কবিতা

বিপ্লব

মনজুর এলাহীর বাগানে,
ছায়াচ্ছন্ন সন্ধ্যায় বসেছিলাম আমরা
কয়েকজন। কথা হ’লো, অনেক ধরনের
কেউ বললেন বঙ্গবন্ধুর কথা,
সেই প্রসঙ্গে নিহত এ্যালেন্দে এবং
চিলিতে সামরিক উত্থানের ইতিহাসও
উল্লেখ করলেন কেউ কেউ। বলা বাহুল্য
ইরাক ইরানের কথাও উঠলো। ক্যাস্ট্রোর পর
কিউবার অনিশ্চিত ভবিষ্যত
বিশ্বব্যাপী অস‍‌‌‌ৎ বণিকদের দাপট,
এবং বাংলার বিপন্ন মানুষ
নিরন্ন আজীবন- এইসব কথা বলাবলি
করলাম আমরা কাজুবাদাম আর
কফি খেতে খেতে। ক্রমশ রাত্রি নেমে এলো
কালো বেড়ালের মতো নি:শব্দ পায়ে।
টেবিল চেয়ারগুলো ঘিরে জোনাকিরা
জ্বলতে লাগলো – যেন চিরকালটা এরকম
জ্বলতে থাকবে তারা। আমরা উঠে গেলাম
ডিনার টেবিলে।
মনজুর এলাহী আবার বললেন: বন্দুকের নলই
শক্তির উৎস। রক্তপাত ছাড়া শ্রেণীসাম্য প্রতিষ্ঠা
অসম্ভব, অনায়াসে কেউ শ্রেণীস্বার্থ ছেড়ে দেয় না।

আমি খোলা জানালা থেকে দেখলাম
মনজুর এলাহীর গোটা বাগান
জোনাকিরা দখল করে নিয়েছে-
বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে।

শহীদ কাদরী
শহীদ কাদরী
জন্ম: ১৪ই আগস্ট, ১৯৪২ বাংলাদেশের একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।কবি শহীদ কাদরী ৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে তিনি এখন আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। পঞ্চাশ উত্তর বাংলা কবিতা ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম করা যায় কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং কোথাও কোন ক্রন্দন নেই এই তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি শহীদ কাদরী বাংলার কবিতায় একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে উঠে কবি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ঠিক তখনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমালেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কবি তাঁর ঠিকানাটি বেছে নিলেও দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা স্মৃতিগুলো সবসময় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, এক ধরনের নস্টালজিক আবেগ তাড়িত করে বেড়ায় ।