার হাজার ডাব লাগবে জলতেষ্টা মেটাতে। জয়নুল লজ্জা পায়। সরাসরি কারো দিকে তাকাতে পারে না। বাবার হাত থেকে ডাবটা নেয় শিউলি। কলাপাতায় মুড়িয়ে আনা পাটিসাপটা পিঠাটা এগিয়ে দেয় বকুল।
বাজান খান। খেতে ভালোলাগবে আপনার। আমরা বাড়িতে এমন পিঠা বানাতে পারি না। আপনি না খেলে আমাদের মনে দুঃখ হবে বাজান।
জয়নুল মিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়। কতকাল কলাপাতায় করে পিঠা খাওয়া হয়নি। রাশিদুন পিঠা বানালে কলাপাতায় সবাইকে পিঠা দিত। বাড়ির পেছন থেকে টুকরো টুকরো পাতা কেটে আনত। তার মা বলত, বৌমার সবকিছু সুন্দর। খাওয়ার সঙ্গে সুন্দর মিলায়। রাশিদুন শাশুড়িকে বলত, অভাবের সংসারে বেশি তো মেলাতে পারি না আম্মা। অভাব না থাকলে অনেক কিছু করতে পারতাম আম্মা।
পিঠা খাওয়া শেষ করেই জয়নুল মিয়া উঠে দাঁড়ায়। যেন কেউ তাকে আর কোনো অনুরোধ করতে না পারে। বাচ্চারা তার হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলে, আপনে আমাদের সঙ্গে কয়দিন থাকবেন ফুপা।
আমি আবার আসব। তোমরা বাড়ি যাও সোনারা। তোরা আয় মা।
জয়নুল মিয়া সবাইকে রেখে হাঁটতে শুরু করে। সবার আগে আগে যায়। লম্বা পা ফেলে। এক সময় পেছনের দলটি থেমে যায়। ওরা পাঁচ বোন ছুটে গিয়ে বাবার কাছে পৌঁছে যায়। পদ্ম বাবার হাত ধরে বলে, আপনি আমাদেরকে ফেলে চলে আসলেন কেন বাজান?
আমি তো ফেলে আসিনি। তোমাদেরকে ওদের কাছে রেখে এসছি মন খুলে বিদায় নেয়ার জন্য। তোমাদের আনন্দ যেন আর একটু দীর্ঘ হয় সে জন্য সরে এসেছি।
বকুল পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে, আমরা তো আপনাকে নিয়েই আনন্দ করতে চেয়েছিলাম।
এই কথা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে পাঁচ মেয়ের মুখোমুখি হয় জয়নুল। প্রবল বিষণ্ণতায় কণ্ঠস্বর ভারি করে বলে, আমি তো এই গ্রামে আনন্দ করার মানুষ না। মায়েরা তোমরা আমাকে আর প্রশ্ন করবে না। আমি উত্তর দিতে পারি না। আমার বুক ভেঙে যায়।
শিউলি আদরের কণ্ঠস্বরে বলে, ঠিক আছে আজ আপনি আগে আগে যান। আমরা পেছনে থাকি। আপনাকে আর কষ্ট দেব না।
জয়নুল কোনো কথা না বলে হাঁটতে শুরু করেন। পেছনে দিকে আবার বলে, তোমরা বাড়ি যেও আমি জসিমের কাছ থেকে ঘরের চাবি আনব।
পাঁচ বোন অনেকটা পথ হেঁটে এক সময় মাঠের ধারে বসে। হাস্নাহেনার কোলের ওপর পোলাও মাংসের পোঁটলা। পুরনো একটি গামছায় যত্ন করে বেঁধে দিয়েছে ওদের মা। চিতই পিঠা, পাটিসাপটাও দিয়েছে। মোয়া-মুড়কি আছে। ঝাকা থেকে ছিড়ে দিয়েছে লাউ-কুমড়ো। পুঁইশাক। ঢেঁড়স, বেগুনও আছে। সাবই মিলে ভাগ করে এক এক পোঁটলা নিয়েছে। সবাই বসে পড়ার সময় যার যার পোঁটলা তার পাশে রেখেছে।
চম্পা বলে, এসবের সঙ্গে আমরা মাকেই নিয়ে যাচ্ছি বাড়িতে।
ঢং দেখাস না। সেসব কথা শুনলে আমার গা জ্বালা করে।
হাস্নাহেনার আপত্তিতে চম্পা চুপ করে যায়। কথা বাড়ায় না।
বকুল ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে দিয়ে বলে, মা মায়ের মতো থাকুক, আমরা আমাদের মতো থাকব। বাজান বাজানের মতো থাকবে। কথার এত ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকার নেই।
কেউ কোনো কথা না বললে পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। বাতাসের শনশন শব্দ হয়। দুচারটে পাখি ডাকে। ঘাসের ভেতর থেকে পোকা উঠে আসে। ফড়িং ওড়ে ওদের চারপাশে। ওরা পরস্পরের দিকে তাকায়। ওরা আবার দূরের দিকে তাকায়। ওরা নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে পারে না। শিউলি উঠে দাঁড়ায়। শাড়ি থেকে শুকনো ঘাসের কুঁচি ঝেড়ে ফেলে। অন্যরা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকায়।
দাঁড়িয়ে কেন?
শিউলি শাড়ি ঝেড়ে কুঁচি ঠিক করতে করতে বলে, মাকে দেখাব বলে শাড়িটা পরেছিলাম।
শাড়ি পরা মেয়েকে দেখে মা কি খুশি হয়েছেন?
জানি না। কিছু বলেননি। যদি বলতেন, তোকে খুব সুন্দর লাগছে রে শিউলি। সেইদিন আমার পেট থেকে বের হলি, আজ তুই কত বড় হয়ে গেছিস মাগো।
আমরাও তো কিছু বলিনি। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে বুবু। একদম শিউলি ফুলের মতো।
শিউলি ওদের দিকে তাকায় না। দু’হাতে চোখ মুছে হাঁটতে শুরু করে। মায়ের সামনেও কিছু বলেনি। বোনদেরকেও আগে বলেনি। এতক্ষণ নিজেকে সামলাতে পারেনি। যাবার বেলায় আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারেনি। ইচ্ছে করছে একদৌড়ে বাবার কাছে পৌঁছে যেতে। কিন্তু বোনদের ফেলে যেতে পারে না। ওরা ছুটে এসে বোনের পাশে পাশে হাঁটে। যে আনন্দ নিয়ে মায়ের বাড়ি থেকে ফিরবে মনে হয়েছিল তার অনেকখানি ডুবে গেছে মন খারাপের মধ্যে। হাসিখুশির উচ্ছ্বাস নিয়ে ফেরা হলো না। নিরানন্দ মন খারাপ নিয়ে বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায় ওরা।
এটা ওদের প্রতিদিনের বাড়ি। বাস করার জন্য এখানে সবকিছু আছে। এখানে বাস করা ওদের জন্য কষ্ট ও আনন্দের। কষ্ট মা নেই, আনন্দ প্রতিদিনের জীবনযাপনে বড় হয়ে উঠতে দেখা। এক অর্থে ভালোইতো আছে ওরা। উঠোনের বাঁশের বেড়া সরিয়ে ভেতরে ঢোকে। দেখা যায় দরজায় তালা। বাবা ফেরেনি। শিউলি বারান্দার পিঁড়িতে বসে বলে, আজ শাড়িটা চুলোয় ঢুকিয়ে দেব। পুড়িয়ে ফেলব।
খবরদার না। এসব বাজে ভাবনা ভাববে না। শাড়িটা তুমি না পরলে আমি পরব।
শিউলি রাগত দৃষ্টিতে বকুলের দিকে তাকায়। যেন ওর ওপর মাতব্বরী করার ইচ্ছাটা সামলে রাখে। বকুল শিউলির রাগ উপেক্ষা করে বলে, তুমি কি শাড়িটা চুলোয় ঢুকিয়ে ঘরবাড়িতে আগুন লাগাতে চাও?
থাক, আমাকে আর বোঝাতে হবে না।
তখন চাবি নিয়ে জয়নুল মিয়া বাড়িতে আসে।
তোমরা কখন এসেছে মাগো?
আমি চাবি নিয়ে দেরি করিনি। শুধু ডিম আর আলু কিনেছি। রান্নাটা বসিয়ে দাও।
আপনার খিদা পেয়েছে?
চম্পা আলু আর ডিম নিয়ে যেতে যেতে বলে, বাজান তো আমাদের মতো পোলাও মাংস খাননি। পিঠা আর ডাব খেয়ে কি খিদা কাটে। আব্বা আপনি হাত মুখ ধোন। রান্না হয়ে যাবে। আমরা সবাই মিলে রান্নার কাজ করব। একটুও দেরি হবে না।
জয়নুল ভীষণ ক্লান্তি বোধ করে। ইচ্ছা হয় একবার ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকতে, পরে ঘরের পেছনে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়। মুখ মোছার জন্য গামছটা চায় পদ্মর কাছে। পদ্ম বারান্দার দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা গামছা নিয়ে আসে। এসে দেখতে পায় জয়নুল দু’হাতে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। ও মৃদুস্বরে ডাকে, আব্বা?
জয়নুল মুখ থেকে হাত সরালে পদ্ম দেখতে পায় তার চোখে পানি। ও ফিসফিস করে বলে, আপনার কি আম্মার কথা মনে হচ্ছে?
না, মা না তো। কবেই তো তাকে ভুলে গেছি। সেই তোমার জন্মের পরে।
ভ্যা করে কেঁদে দেয় পদ্ম। ওর কান্না শুনে ছুটে আসে অন্যরা। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, কি হয়েছে বাজান
তোমরা পদ্মর কাছে জানতে চাও মা। আমার খিদে পেয়েছে।
জয়নুল পদ্মর হাত থেকে গামছা নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। বোনেরা পদ্মকে ঘিরে ধরে বলে, কি হয়েছে রে পদ্ম? বাজান তোকে কি বলেছে?
আমি বাজানের চোখে পানি দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আম্মার কথা মনে পড়ছে কি না? বাজান বলেছেন আম্মাকে ভুলে গেছেন।
কথাটা বলেই পদ্ম আবার জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে।
শিউলি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, বাজান মিছা কথা বলেছে। বাজান ঠিক বলে নাই।
বাজান মিছা কথা বলবে কেন?
বাজানের অনেক দুঃখ রে পদ্ম। চল আমরা রান্নাঘরে যাই।
চম্পা প্রস্তাব করে, বাজানের সঙ্গে আমরাও ভাত খাওয়া শেষ করব। তারপর উঠোনে বসে বাজানের সঙ্গে জ্যোৎস্না দেখব।
হা হা হি হি হাসিতে বাড়ি মাতায় বকুল ও হাস্নাহেনা। চম্পা রেগেমেগে বলে, একটা ইট দিয়ে যদি তোদের মাথা ফাটিয়ে দিতাম। তাহলে বুঝতি হাসি কেমন? পাগলের হাসি পাগল বোঝে না। তোরা সেই রকম পাগল।
বকুল আবার হাসতে হাসতে বলে, পাগল না পাগলি। বল পাগলি।
না, আমি পাগলই বলব।
এই নিয়েইতো বাবা-মায়ের যুদ্ধ। এখন দুইজন দুই দেশে।
শিউলি ওদের হাত ধরে বলে, সবাই রান্নাঘরে চল। ডিম সেদ্ধ হয়ে গেছে। যার যার ডিম সে খোসা ছাড়িয়ে দে।
বাবার ডিমের খোসা কে ছাড়াবে?
শিউলি বলে, আমি। বাবার ডিমের খোসা আজকে তার বড় মেয়ে ছাড়াবে। অন্যদিন অন্যরা।
কেন মেয়েরা খোসা ছাড়াবে? বাবার ডিমের খোসা বাজান ছাড়াবে। যাই বাজানকে দিয়ে আসি।
ডিমের বাটি তুলে নিয়ে পদ্ম বারান্দায় যায়।
বাজান, এইটা আপনার ডিম।
শুধু ডিম এনেছ কেন? ভাত দিবে না? শুধু ডিম খাব?
আপনার ডিমের খোসা আপনি ছাড়াবেন সে জন্য নিয়ে এসেছি। তারপর রান্না হবে।
খোসা আমি ছাড়াব? এই কাজ তো আমি কখনো করিনি?
তাহলে কে করেছে?
তোমার মা করেছে?
তারপরও আপনি আমার মাকে ভুলে যান বাজান? আপনি কেমন মানুষ?
তুমি আমাকে এত বড় কথা বললে?
বেশি বড় কথাতো বলি নাই বাজান।
বলছিস। আমি ডিম খাব না।
জয়নুল হাতের ডিম উঠোনে ছুড়ে মারে। রাগ করে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। পদ্ম দৌড়ে গিয়ে ডিমটা কুড়িয়ে নেয়। রান্নাঘরে এলে চারবোন ওর ওপর রাগ ঝাড়ে।
বাজানকে রাগালি কেন তুই?
সত্য কথা বললে সবাই রাগ করে।
পদ্ম ডিমটা ধুয়ে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে নির্বিকার উত্তর দেয়।
রান্না হলে বাজানের পা ধরে মাফ চাইবি তুই। তাকে ভাত খাওয়ার জন্য ডেকে আনবি।
এ আর এমন কি কঠিন কাজ যে পারব না। বাজানের পা আমি মাথায় তুলে নিব। তারপর বলব, বাজান আমারে মাফ করে দেন।
সাবাস! বকুল ওর মাথায় চাটি মারে। হাসতে হাসতে বলে, এমন পারিস বলেইতো তুই দৌড়ে ফার্স্ট হোস।
হা হা, আমার সঙ্গে কেউ পারে না। আর কতক্ষণ লাগবে রান্না হতে?
হয়ে গেছে। শিউলি ভাতের মাড় গালে। আর দশ মিনিটে ডিম আর আলুর ঝোল রান্না হয়ে যাবে।
কতগুলো শুকনো মরিচ তেলে ভাজো বুবু।
ঠিক আছে, কৌটা থেকে বের করে দে আমাকে। আম্মাও ভাতের সঙ্গে শুকনো মরিচ ভাজা খেতে ভালোবাসতেন। আমিও আম্মার দেখাদেখি মরিচ মাখাতাম। ঝালে আমার চোখে পানি আসলে আম্মা তাড়াতাড়ি চিনি খাওয়াতেন। ঝাল আর মিষ্টিতে আমি বেশ মজা পেতাম।
পদ্ম গম্ভীর হয়ে বলে, আমার এমন স্মৃতি নেই।
শিউলি গম্ভীর হয়ে বলে, তোমার স্মৃতিটাই সবচেয়ে বড় পদ্মমণি।
কেমন? বুঝিয়ে দাও?
তোমার স্মৃতি আমাদের মা ছাড়া সংসার।
পদ্ম অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, তোমরা চার বোন না হয়ে চার ভাই হলে আমার জন্য এমন স্মৃতির ভার হতো না। তোমরা কেন ছেলে হলে না? তাহলে তো সব দোষ আমাকে দিতে পারতে না। থাক, তোমাদের উত্তর শোনার দরকার নাই। বাজানকে ডেকে উঠাই।
পদ্ম ঘরে এসে বাবার পায়ের ওপর নিজের মাথা রাখে। চৌকির পাশে বসে আস্তে করে ডাকে, বাজান।
জয়নুল মিয়া আচমকা জেগে ওঠে, কিন্তু ওঠে বসতে পারে না। কারণ পদ্ম দু’হাতে পা জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
মা পদ্ম, তুমি আমার পা ছাড় মা।
বাজান, আপনি আমাকে মাফ করে দেন। আমি আর এমন কথা বলব না।
মা আমার কাছে তোমাদের অপরাধ নাই। তোমাদের জন্য আমার অনেক মায়া। তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে। ওঠ আম্মা। আমার পা ছাড়।
বুবুর রান্না হয়ে গেছে। চলেন ভাত খাবেন।
জয়নুল আবেদীন চৌকির উপর বসে থেকে বলে, মাঝে মাঝে ক্ষেতে কাজ করে বাড়িতে আসলে শরীর ভেঙ্গে পড়তে চাইত। আমি অনেক সময় শুয়ে পড়তাম। তোমার মা আমাকে ভাত খাওয়ার জন্য ডেকে ওঠাতো।
এখন কি আপনি আম্মাকে স্বপ্নে দেখলেন?
না, নাতো। আমি কোনো স্বপ্নই দেখিনি।
জয়নুল তাড়াহুড়ো করে চৌকি থেকে নেমে স্যান্ডেলে পা ঢোকায়। ঘর থেকে বের হতে হতে বলে, আমার শিউলি মা রান্না ভালো শিখেছে। আমার মা মরে গেলে ওকেই তো সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল।
জয়নুল পদ্মর দিকে তাকায় না। ঘরে প্রদীপের আলোয় সবকিছু দেখা যায় না। মেয়েকে পেছনে রেখে সে দ্রুত উঠোনে চলে আসে। রান্না ঘরে যারা ছিল তারা হইচই করে বলে, বাজান আসছে। বাজান এখানে আসেন। আপনার পিঁড়ি, বাসন দিয়েছি। আপনি বসেন।
তোমরাও আমার সঙ্গে খাও মা। আজ তোমাদের আনন্দের দিন। আমি জানি আমার সঙ্গে ভাত খেলে তোমরা আনন্দ পাও।
ঠিক আছে। তাই হবে।
সবাই মিলে পিঁড়ি পেতে বসে। শিউলি সবার সামনে ভাত দেয়। ডিম-আলুর তরকারি দেয়া বেশ আনন্দ করে খায় সবাই।
এক সময় শিউলি বলে, বাজান আজকের আনন্দের দিনে আপনার জন্য ভালো খাবার আছে। পোলাও-মাংস। আপনি আনন্দ মনে করে খাবেন। আপনার সামনে দেই বাজান।
জয়নুল মিয়া কারো দিকে না তাকিয়ে বলে, দাও। অর্ধেক পেট তো ভরেই গেছে। বেশি দিও না।
শিউলি কোনো কথা না বলে, পোঁটলা বেঁধে আনা খাবারের সবটুকু বাবার বাসনে ঢেলে দেয়। জয়নুল মানা করে না। বরং পোলাও-মাংস পেয়ে খুশি হয়। পুরো এক টুকরো মাংস মুখে পুরে চিবাতে থাকে। ভাতগুলো কত তাড়াতাড়ি খেয়েছিল, পোলাও মাংস অত তাড়াতাড়ি খায় না জয়নুল। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে অল্প অল্প করে খায়। মেয়েরা বুঝতে পারে বাবা এখন অনেককিছু স্মরণ করছে। মেয়েরা চুপচাপ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হাঁড়ি-বাসন ধোয়ার কাজটি ওরা আজ করবে না। বাজানকে একা থাকতে দেয়াই উচিত। বাবাকে সুযোগ দিয়ে ওরা জোরে কথাও বলে না। নিজেরাও নিজেদের এক ধরনের মগ্নতায় ডুবে যায়।
উঠোনে দাঁড়িয়ে পদ্ম বলে, দেখেন কি সুন্দর জ্যোৎস্না রাত। ঝকঝক করছে জ্যোৎস্না।
চম্পা বলে, এমন ঝকঝকে জ্যোৎস্না দেখি নাই। আজ জ্যোৎস্না দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে যেন পরি নেমেছে।
হাস্নাহেনার প্রশ্ন, জ্যোৎস্না রাতে মানুষরা কি করে বুবুরা?
বকুল হাসতে হাসতে বলে, গান গায়। কানামাছি খেলে।
চম্পা বলে, আমার মনে হয় মানুষেরা কাঁদে।
পদ্ম ঝাড়ি মারে, ধুত কাঁদবে কেন? এমন সুন্দর আলো দেখে যে কাঁদবে সে একটা পাগল।
আমিতো পাগলী না, আমার কান্না আসে কেন? আমার বুক ভেঙে যায়। মনে হয় উঠোনে গড়াগড়ি করে কাঁদি।
চুপ কর চম্পা। আমাদের সবার কান্না আসে না। শুধু তোর আসে। কারণ আমাদের মনে দুঃখ আছে। তুই এখন কাঁদবি আমরা আর এক সময় কাঁদব।
চম্পা গুনগুন করে কাঁদতে শুরু করে। শিউলি ধমক দিয়ে বলে, কাঁদবি না, চুপ কর। বাজানরে ভাত খেতে দে।
বাজানের ভাত খাওয়া হয়ে গেছে। দেখো বাজান বাসনে হাত ধুচ্ছে।
চল আগাই। পাঁচ বোন একসঙ্গে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। জয়নুল অনাবিল সরল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলে, খুব ভালো খেয়েছি মায়েরা। আগামী দুই দিন আমার আর খেতে হবে না।
দুই দিন।
হি হি করে হাসে সবাই। হাসতে হাসতে বলে, বাজান উঠানে আসেন। দেখেন কি সুন্দর জ্যোৎস্না।
জ্যোৎস্না! তোমাদের মা জ্যোৎস্না রাত খুব ভালোবাসতো। আমাকে বলত, …। এই বাড়িতে অনেক মায়া।
আম্মার কথা আপনার খুব মনে পড়ে বাজান?
না, না তেমন মনে পড়ে না। মনে পড়বে কেন?
কথা বলতে বলতে জয়নুল বারান্দায় গিয়ে ওঠে।
সেখানে মাদুর বিছিয়ে পা গুটিয়ে বসে। হাতের কাছে পানের বাটা ছিল। সেটা টেনে পান-সুপারি মুখে দেয়। বুকের ভেতর মোচড় অনুভব করে। ভাবে, রান্নাটা রাশিদুনের হাতেরই ছিল। সেই স্বাদ, সেই পরিচিত মশলার গন্ধ- ভুলবে কেমন করে? যতক্ষণ বসে বসে খেয়েছে ততক্ষণই ভেবেছে রাশিদুনের সঙ্গে সংসারটা চলছে। তার মাও আছে। সংসারে তার নিজের মা রাশিদুনের পক্ষে ছিল। খুব কম সময়ই নিজের ছেলের পক্ষে কথা বলেছে। এমন মানুষটি শুধু রাগের ঝোঁকে হারাল। তার জন্য তো সে দরজা খুলেই রেখেছে। রাশিদুন যদি এই বাসায় ফিরে আসে সে দরজা তো তার জন্য খোলা আছেই। কিন্তু ও আসবে না। উনিশ বছর সংসার করার পর কোনো কারণ ছাড়া সে যদি তালাক শুনে তাহলে আসবে কেন?
এ সংসারে বেচারা কেবল কষ্টই করেছে। অভিযোগ কখনো করেনি। তারপর এই অবস্থা। জয়নুল ভাবে, নিজের জীবনটা নিজে নিলে মেয়েরা ওদের মাকে ফিরিয়ে আনতে পারে হয়তো! বলবে কি মেয়েদের এমন কথা ওই জ্যোৎস্না রাতে? উঠোনে নামার জন্য উঠে দাঁড়াতেই শুনতে পায় মেয়েরা পিঁড়ি পেতে গোল হয়ে বসে গান ধরেছে-
এক দেশে এক রাজা ছিল
তার পঞ্চকন্যা ছিল
সেই রাজার মনে দুঃখ
কিসের দুঃখ কিসের দুঃখ
রাজার ঘরে পুত্র নাই
পঞ্চকন্যার মুখে ছাই।
গান গায় আর পাঁচ বোন হি হি করে হাসে। হাসতে হাসতে এক সময় থেমে যায় পদ্ম। সবার দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে বলে, একটা কথা। সবাই থাম।
চম্পা ব্যঙ্গ করে বলে, কি কথা? ঘোড়ার মাথা?
ঘোড়ার মাথা না, হাতীর মাথা। শোনো আমি বলি, তোমরা কেউ বলবে না যে পঞ্চকন্যার মুখে ছাই। বল, পঞ্চকন্যার মুখে সোনা।
সবাই মিলে একসঙ্গে বলে, পঞ্চকন্যার মুখে সোনা।
আবার নতুন করে শুরু হয় গান। গান গাইতে গাইতে ওরা বাবার কথা ভুলে যায়। একজন পিতা কন্যা সন্তান জন্মের দায় নিতে পারেনি বলে পারিবারিক বিপর্যয় ঘটিয়েছিল, এখন সে দু’কান ভরে মেয়েদের গান শুনছে। শুনতে শুনতে মনে হয়, এক সময় মহাজনের ধানের বস্তা ঘাড়ের ওপর টানতে টানতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে যেত, ভাবত মেয়েগুলোর ওজন ধানের বস্তার চেয়ে বেশি। এখন মনে হয় তার দুই কাঁধ ভারশূন্য। চারদিকে কোথাও কেউ নেই। আর এ কথা মনে করে ভয়ে-আতঙ্কে সে চেঁচিয়ে ওঠে।
ভুলে যায় পারিপার্শ্বিকের কথা। বাবার মুখে কান্নার শব্দ শুনে মেয়েরা উঠোনে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ এক পাও এগোয় না। যেন তাদের সঙ্গে বাবার যোজন যোজন ব্যবধান। বিশাল সেই ব্যবধান অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছানো যাবে না।
ব্যবধান ভাঙে বাবা নিজেই। বুকের ভেতরের আর্তনাদ শুনতে শুনতে বলে, গানটা তোমরা আর একবার গাও মায়েরা। তোমাদের গানটা খুব সুন্দর। শেষে বলবে, পঞ্চকন্যার মুখে সোনা।
মেয়েরা আবার গানটা গাইতে শুরু করে- এক দেশে এক রাজা ছিল…। কিন্তু কেউই বাবার কথার সূত্র ধরে বলে না, পঞ্চকন্যার মুখে সোনা বলে না/সবাই মিলে বলতে থাকে- পঞ্চকন্যার মুখে ছাই।
এক সময় পদ্ম চেঁচিয়ে উঠে বলে, আমরা কেন বলছি না, পঞ্চকন্যার মুখে সোনা।
শিউলি বলে, কেন বলব?
প্রতিশোধ। প্রতিশোধ। আমাদের মুখেতো সোনাই উঠেছে।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  কেরানিও দৌড়ে ছিল

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সেলিনা হোসেন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...