কবিতা

যদি আমায় তুমি ভুলে যাও

অনুবাদ:ইমন জুবায়ের

একটি কথা আমি তোমাকে
জানিয়ে দিতে চাই ।
তুমি কি জান
আমি যখন আমার জানালার বাইরে
মন্থর হেমন্তের লাল ডালে
স্ফটিক চাঁদটির দিকে তাকাই,
যদি ছুঁয়ে দিই
আগুনের কাছটিতে
অবোধগম্য কিছু ছাই
কিংবা কাটা গুঁড়ির বৃত্তাকার শরীর-
এসবই তোমার নিকটে আমায় বহন করে নিয়ে যায়,
যেনবা- যা কিছু অস্তিত্বশীল,
সুগন্ধ, আলো, কিংবা ধাতুসমূহ,
যেনবা ছোট্ট নৌকা
যা বইছে
আমার জন্য অপেক্ষমান তোমার দ্বীপ অভিমূখে
ঠিক আছে, এখন,
যদি অল্প অল্প করে আমায় ভালোবাসা কমিয়ে দাও
আমিও অল্প অল্প করে তোমায় ভালোবাসা কমিয়ে দেব।
সহসা
তুমি আমায় ভুলে গিয়ে
আমার দিয়ে চেও না,
কেননা, এরই মধ্যে আমি তোমায় ভুলতে বসেছি।
যদি তুমি অনেকক্ষণ ধরে এসব ভাব আর পাগল হয়ে যাও-
পতাকার বাতাস
যা বয় আমার জীবনের মধ্য দিয়ে,
আর তুমি সিদ্ধান্ত নাও
আমায় ছেড়ে যাবে হৃদয়ের পাড়ে
যেখানে আমার শিকড়,
মনে রেখ যে:
ঐ দিনে,
ঐ মুহূর্তে,
আমি আমার হাত তুলব
আর আমার শিকড় যাত্রা করবে
অন্য কোনও ভূমির সন্ধানে।
কিন্তু,
প্রতি দিনে
প্রতি প্রহরে
তুমি অনুভব করবে আমিই তোমার
নিষ্ঠুর মধুর নিয়তি …
যদি প্রতিদিন একটি ফুল
আমায় খুঁজতে বেড়ে ওঠে তোমার ঠোঁটের দিকে-
আহ্ আমার প্রেম, আহ্ আমার আমি,
আমার ভিতরে সমস্ত আগুন পুর্নবার হয় আবর্তিত
আমার ভিতরে নিভে যায়নি কিছুই, কিংবা হয়নি বিস্মৃত
আমার প্রেম তোমার প্রেম পেয়ে বাঁচে, প্রিয়তম,
আর আমাকে পরিত্যাগ না করে যতদিন বাঁচবে
তোমার আলিঙ্গনে রবে আমার প্রেম।

পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা (১২ জুলাই, ১৯০৪ – ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) ছিলেন চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। কৈশোরে তিনি এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম গ্রহণের পশ্চাতে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলি নিজের পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর পিতা ছিলেন কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চাইতেন তাঁর পুত্র কোনো "ব্যবহারিক" পেশা গ্রহণ করুক। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপায়ার-এর মতো কামোদ্দীপনামূলক কবিতা সংকলন, তেমনই রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহারও। ১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে "বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি" বলে বর্ণনা করেন।[১] ১৯৪৫ সালের ১৫ জুলাই, ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাকিম্বু স্টেডিয়ামে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা লুইস কার্লোস প্রেস্টেসের সম্মানে ১০০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেন নেরুদা।[২] নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর চিলিতে ফিরলে সালভাদর আলেন্দে এস্ত্যাদিও ন্যাশোনালে ৭০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।[৩] জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ট সহকারীতে পরিণত হন। চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পিনোচেট নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দেননি। যদিও হাজারে হাজারে শোকাহত চিলিয়ান সেদিন কার্ফ্যু ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টি পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে।