হাতির ছানা বনশ্রী

একদল হাতি নদী পার হচ্ছিল। দলে মোট ১২টি হাতি। তার মধ্যে দুধের বাচ্চা তিনটি। ওদের বয়স তিন থেকে ১৩ মাস। ছোটটা মায়ের দুধ ছাড়া কিছুই খায় না। কচি ঘাস বা পাতা দু’এক কামড় দেয়, চিবোয়। কখনো গেলে, কখনো ফেলে দেয়। মায়ের থেকে দেখে দেখে শিখেছে। মায়ের দুধেই পেট ভরে যায়। ভারি মজা দুধ খেতে। বড় দুটি মায়ের দুধের সঙ্গে ঘাসও খায়। আর খেলে।
মা-বাপ-চাচাদের সঙ্গে ঢুসাঢুসি করে। তিন বাচ্চা ঠেলাঠেলি খেলে। ডাকে, দৌড়ায়। গাছের ডালপালা শুঁড় দিয়ে টেনে নিয়ে নিজেদের পিঠে ঘষে নেয়। আবার গাছের গুঁড়িতে সারা গা চুলকিয়ে নেয়। বড় দুটি বেশ তাগড়া। আর খুব ফুর্তিবাজ।
পানি খেতে গেলে খুব মজা। পেট ভরে খেয়ে গা ডুবিয়ে দাও। চিৎপটাং হয়ে পড়লেও ভয় নেই। মায়েরা তো পাশেই আছে। বড়রা কত কিছু শেখায়! কত জানে! শুঁড় দিয়ে পানি টেনে নিয়ে মা গায়ে ছিটোয়। পিঠে কাদাও ছিটোয়। ওতে চুলকানি কমে। নদীতে বেশ পানি। স্রোতও আছে। বড়রা সব সময় ওদের ঘিরে রাখে।
সে কী! সবাই মিলে নদী পার হতে শুরু করল। বাচ্চারা মাঝখানে। তিন মাসের বাচ্চা হলেও সাঁতার জানে। আসলে শরীরটা বড় তো, তাই ডুবে যায় না। নদী বড় নয়, কিন্তু শরতের ভরা নদীতে স্রোত বেশ তেজি। দলের প্রধান হলো একটা বাচ্চার মা। বিশাল তার শরীর। বয়সে সবার চেয়ে বড় ও।
হাতিদের এই নিয়ম। মেয়েরাই হয় দলের নেত্রী। দলকে ঠিক ঠিক চালানোই ওর দায়িত্ব। এদিকে একটি বাচ্চা মাঝখান থেকে বেরিয়ে গেল। তাও স্রোতের নিচের দিকে। মা এসে শুঁড় দিয়ে টেনে পাশে পাশে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। আবার স্রোতের টানে একটু আলাদা হয়ে গেল। মা সাঁতরে কাছে গিয়ে শুঁড় দিয়ে দলের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। বেশ কঠিন কাজ। সাঁতারও কাটতে হচ্ছে যে। বাচ্চা তো, গায়ে জোর আর কত! বাচ্চা আরো দূরে সরে যেতে লাগল। তখনো অর্ধেক নদী রয়ে গেছে। মা একবার বাচ্চার কাছে যায়, আবার দলের দিকে তাকায়। বাচ্চাকে খুব শাসায়।
শেষে আর পারল না। বাচ্চাটা স্রোতের টানে কেবলই দূরে সরে যাচ্ছে। ছানাটা শুঁড় তুলে কিছু একটা ধরতে চায়। পায় না, মাও দল থেকে একটু দূরে চলে গেছে। সে আবার দলের দিকে সাঁতরে যায়। আবার ছানার দিকে যায়। শেষে দল থেকে অনেক দূরে চলে গেল বাচ্চাটা। মা ডাকল। চেষ্টা করল।
শেষে ভাটির দিকে গিয়ে বাচ্চাটি কূল পেল। খুব হয়রান হয়ে পড়ল। জিরিয়ে নিল, দেখল চারদিক। খাড়া পাড় দিয়ে তো উঠতে পারে না। শেষে কূলে ওঠার মতো জায়গা খুঁজে পেল। কিন্তু বনের কিছুই তো সে চেনে না। চিৎকার করে ডাকল মাকে। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করল মায়ের ডাক। তারপর যে দিকে চোখ যায় চলতে শুরু করল। একবার ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে যায়, আবার যায় ফাঁকা দিয়ে।
এমন সময় বনের বিটের এক পাহারাদার ছানাটিকে দেখতে পেল। বাচ্চাটি তখন ঝোপের মধ্যে গা লুকিয়ে শুয়ে পড়েছে। ঘুমও পেয়েছে খুব। ঘুমিয়ে পড়ল। বিটের পাহারাদাররা ওকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। ও তো একটি ছানা। দড়ি কী চেনে না। গুড়গুড় করে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করল। শুঁড় দিয়ে বাঁধন খুলতে টানাটানি করল। বিটের পাহারাদাররা দয়ালু। ওকে মারল না, বকল না। এদিক-ওদিক কসরত করে, আদুরে আদুরে কথা বলে তারা তাকে ধরে বিট অফিসে নিয়ে গেল। ওর গলার দড়ি খুলে দিল। ছানাটাও সবকিছুকে খেলা মনে করল। বিট অফিসে দুটি হাতি বাঁধা। ওর চেয়ে বয়সে বড় একটি ছানা। গুড়গুড় করে খুশিতে ছুটে গেল ওর কাছে। শুঁড় দিয়ে শুঁকে দেখে, গায়ের গন্ধটা অন্য রকম। ছুটে গেল বড় হাতি দুটির দিকে। বনকর্মীরা ছানাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু চোখে চোখে রাখল। ছানাটা বড়দের কাছে গিয়েও মায়ের গন্ধ পেল না। দলের চাচা-চাচি, বাবা বা দাদার মতো গন্ধ কারো গায়ে নেই। মাহুতরা ওকে বেশ দেখছে, হাসছে, নজরে রেখেছে। এমন সময় মাহুত বন থেকে পিঠে চড়ে একটি মা হাতিকে নিয়ে এল। বিট অফিসের ছানাটির মা। পোষা হাতিদের রুটিন অনুযায়ী প্রতিদিন কাজ থাকে। কাজ করে মা হাতি ফিরল। অমনি তার বাচ্চা ডাক ছেড়ে মায়ের দিকে ছুটল। সে দুধ খাবে। অনেকক্ষণ ধরে মায়ের দুধ খায় না। মায়ের সঙ্গে বনে যেতে চেয়েছিল খুব। মাহুত নিল না। ছানাপোনা নিলে কাজ হয় না।
মা-হারা বাচ্চাটিও ছুটল সেদিকে। দেখতে ঠিক ওর মায়ের মতো। মায়ের ওপর অভিমান উথলে উঠল। না, সে যাবে না, মায়ের কাছে। মা তাকে নদীতে ছেড়ে দিয়েছিল কেন? তারপর দেখে বড় ছানাটা মায়ের দুধ খাচ্ছে। সে কী! অমনি তার খিদে গর্জে উঠল পেটে। সেও ছুটে গিয়ে ছানাটিকে ঢুস দিয়ে হটিয়ে দিয়ে দুধ খেতে চায়। ওর খুব খিদে পেয়েছে। মা হাতির কেমন মায়া হলো। সে দেখতে লাগল।
বনকর্মী ও কর্তা দেখে খুশি হলো। মা হাতি নতুন বাচ্চাটিকে প্রথম নজরে কাছে ঘেঁষতে দিয়েছে। যাক, ছানাটিকে তাহলে বাঁচানো যাবে। তবুও তারা গরুর দুধ ও পাউডার দুধ কিনে আনতে লোক পাঠাল।
বিট অফিস নড়েচড়ে বসল। সবাই চায় নতুন বাচ্চাটি ভালোভাবে বেঁচে থাকুক। হাতির একটা ছানা তো যা-তা কথা না। এক সময় দেখা গেল নতুন ছানাকে মেনে নিয়েছে নতুন মা।
বিটকর্তা ছানাটির নাম দিল বনশ্রী। দুধ খেল পেট পুরে। পাতানো মায়ের বাচ্চাটি তিন-চার মাসের বড় হবে। ওকে বড় ভাইয়া ডাকবে। দুধ খেয়ে ছুটল ভাইয়ার কাছে। ঢুসাঢুসি, ঠেলাঠেলি, শুঁড় দিয়ে পেঁচাপেঁচি, হাডুডুর মতো তাড়িয়ে নিয়ে ছোটাছুটি। হাতির বাচ্চাদের কত রকম খেলা! চলল দুপুরভর। সন্ধ্যা হতেই বনকর্মীরা আলাদা করে বেঁধে রাখল হাতিদের। মাথার ওপর টিনের ছাউনি। তাতে বিশাল বিশাল লোহার পাতের খুঁটি। পাশেই একদিকে নদী, আরেক দিকে পাহাড়। নদী দিয়ে নৌকায় করে বনের কাঠ, বাঁশ নিয়ে গেলে কর দিয়ে যেতে হয়। বিট অফিসের নাম ওয়াগ্্্্্গা। ওয়াগ্্্্্গা হলো মারমা নাম। অর্থ শুয়োরের মুখো। কর্ণফুলী ওখানে শুয়োরমুখের মতো বাঁক নিয়েছে। হয়তো এ জন্যই এই নাম।
সেই রাতে ১১টি হাতির একটি দল ওয়াগ্্্্্গা বিট অফিসে আক্রমণ করল। বুনো হাতির আক্রমণ যেমন হয়। অমনি পোষা শিক্ষিত হাতির পিঠে চড়ে বসেছে মাহুত। মানুষের বুদ্ধির সঙ্গে বুনো হাতি কি পারবে? সংখ্যায় তারা বেশি। হোক। বিট অফিসে একটি অশ্বত্থ, একটি যজ্ঞডুমুর, একটি চালতাগাছ বেশ বড় বড়। শুঁড় দিয়ে পাতা খেতে খেতে এসব গাছের দফারফা। পাশে মিরতিঙ্গা বাঁশের একটা ঝাড়। ১০ বছরের তেঁতুলগাছে তেঁতুল ঝুলছে। বিটকর্তার বন্দুক আছে। কিন্তু বুনো হাতিগুলো আস্তে আস্তে হিংস্র হয়ে উঠছে। তার মধ্যে তিনটি মাকুন্দ মাস্তান হাতি আছে। ওরা এগিয়ে ছানাটির একেবারে কাছে চলে আসে। পেছন পেছন আসে বাকিরা। আবার হটে যায়।
শেষে বিটকর্তা আদেশ দিলেন, বাচ্চাটিকে ছেড়ে দিন। দড়ি খুলে দিন। কিন্তু এ রকম তো হয় না। ফেলে যাওয়া বাচ্চাকে সাধারণত মা হাতি আর গ্রহণ করে না। তবে কে জানে! কে বলবে, হাতিদের খুঁটিনাটি স্বভাবের কথা! মাহুতরা বিটের হাতি তিনটির পিঠে উঠে যায়। বিটকর্মীরা টিন পেটাচ্ছে। আগুনে মশাল বানাচ্ছে। মাহুতরা তিনটি হাতি দিয়ে ঘিরে ধরে বনশ্রীকে। গলার দড়ি খুলে দিল। বনশ্রী একবার কী যেন ভাবল! বুনো হাতির দল মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। বনশ্রী একবার তার পালক মায়ের কাছে গেল। গা-ঘেঁষে দাঁড়াল। মা পিঠে শুঁড় বুলিয়ে দিল। অমনি বনশ্রী ছুটল বুনো দলের দিকে। সেখানে সবার আগে দলের নেত্রী। কে জানে ওটা বনশ্রীর দল কি না! দলের নেত্রী শুঁড় তুলে আঁ আঁ ডাক ছেড়ে বন কাঁপিয়ে তুলল। বনশ্রী তার কাছে যেতেই তেড়ে উঠল! শুঁড় দিয়ে শুঁকে নিয়ে কী বুঝল কে জানে! শুঁড় দিয়ে এক বাড়ি মারল। তাতে বনশ্রী পড়ে গেল। অমনি এক মাকনা হাতি ছুটে এসে পা তুলে চেপে ধরে আর কী! ভাগ্যিস বনশ্রী পালটি খেয়ে সরে গেল। ঝটপট উঠে গেল। উঠে দৌড় দিল পালক মায়ের দিকে। অমনি মাহুতরা বনশ্রীকে রক্ষা করতে ছুটে গেল পোষা হাতি নিয়ে। মশাল নিয়ে ছুটল বনরক্ষীরা। টিন পেটাতে পেটাতে এগিয়ে গেল বাকিরা। ১১টি হাতির পাল পিছু হটতে লাগল। বিট অফিসের বন্দুক থেকে ফাঁকা গর্জন হলো আবার। বুনো হাতির দল ছুটতে লাগল অন্ধকারে বনের দিকে। আগুনকে তাদের ভয়। বনশ্রী ছুটে গেল তার দুধ মায়ের কাছে। ওর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। দুধ মা তখন সামনের দুই পা ফাঁক করে দিল। বনশ্রী মায়ের সামনের পায়ের মাঝখানের দুধ খুঁজে নিল। দুধ খেতে খেতে সে শুঁড় দিয়ে মায়ের গলায়, এখানে-ওখানে পরশ বুলিয়ে দিতে লাগল। ওর চোখেও তখন সুখের নাকি অন্য কিছুর জন্য অশ্রু! সেই অশ্রু শুধু দেখল ওর মাহুত। মাহুতও তখন হাতির গায়ে হাত বুলিয়ে আদর জানাতে লাগল।
মাহুতরা, বন অফিসের সবাই বুঝতে পারল। মানুষের হাতের ছোঁয়ার গন্ধ পেয়েছে বাচ্চা হাতির গায়ে। তাই তারা বাচ্চাটাকে নিল না।
বনশ্রী দুধ খেতে খেতে ভাবল, বয়ে গেছে আমার!

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  অস্তিত্ব

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

বিপ্রদাশ বড়ুয়া- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...