অন্তরে উপন্যাস

অন্তরে

আপনি কোথায়?
আপনি কোথায়?

ফোনে হ্যালো ইত্যাদি না বলে সরাসরি এরকম প্রশ্ন, জয় একটু থতমত খেল। তারপরই বুঝে গেল ফোনটা কার। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা হাসি হাসি হয়ে গেল তার, গলার স্বর রোমান্টিক হয়ে গেল। মিলা?

তো কে?

কোত্থেকে?

টেলিফোনের দোকান থেকে। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর কই?

কোথায় আমি?

হ্যাঁ।

উত্তরায়।

ওখানে কী করছেন?

সুপারভাইজারি।

মানে?

সুপারভাইজারি মানে জানো না? তদারকি।

বুঝলাম। কিসের তদারকি করছেন আপনি?

বাড়ির।

মিলা বুঝে গেল উত্তরায় যে বাড়ি তৈরি করছেন জয়ের বাবা সে বাড়ির কাজ দেখতে গেছে জয়। এরকম প্রায়ই যায় সে। সারাদিন কাটিয়ে দেয় ওই। বাড়িতে। পরিচয়ের পর বার তিনেক ওই বাড়িতে বসে মিলার ফোন রিসিভ করেছে সে।

কিন্তু আজ এতদূরে আছে জয় এটা তেমন ভাল লাগল না মিলার। বিরক্ত হয়ে বলল, ইস, অতদূরে গেছেন কেন? কাছাকাছি কোথাও থাকতে পারলেন না?

জয় হাসল। কাছাকাছি থাকলে কী হতো?

দেখা হতে পারত।

তাই নাকি?

তো কী!

কী সৌভাগ্য আমার! সত্যি বলছ?

এখনও পর্যন্ত মিথ্যে কথা আপনার সঙ্গে আমি বলিনি।

কবে বলবে?

কখনই না।

কেন?

মিথ্যে বলতে আমি খুব অপছন্দ করি।

একথা সবাই বলে। তারপরও নানাভাবে প্রচুর মিথ্যে বলে।

আমি বলব না।

বলো অন্তত আমার সঙ্গে বলবে না।

আপনার সঙ্গে নয়, কারও সঙ্গেই বলবে না।

বলবে তো বটেই। এবং আজই বলবে।

কার সঙ্গে?

তোমার মা বাবার সঙ্গে কিংবা বাড়ির অন্য কারোর সঙ্গে।

কী ভাবে?

ধরো তোমার মা বাবা কিংবা গার্জিয়ান ধরনের কেউ ঠিক এই সময়টার কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করল। এই সময়টায় তুমি কী করছিলে। তুমি কি সত্য কথা বলবে? বলবে যে বান্ধবীর প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে কথা বলছিলে। এবং কথাও মোটামুটি রোমান্টিক ধাঁচের।

বান্ধবীর প্রাক্তন প্রেমিক কথাটা শুনে বিরক্ত হলো মিলা। রুক্ষ গলায় বলল, আমার এত পয়সা নেই যে ফোনের দোকান থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল টু মোবাইল ফালতু কথা বলব।

জয় বুঝে গেল মিলা রেগেছে। বলল, সরি। জরুরী কথাটাই বলো।

এখন আর বলার মুড নেই।

প্লিজ বলো, প্লিজ।

মিলা চুপ করে রইল।

জয় বলল, তুমি কি তোমাদের বাড়ির ওখান থেকে ফোন করেছ?

না।

তাহলে কোথায় তুমি?

ইস্কাটনে।

ওখানে কী?

আমার বান্ধবী মুন্নিদের ফ্ল্যাট। ওর কাছে এসেছিলাম একটু দরকারে। কিন্তু মুন্নি নেই।

ফোন করে আসনি?

না। ওকে না পেয়ে আপনাকে ফোন করলাম। অন্য রকমের একটা প্ল্যান ছিল, আপনার কথা শুনে মুড অফ হয়ে গেছে।

সেজন্য সরি বললাম তো বাবা।

মিলা চুপ করে রইল।

জয় বলল, প্ল্যানটা বল।

ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করব।

সত্যি?

সত্যি।

আমি তাহলে আসি।

কোথায়?

ইস্কাটনের কাছাকাছ কোথাও।

এদিকে কোথায় আসবেন?

তুমি বলো।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কোনও চায়নিজ রেস্টুরেন্টে?

না, রেস্টুরেন্টে বসতে আমার খুব বিশ্রি লাগে। কে কোথা দিয়ে দেখে ফেলবে?

এই সম্ভবনা সব জায়গায়ই থাকবে।

তা ঠিক।

কিন্তু দেখা করতে হলে কোথাও না কোথাও…।

কথাটা শেষ না করে স্বর বদলালো জয়। তুমি সাহস দিলে একটা কথা বলতে পারি।

বলুন।

রাগ করবে না তো?

না।

প্রমিজ?

প্রমিজ।

আমার এখানে চলে আস।

আপনার ওখানে মানে?

উত্তরার এই বাড়িতে।

মিলা চমকাল। কী?

হ্যাঁ।

কথাটা আপনি ভাবলেন কী করে?

কেন, অসুবিধা কী?

অসুবিধা যে আসলে কী মিলা ঠিক বুঝতে পারল না। একটু থতমত খেল। তারপর বলল, যে বাড়ির কনস্ট্রাকশন চলছে সেই বাড়িতে লোক যায় কী করে?

ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায়। বাড়িটা আমরা তিনতলা করব। একতলাটা প্রায় কমপ্লিট। নিজের মোটামুটি সুন্দর একটা রুম আছে আমার। আমি তো এখন সেই রুমে বসেই তোমার সঙ্গে কথা বলছি। সঙ্গে এটাচড বাথ। একটা এসিও লাগানো হয়েছে রুমে।

এটাচড বাথ শুনে একটু ভাবল মিলা। জয় কি অন্যরকমের কোনও ইঙ্গিত দিল?

মিলার স্বভাব হচ্ছে যে কোনও কথাই সরাসরি বলা। এটাও বলল, আপনি কি অন্যকিছু মিন করলেন?

জয় একটু থতমত খেল। অন্যকিছু মানে?

এটাচড বাথ মানে কী?

এটাচড বাথের আবার মানে কী? রুম সংযুক্ত বাথ।

তা আমি বুঝেছি।

তাহলে?

মেয়েদের কাছে এটাচড বাথের অন্যরকম একটা অর্থ আছে। মানে কথাটা অন্যরকমের ইঙ্গিত বহন করে।

জয় হাসল। আমি সেই অর্থে বলিনি।

তাহলে কোন অর্থে বলেছেন?

আমি আসলে আমাদের বাড়ির অবস্থাটা তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি। আমার রুমের অবস্থাটা বোঝাতে চেয়েছি। তুমি যদি এখানে আস তোমার কোনও রকমের অসুবিধা হবে না, এটা বোঝাতে চেয়েছি। তাছাড়া বাথরুম জিনিসটা মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

জয়ের কথা বলার ধরনে মিলার মনে হলো অতি সরল ভঙ্গিতে কথাগুলো সে বলেছে। এই ধরনের মানুষদের চালিয়াতি কম থাকে।

তাহলে মিলা এখন কী করবে?

যাবে জয়ের ওখানে?

এখন এগারোটা বাজে। এখান থেকে স্কুটারে উত্তরায় যেতে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। অর্থাৎ সবমিলে প্রায় বারোটা। বাড়িতে সে বলে এসেছে তিনটায় ফিরবে। তার মানে উত্তরা থেকে তাকে আবার স্কুটারে চড়তে হবে দুটোর দিকে। সবমিলে ঘণ্টা দুয়েক জয়ের সঙ্গে কাটানো যাবে। মন্দ কী! তাছাড়া জয়ের পরীক্ষাটাও আজ সে নিয়ে ফেলতে পারবে।

মিলা বলল, আসতে পারি, কিন্তু আমার দুএকটা শর্ত আছে।

জয় হাসল। শর্তগুলো আমি জানি।

বলুন তো।

তুমি বলো।
বলেই বলল, না না তুমি বলো না। তুমি টেলিফোনের দোকান থেকে ফোন করেছ। নিশ্চয় দোকানে লোজন আছে। তারা শুনে ফেলবে।

সঙ্গে সঙ্গে জিভ কাটল মিলা। আড়চোখে দোকানের লোকজন দেখে নিয়ে বলল, ঠিক বলেছেন। আপনি খুব সার্ফ। তাহলে আপনিই বলে দিন না কী বলতে চাইছি আমি।
বলতে চাইছ, একা একটি রুমে পেয়ে আমি যেন তোমার সঙ্গে কোনও অশোভন আচরণ না করি, তোমার হাত টাত না ধরি, চুমু খাওয়ার চেষ্টা না করি।

অথবা তারচেও বেশি কিছু…। কথা শেষ করল না মিলা।

জয় বলল, আমি অত খারাপ লোক নই। তুমি না চাইলে জীবনেও তোমাকে স্পর্শ করব না আমি।

সুমিকেও কি এভাবেই বলেছেন?

কথা অন্যদিকে ঘোরাল জয়। তার আগে বলো, তুমি কি আসবে? যদি আস তাহলে আর সময় নষ্ট করো না। আর যদি না আস তাহলে যতক্ষণ ইচ্ছে টেলিফোনে কথা বলতে পার, আমার কোনও অসুবিধা নেই।

সামান্য সময় কী ভাবল মিলা তারপর বলল, আমি আসছি। বাড়ির ঠিকানাটা বলুন।

জয় ঠিকানা বলল। লোকেশান বুঝিয়ে দিল।

ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন (জন্ম সেপ্টেম্বর ৮, ১৯৫৫) বাংলাদেশের একজন কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। তিনি গল্প, উপন্যাস এবং নাটক এই তিন শাখাতেই জনপ্রিয় রচনা উপহার দিয়েছেন। কিশোর বাংলা নামীয় পত্রিকায় শিশুতোষ গল্প লিখে তার সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৭ খৃস্টাব্দে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় '‍সজনী‌'‍ নামীয় একটি ছোট গল্প লিখে পাঠকের দৃষ্টি আর্কষণ করতে শুরু করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম গিয়াসুদ্দিন খান এবং মার নাম আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৭২ সালে পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৭৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকেই স্নাতক (সম্মান) সম্পূর্ণ করেন। কর্মজীবনঃ ইমদাদুল হক মিলন লেখক হিসেবে এপার-ওপার দুই বাংলায়ই তুমুল জনপ্রিয়। দুই বাংলায়ই তার 'নূরজাহান' উপন্যাসটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কন্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। সাহিত্যকৃতিঃ তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২ শত। অধিবাস, পরাধীনতা, কালাকাল, বাঁকাজল, নিরন্নের কাল, পরবাস, কালোঘোড়া, মাটি ও মানুষের উপাখ্যান, পর, কেমন আছ, সবুজপাতা, জীবনপুর প্রভৃতি তার বিখ্যাত বই। নাটকঃ তার লেখা দেড়শতাধিক নাটকের মধ্যে কোন কাননের ফুল, বারো রকম মানুষ, রূপনগর, যুবরাজ, কোথায় সেজন, আলতা, একজনা, নীলু, তোমাকেই, ছোছা কদম, আঁচল, খুঁজে বেড়াই তারে, কোন গ্রামের মেয়ে, মেয়েটি এখন কোথায় যাবে, বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ ১৯৮৬: বিশ্ব জ্যোতিষ সমিতি পুরস্কার। ১৯৮৭: ইকো সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২: হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২ : বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৩: পূরবী পদক। ১৯৯৪: বিজয় পদক। ১৯৯৫: মনু থিয়েটার পদক। ১৯৯৫: যায়যায়দিন পত্রিকা পুরস্কার। ১৯৯৬: ঢাকা যুব ফাউণ্ডেশন পদক। ২০০২: বাচসাস পুরস্কার। ২০০৪ : জিয়া শিশু একাডেমী কমল পদক। এস এম সুলতান পদক জাপান রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড মাদার তেরেসা পদক এছাড়াও, কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখায় 'চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক' লাভ করেন।এছাড়া ২০০৬ সালে জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'তাকেশি কায়েকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটারস লেকচার সিরিজে' বাংলাভাষার একমাত্র লেখক হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। জাপানের চারটি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য এবং তার নিজের লেখা নিয়ে বক্তৃতা করেন। এশিয়ার লেখকদের জন্য এ এক বিরল সম্মান। পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার আইআইপিএম-সুরমা চৌধুরী মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড।