কবিতা

প্রেম

We must Love one each other or die–W.H.Auden

না, প্রেম সে কোন ছিপছিপে নৌকো নয়-
যার চোখ, মুখ, নাক ঠুকরে খাবে
তলোয়ার-মাছের দঙ্গল, সুগভীর জলের জঙ্গলে
সমুদ্রচারীর বাঁকা দাঁতের জন্যে যে উঠেছে বেড়ে,
তাকে, হ্যাঁ, তাকে কেবল জিজ্ঞেস ক’রো, সেই বলবে
না, প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়,
ভেঙে-আসা জাহাজের পাটাতন নয়, দারুচিনি দ্বীপ নয়,
দীপ্র বাহুর সাঁতার নয়; খড়কুটো? তা-ও নয়।
ফুসফুসের ভেতর যদি পোকামাকড় গুঞ্জন ক’রে ওঠে
না, প্রেম তখন আর শুশ্রূষাও নয়; সর্বদা, সর্বত্র
পরাস্ত সে; মৃত প্রেমিকের ঠান্ডা হাত ধ’রে
সে বড়ো বিহ্বল, হাঁটু ভেঙে-পড়া কাতর মানুষ।
মাথার খুলির মধ্যে যখন গভীর গূঢ় বেদনার
চোরাস্রোত হীরকের ধারালো-ছটার মতো
ব’য়ে যায়, বড়ো তাৎপর্যহীন হ’য়ে ওঠে আমাদের
উরুর উত্থান, উদ্যত শিশ্নের লাফ, স্তনের গঠন।

মাঝে মাঝে মনে হয় শীতরাতে শুধু কম্বলের জন্যে,
দু’টো চাপাতি এবং সামান্য সব্জীর জন্যে
কিংবা একটু শান্তির আকাঙ্ক্ষায়, কেবল স্বস্তির জন্যে
বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে
অনায়াসে বিক্রি ক’রে দিতে পারি-অবশ্যই পারি।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই স্বীকারোক্তির পর মনে হলো;
হয়তো-বা আমি তা পারি না-হয়তো আমি তা পারবো না।

শহীদ কাদরী
শহীদ কাদরী
জন্ম: ১৪ই আগস্ট, ১৯৪২ বাংলাদেশের একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।কবি শহীদ কাদরী ৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে তিনি এখন আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। পঞ্চাশ উত্তর বাংলা কবিতা ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম করা যায় কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং কোথাও কোন ক্রন্দন নেই এই তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি শহীদ কাদরী বাংলার কবিতায় একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে উঠে কবি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ঠিক তখনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমালেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কবি তাঁর ঠিকানাটি বেছে নিলেও দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা স্মৃতিগুলো সবসময় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, এক ধরনের নস্টালজিক আবেগ তাড়িত করে বেড়ায় ।