স্মৃতি চারন

সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও

কবির জীবন কাব্যময় নয়। অধিকাংশ কবি এ দেশে দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে লিখে যান। তারা অবশ্য নিজেদের কথা বলতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেন না। কবিকে বলা হয় কালের সাক্ষী। কেউ কেউ কবিকে রহস্যঘন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রশ্ন হলো রহস্যটা কোথায়? সবি তো বাস্তবতা এবং সংগ্রামের কাহিনী মাত্র। কবির যত বড়াই-ই থাকুক লড়াইটাই তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য বিষয়। কবি বলেন, আমি সাক্ষ্য দেই যে, আমি এই জগতে যা কিছু দেখেছি, লিখেছি, শিখেছি এবং পৃথিবীর ওপর দিয়ে মহানগরীগুলোর ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে এসেছি, তার একটা বিবরণ খুঁটিনাটিসহ বলার চেষ্টা, আমার মধ্যে এই সাক্ষ্য ছিল। আমি জীবন সুন্দর এবং সাহসিকতাপূর্ণভাবে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছি। আমি কোথাও ঠিকমতো দাঁড়াতে না পারলেও দেখার চোখ যত দিন ছিল, আমি তার পূর্ণ ব্যবহার করেছি। তবে মানুষের ইন্দ্রিয়গুলো সদা সর্বদা সঠিকভাবে সহায়ক হয় না। যেমন আমার ইচ্ছে ছিল আমি দেখতে দেখতে লিখব, লিখতে লিখতে শিখব। কিন্তু আমার দেখার ইন্দ্রিয় এই দু’টি চু শেষ পর্যন্ত আমাকে তেমন সাহায্য করেনি। চোখ চলে গেছে। দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং আমি চোখের সাহায্য ছাড়াই দেখার ব্যাকুলতায় ভুগছি। না দেখলেও মানুষের মধ্যে একটা বিষয় থাকে। যার নাম আন্দাজ। এই আন্দাজ কবিকে বেশ খানিকটা সহায়তা দিয়ে থাকে। না দেখলেও মনে হয় আমি দেখছি। আর নানা সাহায্য নিয়ে অন্যের সহায়তায় আমি কম বেশি লিখেছিও। আমার লেখা একেবারে অগ্রাহ্য হয়নি।

মনে হয় আমার কিছু পাঠক আছে। এটা আমি বুঝতে পারি। কথা হলো লেখার আনন্দটা আমার মধ্যে এখনো একটু আধটু উত্তেজনার সৃষ্টি করে। লেখা প্রকাশ পেলে আমার কৌতূহল আগের মতোই সজাগ। আমি অবশ্য এখন আর কাউকে নিজের লেখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করি না। এমনিতেই আমার মধ্যে লিখতে পারার কিংবা বলা যায় রচনা শক্তি সৃজন মুহূর্ত ইত্যাদির একটা কম্পন অনুভূত হয়। আমি নিজে তো আর হাত দিয়ে কলম ধরে লেখার কষ্ট স্বীকার করতে পারি না। তবে নিজের হাতে লেখার যে আনন্দ সেটা কিন্তু অন্যের হাত দিয়ে লিখিয়ে নিলেও আমার মধ্যে তরঙ্গ সৃষ্টি করে। আমি উত্তেজনা বোধ করি। এই উত্তেজনা আনন্দময়। তবে খুবই মুহূর্তের জন্য সেটা ঘটে থাকে। যেহেতু আমি কবিতা লেখায় অভ্যস্ত এবং কবিতা লিখতে হলে নীরবতা একাকিত্ব একান্ত দরকার হয়। সে জন্য কবিতা অন্যের হাত দিয়ে লিখিয়ে নিলে সেই মর্ম বেদনাটুকু ঠিক মতো অনুভব করি না। তবুও কাজটা যেহেতু আমাকে মাঝে মধ্যেই করতে হয়, সে কারণে অভ্যেস আলস্য এবং স্বগতোক্তি করার একটা নতুন বিষয় আমার মধ্যে কিংবা আমার হাতে একটু একটু করে তরঙ্গের মতো বলতে থাকে। আমি এমনিতেই কবিতা না লিখে কেবল গদ্যের মধ্যে আনন্দ পাই না। আমার স্বভাব মোটামুটিভাবে এখনো কাব্যের নির্দেশেই স্ফুর্তি পায় এবং বলতে থাকে। আর আমার কাছে কবিতাই মানুষ চাইতে আসে। আমি কাউকে ফিরিয়ে দেই না। এটা তো আমার জন্য আশীর্বাদস্বরূপই বলতে হবে। এতে আমি মানসিক আনন্দে খুব উৎফুল্ল না হলেও আনন্দেই দিন কাটাই।

সামনে শীত ঋতুর আবির্ভাবের সঙ্কেত আমার দেহে অনুভূত হচ্ছে। বহুকাল আগে আমার বয়স যখন অল্প ছিল, আমি শীতকে বেশ ভালোভাবেই অনুভব করতাম। কিন্তু এখন শীত আমার কাছে একটি ভীতিজনক কাল। শীতের সময়ই হলুদ পাতার মতো বুড়ো মানুষেরা ঝরে যায়। মরে যায়। যতই যতেœর মধ্যে বার্ধক্যকে আবৃত্ত করার চেষ্টা করি না কেন, শীত হাড়ের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। আমি শীতকে আগে খুবই আনন্দের সাথে গরম পোশাকের মতো গায়ে জড়িয়ে নিতাম। এখন শীতের আভাসেই ভয়ের কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। শীতকে কিছুতেই আর সৃজনশীল মানুষের সহায়ক হিসেবে গণ্য করতে পারি না। বুড়ো মানুষ শীতে শঙ্কিত থাকে। আর কবিরা, আমি ঠিক জানি না শীতের মহিমা কীর্তন কতটা করেছেন। আমি শীতে ভীতু। শীত সহনীয় আমার কাছে আর নয়। অথচ শীত হলো এই দেশে অতি অল্প সময়ের ঋতু বৈচিত্র্য। যা হোক, বুড়ো মানুষ শীতকে ভয় পায় এবং শীতে লিখতে আলস্য জড়িয়ে আছে। মনে হয় কয়েকটা দিন লেখা বাদ দেই না কেনো।

এই মনোভাব কবির জন্য খুবই বিব্রতকর এবং অনুচিত বলে মনে করি। আসলে ঋতুর ঘাত-প্রতিঘাতে যদি কবির সৃজন উৎসাহ অসহনীয় মনে হয়, তাহলে এটা তো সমর্থন করা যায় না।

তবু লেখালেখি ছাড়া আমার তো আর কোনো কর্তব্যবোধ আছে বলে মনে হয় না। আমি লিখতে পারলে মনে মনে ভাবি, আমার বুঝি আয়ু বৃদ্ধি হচ্ছে। অথচ স্নায়ুর ভেতরে শীতার্ত কম্পনের হিমেল অনুভূতি থাকলে কাব্য হোক কিংবা গদ্যই হোক, তার হাড়ের ভেতরে কাঁপুনি ঢুকে যায়। যা হোক, শীতে ভীত হয়ে থাকা তো আমার পক্ষে একেবারেই বেমানান। আমি মূলত ঋতুর বন্দনা করি না। তবে আমার দেহের চামড়ায় ঋতুর স্পর্শ আমি গ্রহণ করেই বাঁচতে চাই। আমি মূলত গ্রীষ্মের গরমে আরাম অনুভব করি এবং মনে করি গরমেই পরম সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচিত হয়। ফ্যানের বাতাসে ঘাড় নিচু করে পাতার পর পাতা লিখে যেতে আমার তেমন কোনো শ্রান্তি বা কান্তি বোধ হয়নি।

আমি অবশ্য এ সময়ের শিল্প সাহিত্যের ব্যাপারে তেমন অবহিত মানুষ নই। অর্থাৎ কে কী লিখছেন সে সম্বন্ধে আমার আগ্রহ থাকলেও উপভোগ করার পাঠ করার এখন আর কোনো সম্ভাবনা বা সামর্থ্য আমার নেই। তবু আমি অকপটে বলতে চাই যে, আগ্রহ আমার থাকলেও আলস্য আমাকে ঘিরে ধরেছে। যদি একে কেউ অবসাদ বলেন তাহলে আমি তা একেবারে অস্বীকার করতে চাই না। ‘আমি কান্ত প্রাণ এক চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’।

যাই হোক, নিজেকে জাগিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। এর মাঝেই কখনো বা পুষ্পের মতো পাপড়ি মেলে দিয়ে ফোটে গোলাপ। বহু দিন হয়ে গেছে আমি কাউকে একটি গোলাপ ফুল কাঁটা বেছে উপহার দিতে পারিনি। অথচ আমি কতই না ভালোবাসতাম কারো হাতে একটি গোলাপ ফুল তুলে দিতে।

আমাদের সমকালীন সাহিত্যশিল্প কিংবা মানুষের সৌন্দর্য চেতনা কিরূপ ধারণ করেছে তা আজকাল আর সঠিকভাবে সন্ধান করতে পারি না। অথচ কতই না আগ্রহ আমার মধ্যে এখনো তাপ সঞ্চার করে জীবনীশক্তি জাগ্রত রেখেছে। প্রতি মুহূর্তে ভাবি কাউকে জিজ্ঞেস করি কী লিখছ ভাই তুমি? কিন্তু বহু মানুষের আনাগোনার মধ্যেও শিল্প চেতনায় উদ্বুদ্ধ কাউকে নিকটবর্তী পাই না। যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে বয়ে যাচ্ছে তারুণ্যের স্রোত। যার মর্ম উপলব্ধি করলেও তার ধর্ম সম্বন্ধে আমি অজ্ঞাত। তবে আমি জানি না বলেই তো আর শিল্প চেতনা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। মানুষের সৌন্দর্যবোধ সর্বদাই অগ্রসরমান। সে প্রিয়তমা নারীর গালের ওপর একটি তিল চিহ্নের মতো। যাতে সুন্দরীরা আরো সুন্দর হয়। যুবতীরা হয় স্পর্শকাতর এবং প্রকৃতি হয় পরম আত্মীয়ের মতো। সব কিছুই আপন। সব কিছুই সুন্দর এবং হাত বাড়ালেই ধরতে পারি তোমার শাড়ি হে সুন্দরীÑ এটা মনের ভেতর গুঞ্জরণ তুলে আমার চেতনাকে চরিতার্থ করে। তৃপ্তি ও দীপ্তিতে আমার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমি আকাশের তারা গুনতে পারি এবং শূন্যে ভাসিয়ে দিতে পারি আমার কল্পনার কারুকার্যময় পবনের নাও। যে কিনা সোনার বৈঠার ঘায়ে আমাকে নিয়ে যাবে অন্য কোনো কল্পনার রাজ্যে। আর আমি এই বৃদ্ধ বয়সেও যৌবনের শিহরণ অনুভব করে তাকিয়ে থাকব কারো মুখের দিকে।

আল মাহমুদ
আল মাহমুদ
আল মাহমুদ বাংলা ভাষার প্রধানতম আধুনিক কবিদের একজন। ১৯৩০-এর কবিদের হাতে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার ঊণ্মেষ, তার সাফল্যের ঝাণ্ডা আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অদ্যাবধি তুলনারহিত কৃতিত্বের সঙ্গে বহন ক'রে চলেছেন। রবীন্দ্র-বিরোধী তিরিশের কবিরা বাংলা কবিতার মাস্তুল পশ্চিমের দিকে ঘুরিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন;– আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতাকে বাংলার ঐতিহ্যে প্রোথিত করেছেন মৌলিক কাব্যভাষার সহযোগে– তাঁর সহযাত্রী শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের তুলনায় এইখানে তিনি ব্যতিক্রমী ও প্রাগ্রসর। নাগরিক চেতনায় আল মাহমুদ মাটিজ অনুভূতিতে গ্রামীণ শব্দপুঞ্জ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্প সংশ্লেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত রেখায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কথাসাহিত্যে তাঁর মৌলিক শৈলীর স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ অভ্যূদয়ের পর তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯০ দশক থেকে ব্যক্তি জীবনে ইসলামের অনুবর্তী হয়ে তিনি সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ==জন্ম== আল মাহমুদ([[১৯৩৬]]-)খ্রিস্টাব্দে [[ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা]]র মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ।তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। == প্রকাশিত গ্রন্থ == {{div col|3}} * লোক লোকান্তর ([[১৯৬৩]]) * কালের কলস (১৯৬৬) * সোনালী কাবিন ([[১৯৬৬]]) * মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ([[১৯৭৬]]) * আরব্য রজনীর রাজহাঁস * বখতিয়ারের ঘোড়া * Al Mahmud In English * দিনযাপন * দ্বিতীয় ভাংগন * একটি পাখি লেজ ঝোলা * আল মাহমুদরে গল্প * গল্পসমগ্র * প্রেমের গল্প * যেভাবে গড়ে উঠি * কিশোর সমগ্র * কবির আত্নবিশ্বাস * কবিতাসমগ্র * কবিতাসমগ্র-২ * পানকৌড়ির রক্ত * সৌরভের কাছে পরাজিত * গন্ধ বণিক * ময়ূরীর মুখ * না কোন শূণ্যতা মানি না * নদীর ভেতরের নদী * পাখির কাছে , ফুলের কাছে * প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা * প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা * প্রেমের কবিতা সমগ্র * উপমহাদেশ * বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ * উপন্যাস সমগ্র-১ * উপন্যাস সমগ্র-২ * উপন্যাস সমগ্র-৩ * ত্রিশেরা ==কর্মজীবন== সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি [[ঢাকা]] আসেন [[১৯৫৪]] সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। [[১৯৫৫]] সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর([[১৯৬৩]]) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস([[১৯৬৬]]),সোনালি কাবিন([[১৯৬৬]]), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো([[১৯৬৯]]) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। [[১৯৭১]] এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। [[১৯৭৫]] সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। [[১৯৯৩]] সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকাত সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী [[আওয়ামী লীগ]] সরকারের সময় একবার জেল খাটেন । পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।