গল্প

ভীষণ পাজি পিঁপড়া-ছেলে

5492d7c6ad50e7faf1007382b688be0d-20টিপরা খুব মুশকিলে পড়েছে।
সে একটা বয়ামে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু আর বেরোতে পারছে না। কাচটা ভীষণ পিচ্ছিল। আর টিপরা পড়ে আছে একদম বয়ামটার তলায়। ছয় পা দিয়ে সে যে পিলপিল করে উঠে পড়বে, তা সম্ভব হচ্ছে না। পা পিছলে যাচ্ছে।
তার ভীষণ কান্না পেল। সে পিঁপিঁ করে কাঁদতে লাগল। কিন্তু বয়ামের মুখ বন্ধ। তার কান্না শুনবেই বা কে?
এখন সে আফসোস করে মরছে। তার উচিত হয়নি পিঁপড়ার দলের সারি ছেড়ে এই বয়ামের দিকে আসা। চিনির বয়াম। চিনির গন্ধ পেয়ে সে চলে এল। সে যখন তাদের সারিটা ছেড়ে এদিকে পা বাড়ায়, তখন বন্ধুরা তাকে নিষেধ করেছিল। বলল, ‘যাস না, একা একা গেলে পথ হারিয়ে ফেলবি।’ সে বলল, ‘বেশি দূর যাব না। এই একটুখানি যাই, আবার দৌড়ে এসে লাইনে ঢুকে পড়ব।’
লাইন ছেড়ে বেলাইনে গিয়ে সে প্রথমে পেল একটা কৌটার মুখ। সে তাতে চড়ে বসল, তার গায়ে তিনটা চিনির দানা লেগে আছে। মনের সুখে চিনি তিনটা গপাস করে খেয়ে নিল টিপরা। তারপর কে যেন কৌটার মুখটা তুলে কৌটায় লাগিয়ে ফেলল। বেরোনোর পথ খুঁজতে সে কৌটার টিনের ঢাকনাটা ছেড়ে কাচের গায়ে পা দিল। অমনি পিছলে পড়ে গেল একেবারে তলায়। খালি কৌটা। সে কাচের দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই সে ওপরে উঠতে পারছে না।
সে কাঁদছে। এখন কী হবে তার?
তার মনে পড়ে গেল ভাইবোনদের কথা। তার বন্ধুদের কথা। কী সুখেই না সে ছিল এত দিন। আর সে কী ভুলটাই না করল। এখানে এই বয়ামে বন্দী থাকতে থাকতে সে না মরেই যায়।
বয়ামের মালিক বয়ামটা ধোয়ার জন্য হাতে নিলেন। বয়ামের মধ্যে পানি ভরা হচ্ছে। পানির তোড়ে টিপরার একটা পা ভেঙেই গেল প্রায়। সে পানিতে ভাসতে লাগল। তারপর ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে সিংকের মধ্যে চলে গেল। সেখানে সে ভাসছে। ভাসতে ভাসতে চলে গেল সিংকের কোণে। কোনো রকমে পা টানতে টানতে উঠে পড়ল সিংকের গায়ে। সেখান থেকে এখন সে কোথায় যাবে? তার দলের অন্য সবাই কোথায় সে জানে না। সে কাঁদছে। সে হাউমাউ করে কাঁদছে।
সিংকের গা থেকে সে উঠে পড়ল মানুষটার জামায়।
জামার মধ্যে কতক্ষণ থাকা যায়। সে কুটুস করে কামড় দিয়েই বসল।
উফ্ বলে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল মানুষের গলায়। জামা ঝাড়ল মানুষটা।
অমনি সে ছিটকে পড়ল মেঝেয়। আর সেখানেই সে পেয়ে গেল পিঁপড়ার কাফেলাটাকে।
খোঁড়া পা’টা নিয়ে সে ভিড়ে গেল তাদের পিঁপড়ার দলের মিছিলে।

আনিসুল হক
আনিসুল হক
আনিসুল হক (জন্ম: মার্চ ৪, ১৯৬৫) একজন বাংলাদেশী লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তাঁর লেখা মা বইটি বেশ জনপ্রিয়। [বাংলা ভাষার পাশাপাশি বইটি দিল্লী থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং ভুবনেশ্বর থেকে উড়ে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে । জন্ম[: আনিসুল হকের জন্ম রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে। তাঁর পিতার নাম মো. মোফাজ্জল হক এবং মায়ের নাম মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরিনা ইয়াসমিন। শিক্ষাজীবনঃ তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এস.এস.সি. এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচ.এস.সি. পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পান। এসএস সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি ৩য় এবং এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান লাভ করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। কর্মজীবনঃ আনিসুল হক বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগে যোগদান করেন। অল্প কিছুদিন চাকরির পরই তা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় চলে আসেন। তিনি ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক দেশবন্ধু পত্রিকার সহসম্পাদক, ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বাভাস পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজের সহকারী সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দৈনিক প্রথম আলোর সাথে যুক্ত আছেন। তাঁর মূল ঝোঁক লেখালেখিতে। পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লেখেন। বুয়েটে পড়ার সময় কবিতার দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে এর পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মনোযোগী হন। উপন্যাস, বিদ্রুপ রচনা, নাটক রচনায় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। ২০১০ সালে তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম (আইডব্লিউপি)কর্মশালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে যোগ দেন।।তিনি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৭ জন লেখক আইডব্লিউপির কর্মশালায় যোগ দেন।১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৩০টি দেশের এক হাজার ২০০ লেখক অংশ নেন। গল্পঃ যে স্বপ্ন দেখতে জানতো, আজকালকার ভালোবাসার গল্প, অসমাপ্ত চুম্বনের ১২ বছর পর। [৬] কবিতাঃ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে (১৯৮৯), আমি আছি আমার অনলে (১৯৯১), আসলে আয়ুর চেয়ে বড় সাধ তার আকাশ দেখার (১৯৯৫), জলরংপদ্য (২০০২), তোমাকে ভাবনা করি। উপন্যাসঃ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস মা (২০০৩ সালে প্রকাশিত)। এছাড়া বীর প্রতীকের খোঁজে, নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল, খেয়া, ফাঁদ, বেকারত্বের দিনগুলিতে প্রেম, ভালোবাসা আমি তোমার জন্য কাঁদছি, ফাল্গুন রাতের আঁধারে, আমার একটা দুঃখ আছে, ক্ষুধা এবং ভালোবাসার গল্প, হৃদিতা, সেঁজুতি, তোমার জন্য, ৫১ বর্তী, আবার তোরা কিপ্টা হ,আলো-অন্ধকারে যাই,আমার একটা দু:খ আছে, আয়েশামঙ্গল, বারোটা বাজার আগে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গাত্মক রচনাঃ পত্রিকায় ‘গদ্যকার্টুন’ নামে নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে কথাকার্টুন, গণতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি‌‌, রাজা যায় রানি আসে, ছাগলতন্ত্র, অশ্বডিম্ব, সেই গাধা সেই পানি উল্লেখযোগ্য। নাটকঃ নাট্যকার হিসেবে তিনি ভিন্ন ধাঁচের নাটক উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচিত দর্শকনন্দিত টেলিভিশন কাহিনীচিত্রের মাঝে রয়েছে নাল পিরান, করিমন বেওয়া, প্রত্যাবর্তন, সাঁকো, প্রতি চুনিয়া, চড়ুইভাতি, মেগা সিরিয়াল ৫১বর্তী প্রভৃতি। সিনেমার স্ক্রিপ্টঃ মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলরএবং মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন আনিসুল হক। এছাড়া তিনি থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন সিনেমারও স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। পুরস্কারঃ শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার হিসেবে পুরস্কার, টেনাশিনাস পদকসহ বেশ কয়েকটা পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।