নামের সঙ্গে উপাধি ও পদবির যোগ থাকাটা সাধারণ ঘটনা, রফিকুল হকের নামের সঙ্গেও একটি উপাধি আছে, তবে সেটা বংশগত নয়, পারিবারিকও নয়, সামাজিক। রফিকুল হক দাদুভাইয়ের কাজটা কিশোর সমাজকে নিয়ে, তাদের কাছে তিনি দাদুভাই। রফিকুল হক কিশোরদের জন্য ছড়া ও গল্প লিখেছেন। বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র কিশোর-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘কিশোর বাংলা’ সম্পাদনা করেছেন। তিনি কিশোরদের সংগঠন চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ছিলেন। এই তিনটি কাজের কোনোটিই সহজ ছিল না, এখন তো আরও কঠিন। কিশোরদের জন্য এবং তাদের নিয়ে কিছু করতে বড়রা এগিয়ে আসেন না, কারণ এ কাজে সম্মান, প্রতিষ্ঠা, পুরস্কার ইত্যাদি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে না। কিশোররা তো কিছুই দিতে পারে না, এক ভালোবাসা ছাড়া। দাদুভাইকে তারা সেটিই দিয়েছে, তাকে তারা আপনজন ভেবেছে। সেই পাওয়াটাই তার জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিল। তিনি কিশোরদের ভালোবাসেন। তার নিজের ভেতরও একজন কিশোর ছিল, এখনও আছে। এই দেশে এক সময়ে কয়েকটি সজীব কিশোর সংগঠন ছিল। মুকুল ফৌজ, কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর, চাঁদের হাট_ এরা কিশোরদের টানত, তাদের আনন্দ দিত, সৃষ্টিশীল ও সামাজিক করে তুলত। ও রকমের সংগঠন আরও অনেক দরকার ছিল। সে প্রয়োজন মেটেনি, বরং ওই সংগঠনগুলোও এখন আর আগের মতো নেই, কোনো কোনোটা হারিয়ে গেছে, অন্যগুলো নিষ্প্রাণ। এরা যে প্রাণশক্তি হারিয়েছে তার প্রধান কারণ কিশোরদের প্রতি সামাজিক উপেক্ষা। গরিব পরিবারের শিশুরাই সংখ্যায় অধিক, তারা আদর-যত্ন পায় না। অপরদিকে বিত্তবান ঘরের সন্তানেরা অধিক যত্নে ভারাক্রান্ত থাকে। স্কুল-কলেজে পড়ার চাপ যত না বইয়ের চাপ ততধিক। কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটিতে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত। তাদের জন্য খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিসর নেই। বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের অন্তত ছয় কোটিই শিশু-কিশোর। তাদের জন্য চিন্তা করা দেশের ভবিষ্যতের জন্যই চিন্তা করা। অভিভাবকদের নিজেদের জীবনেও সামাজিকতার অভাব। মানুষের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিচ্ছিন্নতা। দৃশ্য-অদৃশ্য দেয়ালের পর দেয়াল উঠছে। দরজায় দরজায় পাহারাদার। প্রযুক্তির সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু কিশোরদের জগৎটা কেবলি সংকীর্ণ হচ্ছে, তাদের বিনোদন আটকা পড়েছে ছোট ছোট ঘরের অতি ক্ষুদ্র সব পর্দায়। এখন হাতেলেখা পত্রিকা নেই, দেয়াল পত্রিকা বিলুপ্তির পথে, কিশোরদের প্রাণ মাতাবে এমন প্রকাশনা নেই। দৈনিকের কিশোর পাতাগুলোর কাঁচুমাঁচু অবস্থা, যেন অপরাধ করেছে। শিশু-কিশোররা এখন লেখে না, বড়জোড় ছবি আঁকে। রচনা ও চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতায় চিত্র যদি পাওয়া যায় বারশ’, রচনা আসে তিনশ’। এসব ঘটছে পুঁজিবাদের দুষ্ট শাসনের কারণে। নদীর উপমা ও তুলনা আমরা বেশ ব্যবহার করে থাকি। কিশোরদের বেলাতেও ব্যবহার করা যায়। কৈশোরে হওয়ার কথা নদীর মতো সজীব ও সতেজ; কিন্তু আমাদের নদীগুলো তো যাচ্ছে শুকিয়ে, দূষিত হচ্ছে পানি, দখল হয়ে যাচ্ছে তাদের প্রবাহ। নদীর শত্রু ও কিশোরদের শত্রু আসলেই এক ও অভিন্ন। নাম তার পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ দখল করে, নষ্ট করে। ছাড় দেয় না, কোনো ধরনের। কিশোরের জন্য ভাবা, লেখা, সংগঠন গড়া, পত্রিকা সম্পাদনা_ সব কিছুই আসলে পুঁজিবাদ বিরোধিতা। রফিকুল হক দাদুভাই ঠিক এই কাজটিই করেছেন এবং করার জন্য অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, করাটা যে প্রয়োজন সেটা বুঝিয়েছেন। তার লেখা ছড়া আমি আগেও পড়েছি; সম্প্রতি পড়লাম ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’। ছড়ার ভেতর বিস্তর মজা থাকে, রফিকুল হকের ছড়ায় সেটা বিশেষভাবেই আছে। ছন্দের মিল, কৌতুক, প্রাণবন্ত চলমানতা, কৌতূহল_ এসব গুণে ছড়াগুলো গুণান্বিত। দুটি উদ্ধৃতি দেওয়া যাক। ‘হাসি’ নামের ছড়াটিতে পড়লাম, হাসি চাই হাসি ঢেলে দিতে পৃথিবীতে সুধা রাশি রাশি। [হাসি :আমপাতা জোড়া জোড়া] এমনটা তিনি চান, কিশোররা সবাই যেন হাসি চাইতে না ভোলে এবং পেতে যাতে সমর্থ হয় সেটা আমাদের দেখা দরকার। ‘সময়’ নামের ছড়াটিতে আছে, সময় কারো আটকে থাকে গলায় সময় আবার সাহস দেবে চলায়। [সময় :নেবুর পাতা করমচা] কথাটা সত্য। সময় আমাদের গলাতে আটকে আছে এবং সময় আবার সাহস দিচ্ছে চলার। এ ব্যাপারটা দাদুভাইয়ের গ্রন্থাকারে প্রকাশিত বড় গল্প ‘একাত্তরের বিচ্ছু বশির’-এ খুব পরিষ্কারভাবে রয়েছে। একাত্তর সালে বশির মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিল, নানা রকমের সাহায্য দিত। যুদ্ধের সময়েই পাকিস্তানি হানাদাররা বশিরদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়, তার বাবা-মাকেও মেরে ফেলে। দশ বছর পর ১৯৮২ সালে সেই কিশোরকে দেখা গেল ঢাকার বায়তুল মোকাররমে কাগজের ব্যাগ বিক্রি করছে। দাদুভাই মন্তব্য করেন না, কিন্তু আমরা বুঝি যে বশিরের জন্য সময় একটা দুঃসময় ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। তবু সে দমেনি, ভেঙে পড়েনি, নিরাশ্রয় অবস্থায় ঢাকায় এসেছে, বায়তুল মোকাররমে ব্যাগ বিক্রি করে বাঁচার চেষ্টা করছে। বাস্তবতা এটাই। কিশোররা বাঁচতে চায়, তাদের বাঁচার অধিকার আছে। কিশোরদের জন্য যারা কাজ করেন তারা সবাই এ কথাটা জানিয়ে দিন। দাদুভাইও দিয়েছেন, তার কাজের মধ্য দিয়ে। তার মতো মানুষ এ দেশে অনেক অনেক প্রয়োজন। দাদুভাইকে তার জন্মদিনে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। – See more at: http://bangla.samakal.net/2016/01/08/184773#sthash.bpWYQsIT.dpuf
Related Articles
নজরুলের ‘জয় বাংলা’
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, সুরমা-ধলেশ্বরী-কর্ণফুলী, আরো কতো-শত নদনদীবাহিত, পলিগঠিত এই বঙ্গীয় অববাহিকা। অনাদিকাল থেকে এই ব-দ্বীপভূমিতে বিবর্তমান মানবগোষ্ঠির স্বাতন্ত্র্যসূচক অভিধার নাম বাঙালি। আর তার বসতভূমির নাম বাংলা নামের দেশ। ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী ধারাবাহিকতায় পূর্বদৃষ্টান্তরহিত এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম-জাতিরাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়ার মুহূর্তে তার সাংবিধানিক নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। এ-কারণে এই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের কাছে ‘নদী বা ব-দ্বীপ বা পলি’-র […]
শীতের কাব্যবয়ান
পৌষ যায় যায়, এখনো মাঘ আসেনি। শীত এসেছে, এখনো আসেনি শীতের বাঘ। যে বাঘের কামড়ে কাঁপন জাগে সুন্দরবনের ডোরাকাটা বাঘের হাড়েও। কাঁপন জাগতে শুরু করেছে আমারও ষাটোত্তর হাড়ে। এখন সকাল এগারোটা, পৌষের শেষ সপ্তাহ। আমার পুস্তকাকীর্ণ লেখার টেবিলে বসে বন্ধ করে দিয়েছি পাশের কাচের জানালা। খুললেই আসছে শীতের মৃদুমন্দ তীর। ত্বকের উপর কেমন যেন ভালো-লাগা […]
অভিমানী আঙুল আমার
সহস্র অভিমানী জীবন আমাদের। হাজারো পরিচয় আর সম্পর্কের বেড়াজালে বেড়াতে বেড়াতে ভুল হয়ে যায়। কিছু ভুল থেকে যায় মনের আড়ালে। অনেক না পাওয়া, অনেক ভুল বোঝাবুঝি আর অনেক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যুতে সেসব সম্পর্কগুলো অভিমানের জন্ম দেয়। আমরা অভিমানী হয়ে যাই হাজারো নিয়মে। কখনও কখনও অনিয়মেও। পৃথিবীর কোনো সূত্র, কোনো মনোবিজ্ঞান দ্বারাই হয়তো সে অভিমানের আঙুল ছুঁতে […]


