কবিতা

এসেছি দাফন ক’রে

কেউ কি শুনতে পাচ্ছে বহুদূর থেকে ভেসে আসা
বন – পোড়া হরিণীর
আর্তনাদ ? সর্ষেক্ষেত , আশশ্যাওড়ার
ঝোপ , মাছরাঙা
আর পানকৌড়িময় বিল ,
প্রান্তর পেরিয়ে – আসা ধ্বনি ক্রমাগত
আছড়ে পড়ছে এ – শহরে
রাজপথে , গেরস্ত পাড়ায় , কলোনিতে
দেয়ালে দেয়ালে কারাগারে ,
অত্যন্ত সতর্ক
প্রহরীবেষ্টিত ছাউনিতে , পরিখায়
কেউ কি শুনতে পাচ্ছে? নাকি এ -আমার
মনেরই খেয়াল ? অতিশয় ন্যালাক্ষ্যাপা
কবিত্বের ব্যাপার – স্যাপার ?
এই তো শুনছি স্পষ্ট এবং নির্ভুল —
কে যেন কুয়াশাময় কণ্ঠে ‘ সত্য , সত্য, ব’লে যাচ্ছে ডেকে
একটানা , অথচ সাধের
সত্য অপুষ্টিতে ভুগে ভুগে
সে কবে হয়েছে দেশান্তরী । সে আবার আসবে কি
ফিরে কোনদিন
ভীষণ উড়নচন্ডে , ভ্রষ্ট , গৃহত্যাগী
পুত্রের মতন ?
‘ সুন্দর , সুন্দর , ওরে সুন্দর কোথায় গেলি ‘ ব’লে
নেকড়ের গায়ের রঙের
মতো অন্ধকারে কেউ বুক – ফাটা আওয়াজে ডাকছে
যে – রকম মৃণাল সেনের
ফিল্মে ছেলে – হারানো মা উজাড় ভিটায়
ফসলবিহীন
ক্ষেতে ও প্রান্তরে সন্তানের নাম ধ’রে
ডাকে , ডাকে , ডাকে ; সে কোথায়
সুন্দর রয়েছে প’ড়ে; তার শব নিয়ে কি ভীষণ টানাটানি ,
খাবলা – খাবলি
করছে শেয়াল আর কুকুরের পাল ,
যেমন আকালে করে ওরা আদম – সন্তান নিয়ে ।
কায়ক্লেশে যাচ্ছিলাম ভদ্রাসনে । উল্টোদিক থেকে
ক’জন নধর ভদ্রলোক —
কেউ পান চিবুতে চিবুতে , কেউ কেউ সিগারেট
ফুঁকতে ফুঁকতে ,
কেউ -বা মাটিতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে —
আমাকে জিগ্যেস করলেন ,
‘ কোত্থেকে এলেন ?’ আমি সূর্যাস্তের দিকে
দৃষ্টি মেলে বলি ,
সাত হাত জমিনের নিচে
এসেছি দাফন ক’রে বিবেকের মৃত দেহটিকে ।

শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান (জন্মঃ অক্টোবর ২৪, ১৯২৯, মাহুতটুলি, ঢাকা - মৃত্যুঃ আগস্ট ১৭, ২০০৬ ) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাঃ জন্ম নানাবাড়িতে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পিতার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। কবিরা ভাই বোন ১৩ জন। কবি ৪র্থ। পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। পেশাঃ শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১] নভেম্বর, ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক দৈনিক পাকিস্তান এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকেঁ পদত্যাগ বাধ্য করা হয়।অতঃপর তিনি অধুনা নামীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুঃ কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, তাঁর মায়ের কবরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।