ওয়েনগঙ্গা

সন্ধে হতে বেশি দেরি নেই। এদিকে ঘন কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি রাস্তাটা এঁকে বেঁকে গেছে। বৈশাখের প্রথম। বৃষ্টি হবে কিন্তু তার আগে খুব জোর ঝড় উঠেছে। পথের দুপাশের জঙ্গলের নানা গাছগাছালির শাখা-প্রশাখা খুব জোরে জোরে আন্দোলিত হচ্ছে। গাড়ি নিয়েছিল ক্ষৌণীশ নাগপুর এয়ারপোর্ট থেকে। ঘণ্টাখানেক যাওয়ার পরেই গাড়ির আর্মেচার জ্বলে যায়। পথ পাশের একটি মোটর মেরামতির কারখানাতে তা সারাতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক লাগে। ও যাবে অনেক দূরের গড়চিরোলিতে। মনে হচ্ছে অনেক রাত হয়ে যাবে পৌঁছতে। এ অঞ্চলে আজকাল আবার মাওবাদীদের খুবই দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। গড়চিরোলি এবং দন্ত্যেওয়ারাতে প্রায়ই মাওবাদী হামলা হয়। ড্রাইভার শান্তারাম বেশ ভীত হয়ে আছে। অন্ধকার হয়ে গেলে তো কিছু দেখাও যাবে না। অথচ গড়চিরোলি পৌঁছতে পৌঁছতে গভীর রাত হয়ে যাবে। কী করবে তা ক্ষৌণীশ বুঝে উঠতে পারছে না। ওদের কোম্পানি এই অঞ্চলে একটি নতুন থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট বসাবে। যে জন্য তাদের কোম্পানির বেশ কজন জুনিয়র অফিসার গত পরশু দিন এখানে পৌঁছে গিয়ে ডেরা করেছে। ক্ষৌণীশ গিয়ে ব্যাপারটা ফাইনালাইজ করবে। জুনিয়ররা বলেছিল ওরা নাগপুর এয়ারপোর্টে আসবে ক্ষৌণীশকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ক্ষৌণীশ ইমেল পাঠিয়ে বলেছে অতখানি পথ এসে তাকে নিয়ে যেতে হবে না। এয়ারপোর্ট থেকেই গাড়ি নিয়ে চলে যাবে। ওদের সঙ্গে দুটি ভাড়ার গাড়িও ছিল কিন্তু তাতেও ও আপত্তি করেছে। আসলে আজকাল একা থাকার সুযোগই পায় না। এতখানি পথ এবং অচেনা পথ ভাবতে ভাবতে দেখতে দেখতে যাবে ভেবেছিল।

ওরা বারবার মোবাইলে ফোন করছে ক্ষৌণীশকে। ক্ষৌণীশ বলেছে ওদের চিন্তা করতে হবে না। তবে রাতে খাওয়ার আগে সম্ভবত পৌঁছতে পারবে না। রাতটা পথেই কোথাও কাটিয়ে দিয়ে কাল সকালে ওদের কাছে গিয়ে পৌঁছবে। তা শুনে ওরা আরও চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ক্ষৌণীশ ওকে নিয়ে ভাবতে হবে না বলে মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে। এবারে বৃষ্টি নামল খুব জোরে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপরে ঝড়ে ওড়া ফুল পাতা বৃষ্টির জলের সঙ্গে এসে পড়ছে। হেডলাইট জ্বেলেও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
শান্তারাম, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। গাড়িটা পথের বাঁদিকে দাঁড় করিয়ে দাও।
– ফাঁকা জায়গা না পেলে দাঁড় করানো যাবে না স্যার, এই ঘন বনের মধ্যে।
– কেন?
– যেমন ঝড় চলছে, গাছ পড়ে যেতে পারে গাড়ির ওপরে।
– সে তো গাড়ি চললেও পড়তে পারে।
– অবশ্য পারে। কিন্তু এমনিতেই এত দেরি হয়ে গেছে। পথে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলে তো আজ রাতের মধ্যেও পৌঁছনো যাবে না গড়চিরোলিতে।
– সে তো জানিই। কিন্তু পথে কোথাও থেকে রাতটা কাটিয়ে শেষ রাতে বেরোনো যায় না? পথে কোনও হোটেল বা বড় ধাবা-টাবা নেই?
– না স্যার। এই পথে কিছুই নেই। তাছাড়া, মাওবাদী ঝামেলার জন্যে এ পথে রাতের পরে কেউ যাতায়াতই করে না।
– ভাল করে ভেবে দ্যাখো। কোনও জায়গাই কি নেই?
– একটা ভাঙা ডাকবাংলো আছে কিন্তু চৌকিদার আছে কি না তা বলতে পারব না।
– যদি পথের ওপরেই পড়ে তবে একবার গিয়ে দেখলে হয় না।
– তা হয়। তবে থাকতে পেলেও বা খাবেন কী? চৌকিদার থাকলেও রান্না করতে পারে কি না তা কে জানে। তাছাড়া, রান্নার রসদও বা ওই দুর্যোগে পাবে কোথা থেকে?
– আরে যে থাকবে নিজে তো কিছু খায়, নাকি? সে যা খায় আমরাও তাই খাব। মোরগা আন্ডা কিছু তো পাওয়া যাবে। না পাওয়া গেলে চালে ডালে খিচুড়ি তো রেঁধে দিতে পারবে।
– জানি না স্যার। সে ডাকবাংলোর যা অবস্থা, তা মানুষ থাকার যোগ্য নয়, তাছাড়া, আপনার মতো রহিস আদমি বলে কথা।
– আমি রহিস নই। সব জায়গাতেই থাকার অভ্যেস আছে আমার। সাবধানে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাচ্ছিল শান্তারাম। সে বিড়বিড় করে বলল, বাংলোর সামনে দিয়েই বয়ে গেছে ওয়েনগঙ্গা নদী।
– কী গঙ্গা বললে?
– ওয়েনগঙ্গা। এ অঞ্চলের বিখ্যাত নদী। তবে ভারী সুন্দর নদী। সেই নদী পারাপার করে মাওবাদীরা আসে যায় বলেও শুনেছি।
– আরেব্বাস। তাহলে তো ভালই হয়। তাদের সঙ্গেও আলাপ করা যাবে যদি দেখা হয়ে যায়।
– আলাপ করবেন তাদের সঙ্গে? আপনি কি পাগল স্যার? তাদের নাম শুনেই মানুষ ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় আর আপনি তাদের সঙ্গে আলাপ করতে চান?
– চাইব না কেন? তারাও তো মানুষ। তাদের কী বলার আছে তাও তো শোনা যাবে।
– নির্জন ভাঙা ডাকবাংলোতে আপনাকে একা পেলে তো তারা আপনাকে খুন করে যাবে।
– খামোখা খুন করবে কেন? বাঘ-ভাল্লুক তো নয়, মানুষই তো। এত ভয়ের কী আছে?
– জানি না স্যার। আপনার মাথায় গোলমাল আছে। আপনি অন্য কারও মতোই নন।
– না শান্তারাম, ঠিকই বলেছ তুমি। আমি একেবারে আমারই মতো। বলতে বলতে বৃষ্টির তোড় কমল। গাছের ডাল পাতা থেকে বড় বড় জলের ফোঁটা টপ টপ করে গাড়ির বনেটে ও উইন্ডস্ক্রিনের ওপরে পড়তে লাগল। ক্ষৌণীশ বলল, গাড়ির এসিটা বন্ধ করে দাও আর কাচও নামিয়ে দাও। বৃষ্টিভেজা বনের গন্ধে নাক ভরে যাবে।
– জানালা খুললে কিরে-মাকড়ে ঢুকে পড়বে গাড়ির মধ্যে। খুবই তংক করবে আপনাকে।
– আর কতদূর এখান থেকে তোমার সেই ডাকবাংলো।
– তা মাইল দশেক তো হবেই।
– রাস্তা পুরোটাই এমন ভাল?
– হ্যাঁ। মহারাষ্ট্রের রাস্তাঘাট সব জায়গাতেই খুব ভাল। রাস্তা নিয়ে আপনার কোনও চিন্তা নেই, ড্রাইভার শান্তারাম বলল।
‘২’
জঙ্গল এবারে আগের থেকে একটু পাতলা হয়েছে মনে হল। আন্ডারগ্রোথ কম, বড় বড় গাছ আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ইতিমধ্যে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির মধ্যে চাঁদ উঠল সমস্ত বনকে রুপোঝুরি করে দিয়ে। কলকাতাতে তো পূর্ণিমা অমাবস্যা বোঝাই যায় না। আজ মনে হয় দ্বাদশী কি ত্রয়োদশী হবে। এই বৃষ্টিভেজা জঙ্গলে চাঁদের যে কি অপূর্ব শোভা!
নিজেই নিজেকে বলল ক্ষৌণীশ। ডাকবাংলোটা পথ থেকে প্রথমে দেখা যায়নি। তবে ওয়েনগঙ্গা নদীটা দেখা গেল দূর থেকে। চাঁদের আলোকে যেন ভাসছে। বাংলোর সামনেই একটা বাঁক নিয়েছে নদীটা। এখন বসন্তকাল। জল কম। তাই দুধারের উঁচু পাড় ছায়া ফেলেছে নদীর জলে। দুএকটা পাল তোলা নৌকাও দেখা গেল। কোনওটা ডানদিক থেকে বাঁদিকে যাচ্ছে, কোনওটা আসছে বাঁ দিক থেকে ডানদিকে। তবে দুএকটিই।
শান্তারাম গাড়িটাকে বাঁদিকে ডাকবাংলোর ভাঙা পিলারের গেট দিয়ে বাংলোর হাতার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। গেটের এক পাশে একটি প্রাচীন মহুয়া গাছ আর অন্য পাশে একটি শিমূল। সেও সুপ্রাচীন। দুটি কোটরা হরিণ শিমূল ফুল খাচ্ছিল। গাড়ির হেডলাইট তাদের গায়ে পড়তেই দু জোড়া চোখ ঝকঝক করে উঠল এবং তারাও জঙ্গলের গভীরে দৌড়ে ঢুকে গেল।
ক্ষৌণীশ আন্দাজ করেছিল যে ওগুলো কোটরা হরিণ কিন্তু চিড়িয়াখানার বাইরে কখনও দেখেনি ওই হরিণ। বন ভালবাসে ও কিন্তু বন বিশারদ তো নয়। শান্তারামকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, কোটরা।
ডাকবাংলোর হাতার মধ্যে শান্তারাম গাড়ি ঢোকাতেই ক্ষৌণীশ দেখল যে একটি ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাংলোর সামনে। সাদা রঙা। কী গাড়ি তা বুঝতে পারল না। আজকাল এত রকম নতুন গাড়ি এসেছে বাজারে যে কোনটা কী গাড়ি তা চট করে বোঝা যায় না।
গাড়িটা দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল ক্ষৌণীশের। গাড়ি মানেই ডাকবাংলোতে লোক আছে। তার মানে এখানে তার পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। তাছাড়া, রিজার্ভেশান-টিজার্ভেশান তো নেইই।
শান্তারামও চিন্তিত হল। কিন্তু তার গাড়িটা নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটার পেছনে লাগালো।
তারপর নেমে, চৌকিদারের খোঁজ করল। মহারাষ্ট্রের মতো সবদিক দিয়েই উন্নত রাজ্যে বিজলি বাতি নেই দেখে একটু অবাক হল ক্ষৌণীশ। এই বাংলোটি সত্যিই প্রায় পরিত্যক্ত- যেমন বলেছিল শান্তারাম। বাংলোর হাতাতেও নানা আগাছা গজিয়ে আছে। সাপ-খোপ থাকাও আশ্চর্য নয়।
শান্তারাম নেমে চৌকিদারের খোঁজ করতে গেল। ক্ষৌণীশ দরজা খুলে নেমে বাংলোটাকে দেখতে গেল ভাল করে।
দেখতে গিয়েই ওর চোখে পড়ল বাংলোর পেছন দিকে দুটি গাছে টাঙানো একটি পুরোনো নাইলনের দড়িতে একটি সায়া ও ব্রা ঝুলছে। সায়াটির রঙ হালকা হলুদ এবং ব্রা-এর রঙ সাদা।
দেখেই একটু হকচকিয়ে গেল ক্ষৌণীশ। ওই দুই অঙ্গভূষণ দেখেই বোঝা গেল যে তা এই বাংলোর চৌকিদারের স্ত্রীর নয়। অত্যন্ত দামি কাপড়ের সায়া এবং ব্রা। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে ও দাঁড়িয়ে রইল সেই আলো আঁধারিতে ভরা সন্ধ্যারাতের ঘোরের মধ্যে পথের অনেক ভিতরে লুকিয়ে থাকা ওই পরিত্যক্ত বাংলোটিতে। গলা তুলে শান্তারাম ডাকল চৌকিদারকে, কিন্তু শান্তারামের ডাকেরও কেউই সাড়া দিল না। অথচ ক্ষৌণীশ দেখতে পেল একদিকের ঘরের মধ্যে লণ্ঠনের আলোকে এক ছিপছিপে নারীমূর্তি নড়াচড়া করছেন।
ক্ষৌণীশ অপ্রস্তুত হয়ে একবার গলা খাঁকরি দিল। তবে ভিতরে থাকা ভদ্রমহিলা জানলার কাছে এসে ইংরেজিতে বলল, লণ্ঠনের তেল ফুরিয়ে যাবে শিগগিরি তাই চৌকিদার নদীর ধারের চায়ের দোকানে গেছে কেরোসিন তেল এবং মোমবাতি ও দেশলাই আনতে। এসে পড়বে এখুনি।
তারপর কী একটু ভেবে বললেন, আপনি কি থাকতে চান এখানে? থাকতে চাইলে পাশের ঘরে চলে যান। ঘরটি খোলাই আছে। যে মানুষটি হাঁকডাক করছিল তাকেই বলুন আপনাকে সাহায্য করতে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই এসে যাবে চৌকিদার। আর কিছু বলা বা জিজ্ঞেস করার আগেই ভদ্রমহিলা আবারও ঘরের আলো-আঁধারির মধ্যে সেঁধিয়ে গেলেন।
ক্ষৌণীশ একটু অবাকই হল। এমন পরিবেশে, এমন ভাঙাচোরা ডাকবাংলোতে রাতের বেলাতে একজন একা মহিলা, বলতে হয় দুঃসাহসী মহিলা, একা একা কী করছেন? তাঁর গাড়িটা আছে বাইরে কিন্তু কোনও ড্রাইভারকে দেখতে পাওয়া গেল ন। ড্রাইভার কি চৌকিদারের সঙ্গে গেল নদী পারে? কে জানে! গেলেও তার যাওয়া উচিত হয়নি আদৌ মহিলাকে এমন বাংলোতে এবং এই রাতের বেলা একা রেখে। ক্ষৌণীশ পেছন দিক দিয়ে ঘুরে বারান্দায় গিয়ে ইজিচেয়ারে বসল। এই রকম চেয়ার আজকাল দেখা যায় না। সমুদ্রগামী জাহাজের ডেকচেয়ারের মতো। বাংলোর বারান্দাটিও অদ্ভুত ধরনের। মধ্যে দিয়ে একটি পার্টিশান সিমেন্টের। পথের সামনে এই বারান্দা। সামনেই বহু প্রাচীন একটি কনকচাঁপার গাছ। আর কদিন বাদেই চাঁপা ফুটবে এবং বাংলোর সামনের জমিটা কনকচাঁপার গালিচাতে ঢেকে যাবে। গন্ধে মঁমঁ করবে। ছেলেবেলায় যে কনকচাঁপা গাছে ভুড়োশেয়ালি নাচের কবিতা পড়েছিল তা বহুযুগ পেরিয়ে হঠাৎ ফিরে এল তার মস্তিষ্কে।
বারান্দা থেকে ওয়েনগঙ্গা নদীটি দেখা যাচ্ছিল। চাঁদের আলোকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল নদীটি। ভদ্রমহিলা যুবতী। সুন্দরী কি না তা জানা গেল না। তবে তন্বী।
এর পরই চার-পাঁচজন ছেলে বাংলোর ভাঙা গেট দিয়ে ভেতরে এসে ঢুকল। তারা ক্ষৌণীশকে দেখে একটু অবাক হল। একজন জিজ্ঞেস করল আপনি কে?
আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার। গাড়ি খারাপ হয়ে গেছিল বলে রাতটা কাটাবার জন্যে এখানে উঠেছি। তবে চৌকিদার নেই এখন। তার সঙ্গে কথা হয়নি। থাকতে দেবে কিনা জানি না।
কোথায় যাবেন আপনি?
যাব গড়চিরোলিতে- কাল সকালে উঠে।
সেখানে কী করতে যাবেন?
কাজে যাব। একটি থার্মাল পাওয়ার স্টেশন হবে সেখানে- সেই কাজেই এসেছি।
ওদের মধ্যে একজন বলল কলকাতার সি.ই.এস.সির কাজে?
হ্যাঁ। আপনারা কী করে জানলেন?
আমরা জানি।
ছেলেগুলো ইংরেজিতেই কথা বলছিল। বেশ ভাল ইংরেজি বলছিল।
তারপর বলল, দিদি কোথায়? মিস দেশ পান্ডে?
– সম্ভবত পাশের ঘরে আছেন। গিয়ে দেখুন।
ইতিমধ্যে ওদের কথোপকথন শুনে মহিলা বারান্দাতে বেরিয়ে এলেন। এবং ওদের সঙ্গে কথা বললেন। বললেন, চৌকিদার চিঞ্চিকেডে গেছে নদীর দিকে। মোমবাতি ইত্যাদি কিনে আনতে। তোমরা কি কিছু খাবে?
– না, না, আমাদের দেরি করার উপায় নেই। আপনি তৈরি তো?
– আমি তৈরিই। শুধু দুটি কাপড় মেলা আছে। এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়ই। তোমরা কি এক কাপ করে কফিও খাবে না?
– সর্দার গোছের ছেলেটি বলল তা খেতে পারি।
চিঞ্চিকেডে এসে যাবে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। এসেই কফি করে দেবে।
তারপরই বললেন তোমরা এসেছ কীসে? আমার গাড়িতে তিন চারজন যেতে পারবে। সকলের জায়গা তো হবে না।
– একজন হেঁটেই চলে যাবে আমাদের ডেরাতে।
– ঠিক আছে।
দেশ পান্ডে মেমসাহেবও ইংরেজিতেই কথা বলছিলেন তবে মাঝে মাঝে মারাঠিতেও বলছিলেন।
একটি ছেলে বলল, আপনার নাম কী?
– ক্ষৌণীশ লাহিড়ী।
– আপনাদের প্লান্ট কমপ্লিট হলে কত লোকের চাকরি হবে এখানে?
– তা পঁচিশ-তিরিশজনের তো হবেই। তার ওপর আনস্কিলড লেবার তো লাগবে অনেকই।
– ভাল কথা।
ইতিমধ্যে চৌকিদার চিঞ্চিকেডে ফিরে এল। এবং মেমসাহেবের কথা মতো কফি বানাতে লেগে গেল। কতগুলো বিস্কুট আছে। সঙ্গে দেব কি?
– দাও। বিস্কুট কোথা থেকে পেলে?
– নিয়ে এলাম তো নীচ থেকে।
– ভালোই করছ। দাও ওদের সকলকে। আমি গিয়ে আমার জামা-কাপড়গুলো তুলে আনি।
– তাড়াতাড়ি করো। আমাদের দেরি করা চলবে না।
– ঠিক আছে।
– আপনারা কি মাওবাদী?
– ঠিক ধরেছেন। তবে আমাদের কাছ থেকে আপনাদের কোনও বিপদ নেই। প্রথমে পঁচিশ-তিরিশজনের চাকরি হবে তার পরে ঠিকাদার মজুর এসবও তো লাগবে প্লান্টে। জিনিসপত্র লাগবে প্রচুর।
– তা তো লাগবেই। তবে আমি ছ দিন পরেই ফিরে যাব কাজ হয়ে গেলেই।
– কোথা দিয়ে ফিরবেন?
– নাগপুর হয়েই এসেছি। রোডে এসেছি, রোডেই যাব। নাগপুর থেকে প্লেন ধরব।
– বাঃ।
চিঞ্চিকেডে একটু পরে কফি নিয়ে এল ট্রেতে বসিয়ে। ওরা বলল, মিঃ লাহিড়ী আপনিও খান।
– থ্যাংক ইউ। খাচ্ছি।
ভদ্রমহিলা বললেন, আমার নাম উর্মিলা দেশপান্ডে। পুলিশ আমাকে তো বটেই এদের সকলকেই খুঁজছে। আমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল এ কথা কারওকেই বলবেন না। বুঝেছেন?
ক্ষৌণীশ বলল, বুঝেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রীমতী উর্মিলা দেশপান্ডে তৈরি হয়ে, হাতে ছোট ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। ওদের কফি খাওয়া হতেই ওঁরা বেরিয়ে গেলেন বাইরের দিকে। চিঞ্চিকেডে ওঁর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল। ওই ছেলেদের মধ্যেই একজন চিঞ্চিকেডেকে একটি দশ টাকার নোট দিল। চিঞ্চিকেডে গেট অবধি ওঁদের সঙ্গে গেল তারপর ওঁদের নমস্কার করল ভক্তিভরে। ওদের জিপটা কোথায় রেখেছিল ডাকবাংলো থেকে দেখা যচ্ছিল না।
ওরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। উর্মিলা গাড়ির চাবি খুলে গাড়িতে উঠলেন। ওঁর সঙ্গে একজন আর পিছনে দু’জন বসলেন। গাড়ির দরজা খুলতেই ভিতরের আলো জ্বলে উঠল এবং ওদের সকলকেই দেখা গেল ভাল করে। সকলেই বয়সে তিরিশের মধ্যে। যৌবন টগবগ করে ফুটছে। যৌবনের যে একটা আলাদা দীপ্তি ও সৌন্দর্য থাকে তাতেই ঝলমল করছে ওরা।
এদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন ওদের মধ্যে নাম না জানা একজন বলেছিল, আপনি আমাদের যা ভাবছেন আমরা তাইই।
মানে, মাওবাদী?
ইয়েস। ভেরি মাচ।
তারপর বলেছিল উরুগুয়ের সন্ত্রাসবাদীরা একটা কথা বলে, জানেন?
না। তারা কারা? তারাও কি মাওবাদী?
না। তাদের বলে টুপামারো। তারা কী বলে জানেন?
না। কী বলে?
বলে, ‘If the country does not belong to everyone, it should belong to on, one’।
ক্ষৌণীশ বলল, তাই?
ছেলেটি এমফ্যাটিক্যালি বলল, ইয়েস স্যার।
‘৩’
ওরা চলে গেল। ওদের গাড়ির টেললাইটের লাল আলো জঙ্গলের মধ্যের রাস্তাতে কিছুক্ষণ অবধি দেখা গিয়ে মিলিয়ে গেল। ওদের কথাই ভাবছিল ক্ষৌণীশ।
ওরা বলছিল, এই ওয়েনগঙ্গা নদীতে নাকি খুব ভাল চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়। আর যাবার সময়ে বলে গেল ‘সিইউ এগেইন’।
ক্ষৌণীশ বলেছিল, সিইউ।
‘৪’
গড়চিরোলিতে পরদিন পৌঁছনোর পর ক্ষৌণীশের কোম্পানির হিতেন গাঙ্গুলি এফএম রেডিও শুনে বলল, দেখুন দাদা। আপনি খুব বেঁচে গেছেন। পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে এক মারাঠি মহিলা আর তিনজন ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পুলিশের মধ্যেও একজন মারা গেছেন।
শুনে, ক্ষৌণীশ স্তব্ধ হয়ে গেল। ভেবেছিল ওদের কাছে দন্তোওয়ারা যাবার ডিরেকশান জেনে নেবে। হল না আর তা।
খবরটা শোনার পর থেকে চাঁদভাসি ওয়েনগঙ্গা নদীর ছবিটা আর প্রায় ভগ্নপ্রায় ডাকবাংলোটির ছবি ভাসতে লাগল ক্ষৌণীশের মনে।
ভাসবে চিরদিন।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  শিশিরের জল

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

বুদ্ধদেব গুহ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...