মরুস্বর্গ-৬

সোনালী অশ্বের পিঠে চড়ে হেরা সোজা উপত্যকার কালো আঙুরের মত নিবিড় মধুচক্রের কাছে উঠে এল। এতবড় প্রশস্ত পথ নিনিভেও ছিল না। পথের দু’পাশে বাজার-পাট বসতে শুরু করেছে। কনানের সমস্ত পথ সবার জন্য উন্মুক্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে নানান দেশের সঙ্গে। নগর প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। উচ্চতার দিকে উঠে গেছে পথ, তারপর সিঁড়ি তৈরি হচ্ছে, যেভাবে কল্পনা করা যায় একটি দুধের রাস্তা নক্ষত্র থেকে নেমে এসেছে মাটিতে, আকাশে দুধের রাস্তা দেখা যায়।

একটি তৃপ্তির খাস ফেলে হেরা নিজেকেই বলল, এখানেই অতএব অমরাবতী। সাদইদের কক্ষ। কক্ষের ভিতর নগ্ন নারী। শুধু প্রমাণ করা যে, রিবিকার হুবহু নকল করা হয়েছে এখানে, যাতে দুটি সত্যিকার প্রজাপতি উড়ে এসে রিবিকার বুত্রে উপর বসে। কিন্তু এটা কি আদৌ প্রমাণ করা সম্ভব! যদি তা প্রমাণিত না হয়, তবে বলা যায় না যে এটি মানুষের গড়া স্বর্গ! স্বর্গ প্রমাণ সাপেক্ষ, তা শুধু ঘোষণা-করা কোন ফলকাকীর্ণ লিপি নয়। সাদইদ বলেছে, যদি প্রজাপতি না উড়ে আসে,বুঝতে হবে এই নির্মাণ মিথ্যা। তাহলে সমস্তই ভেঙে ফেলতে হবে। ভাবলেই মনটা কেমন দমে যায়।

হেরা আবার নিজেকে বলল, সব জিনিসের যেমন চুড়ো আছে, তেমনি সৌন্দর্যেরও চুড়ো আছে। সেখানে স্থাপন করতে হবে রিবিকার নগ্নতা। কিন্তু রিবিকাকেই যে কখনও দেখিনি। সাদইদ তাকে লুকিয়ে রেখেছে। নগ্নতা না দেখলে নগ্নতা উৎকীর্ণ হয় না। নগরীটা বুকের মধ্যে আছে, রিবিকা তো বুকের মধ্যে নেই।

সামনের অর্ধসমাপ্ত মাটির নগ্ন নারীমূর্তির দিকে চাইল হেরা। ভাবল, বাকি কাজ পরে হবে। কাজটা দু’চার দিনের নয়। তবে এ মূর্তি তো রিবিকার নয়। এ যে নিনি। কী মুশকিল। শিশু গেল হত্যায়। বউ গেল পালিয়ে। কেন গেল? বোবা মেয়েটিকে সে ভাষা দিয়েছিল। কিন্তু রইল না। পড়শীরা হত্যার দায় চাপাল নিনিভার কাঁধে। ক্রমাগত বলতে থাকল, এই মেয়ে মরুরাক্ষসী! বাচ্চাকে শুষে নিয়েছে। অবিরাম বলতে থাকলে মানুষ না-পালিয়ে কোথায় যাবে!

ভাবতে ভাবতে হেরার তৃপ্তির শ্বাস বেদনার দীর্ঘশ্বাসে বদলে যায়। এই কনানে আমি কেন এসেছিলাম? বউ আর শিশুর টানে,আর এসেছিলাম কাজ পাব বলে। কিন্তু যুদ্ধ মানুষের আকৃতি ভেঙে দেয়, লুপ্ত করে রূপ আর কাঠামো–একটা শ্বাসরুদ্ধকর অদৃশ্য জগৎ তৈরি করে। কিন্তু যুদ্ধ তো থামল না কখনও। মারী মড়ক বন্যা দুর্ভিক্ষ যেমন পালা করে আসে–বন্যা, অতঃপর মড়ক এবং দুর্ভিক্ষ, সেইভাবে হত্যা ধর্ষণ ইত্যাদি, এইসব ক্রিয়া চলতেই থাকে। মানুষ বস্তুত এইরকমই। যা হারাচ্ছে নিয়ত, তাইই সে নিয়ত খুঁজছে।

মাটির মূর্তির দিকে অপলক চেয়ে আজ জীবনের কত কথাই না মনে পড়ে যাচ্ছিল। এমন সময় আকাশমুখী পথ বেয়ে অপরূপ উপত্যকার দিকে এই সন্ধ্যাকালে উঠে আসে সাদা অশ্বারোহী দেবদূতের ক্ষিপ্রবেগ–সাদইদ।

অশ্ব থেকে অবতরণ করতে করতে বলে–আর কতদূর হেরা! স্বপ্নদর্শী ইহুদ বলে বেড়াচ্ছেন রাত্রের আকাশে বৃশ্চিক তারকার উদয় হয়েছে। যুদ্ধ ধ্বংস আর মড়ক অনিবার্য! আমি শুধু ভাবি আকাশে চাঁদ যে সভা বসিয়েছিল সে দৃশ্য। তিনি দেখেননি।

হেরা হেসে উঠে বলল–আমি শুনেছি অন্য এক কথা। যেসব মা বাপ শিশু সন্তানদের যুদ্ধে মরুভূমির বুকে হারিয়ে ফেলেছে এবং যে-শিশু তার মা-বাপ পায়নি আর যে-দেবদাসী স্বামী পেল না, যে-সৈনিক পেল না ঘর–ইয়াহোর স্বর্গে তারা নিশ্চিত সমস্তই ফিরে পাবে এবং মিলিত হবে। এই বক্তৃতা খুবই নতুন। বৈপ্লবিক বলতে পারো।

–তুমি শুনেছ?

–হ্যাঁ, শুনেছি বইকি! তোমায় লুকবো না। আমি গোপনে ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেক বক্তৃতাই উপভোগ করি। ইহুদ তাঁর অন্তর থেকেই বলেন। খুব স্পর্শ করে। কোমলমতি মানুষ তাঁর কথায় কাব্যের চেয়ে অধিক রস পায়। একদিন খোকা চলে যাবার পর ইহুদের বক্তৃতা শুনতে শুনতে মনে হল সব ছেড়ে দিই, ওঁর পায়ে গিয়ে পড়ে যাই। আমার মনের সেই অবস্থার কথা তোমায় বোঝাতে পারব না।

হঠাৎ সাদইদ খুব স্পর্শকাতর স্বরে বলে–আমি তোমায় কিছুই দিতে পারিনি হেরা! কিছুই পারিনি। বরং আমি কেবল তোমার কাছে চেয়েই চলেছি!

হেরা হা হা করে হেসে ফেলে মাটির মূর্তির দিকে চেয়ে বলে উঠল–কোন কিছু পাওয়ার ব্যাপারে একটা চমৎকার পুরনো পন্থা আছে সারগন। পাথরঅলাদের কথাই ধরো!

বলেই হেরা কাহিল করে হাসল। বলল–পাথরঅলাদের কথা মনে এলেই আমার অসম্ভব রোদন আসে। বাচ্চাটাকে মনে পড়ে কিনা। নিনিভাকেও তীব্র মনে পড়ে যায়। কান্না ঠেকানো যায় না। পাথর মেরে পশু শিকার করা নিশ্চয়ই অজ হাস্যকর। পশুপালন যখন করছি, প্রয়োজনের পশুগুলো তো আমাদের ঘরেই রয়েছে। কিন্তু পাথরঅলারা যখন পশুশিকার করে বেড়াত

সাদইদ বলল–শিল্পী মানুষ হলে যা হয় কথা তোমার ভাবাবেগে এলিয়ে পড়ে–এত বিস্তারিত কর যে, মূল ব্যাপারটা ধরতে খুব চিন্তা করতে হয়।

হেরা আবার হাসল। বলল–আমি তো তোমার মত কর্মের মানুষ নই, চিন্তাবিদও নই। সংগঠন যারা করে তাদের চিন্তাও খুব গঠিত হয়–যেমন মহাত্মা ইহুদ–সব হল লাঠির ইশারাগুছিয়ে ভোলা। আমার হয় না।

–-আচ্ছা, কী বলছিলে বলে দাও। তারপর খুব দ্রুত মূর্তিটার কথা ভাবো!

–মূর্তিটাকে আমি তুক করছি সাদইদ!

সাদইদ চমকে উঠল। তুক বলার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তে সাদইদের চোখের উপর প্রাচীন পর্বতগুহা ভেসে উঠল। পুরনো পাথরমারা মানুষ গুহার দেওয়ালে শিকারে যাওয়ার আগে শিকারের ছবিটা আঁকত–এটা তার হৃদয় থেকে, মানে স্বপ্ন থেকে আসত। তারপর আঁকা ছবিটার ওপর তুক করত। তুক করলে বনে গিয়ে সেই আঁকা ছবিটাই সে জ্যান্তরূপে শিকার করতে পারত। ফলে ছবি বা মূর্তি থেকে তার নড়বার উপায় নেই। সাদইদ ভাবল, আমিও কি পারছি? তাহলে হেরাই বা পারবে কেন? কিন্তু সে কাকে তুক করছে?

সাদইদ বলল-খুব কষ্ট হয় হেরা! সবই তুমি হারিয়েছ, কিন্তু তুক করে সেইসব কি ফিরে পাবে? মাটির তৈরি নিনিভাকে রক্তমাংসে ফিরে পাওয়া–

হেরা সঙ্গে সঙ্গে বলল–না সাদ!

–তবে?

–এ তো রিবিকা স্বর্গদর্শী সারগন! আমি তার নগ্নতা দেখিনি। তাকে দেখাও–আমি নিনিভার রূপ থেকে মুক্ত হই! আমি হৃদয়ের শেষ শক্তি দিয়ে ভেবেছি কিন্তু পারিনি। বারবার নিনিভাই চলে আসে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি পারব!

বলতে বলতে হেরার গলা বুজে এল। একটি অঘটন হল। একটি পাগলা পাথর এই ঘোর হতে থাকা সন্ধ্যার হালকা তিমিরে তৃতীয়ার চাঁদের কোমল। কিরণ মেখে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়তে থাকে। ক্রমাগত পড়ে যেতে থাকে। লাফিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে। একদণ্ড থামছে, কি থামছে না। নিচে ছুটছে একটা বিধ্বংসী ক্ষমতার মত। এ ঘটনা এই পাহাড়ে এই প্রথম।

এই প্রথম জীবনে সাদইদ মুখ ফসকে উচ্চারণ করল সুতীব্র হতাশার সুরেহায় ইয়াহো! এমন তো ভাবিনি।

হেরা বলল–হাঁ, আজ কত মরবে কে জানে! খুব সাংঘাতিক এই পতন। চেয়ে থাকলে মনে হয় এই উপত্যকাটাই যেন বসে যাচ্ছে।

সাদইদ সাদা অশ্বে লাফিয়ে উঠে বসে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। হেরা পিছন থেকে আর্তনাদ করে ওঠে–ওভাবে যেও না সারগন!

তারপর কী ভেবে হেরা একা এই জনশূন্য নির্জনে অট্টহাস্য করে বলে–তুক। তুক করছি ওহে পাথরঅলা! ওহে রুদ্র, তুমি কে? অদৃশ্য, তুমি কে হে! মহাত্মা ইহুদ, আমায় গ্রহণ করুন পিতা! আমি তোমার স্বর্গে যেতে চাই। আমার সংলাপ শুনছে এই উপত্যকা! কেউ শুনছে না। আমিও শুনছি না। হা হা হা হা! হা হা হা!

হাসি শুনে সোনালী অশ্ব হেরার কাছে ঈশ্বরের মত এগিয়ে আসে। অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসতে থাকে হেরা। রাস্তার দু’পাশে দোকানপাট আলোয় উজ্জ্বল বীণা বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছে এক অন্ধ গায়ক, তার গাইবার বিষয়বস্তুটি ভারী সুন্দর।

‘দুধের রাস্তা রাজা খুবই মধুর
এখানে ডুমুর রুটি, এখানে কেবলই সুর।
তবু তোর পাপের ভারা টানবি আর কতদূর–
এখানে তাঁবুর বাজার, এখানে কেবলই সুর।
এখানে তাঁবুর পাশে চাষীদের কুটির আছে,
এখানে মরুর হাওয়া, পাথরে ফুল ফুটেছে।
সব তোর নিজের গড়া, সবই তোর স্বপ্ন রাজা–
মাটিতে দুধের নদী, মধুর ওই উপত্যকা,
সব তোর আকাশ-ছোঁয়া, সবই তোর মাটির টানে
তবু যে পাপের ভারা ডুবে যায় নদীর বানে।
তুই তো বিম্ব ছায়া, তুই তো লোটার ছায়া–
যে রয় মরুর মাঝে যে হয় আসল কায়া;
সে আছে ঝড়ের মুখে, সে আছে মারীর বুকে
সেই যে আসল রাজা, আসবে কনান দেশে।
তার বিবিকে তুই কেড়েছিস, তুই যে রাজা অসুর–
দুধের রাস্তা রাজা খুবই মধুর।’

একটু থেমে আবার গাইছে :

‘তুই যে হত্যাকারী, শিশুকে তুই মেরেছিস,
তুই যে হত্যাকারী, ঘোড়াকে তুই মেরেছিস–
তবু তোর সুনাম করি, তুই যে শান্ত অধীর
কে জানে কী করেছিস, রিবিকা কোথায় আছে;
এখানে মরুর হাওয়া, পাথরে ফুল ফুটেছে।
এ বীণা আমার বীণা, কেড়ে তুই নিস না জানি–
লোটাই আসল রাজা, রিবিকা আসল রানী।
এই সুর কেবল এ সুর, গেয়ে যাই আপন মনে–
তোর ওই স্বর্গে যেন ইয়াহো পাথর হানে।
নতুবা স্বর্গ তোমার ইয়াহো উঠিয়ে নেবেন,
আকাশে নিজের কাছে, আকাশে নিজের কাছে–
এখানে নদীর হাওয়া, আকাশে চাঁদ উঠেছে।’

হেরা বীণাবাদকের গান শুনতে শুনতে আশ্চর্য বোধ করছিল। সে বুঝতে পারছিল, পাপ কীভাবে জাল ছড়িয়ে চলেছে কনানের সর্বত্র। সাদইদ কোনদিনই এই মাটিতে প্রতিষ্ঠা পাবে না। তার এই স্বর্গকে কেউ বিশ্বাস করে না। তাকে ইহুদ হত্যাকারী এবং লুণ্ঠনকারী ঘোষণা করেছেন। মহাপিতা নোহের নৌকাকে নোহের পুত্র অবধি বিশ্বাস করেনি। পিতার নৌকায় পুত্ৰ উঠতে চায়নি। পুত্র বন্যায় তলিয়ে গেল, তথাপি পিতার নৌকায় উঠে এল না। কিন্তু কেন এমন হয়?

বীণাবাদক জানে, সাদইদ তার বীণা কেড়ে নেবে না। এই বিশ্বাস তার অন্তরের, কিন্তু উপত্যকায় যে স্বর্গ তৈরি হচ্ছে তাতে তার আস্থা নেই। কিন্তু কেন?

সমতলে নেমে আসার আগেই হেরার চোখে পড়ল আকাশের তলায় এক সর্বগ্রাসী আগুন লেগেছে। দ্রুত ঘোড়া ছোটাল হেরা। এই ভয়াবহ দৃশ্যের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। অনেকটা কাল কেটে গেছে এই কনানে আসার পর। প্রতিটি পাথর এখানে গেঁথে ভোলার মেহনত সীমাহীন। পথের প্রতিটি স্তর খাড়া করা মুখের কথা নয়। কতবার শ্রমিক কারিগর মিস্ত্রী, চাষনালার চাষী সব ছেড়ে পালিয়ে গেছে। মাঝপথে নির্মাণের কাজ থেমে পড়েছে। তবে এখানে। আর ভয়াবহ বন্যা কিংবা সাংঘাতিক খরা হয়নি। একটু-আধটু যা হয়েছে, তার সম্পূর্ণ মোকাবিলা করেছে সাদইদ। এখানে বাজার বসেছে, কুটির তৈরি হয়েছে। কিন্তু কুটির আর তাঁবুর লড়াই থামেনি। পূর্বদেশী চাষী বা শ্রমিকের সঙ্গে কনানের বিবাদ, বিদ্বেষ দূর করা যায়নি ইয়াহোর নির্দেশে। কখনও কখনও মনে হয় সমস্ত চেষ্টাই অবান্তর। .

হঠাৎ মনে পড়ল, আজ নববর্ষের দিন! রাত্রি নামল। চাষীর ঘরে ফসল ফলেছে সুপ্রচুর। সাদইদ উদ্বৃত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধা পেয়েছে বিচিত্র ধরনের। ইয়াহোর বান্দারা অনেকেই দিতে চায়নি। সাদইদ তবু হেরাকে উপত্যকা ঘিরে প্রাচীর খাড়া করতে বলেছে। পথ তৈরি হয়েছে। আজ আগুন লাগল কেন?

হেরার চোখের সামনে সব ভস্মীভূত হতে লাগল। তাঁবুর পশুরা পুড়ে গেল। চাষীর ঘর জ্বলল। পথের উপর পড়ে রইল মৃতদেহ। বিদেশী সংখ্যালঘু কুমোরদের বউ,কন্যা ধর্ষিতা হল। ঘটনা কেন ঘটল? দু’জন দেবদাসী খুন হয়ে গেল। দেবদেবীর অভিনয়ের রাত বিষাক্ত বিষাদে ছেয়ে গেল। নিশ্চয়ই কোন সেপাই চাষী ঘরের মেয়েকে বলপ্রয়োগের চেষ্টা করে–এমন একটা বিবরণ শোনা যাবে বাতাসে। কিংবা কুমোরদের কোন ছেলে তাঁর মেয়ের উপর নষ্টামির চেষ্টা করে। বলা হবে,এই ঘটনায় কনানীদের কোনওই ভূমিকা ছিল না। অথবা তাঁবুর বসতি আছে বলেই দাঙ্গা বেধেছে, স্বর্গ না গড়তে চাইলে এমন হত না!

হেরা চোখের সামনে দেখতে পেল আলো-অন্ধকার মেশানো একটা কুটির থেকে কচি একটি মেয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনছে দিনারের মত একজন কেউ। হাতে ধরেছে ধারালো তৃতীয়ার চন্দ্রাকৃতি গোল অস্ত্র। কিশোরীটি চিৎকার করছে। মেয়েটির মুখের আদল অনেকটা নিনিভার মত। হেরা বুঝতে পারল, নিনিভার বাপের সংসারে অত্যাচার কখনও থামেনি। বাপ বেচারি কী করবে? তার তো করার কিছু নেই। এতগুলি মেয়েকে সে সামলাতে পারছে না। ইয়াহোর ধর্ম গ্রহণ করার পরও, কনানের পুরনো ধর্ম তাকে ছাড়ছে না। কুমারী বলি হয়েছে, আজ নববর্ষে অন্য মেয়েটিকে টানছে এক মরুজাতক সেপাই।

ধর্ষণে উদ্যত দিনারের একটি ছায়া, দিনার কিনা বোঝা যায় না–অশ্বের পায়ের শব্দে চমকে উঠে কিশোরীর গলায় অস্ত্র পেঁচিয়ে দিয়ে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিল। কিশোরীর দেহ সামনে পড়ে লাফাচ্ছে, গলা দু’ফাঁক হয়ে গেছে পশুর মত। হেরা অশ্য ধাওয়া করে দিনারকে পেল না। হঠাৎ নারীকণ্ঠের আর্তনাদে তাঁবুতে এসে দেখল নিশিমা খুন হয়ে গিয়েছে, তার মাথার কাছে মড়া আগলে বসে আছে এক বৃদ্ধা, সেই বৃদ্ধাই মাঝে মাঝে ককাচ্ছে ভয়ে। হেরা পাগলের মত ছুটে এল পাহাড়ের দিকে। এখানে নাকি ইহুদ থাকেন।

দেখা গেল, ইহুদ কতকগুলো মানুষকে, যারা অধিকাংশ মরুসৈনিক, নির্দেশ দিচ্ছেন–ছুটে যাও। বন্ধ করো তাণ্ডব।

হেরা বলল–যা হবার তা তো হয়েই গেছে মহাত্মা! সম্ভবত আপনার দিনার এইমাত্র এক কিশোরীকে খুন করে অন্ধকারে ছুটে গেল। এবার থেকে আমরা এক ক্ষমতাশালী সৈন্যদল গড়ে তুলতে বাধ্য হব!

তারপর সবচেয়ে বড় বাঁধটা রাতারাতি কেটে দিল কে, জানা গেল না। খরা এল অতঃপর। দগ্ধানো গ্রামের ভস্ম মরুর হাওয়াআকাশেওড়াতে লাগল। বালি উড়ে এসে খাল বুজে যেতে লাগল। পাথর গড়িয়ে পড়তে থাকল পাহাড় থেকে। উপত্যকার মধুচক্র শুধু মোম হয়ে ঝুলে থাকল হলুদ বর্ণে। রাত্রে গ্রামের ভিতর মৃত্যুর রোল উঠতে লাগল। মরু-হায়েনা হানা দিল রাত্রির গভীরে। শেয়াল ছুটে এসে মড়কলাগা পশুর দেহ ধরে টানাটানি করতে থাকল। নীল সমুদ্র হল ধূসর। মিশালের নৌকা অস্থির হয়ে দুলতে থাকল কেবল। দেবদাসীরা তাঁবু ছেড়ে নেমে এল পথে। চাষার ঘর থেকে মেয়েরা নেমে এল পথে। ভাঙা কুটিরে ফেদে বসল দেহের ব্যবসা। কিন্তু খদ্দের জোটানো দায়।

একদিন একটি মেয়ে হেরার হাত ধরে টানল।–এসো না গো! ঘরে আঙুর গেঁজানো মদ আছে।

হেরা চমকে উঠে দেখল, মাথাটা গেছে–এই কি নিনি! নিনি হেরাকে চিনতে পারল না। ভাঙা পাল্লা বন্ধ করে চিৎ হয়ে বসন আলগা করে দিল। হেরা তাকে সম্ভোগ করতে পারল না। পালিয়ে এল। এবার তার মনে হল, সব মিথ্যা! কোথাও নিশ্চয় পাপ করছে মানুষ, কী পাপ বুঝতে পারছে না।

ক্রমশ সে পাগল হয়ে যেতে বসল। বাতাসে পোড়া গন্ধ কিছুতেই দূর হতে চাইছে না। অধিকাংশ পশু মড়কে ফৌত হয়ে গেছে। তাঁবুর মানুষরা গাছের তলায় বসে আছে। যে লোকটির দুটি বউ–তাঁবুর বউ আর কুটিরের বউ–তার অবস্থা খুবই করুণ। কুটিরের বউ তার কাছে আসতেই চাইছে না। চাষাতে চাষীতে খুনোখুনি হয়ে গেছে। পুঁটকি মাছ আর কাঁকড়ার বিবাদ। হেরার মনে হল, মানুষ কখনওই খুনোখুনি ছাড়া থাকতে চায় না। দাঙ্গা, রক্তপাত, ধর্ষণ, মারী, মড়ক, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যাভাব, পথে বসে পড়া তার প্রাগৈতিহাসিক অভ্যাস। যুদ্ধ তার নিয়তি । নগর তৈরি হলেই সেটা সে ধ্বংস করে। সুন্দরী মেয়েকে বলাকার করা, বলি দেওয়া তার কাজ। চিরকাল সে ধ্বংসে আর বলাৎকারে আনন্দ পায়। নির্মাণের আনন্দ দু’এক জনের, ধ্বংসের আনন্দ সবার। নির্মাণের আনন্দ তাকে বোঝাতে হয়, তবে বোঝে–কিন্তু ধ্বংসের আনন্দ বোঝাতে হয় না।

যে যত ক্ষমতাশালী, যে যত সভ্য, সে ততই ধ্বংস ভালবাসে। বিনাশ হল মানুষের প্রবৃত্তি। ঈশ্বর যেমন ধ্বংস করেন, মানুষও তেমনি ধ্বংস করে। দেবদূতরা সুযোগ পেলেই আকাশ থেকে নেমে এসে মানবীর গর্ভসঞ্চার করে। বলাৎকার করার অভ্যাস দেবতারা মানুষকে শেখান। একমাত্র ঈশ্বর যবহ অদৃশ্য, তাঁর বলাৎকারের অভ্যাস নেই, তবে মানুষের হাতে গড়া নির্মাণ দেখলেই তিনি কুপিত হন। ভাষাভেদ করেন। বিচ্ছিন্ন তিনিও করেন। তিনি পাপ দ্বারা মানুষকে শোধন করেন, ধুনুরি যেমন তুলা শোধন করে। নগরগুলি ঈশ্বরের কর্মক্ষেত্র, সেখানে মানুষকে পেঁজানোনা তাঁর কাজ, ধ্বংস করা তাঁর আনন্দ।

কিন্তু নির্মাণ? স্থাপত্য? মূর্তি? হেরা ভাবল, কেন সে নির্মাণ করেছিল? সে কি তবে ধ্বংসের জন্য? একটা পাগলা পাথর যেমন পাহাড় থেকে খসে পড়ে, তেমনি একটা পাথর শিশুর মাথায় মেরে থেঁতলে দেওয়াও কি একটা অদৃশ্য ক্ষমতা? যুদ্ধেরই আর একটা রূপ? দিনার যদি করে থাকে–কেন করছে? সে যুদ্ধের লাশ গুনত ছেলেবেলায় উটের পিঠে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, একথা বলে সাদইদ। যুদ্ধের ভিতর জন্মালে কি একটা মানুষ পাথর মারতে ভালবাসে? আকৃতি নষ্ট করা, মানুষকে পোড়ানো, মাটিতে পোঁতাও কি একটা দায়িত্ব?

ভাবতে ভাবতে হেরার মাথাটা গোলমাল হয়ে যায়। নিনি আমাকে ডাকল! নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বসন আলগা করল কী কুশ্রীভাবে! নারীর সৌন্দর্যে আছে স্বর্গের আলো, শিশুর নগ্নতা ঈশ্বরের হাসির মত পবিত্র। সাদইদ এসব বলে। হেরা ভাবল, আসলে একটি মেয়েকে তুক করা ছাড়া আর কিছুই হয় না। তার সুন্দর আকৃতি এই বিশ্বে কখনও বজায় থাকে না। নগর ধ্বংস হয়, সেও ধ্বংস হয়। তবে নির্মাণ কেন করে মানুষ? হেরা ভাবল, তুক। রিবিকাকে তুক। করব। আর কিছু নয়। একবার তাকে হৃদয়ে বিম্বিত করাই আসলে সবকিছু। সেটাই তো স্বর্গ।

সাদইদের মনে হল, সমুদ্রে জলের তলায় একটি নদী প্রবাহিত হচ্ছে। তার তীরে অমরাবতী। বাইরে মাটির উপর আর কখনও স্বর্গ গড়া যাবে না। তার সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করছিল। মৃত্যুরও আকাঙ্ক্ষা থাকে। মনে হল, মৃত্যু যেন তাকে চাইছে। মিশালের নৌকা দুলছে। অসম্ভব তীব্র জ্যোৎস্নার এ রাত। চাঁদটা রাসরি এসে পড়েছে ঘুমন্ত রিবিকার মুখে। সাদইদ ভাবল, এই ফাঁকে সে জলে নেমে পড়ে। তারপর মনে হল, রিবিকাকে সে আর বহন করতে পারছে না। এই সীমাহীন রূপের ভিতর মদ নয়, মৃত্যু রয়েছে। এমন কি কখনও কেউ ভাবে? সুন্দরের সামনে দাঁড়ালে কি এরকম হয়? মরে যেতে ইচ্ছে করে?

নারী যে সুন্দর, তার রূপ থেকে স্বর্গের আলো তৈরি হয় শিল্পীর হাতে, এই কল্পনা তার মাথায় না এলে, এই জগতে তার কোনওই দুঃখ ছিল না। একটি প্রজাপতি থেকে এই ভাবনার উদয়। সমুদ্রেই তবে তার বিসর্জন হোক। বাইরে জ্যোৎস্না, জলে, কিনারে জ্যোৎস্না, গাছপালায় শিশিরমাখা জ্যোৎস্না, সবই বিচ্ছেদহীন মনে হচ্ছে। অথচ আজ বাতাসে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা সমুদ্রের মত গর্জন করছে। সীমানা হারানো মরুভূমি জ্যোৎস্নায় প্লাবিত–সেখানে ছুটে মরছে কালো অশ্ব–এই একটি ছবি। কোথাও নেই। অথচ মনের ভিতর রয়েছে। সাদইদের বুকের ভিতর একটা পাপের উৎস খুলে যায়। সহসা সে রিবিকাকে জাগিয়ে তোলে।

রিবিকার ঘুম জড়ানো, যেভাবে একটা চুল তার গালের উপর জড়ানো, ঈষৎ জেগেছে, নিদ্রাভিভূত সুন্দর, শুভ্ৰপুষ্প কলিকার মত কোমল-একদিকে ভয়াল যুদ্ধ, অন্যদিকে একা এই নারী–এখানে কী কাজ সাদইদের? মহাপিতা নোহ এই নারীকে কেন রক্ষা করেছিলেন?

জড়ানো গলায় রিবিকা বলল–তুমি ঘুমোবে না সাদইদ?

হঠাৎ মন্থর গলায় সাদইদ বলল–ভাড়াটে সৈনিক আর দেবদাসী। এভাবে বাঁচা যায় না রিবিকা!

ঘুম থেকে চমকে মুখ তুলে চাইল রিবিকা। তারপর বলল–তুমি তো সারগন সাদইদ!

তারপরই দু’চোখ মুদল এবং সাদইদের কোলে মুখ গুঁজে দিল রিবিকা।

সাদইদ কণ্ঠস্বর সামান্য কঠোর করে বলল—কিন্তু তুমি ইয়াহোর জন্য আজ উৎসর্গ হয়েছ আমনের বউ। তোমাতে আমার অধিকার নেই।

এবার মুখ তুলে উঠে বসল রিবিকা। সাদইদের গালে কোমল স্পর্শে হাত বুলিয়ে বলল–জীবন কেন এরকম বলতে পারো? যুদ্ধের দুনিয়ায় ঈশ্বরও করুণা করেন না। তুমি বলেছিলে, মানুষ ক্ষমতাধর! সেই ক্ষমতা কি এত ক্ষুদ্র যে, অধিকারের কথা তুলছ? কেন বারবার এমন করো!!

সাদইদ বলল–পাপ আমাকে উতলা করেছে রিবিকা? আমি পারছি না।

–তোমাকে পারতে হবে সাদইদ! আবার গড়ে তুলতে হবে! একদিন বলেছিলাম, তোমার তৈরি ভাষায় কথা বলব না, তোমার স্বর্গকেও আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তোমাকে চেয়েছি সারগন!

–কেন চেয়েছ! আমি তোমাকে এতদূর টেনে এনেছি শুধু স্বর্গে পৌঁছব বলে। তা যে অবাস্তব। আজ হয় ইয়াহো, নয় হেরা। একদিন প্রশ্ন ছিল, কার কাছে দেব–রাজা হিতেন, নাকি লোটা। দুজনের কেউ তোমায় পায়নি।

-হেরা কেন?

–তোমার নগ্ন রূপ তার বিষয়।

–আমি যাব না। কিছুতেই যাব না। এই রূপ তো তোমারই সারগন। নমরু, আক্কাদ এরা যে কেউ কখনও আমার এত দাম দেয়নি!

–হেরার চোখে তুমি আরে দামী রিবিকা। সে স্থপতি, সে ভাস্কর!

–কিন্তু তুমি স্বর্গদর্শী সাদ! প্রজাপতি তোমার বন্ধু!

–তাই আমার পাপ! আমি বুঝিনি, মধুতে যখন প্রজাপতি লিপ্ত হয়, সেই ঘটনায় পাপ ছিল! অতি-কল্পনায় পাপ থাকে। স্বর্গের কাঠামো মানুষের পাপের পাঁজর দিয়ে তৈরি। ইহুদ বলেন, গ্রামকে শুষে তবে নগর তৈরি হয়, একটা স্বর্গ হল তারই চুড়া! অতএব তোমাকে ইহুদের কাছেই ফিরে যেতে হবে রিবিকা! আমি তোমাকে বইতে পারছি নে!

হঠাৎ রিবিকার মুখ কালো হয়ে গেল! যেন জ্যোৎস্নার চাঁদের গায়ে মেঘ এসে লেগেছে। ক্রমশ কালো হয়ে আসছে সমুদ্র-ছায়া।

রিবিকা ধীরে ধীরে নৌকার উপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল–তুমি রাজা! এই তোমার অহংকার সাদইদ। গ্রাম বসালে, চাষ-আবাদের নতুন নিয়ম আনলে। স্বর্গ গড়তে চাইছ। যুদ্ধ করেছ। তুমি অধিপতি। আমি সামান্য দেবদাসী। যতবার যাকে খুশি দেওয়া যায়। আমি যুদ্ধের পরিত্যক্ত জিনিস। আমাকে দিয়ে স্বর্গ গড়া যায়, যুদ্ধও করা যায়। দেবী ইস্তার আমাকে নগ্ন করেছে, আমন ভোগ করেছে, ইয়াহো তারই শোধ নিলেন নোটাকে দিয়ে। সবই হল!

–এ-সবই ঘটনা রিবিকা! প্রশ্ন করো না। এভাবে চিন্তা করা পাপ। নারী কখনও এভাবে চিন্তা করে না।

–তবে আমায় যেতে দাও। –বলে রিবিকা সমুদ্রে ঝাঁপ দেবার জন্য এগিয়ে যায়। সাদইদ বলে, স্বর্গ ওদিকে নয় রিবিকা! বলেই সে রিবিকার দেহ হাত ধরে টেনে নেয় নিজের দিকে। তারপর অবাক হয়ে ভাবে, স্বর্গ তবে কোথায়! একটু আগেই তো সে নিজে জ্যোৎস্না-পুলকিত রাত্রির তলায় উত্তাল সমুদ্রের নিচে একটি নদীতীরে অমরাবতীর সেই কক্ষ কল্পনা করছিল।

রিবিকা সাদইদের বাধা ঠেলে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে চায়–তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয় সাদইদের বলপ্রয়োগে। সাদইদ অতঃপর রিবিকাকে একপ্রকার জোর করেই সম্ভোগ করতে থাকে। রিবিকা বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারে না। অবশেষে রিবিকা মেনে নেয় এবং ভাবে, এই পৃথিবীকে তার আর কোন প্রশ্ন করার নেই। তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। এই বলপ্রয়োগই বীজ। এরই নাম মাটি আর উদ্ভিদ। দেবী ইস্তারের জন্মকথা, তার মৃত্যু, তার প্রেম আর নগ্নতা কখনও শেষ হবে না। সে স্বর্গে গেলেও নগ্নই থাকবে। তবে, এই পুরুষকে যেন সে এইভাবে অন্য কোন জীবনে বুকের ভিতর পায়–ঈশ্বর যেন এই ব্যবস্থা করতে পারেন!

দাঙ্গাবিধ্বস্ত কনান। দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশ। পশুদের মড়ক লেগেছে। বন্যায় বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে শস্যক্ষেত। বন্যার পর মড়ক। তারপর দুর্ভিক্ষ। তীব্র শীত হানা দিল ঘরে ঘরে। শীতেও মানুষ মরতে লাগল। সবচেয়ে বেশি মারা গেল তাঁবুর লোক। আগুন জ্বালবার, রাতে গা গরম করে কোনপ্রকারে বাঁচার তাগিদে তাঁবুর মানুষ চাষী-গেরস্তর আঙিনায় শুকনো কাঠ চুরি করতে এসে ধরা পড়ল। নির্মম বিচারে চোরের হাত কেটে দিল জনগণ। সেই কাটা হাত দেখিয়ে জনে জনে সে বলে বেড়াতে লাগল–সে একজন দামাদ। জামাইবাবু। চার ঘরের বর, দেখে রাখুন, কী হেনস্থা করেছে।

সাদইদ হেরাকে বলল–সমস্ত উদ্বৃত্ত, যা দিয়ে নগর এবং মূর্তি তৈরি হয়, সব বিলি করে দেব। যত মূল্যবান ধাতু, দামী পাথর বাইরে থেকে আনা হয়েছিল, সব বিক্রি করে বস্ত্র কিনে নেব। সবই বিলি করতে হবে।

হেরা বলল–সব হাতে তুলে দেবার পরও দেখবে, কত মানুষ মরে গেছে।

–তবু যতদূর বাঁচাতে পারি। স্বর্গ গড়ার কাজ স্থগিত রেখে দাও হেরা!

হেরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–মহাত্মা ইহুদ বলেছেন, এই বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মড়ক, মহাশীত সবই স্বর্গ গড়তে চাওয়ার পাপ । তুমিই মানুষের দুঃখের জন্য দায়ী। এতকাল দেবতার দোষ দেওয়া হত, এবার মানুষ তোমাকে দুষছে! তাছাড়া..

–তাছাড়া কী?

–এত কষ্ট, তবু মানুষ দাঙ্গার পর গুমখুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে অবিরাম!

–মহাত্মা ইহুদ কী করছেন হেরা!

–লাঠির শাসন মানুষ শুনছে না সাদইদ। ইহুদ বলছেন, স্বর্গ গড়া বন্ধ হলে তবে মানুষ শাপ এবং পাপমুক্ত হবে।

–স্বর্গ সম্ভব নয় হেরা। তুমি ফিরে যাও।

–আমি ফিরে যাব?

–হ্যাঁ হেরা! আমি তোমায় বিদায় দিচ্ছি!

দামী পাথরগুলি বিক্রি করতে শুরু করল সাদইদ। চোখের সামনে এই দৃশ্য সহ্য করছে পারছিল না হেরা। বণিকরা সব বস্ত্রের বিনিময়ে খরিদ করে নিয়ে উট এবং অশ্বের পিঠ বোঝাই করে ফিরে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্য সমুদ্রের উপর ভাসমান নৌকা থেকে রিবিকাও লক্ষ্য করছিল। সাদইদ একটা উচ্চ শিলাসনে দাঁড়িয়ে খাদ্য আর কাপড় বিলি করছিল। সে দৃশ্য রিবিকার দৃষ্টিসীমার বাইরেই ছিল।

চোখের সামনে দিয়ে বহুকষ্টে সংগৃহীত পাথরগুলি চলে যাচ্ছিল। নির্মাণের কাজে এতবড় আত্মঘাত সহ্য করা হেরার পক্ষে খুবই প্রাণবিদারী ঘটনা। তার সুন্দরের অনুভূতির স্তরে স্তরে আঘাত পড়ছিল বারবার। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, সবচেয়ে উজ্জ্বল পাথরখণ্ড, যা অফুরন্ত বাসন্তী আলো বিকিরণ করে, যা দিয়ে সে অমরাবতীর নির্দিষ্ট কক্ষে চিরবসন্ত বিরাজ করবে এমন স্ফুটিত রঙিন শুভ্রতার সঙ্গে চাপা বাসন্তী আভা ছড়াবে বলে পাথরটি প্রাণান্ত চেষ্টায় জোগাড় করেছিল, সেই পাথরটিও বেচে দিচ্ছে সাদইদ।

দ্রুত ছুটে গিয়ে হেরা বণিকটির সামনে দাঁড়িয়ে সাদইদের দু’হাত চেপে ধরে বলল–দিও না। এভাবে দিও না সাদ। তোমার স্বর্গে তাহলে কখনও প্রজাপতি উড়ে আসবে না।

পাগলের মত ককিয়ে উঠল হেরা। বণিকটি আশ্চর্য হয়ে গেল, কিঞ্চিৎ থতমত করে বলল–পাথরটা দামী নিশ্চয়। দামও আমি দেব। গরম গরম ভাল পোশাক আর খাঁটি মদ আমার কাছে আছে।

হেরা বলল–আপনি অনেককিছুই বোঝাই করেছেন–এই পাথরটা আর চাইবেন না।

বণিকটি বলল–দাম আমি উপযুক্তই দিতাম, আমি উটের পিঠ খালি করে দিয়ে যেতাম। চারদিকে আকাল চলছে, ভেবে দেখুন!

সাদইদ হেরার ভয়ানক অস্থিরতা দেখে বলল–ঠিক আছে সওদাগর, আপনি বরং এখন চলে যান, পরে দেখা যাবে’খন।

–না। পরে নয়। কখনওই নয়। আপনি আসবেন না। চলে যান। একবারে চলে যান!

হেরা যেন আর্তনাদ করে উঠল। বলল–এভাবে আমায় তুমি বাতিল করে দিও না সাদইদ!

এই সময় চোখে পড়ল আর এক দৃশ্য। কাঠের উচ্চ চারপায়ার উপর দাঁড়িয়ে সাদইদের নির্দেশে যে মধ্যবয়স্ক শান্ত মেজাজের স্বাস্থ্যবান কর্মীটি কাপড় এবং গম বিতরণ করছিল তার সামনে সহসা কখন লাঠি হাতে এসে দাঁড়িয়েছেন ইহুদ। লাঠির অগ্রভাগ দিয়ে ঠেলা দিলেন গম মাপার পাত্রটিতে, যে দুঃখী তাঁবুর বাসিন্দা আঁচল পেতেছিল, সে সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে আঁচল গুটিয়ে নিল। গমগুলি মাটির উপর পড়ে গেল।

সাদইদ এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল–ওকে নিতে দিন মহাত্মা ইহুদ!

–না। পাপের শস্য নেবে না। যে উদ্দেশ্যেতুমি মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছিলে, তার অহংকার আছে, সেই শস্য মুখে ভোলা পাপ সাদইদ। ইয়াহোর বান্দা শুকিয়ে মরবে, তবু নেবে না। মরুভূমিতে আমরা পরীক্ষা দিয়েছি, আজও পরীক্ষা শেষ হয়নি। তুমি যা কেড়ে নিয়েছ, সবই তোমায় ফেরত দিতে হবে। তোমাকে মানুষ বিশ্বাস করে না। তুমি নিজেকে ঈশ্বর মনে কর!

ইহুদ আর দাঁড়ালেন না। যে লোকটি ঘাড়ের বসন সামনে মেলে আঁচল পেতেছিল, সে অতঃপর ইহুদের পিছুপিছু ঘাড় নিচু করে চলে যেতে লাগল। পলকহারা সাদইদ খুব আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইল সেদিকে। দুটি চোখ তার ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল। এক সিক্ত বেদনার ছায়া চোখের পাতায় ভার হয়ে বসল। তার মনে হল, সবই বৃথা। এই জীবন আর বহন করা যায় না।

রাত্রির হালকা চন্দ্রকিরণে নিঃসঙ্গ সাদইদ সাদা অখের পিঠে ঘুরে বেড়ায়। দেখতে পায় যে মানুষ ক্ষুধায়, শীতে, মড়কে কাহিল, সে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে আছে, তাঁবুতে বা গৃহকোণে কিংবা পথের ধূলায়, কাঁকরমেশানো কালো মাটিতে, সাদা বালিতে-ইয়াহোর নাম ধরে আর্তনাদ করছে। মনে হল, মনের কোন্ মহাবল এদের এমন করেছে! সাদইদের কষ্টের সীমা রইল না।

গভীর রাত্রিতে নৌকায় ফিরে এসে সীমাহীন অপমান তাকে বিদ্ধ করতে থাকল। দামী পাথরটার কথা তার বারবার মনে পড়ছিল। হেরার আকুলতা সে ভুলতে পারছিল না। মনে পড়ছিল, মানুষের পথে পড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ইয়াহোর নাম উচ্চারণ করতে করতে মরে যাওয়ার দৃশ্য। এরা তার কাছে হাত পাতবে না। পাপের শস্য গ্রহণ করবে না। তাকে তারা বিশ্বাস করে না। সে লোটার বউকে হরণ করেছে। মানুষকে সে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার জন্য উপত্যকায় স্বর্গের ভিত তৈরি করেছে!

সাদইদ রিবিকার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে ছিল। এই সৌন্দর্য এক জমাট বধিরতা মাত্র, চেয়ে থাকলে স্বাসরোধ হয়ে যায়। রিবিকা চোখ মেললে এই রাত্রে আর সাদইদ সইতে পারবে না। সৌন্দর্যের সেই ভাষার সামনে সে দাঁড়াতে পারবে না। এমন কেন ভয় করছে,সাদইদ বুঝে পায় না। মনে হল, জীবনেও সে আর রিবিকার চোখদুটির দিকে চাইতে পারবে না। মরুভূমিতে কোনওই সৌন্দর্য ছিল না, কিন্তু এই নারী ছিল। জীবনে এমন কেন ঘটেছিল,সাদইদের জানা নেই। লোটা সাদইদকে বিশ্বাস করত, ভাবত, সাদইদ থাকতে তার কোনওই ভয় নেই, মৃত্যুও লোটাকে স্পর্শ করবে না। অথচ মৃত্যু নোটাকে স্পর্শ করেছে, সাদইদ স্পর্শ করেছে লোটার বউকে!

সাদইদ আর ভাবতে পারছিল না। স্বর্গের জন্য এই নারীর নগ্নতা জরুরি, হেরার সামনে একান্ত এই রূপ খুলে বসা দরকার। সবই সত্য! অথচ আজ আর কোন কিছুই সত্য নয়। রিবিকার গায়ের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে সাদইদ থেমে পড়ল। তার এত কষ্ট হচ্ছিল যে, বুকের ভিতরে যেন একটি মরুভূমি ঢুকে গিয়ে হাহাকার-করা ‘লু’ প্রবাহিত করছিল।

এইভাবে রাত কেটে যাচ্ছিল। সমুদ্র তোলপাড় করছিল। চাঁদ নিবে গিয়ে সমুদ্র কালো হয়ে আসছিল। চোখের সামনের জল যে জল তা আর মনে হল না। হঠাৎ এ কী! অস্পষ্ট উত্তালতার খাঁজে খাঁজে একটি কালো অশ্ব ছুটে বেড়াচ্ছে কেন? ঢেউগুলি যেন স্থির হয়ে পড়ছে মুহূর্তে, তার আড়ালে কালো ঘোড়া! সেই দৃশ্য ভেঙে আবার একই দৃশ্য তৈরি হচ্ছে।

সাদইদ চাইছিল নিচ্ছিদ্র এক অন্ধকার সমুদ্র যাতে আর দেখতে না হয়। চাঁদ শেষ হলেই যেন সমুদ্র শেষ হবে। বাইরে দূরে গাছপালার দিকে চাইল সে–কালো এলোমেলো ছায়া। অন্ধকারে এইবার সে রিবিকার গায়ে হাত দিয়ে ডাকল–চলো রিবিকা, সময় হয়েছে!

রিবিকা অন্ধকারেই উঠে বসল। নৌকা থেকে নেমে এল ওরা। কোনওই কথা বলল না। সাদইদ ভাবছিল, রিবিকা নিশ্চয়ই কিছু বলবে। নির্বাক অশ্ব অতঃপর অন্ধকারেই অগ্রসর হল। সমুদ্র রইল পিছনে, সামনে গ্রাম, তারপর ক্রমশ নদী এগিয়ে আসতে থাকল। নদী পার হল ওরা। রাত শেষ হয়ে আসছে। মরুভূমি থেকে শীত সরে গেছে। শেষরাতে শীতলতা আছে বাতাসে, আকাশের এককোণে মেঘও জমেছে গ্রামগুলির উপর। অন্ধকার ফিকে হয়েছে, মেঘটার দিকে চোখ পড়ল সাদইদের। রাত এভাবে আরো ফুরিয়ে এল।

রিবিকা তবু কোন কথা বলল না। হঠাৎ একটি কুটিরের সামনে এসে অদ্ভুত একটা গানের কলি শুনে থেমে পড়ল সাদইদ। একটি বৃদ্ধা আপনমনে নিশ্চয়ই বলছে না, কারুকে উদ্দেশ করেই বলছে কোন কাহিনী। ফাঁকে ফাঁকে দু’একটি কলি গেয়ে উঠছে।

সারগন এগিয়ে চলেছে সাদা অশ্বে। পিছনে তেড়ে আসছে মৃত্যুর দেবদূত আজরাইল। সারগন বুঝতেই পারছে না। সারগন বুঝতেই বা পারবে কেন? ইয়াহো যাকে পাঠায়, সেই মরণ, তাকে তো দেখা যায় না। যদি সারগন তার আপন হাতে গড়া স্বর্গে পৌঁছে যেতে পারে, মরণের সাধ্য নেই তাকে ছোঁয়ার। সারগন দ্রুত অশ্ব তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে।

অশ্ব থেকে নেমে পড়ল সাদইদ। শুনতে পেল এবার একটা সুর :

‘সারগন যায় উপত্যকার সড়কে–
মানুষ মরে খিদের জ্বালায় মড়কে।
তবু সারগন থামে না, মধুর দেশে দুধের দেশে;
সারগন যায় সিঁড়ির শেষে উপরে, বাতাসে–
সারগন যায় আকাশে, দুধের পথ, তারার আলোর উপরে,
তার গন্ধ বাতাসে, তার শব্দ আকাশে, শহরে ॥’

সাদইদ কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াতেই গান থেমে গেল। বৃদ্ধা কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। অবাক হয়ে চেয়ে রইল সৈনিকের মত দৃপ্ত বলিষ্ঠ সাদইদের দিকে। সাদইদের আজকের পোশাক ছিল সৈনিকেরই মত।

সাদইদ অভিভূত গলায় বলল–আপনি কে? ওই মেয়েটি কি আপনার? বৃদ্ধা বলল–আমি আর কে বাছা! তোমার দয়ায় আমরা বেঁচে আছি। ওটা আমার মেয়ে। আমি বিধবা। তোমাকে আমি কখনও যে আমার কুঁড়ে ঘরের সামনে দেখতে পাব ভাবিনি। এ যে স্বপ্ন বাবা। দাঁড়াও। তোমার স্বর্গে দেবার। জন্য একটা দানসামগ্রী রেখেছি, ভেবেছিলাম মেয়ের বিয়েতে দেব।

বিধবা ঘর থেকে এক টুকরো ধাতু মুঠোয় করে এনে সাইদের দিকে এগিয়ে ধরল।

বলল–নাও। স্বর্গ গড়ে তোল সারগন। খুব তুচ্ছ, কিন্তু হেলা করো না। আমি দিলাম। আমার আর কিছু নেই।

সাদইদ অশ্বের কাছে ফিরে এল। স্বর্গটিকেই যেন সে হাতের মুঠোয় করে ধরে এনেছে। মুহূর্তে সে তার সমস্ত অবস্থার কথা বিস্মৃত হয়েছিল। রিবিকার হাতটা আপন হাতে তুলে নিয়ে একটি তালুতে ধাতুটুকু অর্পণ করে বলল রাখো রিবিকা!

রিবিকা মুঠোয় চেপে ধরে চোখ মুদে কেঁদে ফেলল। তারপর কথা বলে ফেলল, আর সে চুপ করে থাকতে পারল না।

বলল–আমায় দুর্ভিক্ষের মুখে তাঁবুতে ফেলে দিও না সারগন। আমি বাঁচতে চাই। আমি তোমার। সাদইদ! আমাকে এভাবে কেন নিয়ে যাচ্ছ!

সাদইদ বলল–আমি তোমায় ফেলে দেব না রিবিকা। এ অশ্ব এখন উপরে উঠবে। ইয়াহো নয়। ইহুদ নয়। লোটাও নয় রিবিকা। হেরা! একমাত্র হেরা!

তাঁবুর পথ ছেড়ে অশ্ব উপত্যকার দিকে সবেগে ছুটতে শুরু করল। সাদইদ চিৎকার করে উঠল–হেরা!

রিবিকা ফুঁপিয়ে উঠল পাষাণ-বন্দী উড়ন্ত একটি জোনাকির মত, অশুর মত।

.

১২.

হেরা কেবলই রিবিকার পা দু’খানির দিকে চেয়ে ছিল কতকাল। তার শুধু সাদইদের করুণ অসহায় মুখচ্ছবি মনে পড়ত। কিছুতেই হেরা রিবিকার মুখের দিকে চোখ তুলে চাইতে পারত না। অথচ রিবিকার নগ্ন দেহ এবং মুখের অপরূপতা না দেখলে মূর্তি নির্মাণ করা যায় না। হেরা উপত্যকা নিচে স্বর্গের রাস্তা যেখান থেকে সমতল স্পর্শ করে উপরে উঠে এসেছে ঠিক সেই নিম্নভাগে লোটার অশ্বারোহী প্রস্তরমূর্তি খাড়া করেছে। সমস্ত পথ প্রস্তরশোভিত করেছে। উপত্যকায় সুসজ্জিত করেছে বৃক্ষলতাপুষ্প এবং মধুচক্রের বিন্যাস। স্বর্গের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত করেছে ঝর্নার স্রোত এবং শান্ত উদ্যানকে বেষ্টন করেছে ছবির মত স্থির জলাশয়। এখানে চিরবসন্ত বিরাজ করবে, এই তার প্রত্যাশা।

কিন্তু রিবিকাকে পাথরে উৎকীর্ণ করার উপায় তার জানা নেই। তার কেবলই। মনে হত, সে রিবিকাকে তুক করার কথা বলেছিল এজন্য যে, নিনিভার মুখশ্রী তাকে মুক্তি দিচ্ছিল না। আজ নিনিভা নষ্ট হয়ে গেছে। সে তবে রিবিকার মুখের দিকে চাইতে পারে। কিন্তু কিছুতেই সে চোখ তুলতে পারল না।

.

এইভাবে কতকাল কেটে গেছে। সে ছুটে গেছে সাদইদের কাছে। বলতে চেয়েছে–আমি পারব না সাদ। রিবিকার নগ্ন দেহ এবং মুখশ্রী দেখলে আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারব না। তোমার স্বপ্ন আমার স্পর্শে নষ্ট হবে । তোমাকে আমি নগর দিয়েছি, স্বর্গ চেও না।

সাদইদ বলেছে–আর কতকাল অপেক্ষা করব হেরা! তোমার প্রজাপতি কি উড়ে এল? আমি তোমাকে সর্বস্ব দিয়েছি, আমাকে আমার স্বর্গ উপহার দাও। মরুভূমিতে ছিলাম, একটি মেয়ের রূপ দেখে আমি একটি শিশুর জন্য স্বর্গের কল্পনা করেছি। আমি চেয়ে আছি, তুমি কবে ডাকবে!

হেরা কোন কথা না বলে তার মূর্তির কাছে ফিরে এসেছে। সে কিছুতেই আর শুরু করতে পারছে না! সে রিবিকার পা দু’খানির দিকে চেয়ে আছে। একদিন এভাবে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ হেরার ছায়া পড়ল জলাশয়ের জলে।

হেরার মাথায় বুদ্ধি খেলে ওঠে। হৃদয়ে আলোড়িত হয় ছায়া। সে একটি উচ্চ পাটাতন খাড়া করে। জলাশয়ের উপর, কিনারে বাঁকিয়ে তৈরি করে একটি গোল অর্ধচন্দ্রকলাকৃতি পাটাতন–যার উপর গিয়ে বসে থাকে সে। রিবিকা জলের তলে হেরার ছায়া দেখতে পায় একটি গাছের ছায়ায় বসে–এখানে থাম উঠেছে গৃহের। মানুষ এখানে আড়াল হতে পারে। অথচ জলাশয়ের পতিত ছায়া দেখা যায়।

রিবিকা একদিন অতঃপর পাটাতনের উপর গিয়ে বসে পড়ে। গায়ের কাপড় ফেলে দিয়ে নগ্ন হয়। ছায়ার উপর চোখ পড়ে হেরার। হেরা তার কাজ শুরু করে। হেরা ভালবেসে ফেলে একটি ছায়া। আর কিছু নয়। রিবিকা, নগ্ন রিবিকা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে–সে জীবনভর কোন পুরুষকেই পেল না। সে একটা ছায়ামাত্র। মরুভূমির বুকে সে ছিল। স্বর্গেও সে রয়েছে। অথচ সে মানুষ নয়।

রিবিকা আর্তনাদ করল আমায় যেতে দাও হেরা! আমাকে পাষাণে বন্দী করো না।

হেরা বলল–তুমি ছায়া মাত্র। তোমার কথার জবাব আমার জানা নেই রিবিকা! আমাকে কাজ করতে দাও।

রিবিকা চিৎকার করল–আমি যেতে চাই। আমাকে সারগনের কাছে নিয়ে চল।

–কাজ শেষ হলেই তুমি সারগনকে ফিরে পাবে রিবিকা।

–কবে শেষ হবে?

–আর দেরি নেই।

সাদইদের মনে হল, স্বর্গের সেই কক্ষে রিবিকা রয়েছে। তার কি কষ্ট হয় না?

একদিন সে ঘোড়া ছুটিয়ে উপত্যকায় ছুটে এল।

হেরা বলল–কাজ শেষ হয়ে এসেছে। এবার তুমি স্বর্গে প্রবেশ করবে।

–কবে হেরা?

–কালই সাদইদ। কাল প্রত্যুষে–সূর্যোদয়ের মুহূর্তে । সামান্য কাজ বাকি। কক্ষের নারী স্বর্গের বাইরে অশ্বের হেষা শুনে বাবার মত কেঁদে উঠল। মনে হল, এ যেন লোটার কালো ঘোড়া তাকে ডাকছে। হঠাৎ কেন তার এমন মনে হল সে জানে না। মরুভূমি সত্য ছিল না, এই স্বর্গও সত্য নয়। তার নিজেরই আকৃতি এক মরীচিকা মাত্র। সে বাস্তব নয়। তার বিবাহ বাস্তব ছিল না। সে সমুদ্রে মিশালের নৌকায় লুকিয়ে ছিল সে জীবন অবাস্তবই ছিল। তবে এখানে কেন সে রয়েছে! রিবিকার ইচ্ছে করল, সে বাইরে বেরিয়ে পড়ে।

রিবিকা পারল না। সে তার আপন মূর্তির ওপর মাথা কুটতে লাগল। সে একা। স্বৰ্গ কি মানুষকে এরকম একা করে দেয়? চরম এক নিঃসঙ্গতা ছাড়া তার কিছু নেই।

কিন্তু সেই আগামীর প্রত্যুষ আর এল না। সূর্যোদয় হওয়ার আগেই হেরার কাজ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাত্রির গভীরে তাঁবুর সৈন্যরা এসে হেরার আঙুল কর্তন করে স্বর্গের মেঝেয় ফেলে রেখে চলে গেল। মেঝেয় সর্বাত্মক আর্তনাদ করে গড়াতে থাকল হেরার দেহ। হেরার এই ভয়াবহ আর্তস্বর রাত্রির আকাশকে বিদীর্ণ করতে থাকল।

রিবিকা ভেবেছিল, সৈন্যরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু তাকে তারা স্পর্শও করল না। একজন কেবল বলল–পবিত্র নারী অশুচি হয়েছে, ওকে স্পর্শ করা পাপ। ওকে শুদ্ধ করার লোক নেই।

নগর ধ্বংসের কাজ শুরু হল। ইহুদের অত বিশাল সৈন্যবাহিনী কোথা থেকে এল কেউ জানে না। সাদইদের স্বল্পসংখ্যক সেনার উপর সেই রাত্রেই অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাদইদ বুঝতেই পারেনি, ইহুদের ধর্ম কতদূর প্রসারিত হয়েছে। তলে তলে কতবড় সংগঠন গড়েছেন তিনি। আসলে ইহুদের সৈন্য শুধু নয়, সাগর-জাতি কনানকে আক্রমণ করল সেই রাতে। যুদ্ধ বাধল।

মিশালের নৌকায় একলা শুয়ে ছিল সাদইদ। একজন জোয়ান সমুদ্রের কিনারে অশ্বের পিঠ থেকে নামল। দিনারের মত আকৃতি। সে ঝুঁকে পড়ল নৌকার কাছে। দড়ি খুলে দিল। স্বপ্নগ্ৰস্ত গভীর নিদ্রামগ্ন সাদইদ ভেসে গেল।

.

সমুদ্র তার হৃদয়ে পরম সমাদরে সাদইদকে টেনে নিল। নৌকা তাকে তুলল, ফেলল। এই দৃশ্যের তরঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। এই দৃশ্যের কোন সাক্ষী রইল না। চাঁদের কিরণ ঝিলমিল করতে থাকল কেবল।

কনান থেকে আবার একটি প্রবাহ চলেছে জেরুজালেমের দিকে। বন্দর নগরীগুলি অতিক্রম করছে সেই স্রোত। কিছু স্রোত ছড়িয়ে পড়েছে মরুভূমির বুকে। মানুষের এই বিপুল প্রবাহ থামতেই চাইছে না। মহাত্মা ইহুদ এদের পথ-নির্দেশ করছেন।

ইহুদ বললেন–মানুষ আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, তাদের আবার গুছিয়ে তুলতে হবে। জেরুজালেমের বুকে হবে শেষ যুদ্ধ। সেখানেই গড়ে তুলতে হবে ইয়াহোর মন্দির। ঈশ্বর প্রত্যাদেশ করেছেন, সাদইদের স্বর্গ ছিল তাঁরই স্বর্গের মত সুন্দর। তাই ইয়াহো সাদইদের স্বর্গের সমস্ত আকৃতি নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। স্বয়ং সাদইদ কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না।

একজন বৃদ্ধা হাহাকার করে কেঁদে বলল–লোটা ছিল সাদইদের বন্ধু!

ইহুদ বললেন–সাদইদ জন্মেছিল এক দ্বীপে। সাদইদ প্রসব হওয়ার পর তার মাকে মৃত্যুর দূত হত্যা করেন, মৃত্যুর দূত মাকে হত্যা করার মুহূর্তে কেঁদে ফেলেছিলেন। সাদইদের মৃত্যু যখন হয়, মৃত্যুর দূত আজরাইল ছাড়া তার কাছে। তখন কেউ ছিল না। এই মৃত্যুর নিঃসঙ্গতা কী ভয়াবহ ছিল ওহে আকাশের মালিক ইয়াহো! আজরাইল কত প্রাণ হত্যা করেছেন, কিন্তু কেঁদেছেন মাত্র দু’বার। সাদইদের জন্মের মুহূর্তে এবং মৃত্যুর সময়। কারণ সে স্বর্গে প্রবেশ করতে পারেনি।

মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিয়ে আবার চলতে শুরু করে জনস্রোত। একটি উঠের পিঠে আশ্রয় পেয়েছে রিবিকা। উটের রশি ধরে মাথা নিচু করে চলেছে হেরা।

রিবিকা প্রশ্ন করল–তুমি কেন ওভাবে চলেছ হেরা! কোথায় যাবে?

হেরা বলল–আরো একটি নগর নির্মাণের দিকে চলেছি আমরা! এ পথ স্বর্গের দিকে চলেছে রিবিকা।

রিবিকা পিছন ফিরে চেয়ে সজোরে আতশব্দে চেঁচিয়ে উঠল–কিন্তু সারগন কোথা হেরা! কোথায় তাকে রেখে এলে!

হেরা কোন জবাব দিতে পারল না। ঘাড় নিচু করে এগিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ রিবিকা শুধলো–তোমার যে আঙুল নেই হেরা!

হেরা বলল আমার কিছুই নেই। কিন্তু আমি নিনিভে নির্মাণ করেছিলাম। আমি সাদইদের স্বর্গ গড়েছিলাম। রিবিকা! এই কথা মানুষকে বলবার জন্য আমি তোমার সঙ্গে চলেছি। শুধু এক কষ্ট আর বিস্ময় আমার সম্বল।

–আমার যে কেউ রইল না হেরা!

–আমি রইলাম।

–কিন্তু আমাদের যে কেউ আর চায় না স্থপতি। মহাত্মা ইহুদ আর আমায় চিনতে পারেন না। আমরা যে পাপ করেছি।

হেরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–পাপ!

শুধু এইটুকু উচ্চারণ করেই পথের উপর দাঁড়িয়ে পড়ল হেরা। বুঝতে পারল রিবিকা আর তাকে ইহুদ হত্যা করতে পারেন। কারণ সাদইদ এখন ইতিহাস। কাহিনী-পরাণ। লোটা অমর। ভাবতে ভাবতে উট থেমে পড়ল।

জনস্রোত সামনে এগিয়ে চলেছে। হেরা আর রিবিকা অন্য এক দিগন্তের দিকে পাড়ি জমাল। আকাশে মেঘ জমল, ঝাঁপসা হয়ে এল দিগন্ত। তারাও কাহিনী হয়ে গেছে। তাদের জীবন আর অস্তিত্ব উদ্বাস্তু এই স্রোতের কাছে অনাবশ্যক। এরা তাদের আর চায় না।

দুটি নরনারী অতঃপর একটি জনশূন্য দিগন্তের দিকে চলেছে। এই উট এক জীবনবাহী জীব। তার রয়েছে এক বীর্যবান পুরুষ আর এক ঋতুমতী নারী।

মরুভূমে আবার একটি স্বর্গ তৈরি হবে। অতএব এখান থেকে ফের শুরু হল হেরা আর রিবিকার অভিযাত্রা।

পিছন থেকে বাতাস যেন বলে উঠল–আমার স্বর্গ আর কতদূর হেরা!

হেরা পিছনে চাইলে, সমুদ্র উত্তাল হয়েছে।

আবুল বাশার- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...