ও আমার দেশের মাটি

একসময় এই গানটি বেশ গাইতাম, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা’। আরও গাইতাম, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবো নাকো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি’। এই গানগুলো আর গাই না আমি। কারণ গানগুলোর কথা এখন আমি আর বিশ্বাস করি না। কথাগুলোয় প্রচুর ভুল। শুধু আবেগ দিয়ে মিথ্যেকে সত্য করা যায় না। সত্যকেও মিথ্যে করা যায় না। বাংলাদেশ সকল দেশের সেরা দেশ নয়। বরং বার বার প্রমাণ করছে পৃথিবীর আর সব দেশের চেয়ে প্রায় সবদিক থেকেই পিছিয়ে আছে দেশটি। এই দেশটি নিয়ে কোনও শিক্ষিত-সচেতন মানুষ গর্ব করবে না। দেশটিতে দারিদ্র, প্রতারণা, অন্যায়, অত্যাচার, বৈষম্য, নির্যাতন একেবারে রমরমা। তাই তো দেখি বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল থেকে ৯৭৯ জন লোক ভারতে যেতে চাইছে, আর ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল থেকে কেউ বাংলাদেশে ফিরতে চাইছে না। এই ঘটনা থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি বাংলাদেশের প্রতি কারও আশা নেই, কারও সত্যিকার ভালোবাসা নেই, কে্‌উ বিশ্বাস করে না দেশটিকে, কারও সামান্য আ্স্থা নেই দেশটির ওপর। এই দেশটি থেকে বছর বছর অমুসলিমরা চলে যাচ্ছে নিরাপদ কোনও দেশে। হিন্দুর সংখ্যা কমতে কমতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, অশিক্ষা, অসচেতনতা এত তীব্র যে কেউ দেশটিতে আর বাস করতে চায়না। সুযোগ পেলে সবাই চলে যেতে যায় দেশের বাইরে। আজ যদি সীমান্তে কোনও কাঁটাতারের বেড়া না থাকতো, বা দেশ থেকে ভিসার নিয়ম উঠে যেতো, আমার বিশ্বাস দেশসুদ্ধ লোক দেশ ছাড়তো। দেশটা শুকনো পড়ে থাকতো সুদূর মরুভূমির মতো।
ভারতভাগের সময় পাকিস্তান থেকে হিন্দু যত গেছে ভারতে, ভারত থেকে মুসলমান তত আসেনি পাকিস্তানে। ইস্কুল কলেজ একরকম খালি হয়ে গিয়েছিল দেশভাগের পর। শিক্ষক নেই। বেশির ভাগ ছাত্র নেই। হিন্দুরা ছিল মুসলমানদের চেয়ে বরাবরাই বেশি শিক্ষিত। তাদের অধিকাংশই দেশ ছাড়ার পর মূর্খতার ভারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। দেশভাগের পর মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ যদিও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে বলেছেন, হিন্দু-মুসলমানকে এক জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তারপরও বারবার দাঙ্গা লেগেছে দেশে। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা বার বার দেশত্যাগ করেছে। পাকিস্তানকে হঠিয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল একাত্তরে, সেটি নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল আবার। সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে কয়েক বছরে। দেশত্যাগ শুরু হয়েছে আবার। সব আশার প্রাচীর চুরচুর করে ভেঙে পড়েছে। দেশে অরাজকতা এত তীব্র যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে আজকাল শুধু হিন্দু যাচ্ছে না, মুসলমানও যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে, আসামে, আজ বাংলাদেশের মুসলমানের ভিড়। ভারতবর্ষের প্রায় সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে তারা। শুধু সামান্য অন্নবস্ত্রবাসস্থানের জন্য, জীবনের সামান্য নিরাপত্তার জন্য, সামান্য স্বস্তির জন্য ভারতে বসত গড়েছে। ভারতেই শুধু নয়, বাংলাদেশ ছাড়া প্রায় যে কোনও দেশেই, এমন কী অন্য কোনও গরিব দেশেও তাদের বাস করতে আপত্তি নেই। ইওরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমানোর জন্য সবাই এক পায়ে খাড়া। আগে গলা কাটা পাসপোর্ট হাতে নিয়ে, জীবনের বিশাল ঝুঁকি নিয়ে হলেও, মানুষ দেশ ছাড়তো। দেশে থেকে কিচ্ছু হবে না, দেশে কিচ্ছু নেই সেই যে কতকাল আগে বলা শুরু করেছিল মানুষ, এখনও বলছে। দেশ নিয়ে হতাশার শেষ আজও হয়নি। আর সব দুর্যোগই কাটে, নড়বড়ে দেশও শক্ত পায়ে দাঁড়াতে শেখে, বাংলাদেশই শুধু পারে না, বাংলাদেশের দুর্যোগই শুধু কাটে না।
কিছুদিন আগে দেশের প্রগতিশীল ব্লগারদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে। প্রত্যেকে, হ্যাঁ প্রত্যেকে দেশ ছাড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে আমার লেখালেখির জন্য ফতোয়া জারি করেছিল ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা। আমার মাথার মূল্য ধার্য করেছিল ওরা। লক্ষ লক্ষ লোকের মিছিল হতো আমার বিরুদ্ধে, লং মার্চ হতো। সারা শহরে এক লক্ষ বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেবে বলে সাপুড়েরাও আমার ফাঁসির দাবিতে সাপ হাতে নিয়ে মিছিল করেছে। সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করা হয়েছিল আমাকে হত্যা করার জন্য। সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অন্ধকারে আত্মগোপন করে থাকতে আমি বাধ্য হয়েছি। ওই ভয়াবহ দুঃসময়েও আমি দেশ ত্যাগ করার মতো দুঃস্বপ্ন দেখিনি। আর দেশের দুঃসময় এখন কত ভয়ংকর, কত বীভৎস হলে সব ব্লগাররা বাঁচার জন্য দেশ ত্যাগ করতে চাইছে! এই দুঃসময় অনুমান করাও বোধহয় আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
ব্লগারদের অনেকে এখন ইওরোপ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ থেকে প্রগতিশীল আর শিক্ষিত-সচেতন মানুষগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে। অভিমানে, ক্ষোভে, ভয়ে, হতাশায় দেশের প্রতিভা আজ দেশের বাইরে পাড়ি দিচ্ছে। দেশ কি জানে দেশের কতটুকু সর্বনাশ হচ্ছে দিনদিন?
সরকার কিন্তু চাইলেই এই ক্ষতি রুখতে পারতো। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর তো একটিই কাজ, কী করে ছলে বলে কৌশলে গদিতে বসে আরাম করা যায়, লুঠতরাজ করা যায়, ধর্মান্ধদের আরও ধর্মান্ধ করা যায়, অচেতনকে আরও অচেতন করা যায়, অসৎকে আরও অসৎ করা যায়, প্রতারককে আরও বড় প্রতারক বানানো যায়। সরকারের চরিত্র এখনও যেমন ছিল তেমনই। সামান্যও শুধরায়নি কেউ। ধর্ম যেমন ধর্মান্ধ পোষে, দল তেমন দলান্ধ পোষে। রাজনৈতিক দলে এবং ধর্মে আজকাল খুব একটা তফাত দেখি না। ধর্মগুলো দিন দিন রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। আর, রাজনৈতিক দলগুলো দিন দিন ধর্মীয় হয়ে উঠছে। ধর্ম টিকিয়ে রাখছে রাজনীতিকে। রাজনীতি টিকিয়ে রাখছে ধর্মকে। চমৎকার বন্ধুত্ব তাদের। শুধু বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
দেশটির ভবিষ্যত কী মাঝে মাঝে ভাবি। দেশে কারা বাস করবে শেষ অবধি? বেশির ভাগ ধনীরা আমেরিকায় চলে যায়। মধ্যবিত্তরা এশিয়া বা ইওরোপের কোনও দেশে। গরিবরা যায় ভারতে। শুধু সেই ধনীরাই দেশে বাস করছে, যারা দেশটাকে প্রাণভরে লুঠ করতে পারছে। শুধু সেই দরিদ্ররাই দেশে বাস করছে, যারা কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছে না দেশ ছাড়ার। শুধু সেই মধ্যবিত্তরাই দেশে বাস করছে, যারা নিজেরা ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এ-ই বেশির ভাগের চিত্র। বাকি যারা দেশকে ভালোবেসে দেশে বাস করে, তাদের সংখ্যাটা ক্রমাগত কমে আসছে, সংখ্যাটা শূন্যে এসে ঠেকলেও আমি অবাক হবো না।
ইওরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছে প্রগতিশীল ব্লগাররা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। জানিনা তারা কতদিন আর বাংলায় ব্লগ লিখবে! দেশ থেকে সহস্র মাইল দূরে বসে দেশের কথা লেখার উৎসাহ হয়তো একদিন হারিয়ে ফেলবে। সভ্য দেশগুলো দেশের প্রতিভাবান নাগরিকদের মাথায় তুলে রাখে। বাংলাদেশ তাদের চূড়ান্ত অসম্মান করলো। তাদের হারালো বাংলাদেশ। দেশের সম্পদকে পায়ে ঠেলছে দুর্ভাগা দেশ।
বাংলাদেশকে দেশ বলে ডাকতে আমার আর রুচি হয় না। দেশ মানে আমি নিরাপত্তা বুঝি। যে মাটিতে আমার নিরাপত্তা নেই, সে মাটি আমার দেশ নয়। বাংলাদেশ আসলে কাদের দেশ হয়ে উঠছে? বাংলাদেশ জেনেবুঝে এক পাল অশিক্ষিত, মূর্খ, নারীবিদ্বেষী, ধর্মান্ধদের দেশ হয়ে উঠছে। আমার লজ্জা হয়। হলে কী হবে, সরকারের তো হয় না।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

তসলিমা নাসরীন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Alternative Text