ফেলে যাওয়া

‘তোমার কি সেদিনের কথা মনে পড়ে?’

‘কোন দিনের কথা?’

‘যেদিন আমার গা তোমার গায়ে ছোঁয়াতে দাওনি!’

‘মানে!’

‘তুমি সেদিন প্রথম ক্লাস করতে যাচ্ছিলে। হেঁটেই যাচ্ছিলে তুমি। আমি রিকশায়, তোমার পাশ দিয়ে। তুমি আমাকে খেয়াল করোনি অবশ্য। খেয়াল করবে কী করে! মাথা নিচু করে যে হাঁটছিলে।’

‘তুমি কী ডায়লগটা দিয়েছিলে সেদিন! আপনি নয়, তুমিও নয়।’

‘বলেছিলাম, এই মেয়ে মাথা তোল। টাকা হারিয়েছে, না কানের দুল? রাস্তায় মাথা নিচু করে কী খুঁজছিস? আমার কথা শুনে তুমি মাথা তুলেছিলে। মুচকি একটু হেসেছিলে। আমি আবার বলেছিলাম, জবাব দিচ্ছিস না যে বড়! আমার কথা শুনে তোমার ভয় মেশানো হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হয়েছিল।’

‘তোমার কথা শুনে হাসা ছাড়া আমার আর কী করার ছিল? তারপর তুমি কী কাণ্ডটা করেছিলে বলো?’

‘বলেছিলাম, এই মেয়ে রিকশায় ওঠ। সিটের বাম পাশের খালি অংশটি দেখিয়ে বলেছিলাম।’

‘রিকশাওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়েছিলে তখন তুমি? সে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। একবার তোমার, একবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল।’

‘কী জানি। আমি তো তেমন করে খেয়াল করিনি। আমার সমস্ত খেয়াল তো তখন তোমার ওপর।’

‘আমি যখন রিকশায় উঠতে দোনামনা করছিলাম, রিকশা থেকে ঝুপ করে নেমে পড়েছিলে তুমি। বলেছিলে, এখনই রিকশায় উঠে বস, নইলে টানা/হ্যাঁচড়া করেই রিকশায় তুলবো তোকে।’

‘তাও পারতে তুমি। যা ডাকাবুকো ছিলে!’

‘তুমি কিন্তু টানাটানি করার সুযোগ দাওনি। সুড় সুড় করে রিকশায় উঠে পড়েছিলে।’

‘তোমাকে তো চিনতাম। অনেক আগে থেকেই যে চিনতাম তোমাকে।’

‘চিনবে না! তুমি যে আমার খালাতো বোন। ছোটবেলায় তোমাকে যে উদলা গায়ে…। ওইটুকু পর্যন্ত বলতেই তুমি প্রায়-চিৎকার করে বলেছিলে, চুপ চুপ। আর না, আর এগোবে না কিন্তু।’

‘তোমার মুখ যা আলগা। এরপর কী বলতে কী বলে ফেলো।’

‘তারপর তো তুমি আসল খেলটা দেখালে।’

‘আসল খেল মানে।’

‘খেলার কথা পরে। আগে রিকশাওয়ালার কথা বলি। সে আদৌ ঠিক করতে পারছিল না আমাদের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারটি। পরিচিতই যদি হও, তাহলে এ রকম তুই-তোকারি করছ কেন? তরুণী, সুন্দরী তুমি। তুমি যে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ো, তাও বুঝতে পারছে সে। এ রকম একজন মেয়েকে আমার মতো কালাকোলা একজন এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলবে কেন?’

‘ওর দিকে নজর দেবার মনমানসিকতা ছিল না তখন আমার। আমি তখন তোমার ব্যাপারে অস্থির।’

‘রিকশাওয়ালা কিন্তু এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করে বসেছিল, স্যার, আপনে আফার লগে এই রকম কইরে কথা বইলছেন কেনো? তোমার মনে আছে নিশ্চয়, আমি কটকটিয়ে হেসে উঠেছিলাম।’

‘হ্যাঁ, হাসিটার কথা মনে আছে। তোমার বিকট হাসি শুনে আমি অবাক চোখে তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম।’

‘আমার হাসির ধরন দেখে রিকশাওয়ালা ভড়কে গিয়েছিল। বাড়তি কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হারিয়ে ফেলেছিল সে।’

‘হাসি থামাতে তুমি কিন্তু অনেক সময় নিয়েছিলে। হাসতে হাসতে আমার দিকে তোমার শরীরটাকে ঠেলে দিয়েছিলে।’

‘তাতেই তো তুমি খেলাটা দেখিয়েছিলে। বলেছিলে, দূরে যাও। দূরে বসো। আমাকে ছুঁয়ো না। আমার গা স্পর্শ করো না। তোমার বলার মধ্যে তাপ ছিল। রাগ তোমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। ঠিক কিনা বল। মাথা নিচু করে থেকো না।’

‘হ্যাঁ ছিল তো। আমার বলার মধ্যে ক্রোধ ছিল। ভয়ও ছিল।’

‘ভয়! কিসের ভয়?’

‘পরপুরুষের স্পর্শের ভয়।’

‘পরপুরুষ! কে পরপুরুষ?’

‘সে সময় তুমি আমার জন্য তো পরপুরুষই।’

‘কী আশ্চর্য! আমি যে তোমার আত্মীয়, তা ভুলে গিয়েছিলে?’

‘মা বলেছিল, মেয়েরা বড় হয়ে উঠলে, সব পুুরুষই তাদের কাছে পরপুরুষ। পরপুরুষের মনে বদখেয়াল। বদখেয়ালি পরপুরুষের ছোঁয়াছুঁয়ি এড়িয়ে চলবি শাহেদা।’

‘তা-ই তুমি ওরকম চিৎকার দিয়ে উঠেছিলে?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তারপর তো তুমি বদলা নিয়েছিলে। রিকশাওয়ালাকে বলেছিলে, এই থামো থামো। রিকশা থামতে না থামতেই লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিল রিকশা থেকে।’

‘তারপর?’

‘সিটে বাঁ হাত রেখে ডান হাতের তর্জনীটা আমার দিকে উঁচিয়ে বলেছিলে-।’

‘শোন শাহেদা, আজ তুই আমাকে পরপুরুষ বলে অপমান করলি। তোর গায়ে স্পর্শ লেগেছে বলে তুই রাগ করলি। দাঁড়া, আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সারা জীবন আমার গলায় তুই ঝুলে থাকিস। আর পরপুরুষ বলবি না! সেই পরপুরুষের সঙ্গে তোর শোয়ার ব্যবস্থা করছি। বলে হন হন করে হাঁটা দিয়েছিলাম আমি!’

‘আমার চোখ দুটো তখন বেরিয়ে আসার অবস্থা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালার সামনে এ রকম অসভ্যতা!’

‘তুমি তো জানো- আমি একটু ওরকমই। মুখ একটু আলগা।’

‘শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় যে তোমার মুখ আলগা হয়েছে, এমন তো নয়। ছোটবেলাতেও তোমার মুখ দিয়ে খারাপ কথা বেরোতে। মনে নেই ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কী বলেছিলে?’

‘তোমার তো বেশ ক’জন বোন। ভাই ছিল না তোমাদের। বাবাও গরিব ছিলেন। কয়েক বিঘা চাষের জমি ছিল শুধু। খাটাখাটির জীবন খালুর। বলতে গেলে গোটা দিন খেতখামারেই পড়ে থাকত তোমার বাপ।’

‘তুমি ঠিক বলেছ, তোমাদের তুলনায় আমরা অনেক গরিব ছিলাম। তোমার বাবার অনেক জোতজমি ছিল। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারও ছিলেন তিনি। তোমরা তো মাত্র দুই ভাই। তোমার বাবা লেখাপড়া জানতেন বলে বিদ্যার মর্মার্থ বুঝতেন। তোমাদের স্কুল-কলেজে পাঠালেন তিনি। আমার বাবা নিজের নামও সই করতে পারত না। তাই আমার বড় বোনগুলো আনপড়ই থেকে গেল। মা-ই একদিন আমাকে জোর করে স্কুলে পাঠাল। বাপ আমার গাঁইগুঁই করেছিল।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  স্রোতের মোহনায়

‘তোমার মা বলেছিল, শাহেদাকে আমি পড়াবই। দেখছ না, বড় বুবুর দুইটা ছাওয়ালই কী রকম পড়ালেখা করছে।’

‘এ কথা তুমি জানলে কি করে?’

‘তোমার মা-ই একদিন আমার মাকে বলছে, শুনেছি। সেবার খালা গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। খালা আমাদের বাড়িতে পেঁৗছেই বলেছিল, দু’দিন গা জুড়াতে এলাম বুবু। একাই চলে এলাম। কাউকে সঙ্গে আনিনি। জরিনার বাপকে বলে এসেছি, তোমার মেয়েরাই তোমাকে রেঁধে বেড়ে খাওয়াবে। সংসারের ভার আর সইতে পারছি না। বুবুর কাছে গিয়ে দু’চার দিন থেকে আসি।’

‘আমার মা খুব ভালোবাসতো বড় খালাকে।’

‘আমার মাও পছন্দ করতো তোমার মাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত…।’

‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার মায়ের ভালোবাসা ছোটবোনের ওপর অটুট থাকেনি।’

‘তুমি ঠিকই বলেছ, শেষের দিকে মা কী রকম যেন হয়ে গিয়েছিল। তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চাইলে মা নানা রকম ওজর আপত্তি তুলত। বিশেষ করে আমার দাদা যখন তোমাদের বাড়িতে যেতে চাইত, ভীষণ অস্থির হয়ে উঠত মা। এই অস্থিরতার কারণ তখন তেমন করে বুঝিনি। আমি তখন ছোট, দশ কি এগারো আমার বয়স। দাদা আমার চেয়ে সাত বছরের বড়।’

‘আমি তো তোমার বছর দুয়েকের ছোট। তুমি না বুঝলেও আমি কিন্তু একটু আধটু বুঝতাম। এসব ব্যাপার খুব কম বয়সেই বুঝে ফেলে মেয়েরা। তোমার দাদা কাদির ভাই আমাদের বাড়িতে এলে রহিমা আর জরিনা বুবু বেশ চঞ্চল হয়ে উঠত। আমার মা ওদের চঞ্চলতাকে প্রশ্রয় দিত। কথাটা তোমার মায়ের কান পর্যন্ত পেঁৗছেছিল। তাতে তোমার মা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আমার মায়ের দিক থেকে। কাদির ভাইয়ের আসা-যাওয়া কমে গেল।’

‘আমার আসা-যাওয়া কিন্তু কমল না। সুযোগ পেলেই তোমাদের বাড়িতে চলে আসতাম। আমাদের তো কোনো আপন বোন ছিল না। তোমাদের নিয়ে বেশ আনন্দেই দিন কাটত আমার।’

‘সেই আনন্দেও তোমার মা কিন্তু বাধা দিয়েছেন।’

‘হ্যাঁ, যখন এসএসসি পাস করলাম।’

‘তখন আমার দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি এইটে।’

‘তোমার দুই দুলাভাই-ই তখন ঘরজামাই হয়ে তোমাদের বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছে।’

‘বাবার কোনো ছেলে ছিল না। জামাইদের ছেলে মনে করত মা-বাবা।’

‘মায়ের মনে শঙ্কা ছিল, যদি তোমার মা কাদির ভাই বা আমার গলায় তোমাদের কোনো বোনকে ঝুলিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে ছাড়ে।’

‘শেষ পর্যন্ত দুই বোনের মধ্যে ঝগড়া হলো ভীষণ।’

‘ওকথার আগে ছোটবেলায় তোমাকে কী বলেছিলাম শুনি!’

‘আমি, তুমি আর শরিফাবু সবেমাত্র পুকুরে গোসল করে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছি, তুমি হঠাৎ আমার বুকের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলে তোর ওখানে কিছু নাই কেনরে?’

‘তুমি লজ্জায় মরেছিলে। শরিফা আপা খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল।’

‘আজ ভাবি, কত বড় অসভ্য আর দুঃসাহসী ছিলে সেই বয়সেও।’

‘তো আমার মায়ের সন্দেহের কারণেই আমরা দুই ভাইয়ের তোমাদের বাড়িতে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। আমার মন তখন ভীষণ আকুলি-বিকুলি করত। তোমার জন্য।’

‘আমাদের মধ্যে দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল। আমরা বড় হতে লাগলাম। বড় বোনদের বিয়ে হতে লাগল। আমি এইচএসসি পাস করে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম।’

‘মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিল মা আমায়। একটু মাথা তোলা হলে বিদ্রোহ করলাম। বাবা আমার সঙ্গে ছিল। ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট বেরোল যেদিন, সেদিনই বাবা মারা গেল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হলাম। কী মজার, তুমি এলে এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট হয়ে।’

‘অনেকদিন পরে, সেদিনই প্রথম দেখা তোমার সঙ্গে। আমাকে চিনলে কী করে তুমি?’

‘এই মুহূর্তে যথার্থ কারণ তো বলতে পারব না। তোমার ছোটবেলার হাঁটার ভঙ্গিটা কেন জানি আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। পেছন দিক থেকে দেখে আমার বুকটা ছলকে উঠল। তবে মিলাতে পারছিলাম না, তুমি ঢাকার রাস্তায় কেন? যা-ই থাক কপালে ভেবে বলে উঠেছিলাম, এই মেয়ে তুই শাহেদা না?’

‘আমি চমকে মাথা তুলেছিলাম, তোমার দিকে। এর মধ্যে তুমি বলে ফেলেছিলে, টাকা হারিয়েছে, না কানের দুল?’

‘হা হা হা!’

‘আমি কিন্তু প্রথমে তোমাকে তেমন করে চিনতে পারিনি। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম খুব। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন তরুণ ধমকে কথা বলছে। বলার মধ্যে কী রকম যেন জোর-জবরদস্তি।’

‘শেষ পর্যন্ত চিনলে কী করে আমি যে আমি?’

‘তোমার নাকের মাথায় ওই তিলটা। আর গালের টোলটা। আমাকে মনে করিয়ে দিল, তুমি যে তুমি।’

‘রিকশা থেকে নেমে সামনের দিকে হাঁটা দেওয়ার পর তুমি কিন্তু পেছন থেকে ডেকেছিলে, মুনির ভাই, যেয়ো না। রাগ করো না।’

‘আমি ফিরে এসেছিলাম রিকশার কাছে। তোমার চোখে-মুখে তখন তৃপ্তি আর ভয়ের মাখামাখি। আমি ফিরে এসেছি বলে তৃপ্তি, আবার আমি তোমার পাশে বসতে যাব বলে শঙ্কা।’

‘তুমি কিন্তু রিকশায় ওঠার কোনো আগ্রহই দেখালে না। রিকশাওয়ালার দিকে বিশটা টাকা এগিয়ে দিয়ে বলেছিলে, আপাকে আর্টস ফ্যাকাল্টিতে নিয়ে যাও। বলে আবার হাঁটা। চার-ছয় কদম হেঁটে ঘাড় ফিরিয়েছিলে তুমি। উঁচু গলায় বলেছিলে, শোন শাহেদা, তোকে আমি আমার গলায় ঝোলানোর ব্যবস্থা করবই। এই আমার শেষ কথা।’

‘বিয়ের অনেক বছর পরও তোর সঙ্গে আমি তুই তুই করে কথা বলেছি শাহেদা। তুই কি রাগ করতিস?’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি

‘না। আমার মোটেই রাগ হতো না। আমার মনে হতো তোমার বলার ভঙ্গির মধ্যে আমি আমার মেয়েবেলাকে ছুঁতে পারছি। আচ্ছা, তুমি যে এক লাফে বিয়ে পর্যন্ত চলে এলে, সেই বিয়েটা কি এত সহজে হয়েছিল?’

‘না। মোটেই না। কত কাঠখড় যে পোড়াতে হয়েছে আমায়। কত ঘাম যে ঝরেছে!’

‘তখন তুমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছিলে, বাংলায়।’

‘শুধু পড়ছিলাম না, চাকরিও করছিলাম। বাংলাবাজারের প্রুফ রিডার ছিলাম আমি। ফর্মা পিছু ৬০ টাকা। সামান্য কটি টাকা নিয়ে জামালপুর ছেড়েছিলাম। বাপ মারা গেছে তখন। আত্মীয়স্বজনরা খাবলাখাবলি করে জমিজিরাত দখল করে নিয়েছে। দিন এনে দিন খাওয়া অবস্থা তখন আমাদের। কাদির ভাই বিয়ে করে ঢাকায়। বড় চাকরি করে। মাকে দেখে না। আমার ভেতরে জেদ। জামালপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সোজা ঢাকা। জগন্নাথ হলে এক বন্ধুর সঙ্গে ডাবলিং করি। বন্ধুরা ক্লাসে যায়, আমি অধিকাংশ সময় পড়ে থাকি বাংলাবাজারে। নিজে কষ্টে থাকি। মায়ের যাতে কষ্ট না হয়, টাকা পাঠাই। আমার কথা শুনে তোর মনে হবে আমরা বুঝি পথের ফকির হয়ে গেছি। তা নয় কিন্তু। নাই নাই করেও আমাদের তখন বেশকিছু ধানি জমি রয়ে গেছে। পুকুরটুকুর মিলে বিরাট বসতবাড়ি তো ছিলই।’

‘আচ্ছা একটু থামো তুমি। এক নাগাড়ে অনেক কথা বলে ফেলেছ। দম নাও।’

‘সেদিন আমি রিকশা থেকে নেমে সোজা জামালপুরের গাড়ি ধরেছিলাম। তোর মা সাঁঝবেলায় আমাকে তোদের উঠানে দেখতে পেয়ে বেশ অবাকই হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, কীরে বাপ! কোনো অমঙ্গল সংবাদ!’

‘মা আমাকে পরে তোমার সেদিনের পাগলামির কথা বলেছিল।’

‘আমি সেই সন্ধ্যায় উঠানে দাঁড়িয়ে তোর মায়ের চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, শাহেদাকে আমি বিয়ে করব। আগামী শুক্রবারেই। আপনি রাজি হন বা না হন এই বিয়ে হবেই। তোর মা কিছু বলার আগেই আমি পেছন ফিরে হাঁটা দিয়েছিলাম।’

‘তোমার মাও কি রাজি …।’

‘না। আমার মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। বলেছিল, আমার ছোটবোনরে চিনি। ও একটা বজ্জাত। বাইরের পোলা ধরে ধরে ঘরজামাই করে। সে তোমাকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে। মুনির রে, আমি কিছুতেই তোরে হারাতে রাজি নই।’

‘তারপর?’

‘মাকে বললাম, আমি ঘরজামাই হব না। ঘরজামাই হবার জন্য আমি জন্মিনি। শাহেদা তোমাকে মর্যাদা দেবে মা। মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল, আর মর্যাদা! একটাকে তো দেখছি! কাদির ভাইয়ের বউয়ের দিকেই ইঙ্গিত করেছিল মা। আমি বলেছিলাম, মা, শাহেদা অন্যরকম।’

‘তুমি কি তোমার মাকে মিথ্যে বলনি?’

‘কী রকম!’

‘সেই ছোটবেলার পর অনেকদিন তো তুমি আমাকে দেখনি। মানুষের চরিত্র ছোটবেলার সঙ্গে মিল থাকে না। অসুর দেবতা হয়, দেবতা অসুর হয়ে যায়। আমার সম্পর্কে কিছুই না জেনে মাকে এভাবে বলতে গেলে কেন?’

‘আমার মনে হয়েছিল, সেই সকালের দেখাতে আমি তোর ভেতরের অনেক কিছু দেখে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল, তোকে বিয়ে করলে আমি অসুখী হব না। মনে হয়েছিল, তুই আমার মাকে কষ্ট দিবি না।’

‘কিন্তু তোমার মা তোমার কথাকে বিশ্বাস করেননি।’

‘ঠিক বলেছিস তুই। মা তার কথায় অনড় থাকল, কিছুতেই শাহেদাকে বিয়ে করতে পারবি না। আমি বললাম, ওকেই বিয়ে করব আমি। মা সামনে ভাতের থালা দিল। না খেয়ে উঠে গেলাম আমি। ওই অবস্থাতেই রাস্তায় নামলাম। মা রান্নাঘরে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।’

‘আর তুমি?’

‘আমি ঘাটার আগা থেকে রিকশায় উঠলাম। রিকশা কিছুদূর এগোল। আমার মন ভীষণ বিষণ্ন তখন। ভাবছিলাম, মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করব? মাকে কষ্ট দিয়ে বিয়ে করব? শাহেদাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে এসেছি, তাকে বিয়ে করবই। হঠাৎ পেছন থেকে শুনতে পেলাম, মুনির মুনির রে! দাঁড়া। দাঁড়া তুই। দেখি, আমার বুড়ো মা দৌড়াচ্ছে। ডান হাতটা ওপর দিকে তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে রিকশার দিকে এগিয়ে আসছে মা। আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামলাম। মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা বলল, ১০ মাস ১০ দিন তোরে পেটে রাখছি রে মুনির। তুই আমার কলজের টুকরা রে মুনির। আমার সামনে থেকে না খেয়ে যাচ্ছিস তুই! তারপর মা একেবারে সংযত গলায় বলল, চল, বাড়িতে চল। খাবি। আর শাহেদাকেই বিয়ে করবি তুই।’

‘বললেন তোমার মা!’

‘স্বর্গ হাতে পাওয়া কোনোদিন দেখিনি। ওই মুহূর্তে আমার মনে হলো, মা আকাশ থেকে পূর্ণিমার চাঁদ ছিনিয়ে এনে আমার হাতে তুলে দিল।’

‘তারপর তো বিয়েটা হয়ে গেল।’

‘না শাহেদা। তার পরপরই বিয়ে তো হলো না। এই ২৯ বছরেই সব ভুলে গেলি? ২৯ বছর আগে আজকের দিনেই তো তোর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল। মায়ের সঙ্গে কথা বলার পরও এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল আমাকে। মা সেদিন ভাতপাতেই শর্ত দিয়েছিল, বিয়ে তুই শাহেদাকেই করবি, ঠিক আছে। কিন্তু এক বছর পরে। সবেমাত্র মেয়েটি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনায় ঠিকঠাক মতো মন বসেনি এখনও। সে একটু স্থির হোক। বছরখানেক পরে বিয়ে করিস তুই। এর মধ্যে তোদের মধ্যে ভালো করে জানাশোনা হোক।’

‘ঠিক বলেছ তুমি। তুমি ফিরে এসে বলেছিলে, দেখ মেয়ে, বিয়ে আমি তোকেই করব। তোর মায়ের সাথে কথা হয়েছে। আমার মাকেও রাজি করিয়েছি। তবে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  জনার্দন কৈবর্ত

‘কেন এক বছর পরে, জিজ্ঞেস করবার সাহস করিনি আমি। আমি শুধু ভেবে গেছি, কী অদ্ভুত একরোখা মানুষ তুমি! ছোঁয়াছুঁয়িতে কোথায় আমি একটু আপত্তি করলাম, অমনিতে জেদ চেপে গেল। আরও অবাক করার কাণ্ড যে, এই এক বছরে মুহূর্তের জন্যও স্পর্শ করোনি আমাকে।’

‘কত ঘুরেছি আমরা! বুড়িগঙ্গার তীর ছুঁয়ে কত হেঁটেছি। জোছনাতে ভাসতে ভাসতে জাদুঘর থেকে দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত চক্কর মেরেছি!’

‘কিন্তু একবারও হাত বাড়াওনি তুমি আমার দিকে।’

‘সে সময় মেয়েরা-ছেলেরা পরস্পর জড়াজড়ি করত। চুমোও খেতো।’

‘তুমি তো আমার হাতটি পর্যন্ত ধরোনি তখন।’

‘কেন ধরব বল। আমি তো তখনও তোর কাছে পরপুরুষ।’

‘গোটাটা জীবন তোমার এই অভিমানটা গেল না।’

‘কী করে যাবে বল। তুই তো সেদিন আমার পৌরুষত্বকে খোঁচা দিয়েছিলি। ভেবেছিলি, আমি অন্য দশজনের মতো। ভাবিসনি তো মুনির মুনিরের মতোই শুধু?’

‘তারপর বিয়ে হলো আমাদের।’

‘হ্যাঁ শাহেদা। তুই তখন সেকেন্ড ইয়ারে, আমি থার্ড ইয়ারে। বিয়ের পর তুই আমার মাকে আঁকড়ে ধরলি। ভুল ভাঙালি তুই আমার মায়ের। বুঝিয়ে দিলি মুনিরকে বিয়ে করার সুযোগ না দিলে কত বড় ভুলই না করত মা।’

‘তোমার মা কিন্তু আমাকে কন্যার জায়গায় বসিয়েছিলেন।’

‘বসাবে না! দুই বোনের কত দিনের ভুল বোঝাবুঝিটা মিটালে তুমি!’

‘তোমার মা মানে শাশুড়িমা তাঁকে বেশিদিন সেবা করার সুযোগ দিলেন না আমাকে। ঠেলে ঠেলে ঢাকায় পাঠালেন।’

‘মা বলল, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে শাহেদার। মুনির, তুই ঢাকায় বাসা নে। শাহেদাকে নিয়ে যা।’

‘প্রথমে সেগুনবাগিচায় একটা টিনশেডেই তো থাকতে শুরু করলাম আমরা।’

‘কী আনন্দেই না দিন কেটেছে আমাদের, সে সময়। এক ডজন চুড়ি কিনে দিলে, সস্তা দামের এক জোড়া সালোয়ার-কামিজ কিনে দিলে আহ্লাদে আটখানা হতিস তুই।’

‘টু ইন ওয়ানের কথা মনে আছে তোমার?’

“থাকবে না! কী সুখই না পেয়েছিলি সেদিন। স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে কোলে করেই বাক্সটা নিয়ে এসেছিলি। ঘরে এনে টু ইন ওয়ানের গায়ে বারবার হাত পোলাচ্ছিলি। গানের ফিতা কিনে এনেছিলাম। ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ গানটি বারবার করে শুনতি তুই। তোর সেদিনের তৃপ্তিময় চোখ-মুখের কথা কি ভুলতে পারি আমি।”

‘তারপর তো আমাদের প্রথম সন্তান ফেরদৌস হলো। তারপর হলো মুনিরা!’

‘আমার নামের সঙ্গে মিল রেখেই মেয়েটির নাম রেখেছিস তুই।’

‘তুমি অনার্স, এমএ পাস করলে। আমারও পড়াশোনা শেষ হলো একদিন। চাকরি পেলাম স্কুলে। তুমি বিসিএস দিয়ে সরকারি কলেজে ঢুকলে।’

‘এই সময় মা আমার হঠাৎ করে মারা গেল।’

‘তুমি বিহ্বল হয়ে পড়লে। পাগল পাগল ভাব কাটিয়ে উঠতে তোমার অনেক দিন লেগে গেল।’

‘সেই অবস্থায় তুই আমার পাশে না থাকলে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে যেতাম আমি।’

‘তোমার মাকে খুবই ভালোবাসতে তুমি।’

‘তারপর ছেলে বড় হলো, মেয়ে মাথা তুলল। স্কুল-কলেজ ছাড়িয়ে ফেরদৌস আজ সিলেট মেডিকেল কলেজে পড়ছে। মেয়ে নাইনে। কী ব্যাপার, হঠাৎ এরকম করে হেসে উঠলি কেন?’

‘না, এমনিতে।’

‘নিশ্চয়ই এমনিতে নয়। বিয়ের পর থেকে দেখে আসছি কম কথা বলিস তুই। তোর হাসার মধ্যে একটা মর্মার্থ থাকে। বল না, কেন হেসে উঠলি তুই?’

‘হ্যাঁ, বল।’

‘রাগ করবে না তো?’

‘তোর ওপর কোনোদিন রাগ করেছি শাহেদা! রেগে যাওয়ার মতো কোনো কাজ করেছিস তুই আজ পর্যন্ত?’

‘তাহলে বলি, ছেলেটাও তোমার মতো হয়েছে।’

‘মানে! কী বলতে চাইছিস তুই?’

‘তুমি যেমন অল্প বয়সে প্রেমিকা খুঁজে নিয়েছিলে, তোমার ছেলেও তো তা-ই করেছে।’

‘ও! এই কথা! কী করব বল। শরমিনকে ফেরদৌসের ভালো লেগে গেল। বলল আমাকে। আমি সায় দিলাম।’

‘তাই বলে সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে পড়তে! বাপের মতো!’

‘হা হা হা। বাপকা বেটা সিপাহি কা ঘোড়া।’

‘শরমিনের মা-বাপের সঙ্গে কথা বলে এনগেজমেন্টের দিন ঠিক করে ফেললে। শর্ত দিলে, ফেরদৌসের এমবিবিএসের পর শরমিনকে ঘরে তুলবে।’

‘হ্যাঁ। শরমিনও তখন শেষ বর্ষে পেঁৗছে যাবে।’

‘আজকেই তো এনগেজমেন্টের দিন। শুক্রবার। আজকেই তো ফেরদৌস আংটি পরাবে শরমিনকে।’

‘হ্যাঁ তো। আজকের মতো এমন একটা সুন্দর দিনে শুয়ে আছ কেন তুমি? সব আলসেমি ঝেড়ে বিছানা ছাড়ো শাহেদা। এই দেখ, তোমার বিছানার পাশে একা বসে আছি আমি। ঘরভর্তি মেহমান। এই সময় কি তোমার ঘুমিয়ে থাকা সাজে! সেই ভোরসকাল থেকে ডাকছি তোমাকে। একবারের জন্যও চোখ খুলছ না। বলছই নাতো, আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। আমি আরেকটু ঘুমাই। রাতে যে-পাশ হয়ে শুয়েছিলে, সেই পাশেই শুয়ে আছ শাহেদা। একটুও নড়াচড়া করছ না তুমি। আমি সেই কখন থেকে ডেকে ডেকে হয়রান হচ্ছি। বিয়ের পর কোনোদিন তো এতবার করে ডাকতে হয়নি তোমাকে। এক ডাকেই সাড়া দিয়েছ। আজ দিচ্ছ না কেন? কোনোদিন তোমার আগে শয্যা ত্যাগ করতে পারিনি আমি। সবার আগে তুমিই বিছানা ছাড়তে। আজ, আজ এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে আছে কেন শাহেদা? শাহেদা, শাহেদারে, চোখ খোলো শাহেদা, কথা বলো। শুধু একবার বলো, মুনির ভাই। অত উতলা হয়ো না তুমি। এই তো আমি। তোমার পাশেই তো তোমার শাহেদা।’

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হরিশংকর জলদাস- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...