অন্যান্য

গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ। আপনি এখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মানিত ও গর্বিত স্বামী। আপনার অবস্থান সরকারবিরোধী, কিন্তু আপনি হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আপনি শপথ করেছিলেন, আপনি সুইসাইড করবেন, শেষে আপনি শপথ নিলেন সাংসদ হিসেবে। আপনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী, এখন দুই গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে কাম্য ধন।
আপনিটা কে?
আপনারা জানেন এই ধাঁধার উত্তর।
এটা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। কেউ একজন রচনা করেছেন। আদিতে কে করেছেন জানি না, তাই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারলাম না।
আচ্ছা, আপনি কে? এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। বুশ-সংক্রান্ত কৌতুক। এটা আগে বলে নিই।
বুশ গেলেন ব্রিটেনে। তিনি রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ব্রিটেনে দেশ চালানো হয় কীভাবে?
রানি বললেন, বুদ্ধি দিয়ে।
কেমন?
আচ্ছা, এই যে টনি ব্লেয়ার। ওকে আমি জিজ্ঞেস করব একটা ধাঁধা। আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই। লোকটা?
টনি উত্তর দিল: আমি।
দেখলে, টনির কত বুদ্ধি? এভাবে টনি ব্লেয়ার বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালায়।
বুশ আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তাঁর মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পুরো মন্ত্রিসভা তখন নিশ্চুপ। কী কঠিন ধাঁধা রে বাবা!
তখন বুশ বললেন, পাওয়েল কই? পাওয়েল থাকলে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে পারত। ডেকে আনা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলকে। তাঁকেও জিজ্ঞেস করা হলো একই প্রশ্ন: একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পাওয়েল বললেন, আমি।
বুশ বললেন, হয় নাই, গাধা! সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।
বুশের আরেকটা কৌতুক বলি।
বুশ গেছেন একটা স্কুল পরিদর্শন করতে।
একটা ছেলে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন?
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বুশ বললেন, এখন ১০ মিনিটের বিরতি। বিরতির পর আবার শুরু হবে।
এবার আরেকটা ছেলে দাঁড়াল।
সে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন? তিন. বিরতির আগে দুটো প্রশ্ন করেছিল যে ছেলেটা, সে কোথায় গেল?
আমরাও কিন্তু একই প্রশ্ন করতে পারি।
একটা করতে পারি ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে। আপনি যদি অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি থেকে সরেই এলেন—সরে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ—আর এখন সংলাপের কথা বলছেনই, সেই সরকারের সঙ্গে সংলাপ, যা আপনার ভাষায় অবৈধ, তাহলে কেন এই কাজ আগে করলেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আপনার বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আপনাকে কর্মসূচি স্থগিত করে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেদিন কেন আপনি হরতাল স্থগিত করে আলাপে গেলেন না? কী হতো গণভবনে গিয়ে এক কাপ চা খেলে? মধ্যখান থেকে এত যে মৃত্যু, এত যে অগ্নিদাহ, এগুলোর দায় কে নেবে?
আর শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা যায়, আপনি ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সাংসদ বলতে পারেন কি না?
আর এই কৌতুক-আলোচনার সূত্র ধরে ডা. দীপু মনি বলতে পারেন, ব্রিটেনের রানির ধাঁধার জবাবটা আমি দিতে পারব। আপনারা কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন? আমি তো পারতাম।
আমি কয়েকজন সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, আমাদের আত্মীয়স্বজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কী বলছে?
তাঁরা সবাই নানা বাক্যে যা বলেছেন, তা হলো, মানুষ বলছে, ক্ষমতায় কে এল, কে গেল, আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা শান্তি চাই। আমরা জানতে চাই, আমাদের পথ চলাচলের জন্য বাধাহীন হবে তো? বাড়ি থেকে বেরোলে আমি অক্ষত দেহে ফিরে আসতে পারবে তো? আমার গায়ে কেউ পেট্রলবোমা ছুড়ে মারবে না তো? আমি আমার দোকানপাট খুলতে পারব তো? আমার বাস-ট্রাক-অটোরিকশা নিয়ে আমি
যে রাস্তায় বেরোব, তাতে কেউ আগুন দেবে না তো? আমি যে সবজি বা দুধ উৎপাদন করছি, তা বিক্রি হবে তো? আপনারা থাকেন আপনাদের পলিটিকস নিয়ে, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের কাজকর্ম করতে দিন। আমাদের শিশুদের স্কুলে যেতে দিন।
আমাদের প্রবৃদ্ধি এ বছর কমে যাবে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস। আমাদের এখন দরকার কাজ করা। দেশের মানুষ নিজের উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করে যাবে, যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি।
গণতন্ত্র নামের বাইসাইকেলের দুটো চাকা।
একটা সরকারি দল, একটা বিরোধী দল।
আমাদের সরকারি চাকাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে অবশ্য জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিরও স্পোক দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু বিরোধী চাকা কোনটা? জাতীয় পার্টি?
জানি না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন…সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাচনভঙ্গিটা অননুকরণীয়। এটা কেউ নকল করতে পারবে বলে মনে হয় না। সে চেষ্টা না-হয় আমরা না-ই করলাম।
ওঁরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন, আমরা তো সেই খাবারের ভাগ চাইছি না। আমরা চাই, আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফলটা নিয়ে যেন দারাপুত্রপরিবার মিলে একটু শান্তিতে দিন গুজরান করতে পারি।

আনিসুল হক
আনিসুল হক
আনিসুল হক (জন্ম: মার্চ ৪, ১৯৬৫) একজন বাংলাদেশী লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তাঁর লেখা মা বইটি বেশ জনপ্রিয়। [বাংলা ভাষার পাশাপাশি বইটি দিল্লী থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং ভুবনেশ্বর থেকে উড়ে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে । জন্ম[: আনিসুল হকের জন্ম রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে। তাঁর পিতার নাম মো. মোফাজ্জল হক এবং মায়ের নাম মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরিনা ইয়াসমিন। শিক্ষাজীবনঃ তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এস.এস.সি. এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচ.এস.সি. পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পান। এসএস সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি ৩য় এবং এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান লাভ করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। কর্মজীবনঃ আনিসুল হক বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগে যোগদান করেন। অল্প কিছুদিন চাকরির পরই তা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় চলে আসেন। তিনি ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক দেশবন্ধু পত্রিকার সহসম্পাদক, ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বাভাস পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজের সহকারী সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দৈনিক প্রথম আলোর সাথে যুক্ত আছেন। তাঁর মূল ঝোঁক লেখালেখিতে। পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লেখেন। বুয়েটে পড়ার সময় কবিতার দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে এর পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মনোযোগী হন। উপন্যাস, বিদ্রুপ রচনা, নাটক রচনায় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। ২০১০ সালে তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম (আইডব্লিউপি)কর্মশালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে যোগ দেন।।তিনি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৭ জন লেখক আইডব্লিউপির কর্মশালায় যোগ দেন।১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৩০টি দেশের এক হাজার ২০০ লেখক অংশ নেন। গল্পঃ যে স্বপ্ন দেখতে জানতো, আজকালকার ভালোবাসার গল্প, অসমাপ্ত চুম্বনের ১২ বছর পর। [৬] কবিতাঃ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে (১৯৮৯), আমি আছি আমার অনলে (১৯৯১), আসলে আয়ুর চেয়ে বড় সাধ তার আকাশ দেখার (১৯৯৫), জলরংপদ্য (২০০২), তোমাকে ভাবনা করি। উপন্যাসঃ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস মা (২০০৩ সালে প্রকাশিত)। এছাড়া বীর প্রতীকের খোঁজে, নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল, খেয়া, ফাঁদ, বেকারত্বের দিনগুলিতে প্রেম, ভালোবাসা আমি তোমার জন্য কাঁদছি, ফাল্গুন রাতের আঁধারে, আমার একটা দুঃখ আছে, ক্ষুধা এবং ভালোবাসার গল্প, হৃদিতা, সেঁজুতি, তোমার জন্য, ৫১ বর্তী, আবার তোরা কিপ্টা হ,আলো-অন্ধকারে যাই,আমার একটা দু:খ আছে, আয়েশামঙ্গল, বারোটা বাজার আগে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গাত্মক রচনাঃ পত্রিকায় ‘গদ্যকার্টুন’ নামে নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে কথাকার্টুন, গণতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি‌‌, রাজা যায় রানি আসে, ছাগলতন্ত্র, অশ্বডিম্ব, সেই গাধা সেই পানি উল্লেখযোগ্য। নাটকঃ নাট্যকার হিসেবে তিনি ভিন্ন ধাঁচের নাটক উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচিত দর্শকনন্দিত টেলিভিশন কাহিনীচিত্রের মাঝে রয়েছে নাল পিরান, করিমন বেওয়া, প্রত্যাবর্তন, সাঁকো, প্রতি চুনিয়া, চড়ুইভাতি, মেগা সিরিয়াল ৫১বর্তী প্রভৃতি। সিনেমার স্ক্রিপ্টঃ মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলরএবং মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন আনিসুল হক। এছাড়া তিনি থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন সিনেমারও স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। পুরস্কারঃ শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার হিসেবে পুরস্কার, টেনাশিনাস পদকসহ বেশ কয়েকটা পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।