নন্দিনী পাখিরা

সব সময় মানুষের ঘের; সব সময় শুধুই মানুষ; সর্বদা মানুষ-মানুষ, ভালো লাগে? সবই মানুষের, আর কারও নয়? এ কথা ভেবে আপন মনে, কেমন আনমনা হেসে ওঠে নন্দিনী পাখিরা।

সব সময় মানুষ; কাছেপিঠে সর্বক্ষণ মানুষের গরম নিশ্বাস, কথার গলগলানি, চোটপাট, গায়ের গন্ধ; হাসি, ছ্যাবলামি, গজর-গজর কপটতা, নানান খেল, দাঁতের ঘষায় হিংসার বিদ্যুৎ, অবৈধ ব্যাপারে সিনেমা, সেক্স-সিটি ও কমেডি; মন্ত্রী ফাটা ও নাটা কেষ্টর হেলে ফেলে কেউটে ধরার গল্প ও রগড়- ভালো লাগে?
সে ফ ভাল্লাগে না।
তা হলে তোমার কী ভালো লাগে নন্দিনী?
আগে লাগত সাপ। এখন লাগে পাখি।
সে কী।
হ্যাঁ মহতব পিসা।
মহতব চিত্রকরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল নন্দিনী পাখিরার।
ঋষি গোছের দেখতে মহতব। কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ। আগে সাপ খেলাতেন, এখন পট আঁকেন। বিষ নামানোর ওঝাগিরিও করেছেন এক কালে। এঁর কাছেই সাপ-ধরার বিদ্যা-কৌশল আয়ত্ত করেছিল নন্দিনী তার ছেলেবেলায়। নিতান্ত কিশোরী-বালিকা তখন সে।
তখন সে থাকত রসুলপুর। দিদিমায়ের আঁচলের তলায়। এবং সেখানেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত থেকেছে। কারণ তা নইলে উপায় ছিল না। নন্দিনীর মা মারা যায় তার বছর ছয় বয়েসে। ওই রসুলপুরেই চিত্রকররা থাকত। দুই-চার ঘর চিত্রকর। মহতব ছিলেন চিত্রকরদের মাথা।
নন্দিনীর ডাকনাম ঝুমঝুমি, সংক্ষেপে ঝুম। দিদিমায়ের রাখা।
মাকে অল্প, নিতান্ত অল্প মনে পড়ে। দিদিমাই তার মা। বাস্তবিকই দিদিমাকেই মা বলে ডেকেছে ঝুম। তার হাত ধরেই সোনাডিহি যেত ঝুমঝুমি। চার-পাঁচ ঘর চিত্রকর পরিবারের ডিহায়। সাপ দেখতে যেত।
দিদিমায়ের নাম ছিল দুলি নস্কর অর্থাৎ দোলন নস্কর।
অদ্ভুত মেয়ে এই ঝুমঝুমি; দিদিমাকে মা ডাকলেও পাকা গিন্নির মতো মাঝে মিশেলে দুলি-দুলি বলে ডেকে উঠত। তার পর দিদিমাকে তুইতুকারি করত।
দিদি আয়, মা আয়।
এ রকম বলত।
আর এই রকম ডাকাডাকির বেখাপ্পা সহবত।
দিদিমায়ের মন্দ লাগত না।
তুই আমার কে? মা-মেয়ে, নাকি নাতিন। কে তুই র্যা?
দিদিমায়ের এ কথার জবাবে সেই ক্ষুদ্র বালিকা সুুর নকল করে জবাব দিত, মুই তোর ঝুমঝুমি র্যা!
দিদিমা তাই শুনে খিলখিল করে হেসে উঠত।
সেই পুঁচকে বালিকার সাপের উপর রোখ আর আহ্লাদ ছিল সাংঘাতিক; তাই-ই নয়, মনুষ্যেতর প্রাণী দেখলেই ওই ক্ষুদ্র বালিকার হৃদয় সন্দেহে উদ্বেল হয়ে উঠত।
ডানপিটে, ডাকাবুকো মেয়ে এই ঝুমঝুমি।
যার শুভনাম নন্দিনী পাখিরা। বর্তমানে ২৭ এবং কলেজে পড়ায়; সে ইংরেজি শিক্ষিকা। সে বালিয়া বলে একটি জায়গায় থাকে। ফ্ল্যাটে। একা। তার দিদিমাও আজ আর বেঁচে নেই।
তার বাবা ছিলেন পুলিশের এসআই। পুলিশি ডিউটির বাইরে তার ছিল অদ্ভুত দুটি শখ। পাখি পোষা আর কবিতা লেখা। এছাড়াও অত্যন্ত দরাজ গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন এবং গাইতেন ভূপেন হাজারিকার গান। গলার স্বর কতকটা হাজারিকার মতোই ছিল। তাকে সহকর্মী বন্ধুরা হাজারিকা পাখিরা ডাকত। কোন পাখিরা? হাজারিকা পাখিরা। বাবার আইডেনটিটি এই রকমই ছিল।
অত্যন্ত সাহসী ছিলেন বাবা। অত্যন্ত সৎ। কখনও ঘুষ খাননি। কিন্তু চাকরিটা তো ভালো ছিল না।
বছর দুই আগেও বাবা এই পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন।
বাবা নেই। দিদিমাও নেই।
বালিয়ায় সে একা। ঝুমের বিয়ে হয়েছিল, সে বিয়ে ভেঙেও যায়।
কেন? কেন ভাঙল বিয়ে? কারণ, অদ্ভুত।
অদ্ভুত?
গলায় বিস্ময়ের ও জিজ্ঞাসার সুর নৈঋতের।
নিশ্চয় অদ্ভুত! বলল নন্দিনী।
কিছুক্ষণ অবাক চোখে নন্দিনীর মুখের দিকে চেয়েই রইল নৈঋত।
তার পর বলল, কী সেই অদ্ভুত, শুনতে কি পাই?
এ বার নন্দিনী গাছপালার ফাঁক দিয়ে নীলিমার নীলে তাকাল একটা আনমনা ভঙ্গিমায়। তার পর কান পেতে রইল। এখানে দক্ষিণের একটি সুন্দর বাগানে এসেছে ওরা। কেন এসেছে?
নন্দিনীর একটি খাতা আছে। নাম, সোনালী বিদ্যুৎ ভর্তি দিনলিপি। চমৎকার নাম; বেশ কবিত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। এই একটা ধাত বটে। কতক তো বাবারই মতো স্বভাব পেয়েছে সে। কবিতা না লিখলেও কবি-কবি মন যে তার আছে, কেউ বুঝুক না বুঝুক, ঝুম নিজে তার সেই মনকে ঠিকই বুঝে পায়।
কী হল?
কীসে?
কী সেই অদ্ভুত, বললে না তো!
এই পরিবেশে ও সব কথা থাক।
তুমি তা হলে বলতে চাও না। থাক। জোর করব না। তবে বন্ধু ভেবে সব কথা আমাকে তুমি বলতে পারতে।
নীলিমার নীল থেকে চোখ সরিয়ে এনে কৌটোবাদামের অতি দীর্ঘ গাছটার দিকে, গাছটার মাথার দিকে চোখ তুলল ঝুম।
তারপর বলল, এই গাছটার নাম কৌটোবাদাম।
একটা হরবোলা পাখি এখানে খুব টই দেয়। কায়দা খুব। একজোড়া ঢ্যামনাও আছে বেশ। ভারি মক্করবাজ। যেমন পাখি, তেমনি সাপ। আমি মহতব পিসাকে এই দুই প্রাণীর মশকরা ব্যাপারে বললাম এবং দেখলাম। দেখো পিসা, কাণ্ড! কী দেখলেন পিসা? দেখলেন, হরবোলা নানান পাখির গলা নকল করে ডাকছে আর সাপ জোড়া মোটেও আমাদের ভয় না করে পায়ের কাছে এসে মরার ভান করে পড়ে রয়েছে।
অ।
পিসার বয়েস ১০১ বচ্ছর। দেখে মনে হবে ৬৫-৭০; ভারি আশ্চর্যের। পিসা খুশি হয়ে বললেন, সাপ সুন্দর, পাখিও সুন্দর ঝুম। তুমি আমার গৌরব, মা! কই, তুমি তো সাপকে ভুলে যাওনি খুকি। শাল গাছের মাথাটা দেখুন। আর দেখুন কৌটোবাদামের গাছের মাথা- দিব্যি সমান-সমান। দেখুন নৈঋত, দেখুন না!
আশ্চর্য সুশ্রী দেখতে এই ঝুম। এই নির্জনতায়, এই অরণ্যে তাকে স্পর্শ করতে সাধ জাগে নৈঋতের। কিন্তু তা করলে যদি এই মেয়ে বিগড়ে যায়! বা অপমানিত বোধ করে!
অথচ একটা তীব্র লালসা জাগছে। মাথাটা বোধহয় ঠিক-ঠিক কাজ করছে না। এই দোগনো বাগানের এমন পাখি ডাকা আদিম পরিবেশে আসা কি ঠিক হয়েছে তার?
কেন এল? না এলেই তো হত!
হ্যাঁ, সমান-সমান। তো?
দুটোর মাথা ঝোপ ঝোপ দেখতে।
বটেই তো।
হরবোলাটা এ গাছ থেকে ও গাছে যাচ্ছে আর ডাকছে! কী ডাকছে? কী বলব, বিচিত্র ব্যাপার।
একটু একটু করে চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছিল নৈঋতের। সে দিকে খেয়ালই করছিল না ঝুম। সে হরবোলা ব্যাপারে বৃত্তান্ত তুলে ধরতে চাইছিল তার সহকর্মী-সহশিক্ষক নৈঋতের কাছে।
সব পাখির নকল করাটা বিষম অকাট্য একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড, বুঝলেন নৈঋত? ধরুন… আচ্ছা ঠিক আছে, আগে আপনি দেখে নিন, আমার দিকে নয়, গাছ দুটোর মাথার দিকে।
হ্যাঁ-হ্যাঁ, নিশ্চয়।
এই বলে ঝুমের মুখের উপরে মেলে রাখা লোভমাখা দৃষ্টি চট করে টেনে নিয়ে কৌটোবাদামের উচ্চতায় তোলে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় নৈঋত।
আচ্ছা, আমরা কী দেখতে চাইছি বলুন তো!
মানে, ইষ্টিকুটুম, নাকি হরবোলা? নাকি অন্য কিছু।
মানে, তুমি যা দেখাতে চাইবে।
সমস্যা আছে।
সমস্যা- কী সমস্যা ঝুম?
মিসটিভাস, মক্করবাজ! আমার তো মনে হয়েছে, ওর নিজের গলা বলে কিছু নেই। সবটা অন্যের নকল। ওর ওপর আমার বড্ড রাগ। একাই যেন একশো পাখির মহড়া নেয়। এর গলা, তার গলা ক্রমাগত নকল করবে, থামবে না। সাইজটা বলতে গেলে বুলবুলির মতো।
তাই?
হ্যাঁ স্যার। ঘুণাক্ষরেও বুঝবেন না, কার পাল্লায় পড়েছেন।
এই বলে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল ঝুম। হাসলে নন্দিনী পাখিরা ওরফে ঝুমকে বড়ো বেশি সুন্দর দেখায়। ও ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা, সে একহারা নয়, দোহারাও নয়, তার মাঝামাঝি কিছু। পুরাতন উপমা দিয়ে বলা যায়, ওর পানপাতা মুখ। চোখ দুটো বড়ো বড়ো। উজ্জ্বল শ্যামাঙ্গী সে।
চোখ দুুটিতে কোথাও ভেসে যাওয়ার মতো ঔদাস্য জড়ানো। আবার তা আশ্রয়- স্নিগ্ধ। এবং চোখেরই কোণে হয়তো ওই ঔদাস্যের সঙ্গে উজ্জ্বলতা-মাখা এক ধরনের বিষণতা লুকনো। দুঃখী দুঃখী চেহারা মোটে নয়। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের কোথাও একটা চাপা কষ্ট গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে ভাঙছে ওই ঔদাস্যের ভিতর। তবু ঠোঁটে প্রসন্নতা স্ফুট হয়ে রয়েছে।
ওই চোখ দুটির প্রেমে পড়েছে নৈঋত। শুধু চোখ দুটোরই নয়। বুক দুটোর এবং নিতম্বের। ওর প্রশস্ত কাঁধের। লম্বা বাহু দুটির। সরু কোমরের। শরীরের অদেখা প্রতিটি অংশের প্রতি কামনায় অস্থির হয়েছে এবং দেখা অংশের প্রতিও আসক্ত হয়েছে নৈঋত।
নৈঋত নিজেও একজন বিবাহ-বিচ্ছিন্ন মানুষ। তার ইচ্ছে, সে ঝুমের সঙ্গে লিভ ইন করে।
তার মনে মনে ইচ্ছে। ভীষণ ইচ্ছে। কিন্তু বলতে তো পারছে না ঝুমকে।
নিন, ধরুন; চোখে লাগান।
এই বলে দুটি ছোট দুরবিনের একটি নৈঋতের দিকে এগিয়ে দেয়। হাত বাড়িয়ে দুরবিনটা নেয় নৈঋত।
কৌটোবাদাম এবং সেগুন গাছটার নিচে তিনটে ভাড়–ল গাছ আছে। এবং মজার ব্যাপার, গাছ তিনটের একটি একেবারে বড়ো ডোবাটার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। তার পর রয়েছে ঘোড়া নিম, অশোক, সজনে, গাব আর একটি শ্বেত চন্দনের গাছ। শ্বেত চন্দন অবশ্য রয়েছে সবার থেকে তফাতে, ডোবার অন্য পাড়ে, ওখানে রয়েছে কলাগাছের ঝাড়। লিচু, কাঁঠাল, আম। ছাড়া ছাড়া হয়ে নানান গাছ। এখানে সবুজ খুব বেশি। এই যে সবুজ…।
আচ্ছা ঝুম, শ্বেত চন্দনের গাছটা দেখা যায় না?
জানতাম।
কী?
চন্দনের গাছটাই আপনি দেখতে চাইবেন, কিন্তু সাদা চন্দন আপনাকে আমি দেখাব না।
কেন?
না।
কেন নয়?
এবার চুপ করে রইল ঝুম।
বছর দেড়েক হল কলেজ সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা দিয়ে কলেজের চাকরিটা হয়েছে নন্দিনীর। বাবার মৃত্যুর ছমাস বাদে। বাবা জেনে যেতে পারেননি, মেয়ের এই সুখবর। মেয়ে দাঁড়াল না ঝরে গেল!
বলো।
কী বলব স্যার?
স্যার!
ও সরি।
এই বলে আবার চুপ করে রইল নন্দিনী পাখিরা। ঘটনা এই যে, নৈঋত শাহু তাকে তুমি করে বলবার জন্য মাঝে মাঝেই ঝুমকে পীড়িত করে। তাতে করে ঝুম চেষ্টাও করে ব্যাপারটা, কিন্তু সে তুমি সম্বোধনটা ঠিকমতো চালাতে পারে না। পিছলে গিয়ে আপনি করে ফেলে। দোগনো বাগানটায় এসে ইস্তক তথাকথিত স্যার ওরফে সহশিক্ষক নৈঋতকে তুমি করে বলেনি, নাম ধরে ডেকেছে, আপনি সম্বোধনে। নাম ধরে ডেকে আপনি করে বলা, একটুও ভালো লাগে না নৈঋতের।
ঝুম ২৭। নৈঋত ৩৭।
চোখে লাগাও।
বলে উঠল ঝুম।
বিশেষ খুশি হল নৈঋত।
দুরবিন চোখে লাগাতে লাগাতে বলল, আমি কিন্তু না দেখে যাব না ঝুম।
বলে চোখ দুটো ছুঁচালো করে মাথাটা স্বল্প নাড়িয়ে এমন একটা ভঙ্গি করল নৈঋত যে, এই ধরনের গোঁ ঝুমের মোটেও ভালো লাগল না। সে মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করল না।
চুপ করে রইল।
দুরবিন চোখে লাগিয়ে একটা চমৎকার শিস দিয়ে উঠল নৈঋত। দেখা গেল শিসটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে লীলায়িত হচ্ছে। বাবা হলে, শিস দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত, ব্যাপারখানা নিতে পারতেন না। যা হোক। সুরটা নিতান্ত চেনা। কিন্তু পেটে আসছে, মুখে আসছে না ঝুমের।
এত চেনা সুর মনে না এলে নিজেরই উপর কেমন রাগ হয়। বাবা ছিলেন গানেরই মানুষ। রূপপুর থানার তার সহকর্মীরা বাবাকে বলত হাজারিকা পাখিরা। বাবা ভূপেন হাজারিকার গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন।
মানুষ মানুষের জন্য গাইতেন।
মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে গাইতেন। আর যা বিশেষ বিস্ময়ের, তা হল, বাবা তার গাওয়া গানের কথাগুলোকে বিশ্বাস করতেন। তাছাড়া বাবা কবিতা আবৃত্তি করতেন। শম্ভু মিত্রের গলা নকল করে জীবনানন্দ আবৃত্তি করতেন। মানুষটাই ছিলেন অন্যরকম। একটা কেমন আবেগচালিত মানুষ। আÍপরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন, আই অ্যাম আ পোলিশ-পোয়েট; আমি পুলিশ কবি।
ভারি অদ্ভুত মানুষ।
রূপসী বাংলা ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয়। যেন তা গীতা-পরণকথা। বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছিÑ বাবা গাইতেন এবং আবৃত্তি করতেন।
এটাই তবে মস্ত সমস্যা ঝুমের। বাবা। সে বাবায় আচ্ছন্ন। তার মনে পড়ছে না, বাবা কি এই গানটা গাইতেন; যা এখন শিস হয়ে এই অরণ্য বা বাগানটা চকিত করছে।
অর্ধস্ফুট গলায় ঝুম বলে ওঠে কী যেন…।
নৈঋত শিস থামিয়ে দেয়।
সে শিস দিতে দিতে চোখের উপর ধরছিল দুরবিনটা। দেখছিস কৌটোবাদামের চূড়া। তার পর দুরবিন চোখের উপর থেকে সরিয়ে শূন্যে ধরে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখছিল পাশে দাঁড়ানো নারীর মুখ। ঝুমও তার চোখের উপর থেকে দুরবিন সরিয়ে নৈঋতের ছুঁচালো ঠোঁটের দিকে দেখছিল এবং ভাবছিল শিসটা খারাপ না, কিন্তু গাইতে কি পারে? গায়নি তো কখনও। গাইলে কেমন হয়, সেটাই তো ব্যাপার আদতে।
কিন্তু এখানে শিস চলে, গান তো চলে না। গাইলে পাখির দল কী করবে বলা যায় না। অর্থাৎ উড়ে পালাবে। শিস শুনলে পাখি অবশ্য কান পাতে।
না, শিসটা যেন বা ধীরে ধীরে আরও রবীন্দ্রগন্ধে উতলা হয়ে উঠছে। বেশ পারে তো ভূগোলের এক কলেজীয় স্যার। বেশ একটা তাজা ব্যাপারও আছে। খারাপ তো লাগছে না। কিন্তু বাবা এ জিনিস নির্ঘাত পছন্দ করতেন না।
সেই শিস থামিয়ে দিয়েছে নৈঋত। থামিয়ে দিয়ে মুখটা তার, ডাইনে ঈষৎ শরীরসুদ্দো হেলিয়ে, ঝুমের কানের কাছে ঠেলে দিয়ে আবেগমাখা গাঢ় স্বরে বলল, আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ।
বলে আবার শিস দিতে থাকল নৈঋত।
আশ্চর্য! এত চেনা গানটা কিছুতেই মনে এল না।
এমন কেন হল। এমন তো হয় না।
কিন্তু স্যার।
হ্যাঁ বলো।
শিস থামিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করল নৈঋত। যেন একটা সিনেমা চলেছে। যা মুখে বলা যায় না, তা গান দিয়ে বলা হত আগের দিনের সিনেমায়। এখনকার দিনের আইটেম সং নয় সে সব, ঝান্ডু বাম বা ফেভিকল সং নয়। তবে ব্যাপারটা শিস দিয়ে সারা হচ্ছে, যেন এক হরবোলা পাখি রগড় করছে।
পাখিটা কিন্তু স্যার, ঘাসরঙা। বুলবুলি সাইজ। যা হোক।
যা হোক?
বাবা হৃদয় নিয়ে অন্য একটা গাওনা করতেন।
যথা।
বলব?
হ্যাঁ, বলো।
ফের চুপ করে যায় নন্দিনী। সে ভাবতে থাকে সেই হৃদয় যে কী হৃদয় শিস দিয়ে রবীন্দ্রগান বাতাসে খেলানো এই মানুষটা, যে কি না পাখি দেখতে দোগনো বাগানে এসেছে, সে কি সত্যিই বুঝবে। এই স্যার কি সত্যিই পাখি দেখে আনন্দ পায়?
বাংলা ভাষায় এই কবিতা লেখা হল কী করে। কেন একজন বাংলার কবি এই সব লিখলেন?
তিনি কি আমার বাবার মতন পাগল ছিলেন? নাকি আমার বাবাই তাঁর মতো পাগল ছিলেন?
তাঁর নাম ছিল জীবনানন্দ=জীবন+আনন্দ অথচ তিনি কেমন যেন ছিলেন। গেরস্ত বাঙালির মতো সংসার-সুখ, বিষয়-সুখ, ভোগের সুখ কি পেয়েছিলেন? ট্রাম চাপা পড়ে বাংলার এই মহাকবি মারা যান। কী আশ্চর্য! বাঙালির ব্যাপারই একেবারে অন্যরকম। মহাকবি ট্রাম চাপা পড়ে মারা যাচ্ছেন!
আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল…
জীবনানন্দের ছিল হৃদয়ের অন্য এক ব্যাকুলতা।
মণিমাধব পাখিরার ছিল তেমনই এক ব্যাকুলতা। আমার বাবার। মণিমাধব এসআই। ভাবছিল ঝুম।
বলো কেমনতরো হৃদয়?
হ্যাঁ সার! ভাবি, কেমনতরো! ভেবে পাইনে কেমনতরো!
আবার চুপ করে ঝুম। তাকায় রৌদ্রের দিকে।
একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।
বাতাসে পুজো পুজো গন্ধ। আকাশে মেঘের স্বর্ণচূড় রথ; গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে। কৌটোবাদামের মাথাতেও আশ্চর্য আকাশ।
ঝুম অত্যন্ত নিচু সুরে গেয়ে ওঠে, আবৃত্তির সুরে,
রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের; কোন গল্প, কী কাহিনী, কী স্বপ্ন যে বাঁধিয়াছে ঘর আমার হৃদয়ে, আহা, কেহ তাহা জানে নাকো কেবল প্রান্তর জানে তাহা, আর ওই প্রান্তরের শঙ্খচিল; তাহাদের কাছে যেন এ-জনমে নয়- যেন ঢের যুগ ধরে কথা শিখিয়াছে এ-হৃদয় স্বপ্নে যে বেদনা আছে; শুষ্ক পাতা- শালিখের স্বর, ভাঙা মঠ- নক্সাপেড়ে শাড়িখানা মেয়েটির রৌদ্রের ভিতর হলুদ পাতার মতো সরে যায়, জলসিঁড়ির পাশে ঘাসে…
বটে!
হ্যাঁ স্যার। কোন গল্প, কী কাহিনী, কী স্বপ্ন যে বাঁধিয়াছে ঘর আমার হৃদয়ে, আহা, কেহ তাহা জানে নাকো
অ!
হ্যাঁ। কেউ তাহা জানে নাকো- কেবল প্রান্তর জানে তাহা, আর…
আর?
আর ওই প্রান্তরের শঙ্খচিল; তাহাদের কাছে যেন এ-জনমে নয়- যেন ঢের যুগ ধরে কথা শিখিয়াছে এ-হৃদয়।
অ। অদ্ভুত!
আর বাবা সবচেয়ে বেশি আবৃত্তি করত, বিখ্যাত সেই জীবনানন্দীয় সনেট;
আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
আসলে স্যার, জীবনানন্দের কবিতাকে বাবা আশ্চর্য এক উপলব্ধি সহকারে বিশ্বাস করত।
আমিও বাবারই মতো ভাবি।
কী ভাবো?
আবার চুপ করে যায় ঝুম এবং চোখে দুরবিন নেয়, তার পর কৌটোবাদাম, অর্জুন, সেগুন, বহেড়া, হরীতকী, বট ছুঁয়ে দৃষ্টিকে নামিয়ে এবং ঘুরিয়ে আনে ভাড়–লের উপর। মনে হচ্ছে, কৌটোবাদাম থেকে নেমে এসেছে। বড্ড দুষ্টুমি করা, কত গলায় ডেকে ওঠা, আর সবুজ পাতায় মিশে থাকা, পুরো ব্যাপার চমৎকার।
দেখুন, ওই দেখুন, নেমে এল! মনে হচ্ছিল অনেকগুলো; তা নয়, আসলে মাত্র একটাই হরবোলা। কতগুলো গলায় ডাকছিল। একাই একশো।
কিন্তু তুমি বাবার মতো কী ভাবো ঝুম?
আসলে স্যার সবই হচ্ছে, মনে হওয়া নিয়ে; কী বিশ্বাস করি তাই নিয়ে। এক কথায় বিলিফ কী আর কিসে কার রুচি, কিসে আনন্দ, তাই নিয়েই কথা। আমরা পৃথিবী ছেড়ে কোথাও যাই না। মৃত্যুর পরেও না। আমি তো বাবাকে পাই এক-এক দিন এক-একটা পাখির ছদ্মবেশে। এটা মনের ব্যাপার।
বুঝলাম না ঝুম।
কিছুক্ষণ ফের চুপ করে রইল নন্দিনী। চোখে দুরবিন ধরে রেখে ভাড়–লের গাছগুলোর দিক দেখতেই থাকল। সে বুঝতে পারছিল, নৈঋত তার কাছে বিলিফের বা হৃদয় প্রত্যয়ের কথা শুনতে চাইছে, রুচি ব্যাপারে শুনতে চাইছে।
গলায় ঈষৎ ঔদাস্যমাখা সুরে ঝুম হঠাৎ বলল, সব কথা কি বোঝানো যায়, বলুন।
দেখুন। কখন এসে বসেছে ওটা।
ওটা মানে কোনটা?
কৌটোবাদামের মাথায় বসেছে। একটা শঙ্খচিল। চোখে নিন দুরবিনটা। ভালো করে দেখুন।
দুরবিন চোখে তোলে নৈঋত।
তার পর বলে ওঠে, আরে, তাই তো!
আমি এখানে এলেই, কিছুক্ষণ বাদে ও আসবেই। হয়তো বলবেন যে, ওটা ওর জায়গা। হতে পারে। ভাবি, ওই পাখিটা বাবারই ছদ্মবেশ নয়তো। এরকম ভাবতে আমার ভালো লাগে। সুখ হয়। একটা অলৌকিক আনন্দ হয়। বাবা বলত, মানুষের এই রকমই হয়। পূর্বপুরুষরা মৃত্যুর পর পাখি হয়। মন বলে, এরকম হলে ভালো হত। তাই পাখি হয়ে সন্ততির কাছে আছে। আমি তো ভাবতেই পারি না, বাবা আমাকে ছেড়ে এত দিন রয়েছে, দেখাই করছে না, এ হতে পারে না। দেখুন না কেন, কৌটোবাদাম থেকে সবুজ বুলবুলি, মানে হরবোলাটা নেমে এল ভাড়–ল গাছে, তার পর শঙ্খচিলটা এল। আর হরবোলা হোক বা অন্য কেউ, ভাড়–ল ফল ঝরিয়ে ডোবার জলে ফেললে টুবুক করে চমৎকার একটা শব্দ হয়, সেই শব্দটাও নকল করে হরবোলা। ভারি সুন্দর ব্যাপার, তাই না?
ঝুমের কথাগুলো শুনতে শুনতে একেবারে বিস্ময়মুগ্ধ হয়ে এবার ভ্যালভেলে চোখে ঝুমকে দেখতে থাকে। ভাবে মানুষ যে কত রকমের হয়। নৈঋতের সেই মুগ্ধতা আবেশিত চোখের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে চাইল এ বারে ঝুম।
তার পর বলল, জীবনানন্দের কবিতা মানেই তো পাখি। শুধু যে রূপসী বাংলা-তেই পাখি রয়েছে তাই-ই তো নয়, পাখি ছাড়া জীবনানন্দ হয় না, একেবারেই হয় না। বাবা বলতেন, তার মতো পাখি দেখা কবি সংসারে মেলে না। এক হাঁস আর বুনো হাঁস নিয়েই কত রকম কবিতা জীবনানন্দের। এই যে পাখির ডাক, এটাকে তো বুঝতে হবে।
কী রকম?
চোখ থেকে দুরবিন নামিয়ে কথাগুলো বললে ঝুম। তার পর চোখে লাগালে। তার পর তারা যে ডিহির মতো উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিল, সেখান ছেড়ে আরও খানিকটা উঁচু দিকে এগিয়ে গেল। ঝুম সামনে। নৈঋত পিছনে।
দুজনেরই এখন চোখ থেকে নামিয়ে হাতে ধরা ক্ষুদ্র দুরবিন।
ঝুম বলল, ধরুন, যদি বলি, ঘুঘুর ডাকে শান্তি আছে। শুনে আপনার মনে হবে, তাই বুঝি!
আছে বুঝি! বলে বিস্ময় প্রকাশ করে নৈঋত।
এখান থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা টুকটুকে লাল টালির ঘর দেখা যাচ্ছিল। টালির উপর বসে রয়েছে ঘুঘুর একটা দল।
ঝুম বলল, বেশির ভাগ ছিটঘুঘু। দুটো-তিনটে কণ্ঠিঘুঘুও আছে। কই, রামঘুঘু, নেই দেখছি। ছিট বা তিলে, এরাই বাংলার সাধারণ ঘুঘু। এ মাথা ঠুকে ঠুকে ডাকে। বাবা বলত, এ মাথা ঠুকে ঠুকে শান্তি কামনা করে। এ দিতে চায়, মানুষকে, শান্তির স্বাদ। জীবনানন্দ একটা ছবি দেন এ রকম :
এখানে খড়ে ভরে আছে দু-চার মাইল কামিনী ধানের ক্ষেত;
ঘুঘুর ডাকে আদিম শান্তি আরও অনেকক্ষণ;
মিছরি-গুঁড়ির মতন বৃষ্টি রোদ্দুরে উজ্জ্বল :
আকাশে চাতক : ওর একরাশি আত্মীয়স্বজন;…
আচ্ছা, নৈঋত, আমরা দোগনো বাগানে কেন এলাম?
বিস্ময়ের চাপে নৈঋত কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললে, ঘুঘুর ডাকে আদিম শান্তি; আদিম শান্তি?
আদিম শান্তিই তো প্রকৃত শান্তি, বিশুদ্ধ শান্তি।
অ। আচ্ছা।
আচ্ছা, দেখুন স্যার। চিলটা কৌটোবাদামের মাথায় রয়েছে, আমরা কতদূর থেকে দেখছি। কিন্তু জীবনানন্দ দেখেছিলেন অনেক কাছ থেকে। মাথার উপর দিয়ে গেছে পাখিটা- লিখেছেন, চিলের ডানার থেকে ঠিকরিয়ে রোদ চুমোর মতন চুপে মানুষের চোখে এসে পড়ে;Ñ দৃশ্যটা ভাবুন।
হ্যাঁ আমি দেখতে পাচ্ছি বইকি।
ডানা থেকে ঠিকরিয়ে আসছে রোদটা। ঠিকরিয়ে শব্দটায় ঠিকরোনোটা যেন দেখা যায়, তাই না?
ঠিক।
ঠিক বলার পর বিহ্বল হয়ে নৈঋত ঝুমের মুখের উপর থেকে দৃষ্টি টেনে নিয়ে কৌটোবাদামের মাথায় তোলে। অতি বিহ্বল হয়ে ওই শঙ্খচিলটাকে দেখতে থাকে।
আসলে আমরা ডানার ঠিকরোনো আলো দেখতে পাই কিনা, সেটাই কথা।
এই বলে ঝুম জীবনানন্দ থেকে ফের উদ্ধৃতি টানে; নদীর জলের পথে মাছরাঙা ডানা বাড়াতেই আলো ঠিকরায়ে গেছেÑ যারা পথে চলে যায় তাদের হৃদয়ে;…
এই বলে ঝুম আবার বললেন, দেখতে হবে ডানার আলো হৃদয় পর্যন্ত যাচ্ছে কি না, ঠিকরে পড়ছে কি না হৃদয়ে। যারা বার্ডার (ইরৎফবৎ) তারা কীভাবে দেখছে ডানা; তার ঠিকরানো আলো কি হৃদয়ে এসে পড়তে দেখতে পায়? স্যার, পায় কি?
কারা?
যারা পাখি দেখতে বার হয়েছে। বার্ডার।
বার্ডার শব্দটা আগে কখনও শোনেনি নৈঋত শাহু। তবে শব্দটা যে নতুন কয়েনেজ, সন্দেহ নেই। তাছাড়া সন্দেহ নেই, নৈঋত নিজে কোনও বার্ডার নয় কোনও কালে। সে দোখনো (বা দোগনো) এই বাগানে এসেছে, ঝুমকে যদি ফুসলাতে পারে, তাই।
সে পাখি নয়, যা সে ভালোবাসে, তা হচ্ছে, নারী। লোকে যা জানে, তা হচ্ছে, তার দাম্পত্য টেকেনি, ঠিকই যে টেকেনি, কিন্তু তা যে একাধিক বার, বস্তুত তিনবার, তা প্রায় কেউ জানে না বললেই চলে। কলকাতার উপকণ্ঠের যে কলেজে সে পড়ায়, সেখানে কেউ জানে না, তার কত বার কী হয়েছে!
ভাড়–লের ওখানে একটা মাদার গাছ আছে, আপনাকে বলতে ভুলে গেছি স্যার। মাদারের লাল ফুল দেখেছেন কখনও?
না।
পাখি বুঝতে হলে কিছুটা গাছও তো বুঝতে হয় স্যার।
আমি তোমাকে বুঝতে চাই ঝুম!
আমার পদবি স্যার পাখিরা। আমি স্যার পক্ষীবংশীয় মানুষ। বাবা বলেছিল, তুমি পক্ষীবংশীয়; নাগবংশীয় নও। তাই সাপের ব্যাপারটা ছেড়ে দাও খুকি। অবশ্য স্যার, আপনি এ জিনিস বুঝবেন না।
কেন বুঝব না ঝুম, এ তুমি কী বলছ।
আচ্ছা, বলব আপনাকে। পরে।
এখনই নয় কেন? সবই তো তুমি একটু করে কথা পাড়ছ, তার পর আর বলছ না।
কিছু কিছু পাখি এ রকমই হয়।
কী রকম?
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। এটি কবি বিনয় মজুমদারের লাইন।
অ।
হ্যাঁ নৈঋত।
এই বলে চোখে দুরবিন নেয় নন্দিনী পাখিরা। সংসারে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের জীবন অসম্ভব জটিল।
কারণ নৈঋত নিজের কথা কাউকে বলে না।
আচ্ছা ঝুম।
হ্যাঁ, বলুন।
মাদার গাছে, কোন পাখি আসে বা বসে?
ইষ্টিকুটুম বা খোকা হোক। আসলে ইনিই হলেন বেনেবউ। একেই বলে, হলদে পাখি। বাংলায় এর দুটো প্রজাতি আছে। ইংরেজিতে বললে সুবিধা হবে। ওরিওল। একটা কালো মাথা ওরিওল, এটাই বেনেবউ নাম। আর একটা হল গোল্ডেন ওরিওল। তার বাংলা নাম, সোনাবউ। কিন্তু জগদানন্দ রায় এই ভাবে দুই প্রজাতিতে এদের ভাগ করেননি। এরই নাম কৃষ্ণ গোকুল।
আচ্ছা!
আপনি শোনেননি কখনও?
খোকা হোক ডাকটা শোনা।
এটাই বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। এই হলদে পাখি। এর একটা চেনা ডাক আছে স্যার। চিয়াক চিয়াক।
ওই ডাক তো এতক্ষণ শুনছিলাম।
ভুল শুনেছেন। ওই ডাক দিচ্ছিল হরবোলা।
আর দেখুন, হরবোলা যদি খোকা হোক খোকা হোক ডাকে, তা হলে, পুরো ব্যাপারটা ফলস। মানে ফাঁকি। আমার বেলায় যেমন হয়েছিল।
মানে?
মানে বলতে, এটি আমার দিদিমা দুলি নস্করের বানানো গল্প, যা আমাকে শুনিয়ে উনি মজা পেতেন। কারণ আমি যখন নাকি মায়ের পেটে এলাম, তখন রসুলপুরে মা তার মায়ের কাছে গেলে বাড়ির কাছের মাদার গাছে লুকিয়ে সেই একটা পাখি খোকা হোক খোকা হোক করত। এ ক্ষেত্রে লোক-বিশ্বাস, বিশেষ করে মেয়েদের বিশ্বাস এই যে, গর্ভবতীর তা হলে খোকাই হবে। কিন্তু হল না। মায়ের খোকা হল না। হলাম তো আমি। পাখির কথা খাটল না। এই না?
বুঝলাম, তার মানে…।
বোঝাই তো যাচ্ছে এই কথা! বেনেবউ খালি বলে গেল, ছেলে হোক; পাখির কথা মিথ্যে হয় কী করে! আমি এই নন্দিনী, কেউ তো আমায় সাধেনি; মেয়ে হোক-মেয়ে হোক, বলার মতো পাখিই তো নেই বাংলায়। এই পৃথিবীতে আছে নাকি কোথাও? সুতরাং বিনে ডাকে আমি এলাম চলে। বাবা কিন্তু খুশি। মেয়ে হয়েছে বলে খুব খুশি। একটি মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে গিয়েই তো বাবা…
এই পর্যন্ত বলেই গলাটা আকস্মিক কান্নায় ধরে এল নন্দিনীর, কথা আটকে গেল।
দ্রুত নৈঋত বলে উঠল, জানি। পুরো ঘটনা খবরের কাগজে ছেপে বার হয়েছিল।
ওরা স্বামী-স্ত্রী একটি মোটরবাইকে সিনেমা দেখে ফিরছিল; চারজনের একটা দল ওদের ফলো করে। ওদের ছিল দুখানা বাইক। এক বাইকে দুজন। আর এক বাইকে দুজন। সিনেমা হলের ওখান থেকেই টার্গেট করে ওরা। কিন্তু না, আমি আর বলব না নৈঋত। থাক।
নৈঋত দেখল, তার বাবার এই ঘটনাটা বলে শোনাতে অত্যন্ত কষ্ট এবং সুখ পায় নন্দিনী। এই ঘটনার বিবরণ আগেও দুবার শুনেছে শ্রীশাহু। এটি আরও একবার শোনা চাই।
কারও মন পেতে হলে শুনতে হবে।
প্রোমোশন পেয়ে বাবা তখন রূপপুর থানার মেজোবাবু। দোগনো ডাকাত ধরার কাজে অত্যন্ত সাহসী পুলিশ। একদিনে একা আটজন ডাকাতকে গুলি করে খতম করেছিল। এই ঘটনার আগে এই ডাকাতরাই পরস্পর গা-লাগা ব্যাংক ও ডাকঘরে হামলা করে ৫০ লাখ টাকা লুট করেছিল এবং ডাকঘর ও ব্যাংকের ছজন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছিল।
তারই উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল বাবা। বাইক ছিল বাবার নেশা। থানার সহকর্মীরা যখন ভ্যানে বা জিপে কোথাও যেত বা ফিরত, বাবা তখন বাইকে- ধাঁ করে এগিয়ে গিয়ে কোথাও গাছের তলায় দাঁড়িয়ে গোটা টিমের জন্য অপেক্ষা করত বা ফেরার পথে সবার আগে থানায় পৌঁছত।
এই বাবা লোচ্চা দুষ্কৃতির হাতে শেষ হয়েছে।
থাক বলাটা তোমার দেখছি ম্যানারিজম। পাখি দেখতে এসেছি ঠিক কথা। আমি সৌখিন। কিন্তু তুমি তো তা নও। পাখি সম্বন্ধে তোমার ফিলিং একেবারে অন্যরকম। কিন্তু কথা হচ্ছে, শুধু পাখি দেখা তো নয়, সেটা তো আছেই, তাছাড়া আমরা অন্য কথাও তো বলব। দুজন দুজনকেই জানব-বুঝব। নয় কি?
জানা-বোঝার জন্য দোগনো বনে বা বাগানে কেন? কলেজেই তো আমাদের দেখা হয়।
একান্ত করে তো হয় না। তুমি তো তোমার বাড়িতেও ডাকো না ঝুম।
দেখুন স্যার। আমরা এখানে এসেছি বনের সাধারণ যে পাখি, তাদের কাছে। এরা আমাদের সনাতন প্রতিবেশী। পাখির নাম ইষ্টিকুটুম। তার মানে, সে আমাদের কুটুম। মানে আÍীয়। পরম আÍীয়। সে বেনেবউ। অর্থাৎ বউ। এক ধরনের পাখি আছে, নাম তার, গয়লা বুড়ি। ভাবতে পারেন?
সরি! আমার ভুল হয়েছে।
হ্যাঁ স্যার। পাখি আর মানুষের সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের পুরনো। বা লক্ষ লক্ষ বছরের। তাই জীবনানন্দ বারবার পাখিজš§ চেয়েছেন। যারা বার্ডার তাদের ৯৯ শতাংশ বা ৯৯.০৯ শতাংশ এই সব জানে না। তাদের কারও পাখি হতে ইচ্ছে হয় বলে শুনিনি। কাজী নজরুল ইসলামের শিশুদের নিয়ে কবিতায় সেই ইচ্ছে প্রবল। আমি হব সকালবেলার পাখি। সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি ডাকি। শিশুর যে পাখি হতে ইচ্ছে করে, সে আমরা জানি। কিন্তু জীবনানন্দের ইচ্ছে করেছে পাখি হয়ে জš§ নিয়ে বাংলায় ফিরে আসতে। যা হোক। বাবা ছাড়াও আর একজনের কথা এইবেলা বলতে হয় নৈঋত।
অ। তাই? বলো, তা হলে।
নাম তার অভিনব হাসান। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত যাদবপুরে। মন দিয়ে করত একটি কবিতা-পত্রিকা। নাম জীবনানন্দ। বাবার কাছে আসত। বাবার কবিতা ছাপত তার পত্রিকায়। বলত, কবি-জীবন একটি গুপ্ত সমিতির সদস্যদের মতো। আমরা সংখ্যায় এত কম। সমাজ আমাদের পাত্তা দেয় না। খুব গোপন প্রভাব পড়ে সমাজের উপর, অল্প লোকের উপর। যেমন বার্ডার যারা তাদের উপর জীবননান্দের কোনও প্রভাব কি আছে! নেই। নেই কেন? যা হোক।
হ্যাঁ, বলো।
হাসান ছিল একেবারে অন্য রকম মানুষ। সুন্দর আবৃত্তি করতে পারত। জীবনানন্দের অসংখ্য কবিতা ছিল মুখস্থ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ফাংশনে একবার ও শোনান জীবনানন্দের এমন একটি কবিতা যার খোঁজ প্রায় কেউই রাখত না। চলুন যেতে যেতে শোনাচ্ছি সেটা।
ডিহি ছেড়ে নেমে আসে ওরা।
বিকেল হয়ে এসেছে। সূর্যাস্তের আভা কমলা রঙের; গাছপালা-পাতা ভেদ করে আসছে। বৃষ্টি হওয়াতে বাগানের গন্ধটা কেমন ভারী। এ ধরনের বন্য প্রাকৃতিক ঘ্রাণ নৈঋত জীবনে কমই পেয়েছে। এই ঘ্রাণ অত্যন্ত ভালোবাসে ঝুম।
আচ্ছা স্যার! এই যে এতসব কবিতা আপনাকে শুনতে হচ্ছে, মনটা কি তাতে ভারী হয়ে উঠেছে, আপনি কি অপ্রসন্ন?
আরে না না!
কথা হল বেনেবউ মাদার ফুলের মধু খায়। সেই জন্য মাদার গাছে বসে। মধু খায় আর ছোট ফল খায়। বট, অশ্বত্থ, পুটুস। পোকা খায় না। কিন্তু হরবোলা পোকা খায়। আমার প্রশ্ন, হরবোলা মাদার গাছে বসবে কেন? সে গেরস্তকে শুনিয়ে কেন বলবে, (গেরস্তর) খোকা হোক। দিদিমা বললে, হরবোলার কারসাজিতে তুই হয়েছিস, ইষ্টিকুটুম তোর জন্য ডাকেনি। কেন ডাকবে, তুই তো আর ছেলে নোস।
নৈঋত মেধাবী। সুতরাং সে কাব্য কবিতা একেবারে বুঝবে না, এমনকি আর হয়! ফের সে কবিতা-বিদ্বেষীও নয়। সে কবিতাকে কোনও বায়বীয় পদার্থ বলেও মনে করে না। বরং সে মনে করে যত কম লোকেই নাড়াচাড়া করুক না কেন, বাংলা কবিতার একটা মর্যাদা আছে। এই জিনিসকে হেয় করলে, যে করে, তার নিজেকে নিজেরই দ্বারা খাটো করা হয়। কিন্তু কবিতা শুনতে শুনতে, পাখি দেখতে দেখতেও ঝুমকে ছুঁয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল।
দুলি নস্কর আমাকে কেন যে অমনি করে গঞ্জনা দিত। আমার রাগ হত, কান্নাও পেত। তাকে বলতাম, দেখ মা, আর জন্মে আমি সোনা বউ হব, তখন দেখবি, সোনাডিহির মাদার গাছে কী সব হবে।
তাই?
হ্যাঁ।
কী হবে?
কথাটাই ওই। কী সব হবে! দিদিমায়ের কাছেই শেখা কথাটা। সেই তাকেই শুনিয়ে দিয়েছিলাম।
সত্যিই এ বার আসল গল্পটা শুরু হয়। তাকে দেখতে পায় ঝুম। কালো মাথা বেনেবউ। আশ্চর্য রং তার গায়ের। সরষে ফুলের মতো সোনালি হলুদ। গলা কালো, বুকের ঊর্ধ্বভাগেও কালো রং। টলটলে কালো। হলুদটা সোনামাখানো বলেই তার সঙ্গে কালোকে দেখাচ্ছে বিশেষ সুন্দর। দেখেই মনে হল কী সব যেন হবে!
দেখছেন! আহা! দেখছেন তো!
কী ম্যাডাম?
ম্যাডাম! আচ্ছা বেশ, তাই সই। কিন্তু পাখিটা দেখুন! এর খেলা দেখাব বলেই আপনাকে এই বাগানে টেনে এনেছি।
বেশ। কিন্তু তুমি যদি আমাকে স্যার বলো, আমি তাহলে তোমাকে ম্যাডামই তো বলব।
পাখিটা দেখুন। আস্তে। কথা কম। দেখা বেশি। পাছে পালায়, তাই থেমে থেমে একটু আধটু কথা। খুব লাজুক তো! একা থাকতে ভালোবাসে। পণ্ডিতি বাংলায় বলা যায় নৈঃসঙ্গপ্রিয়। পাখি হরবোলা ওরফে সবুজ বুলবুল কিন্তু কৃষ্ণ গোকুলের আসল সুর নকল করতে পারে না। বড়ো জোর পারে চিয়াক করতে। এই ডাকটা হলুদ পাখির একটা মামুলি ডাক। স্বর নকল করা আর সুর নকল করা তো এক কথা নয়।
গাছের পাতা-পল্লবের ঘনত্বে ডুবে হারিয়ে যাচ্ছে খোকা হোক পাখিটা। তার পর হঠাৎ বার হয়ে এসে বাতাসের তলা থেকে উপরে উঠেই নিচে নেমে আসছে- একটা চমৎকার গোত্তা খেয়ে বাতাসের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে ঠেলে উঠছে এবং নামছে। আর এই যে ওঠা-নামা-গোত্তা খাওয়ার ক্ষিপ্রতা, তাতেই ঝলসে উঠছে বাতাসের স্তরে স্তরে আশ্চর্য সোনালি বিদ্যুৎ। অরণ্যের বিচিত্র আলো-ছায়ার ভিতর চলেছে রং নিয়ে বাতাসে আদিম এক স্বরলিপির খেলা। পিলো-পিলোলো। সুরটা হচ্ছে পিলো-পিলোলো। বা ওলো, কে এল? বা ওলো, কী এল?
অর্থাৎ ছেলে না মেয়ে? বউয়ের পেটে কী এল? আশ্চর্য মধুর এই সুর।
মনে পড়ছে অভিনব হাসানের মুখ। বাবার সঙ্গে তার কী যে ভাব ছিল। অসম বয়েসি হয়েও মণিমাধব আর অভিনব ছিল দুুই বন্ধু যেন বা। ওই অভিনব জীবনানন্দের সেই কবিতাটি আবৃত্তি করত; প্রথম করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যালে।
সেই মেয়েটি এর থেকে নিকটতর হল না;
কেবল সে দূরের থেকে আমার দিকে একবার তাকালো
আমি বুঝলাম
চকিত হয়ে মাথা নোয়ালো সে
কিন্তু তবুও তার তাকাবার প্রয়োজন-সপ্রতিভ হয়ে
সাত-দিন আট-দিন ন-দিন দশ-দিন
সপ্রতিভ হয়ে- সপ্রতিভ হয়ে
সমস্ত চোখ দিয়ে আমাকে নির্দিষ্ট করে
অপেক্ষা করে- অপেক্ষা করে
সেই মেয়েটি এর চেয়ে নিকটতর হল না
কারণ, আমাদের জীবন পাখিদের মতো নয়
যদি হত
সেই মাঘের নীল আকাশে
(আমি তাকে নিয়ে) একবার ধবলাটের সমুদ্রের দিকে চলতাম
গাঙশালিকের মতো আমরা দুটিতে
আমি কোনো এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি
তুমি কোনো এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছো
হয়তো হাজার-হাজার বছর পরে
মাঘের নীল আকাশে
সমুদ্রের দিকে যখন উড়ে যাব
আমাদের মনে হবে
হাজার-হাজার বছর আগে আমরা এমন উড়ে যেতে চেয়েছিলাম।
কবিতাটি পুরোটা মনের উপর দিয়ে বয়ে নেমে গেল। যেভাবে সাগরের ঢেউ তট ছুঁয়ে নেমে যায়।
আচ্ছা ঝুম!
আস্তে।
সরি!
ইষ্টিকুটুম অনেকক্ষণ খেলা দেখাল। ঝুমের চোখ মুখের বিস্ময়-মুগ্ধতা পাখি থেমে যাওয়ার পরেও রইল; দু-এক নিমেষ। সেই মুগ্ধতার দিকে দেখছিল নৈঋত।
হঠাৎ কেন যে, কী মনে করে, নৈঋত বলে উঠল, আমরা কখন ফিরব নন্দিনী?
কথাটায় আঘাতই পেল নন্দিনী ওরফে ঝুম। নৈঋত হঠাৎ হঠাৎ ঝুমকে নন্দিনী বলেও ডাকে। আঘাত অবশ্য সে জন্য নয়; ফেরার কথায় দুঃখই হল ঝুমের।
নন্দিনী বলল, তার মানে, আপনি ফিরতে চাইছেন? তা হলে আপনাকে একাই ফিরতে হবে। রাতটা আমি এখানেই কাটাব।
সে কী! এই বন-বাগানে থাকবে?
থাকব। আগেও থেকেছি।
আগেও থেকেছ! বলো কী? কী ভাবে থেকেছ?
টঙে।
ঝুমের এই কথায় একেবারে ভেবলে থ হয়ে গেল নৈঋত। তার মনে হল, এই নন্দিনী আসলে বুনো।
নৈঋতের হতবাক অবস্থা দেখে নন্দিনী বলল, অর্থাৎ বড় গাছের ডালে মাচা বেঁধে গাছ-পাহারার ব্যবস্থা রসুলপুরেও ছিল। এখানে ওই ধরনের মাচায় ছই থাকে। অবশ্য রসুলপুরে ছই থাকত না, তা নয়। তবে ছই ছাড়াও থেকেছি। শিশির পড়বে বলে কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হত। ডালে দড়ি বেঁধে মশারি টাঙানো হত। এখানে পাহারা যে দেয়, টঙে থাকে, আবার রয়েছে কাঠের ঘর, সেখানেও থাকে। তো…
হ্যাঁ বলো। থামলে কেন?
ওর নাম খোকা। দেখতে অবিকল অভিনব। আমি মনে করি ও অভিনবই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওকে অভিনব বলে ডাকলে ও সাড়া দেয় না। আমার খুব কষ্ট হয়। আমি তো বলি, দেখ, আমি ঝুম, ঝুমঝুমি পাখিরা, মনে পড়ে না? তখন ও বলে, তাতে কী? অর্থাৎ ও আমায় চিনতে চায় না।
কেন?
কী করে বলি, কেন! ফের মনে হয়, তাহলে কি সে হাসান নয়?
অ।
হ্যাঁ স্যার। তবে খোকাকে দেখে কখনও আমার স্বাভাবিক মনে হয়নি। মনে হয়েছে, মাথার কোনও গোলমাল আছে। মাঝে মাঝেই ওকে রিহ্যাবে রেখে আসতে হয়, নেশা ছাড়াবার জন্যে। নেশাই ওর সর্বনাশ করেছে। ছাড়ে আবার ধরে। হয়েছে কী যেই আবার ধরে, অমনি সে নিজেই বুঝতে পারে, ঠিক হচ্ছে না। তখন সে নিজেই জেনেসিসে চলে যায়। এখন আর রেখে আসতে হয় না। ও ওষুধ খাওয়া বন্ধ যেই করে, সমস্যা শুরু হয়।
কী বললে, জেনেসিস?
একটুখানি চুপ করে থেকে নন্দিনী বলল, হ্যাঁ, জেনেসিস ফাউন্ডেশন। একটা রিহ্যাব-সেন্টার বলা যেতে পারে, নেশাড়ি মানুষকে তার সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি চিকিৎসা-কেন্দ্র। রাজু বৈদ্য বলে একজন আমাকে খোকা সম্পর্কে বলেছে। রাজুই এই বাগানটা দেখে। সরকারিভাবে। মাইনে পায়। বুঝতে পারি না, খোকা তো অভিনবই। তা হলে সে আমাকে চিনতে পারছে না কেন? যখন সে যাদবপুরে পড়াশোনা করছে, তখনই টের পেতাম, সে মাঝে-মিশেলে গাঁজা খায়, মদ্যপানও করে। তখন তো বুঝিনি, নেশা কী মারাÍক ব্যাধি!
খুব মারাÍক। খুবই মারাÍক। ভয়াবহ।
অপুদি জেনেসিসের ডাক্তার। অপর্ণা সরকার। পাটুলিতে থাকে। আমার ওখান থেকে কাছেই হয়। ওর কাছ থেকে খোকা ব্যাপারে জানতে পারি। অপুদিকে বলেছি, খোকা তো খোকা নয়। ও অভিনব হাসান। কিন্তু ও নিজেকে খোকা বলে পরিচয় দিচ্ছে কেন? অপুদি বলেছে, রাজনৈতিক সংঘর্ষে ওর বাবা-মাকে রাজনৈতিক কর্মীরা ওকে বেঁধে রেখে ওরই চোখের সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে। চোখের সামনে।
অ।
ও ওর বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওর আর কেউ নেই। আমারই মতো। ঠিক আছে, চলুন।
কোথায় যাব?
আপনি তো ফিরতে চান। চলুন তা হলে। আপনাকে বিদায় জানিয়ে, রাজুর সঙ্গে কথা বলে…
ঠিক আছে। আমাকে দুটি জিনিস দেখাও। জিনিস নয়। দুটি, কী বলব! প্রাণ। দুটি প্রাণ। শ্বেত চন্দনের গাছটা আর খোকাকে। তার পর আমি চলে যাব।
আপনাকে ভালো লাগল স্যার।
কেন?
আপনি গাছ এবং একজন পাগল সম্পর্কে প্রাণ কথাটা ব্যবহার করলেন। যদিও খোকাকে পাগল বলাটা বারণ। চলুন।
ওরা এগিয়ে চলল।
দুই
সব শুনেটুনে নৈঋতের মনে হয়েছিল, খোকা কতটা পাগল জানা দরকার। কী তার কেতা বুঝে নিতে হবে। তার পর নন্দিনীকে বোঝাতে হবে, ইট ইজ আ লস্ট কেস; এই বান্দাটি (অর্থাৎ খোকা) কখনও
সুস্থ হবে না। এর কোনও পুনর্বাসন হয় না।
এই ধরনের ফন্দি কেন তার মাথায় আসছিল ভেবে পাচ্ছিল না নৈঋত। খোকার কথা ভেবে সে আশ্চর্য ঈর্ষাবোধ করছিল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল খোকা বা অভিনব হাসান বড্ড বেশি ভাগ্যবান। পাগল হয়ে এ রকম ভাগ্যবান হওয়াই তো ভালো। মদের নেশা তারও তো কম নেই। শুধু জীবনানন্দ দিয়ে একটা এ রকম লকলকে যুবতীকে ফুসলানো যায়, তা নৈঋতের জ্ঞানের পরিসীমার মধ্যেই ছিল না।
মণিমাধব নামের পুলিশ-পোয়েটের উপর, হাজারিকা পাখিরা নামের এসআই-এর উপর তার রাগই হচ্ছিল। এই পুলিশ পাখিরা কী করলেন? নারীর ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণটাই খোয়ালেন। এই ধরনের মানুষ এখনও বাংলায় জন্মায় কী করে?
বুঝলে ঝুম। আমার পছন্দের হল উইলিং মেয়েমানুষ। লম্পটী যুবতী। কী আশ্চর্য। কেন তুমি বুঝতে পারছ না। দাঁড়াও আমি ব্যবস্থা করছি। দরকারে আমি কীই না পারি। তোমাকে ফুসলাতে জীবনানন্দের কবিতাই যদি টোপ হয়, তাই-ই হোক। দশ-বিশটা তেনার কবিতা কণ্ঠস্থ করলেই তো হল! তোমার শরীরটা আমার চাই নন্দিনী।
উপরের সংলাপ নৈঋত বলেছিল গত পরশু স্বপ্নে। দক্ষিণের বাগানে ইষ্টিকুটুমকে দেখে আসার রাতে। সেই রাতেই ভোররাতের দিকে আরও একটি অদ্ভুত স্বপ্ন সে দেখে।
শ্বেত চন্দনের গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে নৈঋত। নৈঋতের অত্যন্ত কাছ ঘেঁষে নন্দিনী। সহসা ঘটনাটা ঘটে।
শিউরে ওঠার মতোই দৃশ্য। চন্দন গাছটাকে ঘিরে বিদ্যুতের তার জাল। দেখেই বোঝা যায়, তারে হাত পড়লে, যার পড়বে তার মৃত্যু অবধারিত; মরতে সময় নেবে না।
তীব্র কাম-কাতর হলেও আপাদমস্তক শিউরে উঠল নৈঋত শাহু। সত্যিই তার কেমন যেন হল। ঘটনাটা বাস্তবেও এই রকমই ঘটেছে। কিন্তু পরের ঘটনা স্বপ্নে ঘটে চলে অন্য রকম।
শ্বেত চন্দনকে ঘিরে রেখেছে বিদ্যুতের তারের গণ্ডি। কোনও চন্দন-দস্যু যেন তাকে অপহরণ করতে না পারে। কিন্তু এ কেমন বন্দিত্ব। মনে হল গাছটি তো বাঁচবে না। বা মনে হল, গাছের প্রাণ ভয়ে এতটুকু হয়ে রয়েছে।
ইশ! এ সব কী দেখছি বলো তো!
কী বলব বলো। এই জন্য তোমাকে শ্বেত চন্দনের গাছটা দেখাতে চাইনি নৈঋত। এখানে এলে আমার কেমন কান্না পেয়ে যায়।
পাহারার জন্য তো ওরা আছে। রাজুরা। তা ছাড়া দামি গাছ তো আরও আছে। নেই?
তা থাকবে না কেন।
এই সব কথা হতে হতে ঘটনাটি ঘটে। নৈঋতের একটি হাত ঝুমের একটি হাতের মুঠোর কাছটা আলতো করে চেপে ধরে। তার পর মুঠোর মধ্যে নন্দিনীর হাতকে পুরোটা, কবজিসহ নিুাংশ নিয়ে নেয়।
তার পর আঙুল দিয়ে আঙুলের আলিঙ্গন; আঙুল-বন্ধন চলে। এই অবধিও কিছু বলে না নন্দিনী। এর পর আরও অগ্রসর হয় নৈঋত।
অতঃপর হাত ছেড়ে সামনে দাঁড়ায় শাহু। পাখিরার কাঁধে হাত রাখে।
নন্দিনী শুধায়, এমন কেন করছেন স্যার!
আমার যে বড্ড ইচ্ছে করছে ঝুম!
না।
কী নয়?
না-না, এ ভাবে হয় না।
কেন হয় না। আমি ক্ষুধার্ত ঝুম।
না।
আমি তৃষ্ণার্ত।
স্যার! এটা অভিনব হাসানের জায়গা।
দেখুন, শ্বেত চন্দনের অবস্থা দেখুন। মাফ করবেন, আমি এ সব পারব না নৈঋত। আমাকে ছাড়–ন। প্লিজ!
এরপর ঘটনা অন্য এক চেহারা নেয়।
তোমাকে আমি ছাড়ব না। কিছুতেই না। যা বলছি শোনো।
সেই আসন্ন সন্ধ্যায় ঝুমকে ধর্ষণ করে নৈঋত। কিছুটা সম্মতির ভেতর দিয়ে ধর্ষিতা হয় নন্দিনী।
স্বপ্ন বলেই এরকম হয়।
স্বপ্ন বলেই ঘটনাটা আরও অন্য রকম হয়।
উদভ্রান্তের মতো ছুটতে শুরু করে। সহসা বোঝা যায় না, ঝুম কোন দিক থেকে কোন দিকে চলেছে। এবং তার পর সব থেমে যায়।
তার পর সে শ্বেত চন্দনের বৈদ্যুতিক তারের জালে গ্রস্ত হয়। সে জ্বলে যায়। চিৎকার করে। পুড়ে কালো হয়ে যায়। ছটফট করতে করতে সর্বাঙ্গ থেমে যায় ঝুমের।
তখনই বোবা যেন আর্তনাদ করছে, এমনই বোঁ বোঁ শব্দ গলায় ঘুম ভেঙে জেগে বিছানায় উঠে বসে নৈঋত। অদ্ভুত। এমনই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে সে। তার সারাটা শরীর ঘেমে নেয়ে গিয়েছে।
নৈঋত বিশ্বাস করতে পারছে না।
এমন কেন হল! এ কি সত্যিই ঘটেছে। নন্দিনী কি বেঁচে নেই। তাকে কি এমনি করে মেরে ফেলল নৈঋত? ধীরে ধীরে নৈঋত বুঝতে পারে সবই ঘটে গেল স্বপ্নের ভিতর।
কিন্তু স্বপ্নও তো মনে হচ্ছে না!
এ সে কী করল।
ভোররাত। বাইরে হাল্কা হয়েছে আঁধার।
জানলার একটা পাল্লা খোলা। বাতাস বয়ে আসছে। বাতাসে পুজো-পুজো গন্ধ। হিমের হালকা ছোঁয়া লেগেছে হাওয়ায়। একখানা পাতলা বালাপোশ গায়ে ফেলে নৈঋত ইংলিশ খাটে ঘুমিয়েছিল। এখন সে বসে রয়েছে।
মাথার উপরে পাখাটা ঘুরছে এক পয়েন্টে।
বাইরে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। বিছানায় বসেই রইল নৈঋত। কিছুক্ষণ আগেও তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এখন তার বুকের ভিতরে অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে। অতি অদ্ভুত সেই কষ্ট।
বিছানায় বসেই রইল সে।
ভোর হয়ে গেল। সূর্যের আলো কেবলই ফুটেছে। তখনই তিনবার কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এল নৈঋত।
কে? বলে নীচের দিকে ঝুঁকল গ্রিল ধরে নৈঋত শাহু।
বাড়ির তলা থেকে জবাব এল, আমি স্যার রাখাল।
কী হয়েছে রে।
সরমার বাচ্চা মেয়েটার কী যেন হয়েছে। একবার আসবেন?
কী হয়েছে?
কথা বলছে না।
সে কী রে।
এই বলে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে নৈঋত রাখালকে বলল, চ। আমি আসছি।
বলে ঘরের ভেতরে এসে জামা গলিয়ে একখানা চাদর গায়ে জড়িয়ে নেয় নৈঋত। তার পর দরজায় এবং গেটে তালা লাগিয়ে রাস্তায় পা বাড়ায়। টাকা-পয়সার পার্সটা সঙ্গে নিয়েছে। রাখালের গলার স্বরে কেমন একটা খারাপ গন্ধের আভাস ছিল। সরমার মেয়ে মিঠু কথা বলছে না কেন?
দ্রুত পা চালায় নৈঋত।
মর্নিং ওয়াকে বার হয়েছেন ডাক্তার সতীপ্রসাদ মিত্র। এসপি মিত্র। লোকে তাকে প্রসাদ ডাক্তার বলেই অধিক চেনে। তাঁকে হাত তুলে থামায় নৈঋত এবং বলে, আমার সঙ্গে একটু যাবেন স্যার। যদি দয়া করে…
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ষোলোআনা ভদ্র এবং গরিবদরদি ডা. সতীপ্রসাদ বললেন, নিশ্চয় যেতে হবে। কিন্তু কোথায়?
তিন বাড়ির ঠিকে কাজের মাসি সরমা। ওর মেয়ে ছবছরের মিঠুর কথা বন্ধ হয়ে গেছে। রাখাল এসে বলে গেল। সরমা আমার বাসাতেও কাজ করে। কী হল বলে যাচ্ছি।
তা হলে তো যেতে হয়। বললেন ডাক্তারবাবু।
কাছেই একটা ছোট্ট টালির বাড়িতে থাকে সরমা তার ছবছরের মেয়েকে নিয়ে। ওর স্বামী সোনারপুর স্টেশনে পানিফল, কাগজি লেবু, ফটাস জল বেচত। বাজারে ডালিতে করে দিশি ডিম বেচত এক মাঝবয়েসি স্ত্রীলোক, তাকে সঙ্গে করে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়েছে কেউ বলতে পারে না।
ইমারতি দ্রব্য বেচে ব্যবসা করে নন্দুবাবু। তাঁর ওখানে কাজ করে সরমা। ওর কাজের প্রধান জায়গা ওটাই। নন্দুর আসল-আদি বাড়ি বহুড়–। বহুড়– নৈঋতের মামাবাড়ির জায়গা। সেই সূত্র
ধরেই নন্দু নৈঋতের ব্যাপারে আছেন। কাজের মেয়ের ব্যবস্থা দেখে দিতে বললে নন্দু সরমাকে পাঠালেন। এভাবে দুজায়গায় কাজ ধরতে হল সরমাকে। এছাড়া একটা তিন সিটের মেস আছে এই সাহেবপাড়ায়। ওখানে শুধু থালা-বাসন ধোয় সরমা নস্কর। ঝাঁট দেয় একবেলা।
পৌঁছে দেখা গেল, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। সরমার কোলে তার মেয়ে শুয়ে আছে। নিথর। নিস্পন্দ। চোখ খোলা। চোখের তারা স্থির। সারা মুখে একটা নীল ছায়া পড়েছে। মেঝেয় খানিকটা রক্ত পড়ে কালচে হয়ে গিয়েছে। মেয়েকে আঁচল দিয়ে ঢেকেছে, গলা অবধি।
প্রসাদ ডাক্তারবাবু দৃশ্য দেখেই শিউরে উঠলেন।
বললেন, এ কীসে আনলেন মিস্টার শাহু! দেখি… বলে মায়ের আঁচল ঝুঁকে নেমে মিঠুর গা থেকে সরিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু।
আমি আর দাঁড়াইনি ওখানে। ধর্ষণ করার পর গলাটিপে হত্যা করেছে মিঠুকে। তার পর থেকে সরমা পাগলির মতো আচরণ শুরু করল। দুর্বোধ্য ভাষায় আপন মনে কথা বলে যেত সরমা নস্কর।
মিঠু শিশু ছিল। কিন্তু তার দেহে কিশোরীর আভা ফুটে উঠেছিল। অর্থাৎ তার দেহ বয়েসের তুলনায় ফনফনিয়ে উঠছিল দ্রুত। কারও চোখ পড়ে সেই উর্বরতার দিকে। এই পাড়ারই কেউ কামার্ত প্রকৃত লম্পট, মিঠুকে শেষ করে দিল। অথচ সেই লোকটাকে শনাক্ত করা যাবে না কখনও।
এই সব ভাবতে ভাবতে নৈঋত অন্তরীণ হল তার বাসায়। সে নিজেকেই নিজে বন্দি করে রাখল। সে কলেজ গেল না। কারও সঙ্গে দেখা করল না। সেলফোনটা চার্জ করল না। ল্যান্ডফোন অকেজো হয়ে রয়েছে, তা সে আর সারাল না। শুধু সে সাত দিনের আনলিভ নিল, তা-ও ঠিক নিল বলা যায় না, নেবে ঠিক করল। এ ব্যাপারে কলেজকে জানিয়ে দিতে পাবলিক বুথ থেকে কলেজে ফোন করে এল। ব্যস।
জায়গাটা কলকাতার দক্ষিণপূর্ব শহরতলির কোনও এক এলাকা। এখানে এখনও নানান গাছপালা ঘেরা বাড়িঘর। দ্রুত বহুতল নগরায়ন চলেছে। এখনও রয়েছে পুকুর-ডোবা, ছোট বন ও বাগান। একটু এদিক ওদিক হেঁটে গেলে বাগান ও বন, পুকুর ও ডোবা দেখা সম্ভব। জানলা খুলে দূরের গাছপালার দিকে চেয়ে থেকে জানলা বন্ধ করে দিয়ে বিছানার উপর একা বসে থাকে নৈঋত। তার চোখের সামনে কোনও চিত্রকরের আঁকা এক নারী।
ছবিটা কিনতে সাহায্য করেছিল নৈঋতের এক বন্ধু সন্দীপ, যে ছিল চিত্রকলার প্রসিদ্ধ সমালোচক; বলেছিল, কিনে রাখো, পরে বুঝবে কী ভালো কাজ করেছ; নবীন এই চিত্রকর ভবিষ্যতে প্রচুর-বিপুল নাম করবে। তখন চাইলে বিশাল দামে বেচে দিতেও পার। না, বেচার কথা নয়। ছবিটা ঘরে রেখে এখন গর্ব হয় নৈঋতের। এই শিল্পীর এখন জগৎজোড়া নাম।
এই ছবিটা ছাড়া সাত দিন কাউকে দেখেনি নৈঋত শাহু। সাত দিন সরমাও কাজে আসেনি।
এই সাত দিন নৈঋত কেবলই ভেবেছে এ সে কী করল। তার শুধুই মনে হচ্ছিল মিঠুর মৃত্যু আর সে, দূরত্ব কত দূর?
কলিংবেলটা বাজল। খবর-কাগজ-অলা কি? বা দুধ-অলা? শুধু এই কাজটা করেছে নৈঋত। বেল বাজলে দরজা খুলে দুধ আর খবরের কাগজ ভেতরে নিয়েছে।
কাগজ পড়েনি নৈঋত।
কাগজ বা দুধ একবার বেল দেয়।
আর পরপর তিনবার বেলটা বাজল। এরকম তিনবার কে বাজায়? এ তো সরমা। ফলে দরজা খুলে দেয় নৈঋত।
এটি একটি দোতলা বাড়ি। সাহেবপাড়ায় একতলা-দোতলা এবং দু-একটি তিন-চারতলা বাড়ি মাথা তুলে রয়েছে এবং হঠাৎ করে প্রধান রাস্তার পাশে বহুতল। কিন্তু চারিদিকে নানান গাছপালা। গাছে-গাছে পাখিও দেখা যায়। সেই সব পাখির দিকে আগে চেয়ে দেখেনি নৈঋত। আজ এই ভোরবেলা সেই সব পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিল সে। অবাক হল। নৈঋত অবাক হল।
দরজা খুলে দিয়ে খাটে ফিরে এসে আগের মতো চোখ মুদে বসে রইল সে। তবু বুঝতে পারল, ঘরে ঢুকে এসেছে সরমা। ঠিক একটি ছায়ার মতো এসেছে।
বাবু!
এই ডাকে চোখ খুলল নৈঋত। দেখল, এ যেন সরমা নয়, সরমার ছায়ামাত্র। কেমন যেন অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কাজ কি ধরব বাবু?
ধরো।
এই বলে কিছুক্ষণ চুপ করে সরমার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থেকে নৈঋত বলল, পুবের জানলা খুলে দাও।
বাবুকে কেমন অসুস্থ এবং আনমনা দেখাচ্ছে। মনে হল সরমার। সে পুবের জানলা খুলে দিল। ওই দিকে একটি বাঁশবন রয়েছে, তার আড়ালে রয়েছে একটি বড় ডোবা। সজনে, খিরিশ, ডুমুর, কদম, আমলকী ছাড়াও রয়েছে নানান গাছ। বাঁশবনটা তলতা বাঁশের। এ দিকটায় সুপুরি, নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারাও এখানে-ওখানে। অশোক, হরীতকী ইত্যাদি আছে।
এ বছর কার্তিকে পুজো। পুজোর আর একেবারেই দেরি নেই। বাতাসে শীতের গন্ধ একেবারে স্পষ্ট। শীতের আগাম বার্তা বয়ে আনছে হাওয়া।
পুবের জানলা খুলে দিয়ে তলতা বাঁশের সবুজতার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আধফোটা গলায় সরমা বলল, দুধরাজ!
কথাটা কানে এল নৈঋতের; সে চমকে উঠে বলল, কী বললে সরমা?
সরমা তলতা বাঁশের সবুজতার পুঞ্জে চেয়ে থেকে বলল, দুধরাজ, মস্ত সাদা লেজটা। তাই দেখে মিঠু হাততালি দিত। কী ধবধবে সাদা রং, দেখুন না!
সরমার মুখের এমন কথায় এবং দেখুন না বলার কোমল ডাকে বুকের ভেতরে আশ্চর্য এক বেদনামাখা মোচড় অনুভব করে বিচলিত হয়ে খাট থেকে নেমে পুবের ওই জানলার কাছে আসে নৈঋত। তার পর পাখিটার দিকে এক ঝলক চেয়ে দেখেই বুঝতে পারে তার বুকের মধ্যে অদম্য একটা কান্না চাপ তৈরি হচ্ছে।
অথচ সরমার সামনে কাঁদা তো যায় না।
নৈঋত তাই জানলার কাছ থেকে সরে চলে আসার আগে বলে, দুধসাদা বলেই বোধ হয় দুধরাজ নাম। অথচ ভালো করে দেখিইনি কখনও। ঝুম না হলে এভাবে চোখ খুলত না। বলে বাথরুমে ঢুকে পড়ে।
ছটা বেজেছে। শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে জলচালুনিটা নব্ ঘুরিয়ে চালু করে দেয়। তারপর নৈঋত ঝরে পড়া জলের ভিতর কাঁদতে থাকে।
সাত দিন বাদে সে স্নান করল। সেলফোনটা চার্জে বসাল। সরমার রান্না করা ভাত-তরকারি খেল।
কলেজ যাবে মনস্থ করল নৈঋত।
ঘর ঝাঁটা দিয়ে, থালাবাসন মেজে, রান্না চাপায় সরমা। তার পর রান্না হয়ে গেলে ডাইনিং টেবল-এ রান্না হওয়া যা কিছু সবই সাজিয়ে রেখে এবং ঢেকে রেখে নন্দবাবুর ওখানে চলে যায়। আজ যায়নি। নটার মধ্যেই সব হয়ে যায়। দশটা বাজে।
খেতে বসে ঈষৎ অবাক হওয়ার সুরে নৈঋত বলল, এখনও যাওনি?
সরমা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বলল, আমি আর যাব না বাবু।
কেন সরমা?
না। ওখানে আর না।
কেমন একটা চাপা ক্ষোভ ও কাউকে প্রত্যাখ্যান করার সুর খেলে গেল সরমার গলায়।
কী হয়েছে? গ্রাস মুখের কাছে এনে মুখে-না-নিয়ে থেমে, জানতে চাইল নৈঋত।
সরমা কান্না ঠেলে-আসা রোধ করতে চেয়ে বলল, কিছু না।
বোঝা গেল এটাই তা হলে অনেক কিছু।
হঠাৎ কী হল কে জানে, সরমা বলে উঠল, না-না বাবু, থাক।
কেন, থাকবে কেন?
চুপ করে রইল সরমা।
কী মনে করে, ভাতের গ্রাস দুবার মুখে নিয়ে গিলে নৈঋত বলল, ঠিক আছে। তোমাকে বলতে হবে না।
না-না বাবু। আমি বলব। আমাকে বলতে হবে। মেয়ের ধর্ষণ হল, কী করে হল। বলব না!
না। বলবে না। আমি শুনতে চাইছি না সরমা। আমাকে খেতে দাও।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সহসা দমকা আবেগে খিলখিল করে হেসে উঠে সরমা বলে ওঠে, আপনি কি… না থাক। …নন্দুকে ভয় পাচ্ছেন এত।
হ্যাঁ, এত!
আবার হেসে ওঠে সরমা।
আমি কিন্তু পাই না। হাসি থামিয়ে বলে উঠল সরমা নস্কর।
সরমার কথার পিঠে কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল নৈঋত। দরজা ছেড়ে ফের পুবের জানলার কাছে গেল সরমা। নিশ্চয় দুধরাজ পাখিটাকেই আর একবার দেখতে চাইছে সে।
হঠাৎ আর খেতে ইচ্ছে করল না নৈঋতের। অর্ধভুক্ত থালা সে সামনে ঠেলে দিয়ে উঠে পড়ল। দ্রুত বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে তোয়ালেয় মুছে নিতে নিতে শুধাল, পাখিটা আছে?
আছে কোথাও। আবার আসবে।
তুমি কী করে বলছ, সে আবার আসবে?
ও তো এখানকারই পাখি। আমার মেয়ে যেমন এখানকার। সেই রকম।
পাখিটা ওই বাঁশবনেই ঘোরাফেরা করে বোধ হয়?
আজ্ঞে বাবু, করে তো! মিঠু ওটার লেজ নিয়ে বাতাসে লেজ খেলিয়ে ওড়া দেখতে দেখতে হাততালি দিলে বলতাম, বেধবার আবার শখ কত! তার পর বলতাম, নিজে আমি কী, তাই তো বুঝলাম না!
দুধরাজের সঙ্গে বেধবার কী সম্পর্ক সরমা?
সে কী বাবু, জানে না?
কী?
ওটার আর এক নাম বেধবা পাখি।
অ, তাই!
ওই দেখুন, আবার এসেছে। কিন্তু কিছুই যে খেলেন না বাবু!
যথাস্থানে তোয়ালেটা রেখে দিয়েছে নৈঋত। কেন খেতে পারল না, সে কথার জবাব না দিয়ে খোলা জানলার কাছটায় এগিয়ে গেল সে।
কই? ও, তাই তো! বলে গাঢ় এক বিস্ময়মাখা চোখে কালো মাথার ঝুঁটিঅলা বুলবুল গোত্রের পাখিটির বাতাসে ভেসে লেজ ভাসিয়ে খেলা করার দৃশ্য দেখতে থাকে নৈঋত শাহু। বাতাসে নামা-ওঠা করছে রিবন ফিতার মতো লেজঅলা পাখিটা। রিবন ফিতাও বলা যায়, সাদা ফর্দের কাগজও বলা যায়।
বাবু!
বাবুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা সরমা বাবুকে সম্বোধন করলে। বাবু বাঁশবনের কোল-ঘেঁষা শূন্যতায় সাদা ফর্দের ঢেউ খেলানো দেখছে। মনের ভেতরে কথা এল, এ জিনিস ঘুড়ির লেজের চেয়ে সহস গুণ সুন্দর। কিন্তু ক্রিক রো-তে মানুষ হওয়া এই নৈঋত বিধবা পাখির খেলা দেখেনি কখনও। এভাবে।
কেন?
বাবু! ফের ডেকে ওঠে সরমা।
নৈঋত বলল, হ্যাঁ, বলো!
মা, ওই দেখো, বেধবা পাখি! বলত মিঠু, আসলে কী বাবু, জীবন একটা ফক্কিকারি। আর ওই হল তার দুয়াভুয়া।
দুয়াভুয়া!
হ্যাঁ বাবু।
এই বলে ঘরের অন্যত্র সরে চলে যায় সরমা। কথাটা কান দিয়ে শ্রীশাহুর একেবারে মর্মে চলে যায়। সে কেমন একটা বিড়বিড় করতে থাকে, ফক্কিকারি, দুয়াভুয়া। আশ্চর্যই বটে! দুয়াভুয়া, ফক্কিকারি। ওই দুধরাজ এক দুয়াভুয়া! এ কেমন বিদীর্ণ-বিস্ময়!
যখনই চোখের সামনে এই পাখি বাতাসে লেজ দুলিয়ে ঢেউ তুলবে মিঠুকে মনে পড়ে যাবে সরমার। এর লেজে দুটি পালক। ভারি অদ্ভুত! এর সুন্দর জীবনটাকে দেখবার সময় হল না তার। অথচ মিঠু এটাকে দেখে কত আনন্দ না পেয়েছে।
বাবু পাখি দেখে আনন্দ পাচ্ছে দেখে সন্তান-সন্তাপের ভেতরেও সরমার মনটা খুশি হল এ কথা ভেবে যে, মিঠুকে বাবুর মনে পড়েছে।
আমাকে কাজে রাখবেন তো বাবু!
কেন এ কথা বলছ, তুমি তো রয়েছ।
বলা তো যায় না।
কেন?
এই বলে বাঁশবন থেকে দৃষ্টি টেনে এনে ঘরের ভেতরে ফেলে নৈঋত সরমাকে দেখে বুঝে নিতে যায় কী বলতে চাইছে এই যুবতী! দেখা গেল, দেওয়ালে টাঙানো মস্ত ও আয়তাকার ফ্রেমে চিৎ কিন্তু অল্প কাত হওয়া ছবির দিকে পলক না ফেলে চেয়ে রয়েছে সরমা নস্কর।
আচ্ছা সরমা, তোমার পদবি নস্কর তো?
না বাবু, তিন-তিন বার স্বামীর মৃত্যু খবর পেয়েছি। এখন আমি বাপের পদবি নিয়ে চলি। একটা ব্যবস্থা হয় না? গায়েন পদবি করা যায় না স্যার?
অ্যাফিডেভিট করাতে চাও?
আজ্ঞে। রাজেশ ঠাকুর করিয়ে দেয়। টাকা নেয় চারশো। কাগজে ছাপিয়ে দেয়। অদ্য হইতে অমুক ছিলাম তমুক হইলাম। নস্কর হইতে গায়েনে ফিরিলাম।
তুমি তো সবই জানো দেখছি।
আজ্ঞে পদ্মমণি স্কুলে সিক্স ইস্তক পড়েছি। তার পর আর হয়নি।
কেন?
ভুখা মিছিলে সে বছরগুলি চলল; মিছিলে ছিল বাপ। বাপটা মরে গেল। আর মায়ের ছিল মাথার দোষ। ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়াত। সাঁতার জানত না। এক পূর্ণিমা রাতে মাথায় জ্বলন্ত লণ্ঠন নিয়ে জলে চলে গিয়ে ডুবে মরল। আমি তিন বচ্ছর পাগল হয়ে সংগ্রামপুরে ননি মাসির কাছে থাকলাম। তার পর কত কী হয়েছে!
কী হয়েছে?
ঠিক আছে। ভাত-তরকারি যা আছে নিয়ে যেও বা এখানে খেও। আমি কলেজ বার হব।
এবার ছবির দিক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় সরমা।
দেখুন বাবু, রাখাল সব জানে। শুধোলে সব পাবেন। নন্দু রাখালকে দিয়ে সাঁঝরাতে ডেকে পাঠালে, তার পর মাঝরাত পার করে ছাড়লে। বলাৎকার তো আমারও হয়েছে বাবু। নন্দু যখন ইচ্ছে ডেকে পাঠায়। রেপ করে ছেড়ে দেয়। আর কত মুখ বুজে থাকব। কীসের জন্ম, কীসের জীবন দাদাবাবু। স্যার! পুরা ফক্কি!
এ বার পুরোপুরি বাইরের দিকে মুখ করে জানলার কাছে শিক ধরে দাঁড়ায় নৈঋত। আশ্চর্য শুভ্র পালক বাঁশবনের কাছে শূন্যতায় নেচে নেচে কী যেন লিখে দিচ্ছে; নৈঋত পড়ে উঠতে পারছে না। তার চোখ জলে ভরে আসছে। দুধরাজ অত্যন্ত কর্কশ গলায় ডাকছে। চেঁ-চেঁ। চেচেওয়ে! চেক!
কান্না কেন পাচ্ছে? নৈঋত তো মেয়েদের ফুসলাতে ভালোবাসে এবং সে চায়, মেয়েরাও তাকে সিডিউস (ংবফঁপব) করুক। সে বরাবর মেধাবী। সে দেখতেও সুন্দর। ইংরেজি সিডাকটিভ (ংবফঁপঃরাব) কথাটা তার ভারি পছন্দের। মেধা ও প্রতিভা, সে মনে করে সিডাকটিভ। অর্থাৎ সম্মোহক। সম্প্রতি একটি লেখায় কোথায় যেন সে পড়ল, ইন্টিলেক্ট ইজ সিডাকটিভ অ্যান্ড ইজ ইকুয়ালি ঈগার টু বি সিডিউসড।
ওহঃবষষবপঃ রং ংবফঁপঃরাব… ধহফ রং বয়ঁধষষু বধমবৎ ঃড় নব ংবফঁপবফ. বড্ড ভালো কথা। অসম্ভব ভালো কথা। এসপার-ওসপার কথা। একেবারে ফাটিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মতো কথা। অকপট সুন্দর কথাগুলি। যাকে বলা যেতে পারে রানুভানু কথা।
কিন্তু তাই বলে রেপ! ধর্ষকাম এবং হত্যা! হিংস কদর্য যৌনতা! যৌন-বীভৎসা! যৌন-জিঘাংসায় সে আশ্চর্য অসুর।
কালাচাঁদকে বলে গিয়েছিলাম, মিঠু থাকল, দেখিস!
কাকে বলে গিয়েছিলে সরমা?
কুকুর কালাচাঁদকে। ওই তো পাহারা দেয় বাবু।
তো?
এবার চুপ করে রইল সরমা। তারপর ফুঁপিয়ে উঠল।
দেখো, সরমা। আমি শুনতে চাইনি। কেন শুনতে চাইনি। কারণ মনে হয়েছে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবে। তা ছাড়া নন্দুর ব্যাপারে কথা কম বলাই তো ভালো। লোকটার হাত খুব লম্বা। থানাকে পর্যন্ত তাঁবে রেখেছে। গুণ্ডা পোষে লোকটা। রুলিং পার্টির লোকাল মাথা তো নন্দুই। তাছাড়া সাত দিন হয়ে গেল। আর কী করবে? থানায় ডায়েরি পর্যন্ত করোনি? করেছ?
হ্যাঁ। রাখালকে নিয়ে গেছিলাম। বড়োবাবু শুনলই না ভালো করে কথা। তাড়িয়ে দিলে। বললে, যা বলার আমার সামনে বললি, পাড়ায় এসব বলে বেড়াস নে সরমা। বিপদ হবে।
তা হলে আর বলছ কেন গায়েন?
আজ্ঞে। চাপতে যে পারছি না বাবু। বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছি। ইজ্জতের ব্যাপারে খচখচ করে বেশি বেশি। নন্দুর যে গায়ের জ্বালা বেশি। আমার যে হায়া বেশি স্যার।
সরমাকে এভাবে জানত না নৈঋত। কাজের মেয়ের এমন বাকপটুতায় সে মুগ্ধ হচ্ছিল আর সরমার ভাগ্যের কথা ভেবে ক্রমান্বয় তার হৃদয় কষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছিল।
নৈঋত বলল, চাপতে হবে সরমা, চাপতে হবে।
পারব না বাবু!
পারতেই হবে।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  কেরানিও দৌড়ে ছিল

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

আবুল বাশার- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...