গল্প

কফিচুমু

51fab7a6e3515-Untitled-19কান্তা, তোমাকে খুব মনে পড়ছে আজ। সেই রাতের মতো আজ রাতেও কি আমার ঘুম হবে না? বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, পাশে নার্গিস ঘুমুচ্ছে নিশ্চিন্তে, পাশের ঘরে দুই ভাই পরশ আর পাভেলও নিশ্চয়ই ঘুমে কাদা হয়ে আছে। আমার ঘুম আসে না। আমার তোমার কথা মনে পড়ে। আমি বিছানা ছাড়ি, ডাইনিংয়ে গিয়ে গেলাসে পানি ঢেলে খাই, একবার বারান্দার দিকে তাকাই, বারান্দার মানিপ্লান্ট আর অ্যালামান্ডা গাছের সবুজ পাতা হলুদ ফুল বৃষ্টি ধোয়া, কালো পটভূমিতে মৃদু বাতাসে দুলছে। বৃষ্টির ফোঁটার গায়ে ফিলিপস বাতির বিন্দু।
তোমার ওপরের পাটির বাম দিকে একটা দাঁত ছিল আরেকটা দাঁতের ওপরে তোলা। আমরা বলতাম, ম্যারা দাঁত। ওই রকম দাঁতকে কী বলে—জানতে চাইলে বিটলা শাহিন ডিকশনারি দেখে বলেছিল, গজদন্ত।
হাসলে তোমার গালে টোল পড়ত যে।
আমাদের ক্লাসে একজন কবি ছিল, আমাদের ক্লাসে ৩৮ জন ছাত্র আর ১১ জন ছাত্রীর মধ্যে সেই ওমর খৈয়ামই কেবল থার্ড ক্লাস পেয়েছিল, সে বলেছিল, তোমার গালের টোল আর বিউটি টুথের জন্য সে সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে পারে। এই নিয়ে কবিতা লিখেছিল।

তোমার গালে টোল ছিল,
আমার হূদয় দুলছিল।

ওমর ও-কার দিয়ে কথা বলতে পারত না, ‘মুলা খেতে চুর ঢুকেছে’ ধরনের উচ্চারণ ছিল তার, সে তার নিজের লেখা কবিতাটা পড়ত এইভাবে:

তোমার গালে টুল ছিল,
আমার হূদয় দুলছিল।

কান্তা, তোমাকে নিয়ে আমিও মনে মনে একটা কবিতা বানিয়েছিলাম।

কান্তা, কান্তা,
তুমি আমার মনের মানুষ,
সেই কথা কি জানতা?

কিন্তু ঘুণাক্ষরেও এই কথাটা আমি তোমাকে বুঝতে দিইনি।
আমি যে মফস্বল থেকে গিয়েছিলাম। রাজবাড়ী তো তেমন কোনো শহর নয়, আমাদের ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই, আছে সার কারখানা, আমাদের মানিকগঞ্জে মানিক নেই, আমাদের রাজবাড়ীতেও মোটেও রাজপুত্ররা ঘোরাফেরা করত না। লিচুবাগানে গ্রীষ্মকালে টিন বাঁধা হতো, সারা রাত ঢনঢন করে কেরোসিনের টিনগুলো বাজত, সন্ধ্যা হলেই একঝাঁক বাদুড় উড়ে যেত মাথার ওপর দিয়ে। আমাদের টিনে ছাওয়া টিনের বেড়ার ঘর থেকে টিউবওয়েলের পাড়টা ছিল ঢের দূরে, শেয়াল-ডাকা রাতে উঠোন পেরিয়ে টিউবওয়েলের পাড়ে যাওয়ার সময় ঢোলকলমির দামের ওপরে জোনাকিপুঞ্জের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, দূরে বিলের মধ্যে আলেয়া দেখে ভূতের আগুন বলে ভয় পেলে মা আমার বুকে থুতু দিয়ে দিতেন। মেঘলা বিকেলে চোরকাঁটাভরা খোলায় বসত ফড়িঙের হাট। আমি প্রাইমারি স্কুলে যেতাম খালি পায়ে, এক দৌড়ে। টিফিনের সময় দৌড়ে এসে খড়ে ছাওয়া পাকঘরের কাঁচা মেঝেয় পিঁড়ি পেতে বসলে মা কাঁসার বাটিতে দিতেন দুধ, তাতে গুড় মাখলে রং হতো লাল। হাইস্কুলে গেছি দুই ক্রোশ দূরে, লুঙ্গি পরে যেতাম, তাতে খাল পার হওয়াটা সহজ ছিল। সেখান থেকে আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলাম, সে তো আমাদের হামেদ চাচার কল্যাণে, তিনি সেকালের বিএ, রোজ বিকেলে বাড়িতে এসে ট্রানস্লেশন ধরতেন, বল তো ফখরুল, ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল—এর ইংরেজি কী?
মুহসীন হলে জায়গা পেয়েছিলাম, এলাকার বড় ভাইয়ের সঙ্গে এক বিছানায় ডাবলিং করতাম। বিকেল হলেই চলে যেতাম টিউশনিতে।
ক্লাসে প্রথম দিন গিয়ে গোটা দশেক মেয়ে দেখে চোখ তুলে চাইতে পারিনি। খুব লাজুক ছিলাম যে। কিন্তু ক্রিকেটটা কী করে যেন ভালো খেলতে শিখেছিলাম, ওই অজপাড়াগাঁর স্কুলেই। কারণ, আমাদের ড্রিল স্যার। তিনি নাকি ওয়ারীতে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলেছেন। আবদুল বারী নামের ওই শিক্ষক আমাদের বড়দরিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে ক্রিকেটের সেট এনেছিলেন। আমি আর সব ছেলেপুলের সঙ্গে অনেকটা সময়ই কাটিয়েছি স্কুলের মাঠে, ক্রিকেট খেলে খেলে। এমন ভালো খেলি না যে কোনো ক্লাবে চান্স পাব। আবার এমন খারাপ খেলি না যে ইন্টার ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ১১ জনে জায়গা হবে না।
কান্তা, তিনটি বছর আমরা পার করলাম এক ক্লাসে। কোনোদিন দুজনের মধ্যে কোনো বাক্যবিনিময়ও তো হয়নি। আমি শরীয়তপুরের ছেলে, গায়ের রং কালো, বেঢপ লম্বা, কোনো দিন ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে জার্নাল পড়িনি, সিনেমার ক্যাসেট তুলিনি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে গিয়ে ছবি দেখিনি, আমি তোমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকাব কী করে? সাহস ছিল না, কান্তা।
কিন্তু ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে আমি ব্যাটিং করতে নেমে একটা ছক্কা মেরেছিলাম, আর আনবিটেন সেভেন্টি ফোর, আমি ম্যান অব দ্য ম্যাচ, সেটা কিন্তু আমি তোমাকেই উৎসর্গ করেছিলাম, তুমি হলুদ রঙের কামিজে, কালো সানগ্লাসে, সাদা ক্যাপে অপ্সরীর মতো হাততালি দিচ্ছিলে, তুমি জানতে না, কান্তা, আমার পক্ষে ভালো ব্যাটিং করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি যাচ্ছেন এক বছরের জন্য, ইংল্যান্ড। ক্লাসে তিনি বললেন, ‘আজই তোমাদের সঙ্গে আমার শেষ ক্লাস। আমি যখন ফিরব, তখন তোমরা তো সব বেরিয়ে যাবে। তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ শুনে সবচেয়ে বেশি যে কাঁদল, সে তুমি।
তোমার দু-চোখ বেয়ে জল ঝরছে, গমের মতো তোমার গায়ের রং, তার ওপর জল, মনে হচ্ছে দু-ফোঁটা সোনা, আমার মনে হলো, আহা, আমি যদি মুছে দিতে পারতাম। স্যার চলে গেলেন, তুমি দাঁড়িয়ে গেলে টেবিলের পাশে, আমাদের দিকে ফিরে বললে, ‘এই এসো, আমরা এসএমআই স্যারকে ফেয়ারওয়েল দিই। সবাই ২০ টাকা করে চাঁদা দাও। এই আবেদিন, তুমি সবার কাছ থেকে চাঁদা নাও তো।’
আমাকে কেন তুমি এই দায়িত্ব দিয়েছিলে, আমি জানি না। আমি অপরাজিত ৭৪ করেছিলাম বলে! সবচেয়ে লম্বা ছেলে ক্লাসে, গায়ের রং কালো, আমার একটা ডাক নাম আছে—কাজল। ক্লাসে এই নামে একটা মেয়ে থাকায় আমি সেটা কোনোদিন প্রকাশ করিনি।
চাঁদা তোলা, মানপত্র লেখা, সেটা কম্পোজ করতে নীলক্ষেতে যাওয়া—উফ, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো তুমি আমাকে উপহার দিয়েছিলে, কান্তা। আমি কি কোনো দিনও ভাবতে পেরেছিলাম, আমি আর তুমি এক রিকশায় উঠব, কোনো দিনও। তুমিই আমাকে ডেকে নিলে, ‘এই আবেদিন (আমার ভালো নাম ফখরুল আবেদিন, আমি চাই না আমাকে কেউ ফখরুল নামে ডাকুক, কারণ, ইংরেজি বিভাগের স্মার্ট ছেলেমেয়েরা জাকারিয়াকে ডাকত জ্যাক, আমার আশঙ্কা ছিল ফখরুল থেকে ফাখরুল, শেষ পর্যন্ত সেটাকে তারা বানিয়ে ছাড়বে ফা…), চলো তো, একটু নীলক্ষেত যেতে হবে।’ কবি ওমর খৈয়ামই মানপত্রটা লিখেছিল, ইংরেজিতে। তখন সদ্য লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন আবদুস সালাম স্যার, তিনি লেখাটা এডিট করে দিলেন। আমি চাঁদা তুলছি, মোট ৪১ জন টাকা দিল, বাকিরা দিল না। ৮২০ টাকা তখন অনেক টাকা।
তুমি, মিনারা আর আমি, আমরা তিনজন খাটাখাটনি করছি। নিউমার্কেটে গিয়ে কলম কেনা হলো, মগবাজার আড়ংয়ে গিয়ে পাঞ্জাবি। আর ক্লাসের ফাঁকে তোমাদের আড্ডায় আমার জায়গা হতে লাগল। আমি এখন তোমাদের সঙ্গে মলের ঘাসে বসতে পারি, বাদাম ছিলে খেতে পারি, তুমি আহ্লাদী ছিলে, বলতে, ‘এই আবেদিন, আমার বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দাও।’ আমি বাদামের দানা বের করে ফুঁ দিয়ে তার খয়েরি আবরণটা উড়িয়ে তারপর তোমার হাতে দিতাম। তোমার আঙুলগুলো সত্যি সত্যি কাঁঠাল-চাঁপার কলির মতো ছিল। তুমি কী একটা পারফিউম দিতে, সেটা ছিল বাতাবি ফুলের গন্ধের মতো, কিন্তু বিকেল হতে হতে তোমার কামিজ ঘামে ভিজে যেত, তোমার শরীর থেকে একটা বুনো গন্ধ এসে আমার নাকে লাগত, আমি পাগল পাগল হয়ে যেতাম।
তারপর এল সেই বিকেলটা। আমরা কাঁটাবনের মোড়ের দোকান থেকে মানপত্রটা বাঁধাই করে নিয়ে চললাম এলিফ্যান্ট রোডে, কফিশপে। আমরা দুজন। এক রিকশায়।
তুমি বললে, ‘কী খাবা?’
আমি তো জানি না কফিশপে কী খেতে হয়। দোতলায় কাচের জানালার পাশে বসে আছি। নিচে সন্ধ্যা নামছে এলিফ্যান্ট রোডে। গাড়ির হেড লাইট জ্বলছে।
তুমি কাটলেটের অর্ডার দিলে। বললে, দু কাপ কফি।
আমি বললাম, কান্তা, আমি কফি খাই না।
তাহলে সেভেন আপ?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
সেভেন আপটা আগে এল। তারপর কাটলেট। সবার শেষে তোমার কফি।
লাল কাপে তোমার ঠোঁট। তুমি ধীরে ধীরে কফি খাচ্ছ। তোমার শরীরে ঘামের বুনো গন্ধ।
কফিশপটায় ভিড় নেই। বিশাল ঘরে আমরা দুজন। ও পাশে অনেক দূরে একজন ম্যানেজার।
তোমার কোল থেকে তোমার ছোট্ট ব্যাগটা পড়ে গেল মেঝেতে। দুজনে একসঙ্গে উবু হলাম সেটা তোলার জন্য। তোমার গাল আর আমার গাল পরস্পরকে ছুঁয়ে গেল।
তখন তুমি হাত বাড়িয়ে আমার ঘাড়ের পেছনটা ধরে আমার মুখে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলে।
কফির স্বাদে আমার মুখ ভরে গেল।
তুমি বিড়বিড় করে বললে, ‘সুইট হেলেন, মেক মি ইমমরটাল উইথ আ কিস।’
আমি এর আগে কোনো দিন কফি খাইনি।
এই প্রথম আমি কফি খেলাম। তোমার ঠোঁটের পেয়ালায় ঠোঁট রেখে।

আমি তোমার হাত আমার মুঠোয় নিলাম। তোমার আঙুল নিয়ে খেললাম। তোমার বাম হাতে অনামিকায় একটা আংটি। এটা আমি আগে দেখিনি।
আমি সেটা নিয়ে আমার আঙুলে খেলতে লাগলাম। তুমি বললে, ‘এটা আমার এনগেজমেন্ট রিং।’
গতকাল তোমার বাগদান হয়ে গেছে। ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্নে। তুমি অনার্স শেষ করেই চলে যাবে।

কফিতে ক্যাফেইন থাকে। ক্যাফেইন ঘুম তাড়ায়। মুহসীন হলের শেওলা ধরা ছাদের নিচে শুয়ে সারা রাত আমার ঘুম এল না।

বহুদিন পরে, কান্তা, আজ রাতেও আমার ঘুম আসছে না।
আজ দুপুরবেলা, হঠাৎই আমার বুকটা ধড়াক ধড়াক করতে লাগল। ভয় পেয়ে চলে গেলাম কাইয়ুম ভাইয়ের কাছে। হার্টের ডাক্তার। ল্যাবএইডে বসেন। ইসিজি করালেন। বললেন, ‘ভয় পাবার কিছু নাই। ড্রপ বিট। ব্লাড প্রেশার তো ভালো আছে। আপনি কি কফি খান?’
: হ্যাঁ। খাই। আজ ২৪ বছর ধরে রোজ দু কাপ কফি খাই। এই একটাই আমার নেশা।
কান্তা, তোমার বিয়েতে আমি একটা কফিসেট উপহার দিয়েছিলাম। দুটো ছোট্ট কাপ আর একটা কেটলি। দোকানি ওটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বিয়েতে এর চেয়ে ভালো উপহার আর হয় না। বর-বউ কফি নিয়ে পাশাপাশি বসবে বারান্দায়। আকাশ দেখবে। সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখবে। গান শুনবে। আর কফি খাবে।
তুমি চলে গেলে। আর কোনো যোগাযোগ রইল না তোমার সঙ্গে। আমি তোমাকে ভুলে গেলাম।
বিশ্বাস করো কান্তা, আজ দুপুরে ডাক্তার কাইয়ুম যখন বললেন, ‘আপনার হার্টের বিট ড্রপ হচ্ছে কফির কারণে, কফি খাওয়া বাদ দেন,’ তার আগে পর্যন্ত তোমার কথা আমার মনেই ছিল না।
ডাক্তারকে বলতে পারিনি, কফি খাওয়া আমি ছাড়তে পারব না।
ব্যাংক থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। অভ্যাসবশত টিভির সামনে বসেছি, নার্গিস হিন্দি সিরিয়াল দেখছে, আমি সকালের বাসি পত্রিকা ওল্টাই, ওই ঘরে পরশ কম্পিউটারে, পাভেল প্লেস্টেশনে, কাজের মেয়ে কফি দিয়ে গেল।
কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে, কান্তা, তোমার কথা মনে পড়ে গেল।
কান্তা, তুমি এখন কোথায় আছ, কেমন আছ?
তোমার ক ছেলেমেয়ে?

আমি কফিটা খেলাম না। খাব না বলে প্রতিজ্ঞা করে খাইনি—তা নয়। আমার মনটা এত উদাস হয়ে গেল যে মন দিয়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে লাগলাম।
গত ২৪ বছরে এই প্রথম বোধ হয় একটা সন্ধ্যা আমার কফিবিহীন কাটল।

২৪ বছর আগে একটা রাত আমার ঘুম আসেনি, কারণ আমি তোমার মুখের পেয়ালা থেকে কফি পান করেছিলাম।
আজ রাতে আমার ঘুম আসছে না, কারণ আমি আজ সন্ধ্যায় কফি খাইনি।

আনিসুল হক
আনিসুল হক
আনিসুল হক (জন্ম: মার্চ ৪, ১৯৬৫) একজন বাংলাদেশী লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তাঁর লেখা মা বইটি বেশ জনপ্রিয়। [বাংলা ভাষার পাশাপাশি বইটি দিল্লী থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং ভুবনেশ্বর থেকে উড়ে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে । জন্ম[: আনিসুল হকের জন্ম রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে। তাঁর পিতার নাম মো. মোফাজ্জল হক এবং মায়ের নাম মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরিনা ইয়াসমিন। শিক্ষাজীবনঃ তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এস.এস.সি. এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচ.এস.সি. পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পান। এসএস সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি ৩য় এবং এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান লাভ করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। কর্মজীবনঃ আনিসুল হক বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগে যোগদান করেন। অল্প কিছুদিন চাকরির পরই তা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় চলে আসেন। তিনি ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক দেশবন্ধু পত্রিকার সহসম্পাদক, ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বাভাস পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজের সহকারী সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দৈনিক প্রথম আলোর সাথে যুক্ত আছেন। তাঁর মূল ঝোঁক লেখালেখিতে। পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লেখেন। বুয়েটে পড়ার সময় কবিতার দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে এর পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মনোযোগী হন। উপন্যাস, বিদ্রুপ রচনা, নাটক রচনায় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। ২০১০ সালে তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম (আইডব্লিউপি)কর্মশালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে যোগ দেন।।তিনি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৭ জন লেখক আইডব্লিউপির কর্মশালায় যোগ দেন।১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৩০টি দেশের এক হাজার ২০০ লেখক অংশ নেন। গল্পঃ যে স্বপ্ন দেখতে জানতো, আজকালকার ভালোবাসার গল্প, অসমাপ্ত চুম্বনের ১২ বছর পর। [৬] কবিতাঃ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে (১৯৮৯), আমি আছি আমার অনলে (১৯৯১), আসলে আয়ুর চেয়ে বড় সাধ তার আকাশ দেখার (১৯৯৫), জলরংপদ্য (২০০২), তোমাকে ভাবনা করি। উপন্যাসঃ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস মা (২০০৩ সালে প্রকাশিত)। এছাড়া বীর প্রতীকের খোঁজে, নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল, খেয়া, ফাঁদ, বেকারত্বের দিনগুলিতে প্রেম, ভালোবাসা আমি তোমার জন্য কাঁদছি, ফাল্গুন রাতের আঁধারে, আমার একটা দুঃখ আছে, ক্ষুধা এবং ভালোবাসার গল্প, হৃদিতা, সেঁজুতি, তোমার জন্য, ৫১ বর্তী, আবার তোরা কিপ্টা হ,আলো-অন্ধকারে যাই,আমার একটা দু:খ আছে, আয়েশামঙ্গল, বারোটা বাজার আগে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গাত্মক রচনাঃ পত্রিকায় ‘গদ্যকার্টুন’ নামে নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে কথাকার্টুন, গণতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি‌‌, রাজা যায় রানি আসে, ছাগলতন্ত্র, অশ্বডিম্ব, সেই গাধা সেই পানি উল্লেখযোগ্য। নাটকঃ নাট্যকার হিসেবে তিনি ভিন্ন ধাঁচের নাটক উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচিত দর্শকনন্দিত টেলিভিশন কাহিনীচিত্রের মাঝে রয়েছে নাল পিরান, করিমন বেওয়া, প্রত্যাবর্তন, সাঁকো, প্রতি চুনিয়া, চড়ুইভাতি, মেগা সিরিয়াল ৫১বর্তী প্রভৃতি। সিনেমার স্ক্রিপ্টঃ মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলরএবং মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন আনিসুল হক। এছাড়া তিনি থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন সিনেমারও স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। পুরস্কারঃ শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার হিসেবে পুরস্কার, টেনাশিনাস পদকসহ বেশ কয়েকটা পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।