কেরানিও দৌড়ে ছিল


২৩
সোনালি খড়ে ছাওয়া গোলঘরের টেবিলে এসে বসবার সঙ্গে সঙ্গে ধোপদুরস্ত শাদা প্যান্ট-শার্ট পরা এক সেবক এসে লণ্ঠনের চিমনির মতো কাচের লাল গোলকের ভেতরে দুটি মোমবাতি রাখে। নিবিড় একটি আলো ছড়িয়ে পড়ে। লেডির মুখটিকে আরো অপরূপ দেখায়। কেরানি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ থেকে বিস্ময় কাটে না_ ইনিই তিনি? যার কথা এত শুনেছে সে, যার ছবি কাগজে কাগজে এতবার সে দেখেছে!
সেবকটির পরে পরেই আরেকজন আসে। তার হাতে গেলাশ, বরফ আর ব্লু লেবেল জনি ওয়াকার হুইস্কি। আরো, আসে আরেকজন। একই রকম ধোপদুরস্ত শাদা প্যান্ট-শার্ট পরা। তার হাতে ট্রে। ট্রের ওপরে পনিরের টুকরো, আনারসের টুকরো, গার্লিকে মৃদু সাঁতলানো মাশরুম, ব্ল্যাক অলিভ, সব কাঠিতে গাঁথা। হ্যাঁ, ড্রিংকসের সঙ্গে এ রকম খুচরো খাবার কেরানির অজানা নয়। সোনারগাঁও, র‌্যাডিসন, ওয়েস্টিন, রূপসী বাংলার বারে বসে আগেও সে টেবিলে পেয়েছে।
সেবক হুইস্কি পরিবেশন করে। লেডি গেলাশ তুলে ধরে কেরানির গেলাশে ছুঁইয়ে প্রায় ফিসফিস কণ্ঠে উচ্চারণ করে, চিয়ার্স। এতদিন খাম্বা সামাদের সঙ্গে এত বিভিন্ন বারে কি নিউ ঢাকা বোর্ডিংয়ে মদ্যপান করেছে কেরানি, কিন্তু গেলাশে ঠোঁট ছোঁয়াবার আগে চিয়ার্স উচ্চারিত হতে সে শোনেনি। সে থতমত খেয়ে বলে, জ্বী? কিছু বললেন?
লেডি মোহময় ফিসফিস কণ্ঠে তখন বলেন, চিয়ার্স বলতে হয়। আই ক্যান সি ইউ আর সো ইন্নসেন্ট।
ইন্নসেন্ট! নিষ্পাপ? কী বলতে চান লেডি? কী বোঝাতে চান? কেরানি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে লেডির দিকে। তার জীবনে এত বিস্ময় সে দেখেছে, কিন্তু আজ সব ছাপিয়ে গেছে। আজ সত্যিই সে বিস্ময়ের ঘোরে জ্ঞানহারা। এই তিনি! আর এরই সমুখে সে? নিরালা নির্জন এই বনভূমিতে? স্বর্গের মতো একটি দ্বীপে? ডিনারের এই টেবিলে?
নিজের ভাগ্যতারাকে ধন্যবাদ দেয় কেরানি। লেডির সঙ্গে তার কাজ, বলেছিলো খাম্বা সামাদ। কিন্তু কী তার কাজ এখনো সে জানে না। তবে এতটুকু সে না-বোঝার মতো বেকুব নয় যে, লেডির সুনজরেই সে পড়েছে। তার আশা হয়, এইবার সে তার বড়বোনের জন্যে কিছু একটা করতে পারবে। খাম্বা সামাদের সঙ্গে সম্পর্ক হবার পর থেকেই সে ভাবছিলো, আহ, বুবুকে যদি একটা স্কুল করে দেয়া যেতো জলেশ্বরী শহরে! আর স্কুলটা যদি তার বাবার নামেই হতো! আজমতউল্লাহ বালিকা বিদ্যালয়! না, পুরুষ নামের সঙ্গে বালিকা বিদ্যালয় কথাটা ভালো শোনাচ্ছে না। তাহলে মায়ের নামে। কতকাল বিস্মৃত মায়ের নামটা স্মরণ করে ওঠে আমাদের কেরানি। বানেছা বিবি! বানেছা বিবি বালিকা বিদ্যালয়। না, এটাও তো খুব গাঁইয়া শোনাচ্ছে।
হাতের গেলাশ হাতেই ধরা থাকে কেরানির। লেডি বলেন, তোমাকে চিন্তিত দেখছি। কী ভাবছো?
কেরানির সাহস হয় না লেডির ইংরেজির বিপরীতে ইংরেজিতে উত্তর দেয়। লেডির অমন পরিশীলিত ইংরেজির মুখে তার ইংরেজি হাস্যকর শোনাবে ভেবে সে কুঁকড়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর চোখে যখন পড়ে যে লেডি তার দিকে বিশাল দুটি চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন উত্তরের অপেক্ষায়, তখন সে বাংলায় বলে, না, ম্যাডাম। ভাবছিলাম আমার বোনকে যদি একটা ইশকুল করে দিতে পারতাম।
হবে। করে দেবো।
ধন্যবাদ।
লেডি গেলাশে হালকা চুমুক দিয়ে, একটা মাশরুম কেরানির হাতে তুলে দিয়ে, ধীরে, থেমে থেমে বলেন, এখানে_ তুমি_ নিজের বাড়ির মতো_ থাকবে।
জ্বী।
যা খুশি_ করবে। যা ইচ্ছে_ আমার কাছে_ চাইবে।
ইয়েস, ম্যাডাম।
ওই ডাকটি আমি পছন্দ করি না। এত শুনি! কান পচে গেছে!
কিন্তু পাল্টা কী বলে ডাকবে লেডি সেটাও বলে দেন না। কেরানি সিদ্ধান্ত নেয়, সম্বোধনহীন সংলাপই সে চালিয়ে যাবে।
গেলাশে দীর্ঘ একটা চুমুক দেয় কেরানি। এক নিঃশ্বাসে অতটা তরল গলায় নিতে দেখে লেডি প্রশংসামাখা চোখে কেরানির দিকে তাকান, তারপর তার হাতের ওপর এক মুহূর্তের জন্যে নিজের হাত রেখে বলেন, ধীরে। আমাদের হাতে ঢের সময়। ডিনারটা আমি এনজয় করতে চাই। তুমিও রিল্যাক্স করো। কিছু বলো।
দুম করে কেরানি বলে বসে, আমার আর একটা অনুরোধ আছে। বোধহয় সামাদভাইয়ের একটা কাজ আপনার হাতে।
সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে লেডি বলেন, আছে তো! আমি তাকে বলে দিয়েছি তো_ হবে। নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছি। একটু আগেই বলে দিয়েছি।
ধন্যবাদ।
না, ধন্যবাদ আমি পছন্দ করি না।
কেরানি ঘাবড়ে গিয়ে হেসে ফেলে। বলে, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।
ইন্নসেন্ট বয়! তুমি বেশ! মনে যা আছে বলে ফ্যালো।
জ্বী। আমি কথা মনের মধ্যে পুষে রাখতে পারি না।
তাই! লেডি চোখ সরু করে কিছুক্ষণ কেরানির নিরিখ করে আরো একবার উচ্চারণ করেন, ইন্নসেন্ট বয়!
আরো একবার! নিষ্পাপ বালক! কথাটা বড় অদ্ভুত মনে হয় কেরানির। সত্যিই কি সে নিষ্পাপ? বরং তার মনে হয়, সে তো স্বাভাবিক একটা মানুষ। সে যা করে, যা বলে, সবই ভেতরের একটা স্বভাব থেকে। এর বেশি তো কিছু নয়! এ রকমই তো হওয়া উচিত মানুষের।
আমাদের মনে পড়বে, কেরানি কিন্তু মদিনার সঙ্গে তার বিয়ের কথাটা রুহিতনকে বলতে পারে নাই। কিন্তু সে যেন একটা জীবন আগের কথা। এখন বোধ হয় তার ভেতরে একটা বদল এসে গেছে। না, এখন থেকে সে আর সত্যিটা বলতে দ্বিধা করবে না। আর, আমরাও অচিরে, আজ রাত ভোর হবার আগেই, দেখতে পাবো এর জন্যে তাকে কতখানি মাশুল দিতে হবে।
কেরানি টেবিলের ওপর রাখা একটা কার্ড এতক্ষণে দেখতে পায়। কৌতূহলী হয়ে হাতে তুলে নেয় কার্ডখানা। পুরু খসখসে কাগজের ওপর সোনালি চিকন পাড়, পাড়ের ভেতরে ঘন নীল কালিতে ইংরেজিতে ছাপানো কয়েকটি কথা। মাথার ওপরে বাঁকা হরফে লেখা_ মেনু।
লেডি বলেন, আমাদের আজকের ডিনার মেনু।
কেরানি অবাক হয়। রেন্টুরেন্টে না হয় মেনু থাকে_ এখানেও! দুজনের জন্যে ডিনারেও? কার্ডখানা সে পড়তে চেষ্টা করে। কিছু শব্দ চেনা, যেমন লবস্টার, কিন্তু তার পাশেই থার্মিডোর? মানে কী? আইসবার্গ লেটুস. সেটা? ল্যাম্ব বোঝা যাচ্ছে ভেড়া! লেগ অব ল্যাম্ব, তাও বোঝা যাচ্ছে। পাশেই মিন্ট সস লেখা, মিন্ট মানে? একেবারে নিচের দিকে লেখা টিরামিসু। টিরামিসু? সেটা আবার কী?
কেরানি কার্ড থেকে চোখ তুলে দেখে, লেডি তার দিকে তাকিয়ে আছেন, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। কেরানি কার্ডখানা হাত থেকে নামিয়ে রাখতেই লেডি বলেন, আই ক্যান সি ইউ আর পাজল্ড। হিয়ার, লেট মি এক্সপ্লেইন কার্ডে সব লেখাই আছে, এর পরে ডিনারের শুরুতে এনে রাখবে গ্রীন স্যালাড। আইসবার্গ লেটুস, টমাটোস, ব্লু চিজ অ্যান্ড কিউব্স অব কিউকুম্বার। আইসবার্গ লেটুস একটা বিশেষ লেটুস। ব্লু চিজটাও ফ্রেঞ্চ। কিউকুম্বার তো বোঝো? শসা! অ্যাসপারাগাস সুপ। অ্যাসপ্যারাগাস! আহ, অ্যাসপ্যারাগাস! এ শবজি আমাদের দেশে হয় না। ইম্পোর্টেড! মাই ফেভারিট। তোমার জন্যে আজ আমি স্পেশাল সব অ্যারেঞ্জ করেছি। আমি চাই এর ভেতর দিয়ে একটা বন্ধুত্ব হোক_ তোমার সঙ্গে।
বন্ধুত্ব? কেরানি দিশেহারা হয়ে ঢোক গেলে।
লেডি এই প্রথম খিলখিল করে হেসে ওঠেন। হাসতে হাসতে বলেন, জানো না, এ উওম্যানস্ হার্ট ক্যান বি রিচড থ্রু স্টমাক। আমাদের কেরানি এ কথার অর্থ বিন্দুমাত্র উদ্ধার করতে পারে না। হার্ট? স্টমাক? কেরানির হাত নিজের অজান্তেই একবার নিজের বুকে তারপর পেট ছুঁয়ে দেখে ওঠে। তবু ঠাহর হয় না বাক্যটির অর্থ। সে ঘোরলাগা চোখে লেডির দিকে তাকিয়েই থাকে।
লেডি বলে চলেন, এরপর লবস্টার থার্মিডোর। খাওনি? সামাদ যে বললো, সোনারগাঁয়ে এই ডিশটা তুমি খুব পছন্দ করেছো।
কেরানির মনে পড়ে যায় খাম্বা সামাদের সঙ্গে সোনারগাঁয়ে সেই প্রথম ডিনারের কথা। সে ঘোরলাগা গলায় উচ্চারণ করে, হ্যাঁ। হ্যাঁ!
তারপর আসবে লেগ অব ল্যাম্ব, মিন্ট সস্, বোট অব গ্র্যাভি, বাস্কেট অব মেডিটেরিনিয়ান টমাটো অলিভ ব্রেড। মিন্ট সস বুঝতে পারলে না? আমাদের পুদিনার চাটনি গো! ল্যাম্বের সঙ্গে ভালো যায়! তারপরে ডেসার্ট দেবে টিরামিসু। ইটালিয়ানরা খুব পছন্দ করে। তিন রকমের চিজ দিয়ে মিষ্টি করে বানায়। এক্সসেলেন্ট। আহ্! আর এসবের সঙ্গে আমরা খাবো বুজোলে রেড ওয়াইন। লাল! আঙুর দিয়ে ওয়াইন হয়। বুজোলেটা আঙুরের একটা বিশেষ জাত! অ্যান্ড টু রাউন্ড আপ আওয়ার ডিনার_ কনিয়াক মাখ্টেল। দারুণ একটা ব্র্যান্ডি। আই লাভ ইট!
আমরা এখন একটু সরে দাঁড়াই। ডিনারটা ওরা করুক। নিরিবিলিতে ডিনার, সেখানে ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো কাজের কথা নয়। আখ্যানেরও শেষ পর্যায়ে আমরা এসে যাচ্ছি। আমাদের হাতে আরো অনেক আখ্যান জমা হয়ে আছে। পৃথিবীর কথা ছেড়ে দিই, আমাদের এই বাংলাদেশে কি আখ্যানের কোনো কমতি আছে? মুক্তিযুদ্ধটাই তো এক মহাকাব্য, কত আখ্যান তার! আর মুক্তিযুদ্ধের পরে? সেও কত কাহিনী! জাতির পিতাকে তো আমরাই হত্যা করেছি। জাতির স্বপ্নকেও আমরা বুলেটবিদ্ধ করেছি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলেছি। বীর কে, আর বীর কে নয়, এ নিয়ে আমাদের মধ্যেই তো পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন, তা নিয়েও তো আমাদের মধ্যে মতবিভেদ! পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন অদ্ভুত মতান্তর মনান্তর আর আমরা দেখি না!
কেরানির ভাগ্য ভালো, ডিনারে বসে লেডি রাজনীতির ধারেকাছেও যান না। প্রতি মুহূর্তে কেরানির আশংকা ছিলো, খাম্বা সামাদের নির্দেশ তার স্মরণে ছিলো_ না, রাজনীতির আলোচনা নয়। তোমাকে পরীক্ষা করবার জন্যে রাজনীতির কথা লেডি তুললেও তুমি গাধাটি সেজে থাকবে।
গাধা! গাধা! সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ডিনার টেবিলে গেলাশের পর গেলাশ হুইস্কি! পাত্রের পর পাত্র ওয়াইন! তারপর ব্রান্ডি! কেরানি আর ধাতস্থ নেই। কিন্তু লেডি একেবারে সন্ধ্যেবেলার মতো তাজা রজনীগন্ধাটি।
বিছানায় এসে ধপ করে পড়ে যায় কেরানি।
আহ, বিছানা। এমন আরামের বিছানা কেরানি জীবনে পায়নি। এমন মশারিও সে দেখেনি। মশারি হয় চৌকো, এ মশারি গোল। ছাদের একটা আঙটা থেকে মুঠো করা মশারির মাথা গোল হয়ে বিছানাটি ঘিরে আছে। কী স্বচ্ছ মশারি! হস্তিবাড়িতে জ্যোৎস্না যখন নামে তখন সেই জ্যোৎস্নাও এর মতো স্বচ্ছ নয়, লঘু নয়।
মাতাল বেপথু হাতে মশারিটা সরাতেই চোখে পড়ে বিছানায় পাটভাঙা ধবধবে চাদর। কী নরোম বালিশ। বালিশের ওপর রাখা ফুল। লাল একটি গোলাপ। কী বড় গোলাপ! কুলকুল করে বইছে এসির মিষ্টি ঠান্ডা হাওয়া। গায়ের লেপটিও সিল্কের কভারে কী মোলায়েম। লেপ তো তুলোর হয়। এ যে তুলোর চেয়েও নরোম আর পাখির পালকের চেয়েও হালকা। কেরানি জানে না, আমরা জানি এ লেপের ভেতরে তুলো নয়, পাখিরই পালক পোরা। হাঁসের ছানার সবচেয়ে কচি পালক তুলে তুলে লেপের ভেতরে রাখা হয়েছে। আহ, না জানি কত হাজার হাঁসের ছানাকে প্রাণ দিতে হয়েছে এই একটি লেপের আরাম রচনার জন্যে!
প্রাণঘাতী চিৎকার করে ওঠে কেরানি!
না, হাঁসের ছানাদের জন্যে নয়, ঘুমের ভেতরে হঠাৎ এক স্পর্শ পেয়ে। কোমল একটি দেহের স্পর্শ। অজানা। অচেনা। শীতল। কিন্তু শীতলও নয়। চিৎকার সে করে ওঠে, কিন্তু কণ্ঠে তা ফোটে না।
স্বপ্ন?
না, স্বপ্ন তো নয়। নারী দেহের সঙ্গে কেরানির পরিচয় নেই তা নয়। রূপাই! মদিনা! রুহিতন! জজমিয়া! ও জজমিয়া! কোমরের কাছে বিছের মতো সায়ার দড়ির বসে যাওয়া দাগ! রাণী বিভাবতীর স্ত্রীঅঙ্গে লাল তিল! শরীরের উত্তাপ!
হুইস্কি ওয়াইন ব্র্যান্ডির অতল সাগর থেকে জেগে ওঠে কেরানির মাতাল চৈতন্য।
পাশেই সে আবিষ্কার করে এক নারীকে।
কে?
নারীটি তাকে বেষ্টন করে আছে সমস্ত শরীর দিয়ে।
কে?
নারীটি তখন কেরানির আর্ত ঠোঁটের ওপর ঠোঁট ঠেসে হিসহিস করে ওঠে, চুপ! চুপ!
আমরা কি জানি না, মাতাল শরীরে বল যখন ফেরে তখন দ্বিগুণ হয়েই ফেরে? নারীটিকে প্রবল হাতে শরীর থেকে সরিয়ে কেরানি উঠে বসে।
ঘরের ভেতরে মৃদু নীল আলো। সেই আলোয় সে দেখে ওঠে_ লেডি! তার জগৎ ভেঙে পড়ে। সে চিৎকার করে ওঠে, আপনি!
আর সঙ্গে সঙ্গে লেডিকে দুহাতে পুতুলের মতো তুলে, বিছানা থেকে তুলে, মশারি ছিঁড়েই যেন, সে আছাড় দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়। তারপর নিজে সে বিছানাতেই হামা দিয়ে বসে হাঁপাতে থাকে, যেন একটা জীবন ধরে অবিরাম দৌড়ে দৌড়ে দৌড়ে এখন সে আর শ্বাস পাচ্ছে না, থেমে পড়েছে। হাঁপাচ্ছে। নিজের ভেতরটাকে সামলাচ্ছে, যেন এই প্রশ্বাসের সঙ্গে তার জীবনবায়ুটিও না বেরিয়ে যায়।
হাঁপাতে হাঁপাতে কেরানি ওই মেঝেয় লুণ্ঠিত নারীকে বলতে থাকে, আপনি!_ আপনি!_ আপনি!_ যখন সবাই জানবে!_ যখন সবাই জানবে!_ যখন সবাই জানবে!
লেডি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ান। ভাঙা পুতুলের মতো নয়, প্রতিমার মতো সতেজ সটান তিনি উঠে দাঁড়ান।
কেরানি চোখ ফিরিয়ে নেয়। না, সে পারবে না। পারবে না। পারবে না। এমনকি এই বিশ্ব বিদীর্ণ করা বিস্ময়কর কথাটিও সে পৃথিবীর কাছে গোপন রাখতে পারবে না। নিষ্পাপ বালক! ইন্নসেন্ট বয়! এতক্ষণে কথাটির মর্মার্থ সে নিজের ভেতরে অনুভব করে ওঠে। তার ঠোঁট নিশ্চুপ নিস্পন্দ থাকবে না। আর লেডিও যে কথাটা সন্ধ্যের ডিনার টেবিলে একাধিকবার বলেছিলেন তাকে বিমুগ্ধ কণ্ঠে, তাঁর কণ্ঠও আর বিমুগ্ধ থাকবে না, তাঁর হাতটিও অতঃপর আর নিশ্চেষ্ট থাকবে না।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  বহরমপুর ভ্রমণ

২৪
সদরঘাটের ঠিক সেই জায়গাটিতে, সেই বুড়িগঙ্গার কিনারে, বর্জ্য যাবতীয় ডাবের খোসা বোতল পলিথিনের ব্যাগে আবিল কাদার ভেতরে, একদিন যেখানে পাগলিকে এনে ফেলা হয়েছিলো তার সদ্যোজাত শিশুটি সমেত, যেখানে পরেপরেই নীল সাগর লঞ্চের মালিক আহমদউল্লাহ্র লাথিতে পড়ে গিয়েছিলো আমাদের কেরানি, সেখানে আজ উপুড় হয়ে পড়ে থাকা একটি লাশ আমরা দেখতে পাই।
আমরা দেখি কি বিসমিল্লা হোটেলের নিজামতমিয়াই প্রথম দেখে। ফজরের আজানের পরপরই হোটেল খুলতে এসেছিলো সে, দ্যাখে শ’খানেক কাক নদীর পাড়ে কী একটা ঘিরে উড়ছে আর ভীষণ কা কা খা খা করছে।
এই হালার কাউয়ারা! দ্যাশটা ভাগাড় হয়া গ্যাছে!
না, নিজামত মিয়া দাঁড়ায় নাই। তার সময় নাই। হোটেল খুলতে হবে। বিজিনেছ বইলা কথা! বিজিনেছ তো বন্ধ থাকতে পারে না।
একের পর এক লঞ্চ আসতে থাকে দূরদূরান্ত থেকে, সারা রাত নদীর কালো পানিতে প্রপেলারের আঘাতে আঘাতে শাদা শাদা ফেনার ফুল ফোটাতে ফোটাতে। ভোরের আলো এখনো ভালো করে ফোটে নাই। যাত্রীরা নামে। তাদেরও সময় নাই। রাতের জাগরণ আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির পর এখন তারা যে যার ঠিকানায় যাবে। কাকের জটলা আর চিৎকারের দিকে ভ্রুক্ষেপ করার মতো মন তাদের নাই।
ঘাটের কুলিরাও যাত্রীদের মোট বহনের জন্যে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। এই তাদের রুটি রোজগার। পেটের চিন্তা বড় চিন্তা।
কর্কশ কণ্ঠ হলেও এ জগতে আজ কাক ছাড়া প্রাণী নাই যে মানুষের একটি লাশের জন্যে শোক করবে। লাশ ঘিরে আমরা কোরানপাঠ কত শুনেছি। আজ না হয় কাকের কণ্ঠে কাকেরই কর্কশ চিৎকারে আহাজারি আমরা শুনি।
এই লাশটির কথা দূর পাবনায় মানসিক হাসপাতালের বেডে শুয়ে সেই পাগলি শুনতো, তাহলে সে হয়তো খলখল করে হেসে উঠতো। কিন্তু আমরা কল্পনা করি, তার চোখ দিয়ে তখন পানি পড়তো ঝরঝর করে। হয়তো সে পানি পড়তো তার শিশুটির কথা মনে করে। না জানি খুলনার মিশনারিদের কাছ থেকে সে কোন্ পালক মায়ের কোলে এখন। সে খবর কোনোদিন এই জননীর কাছে পেঁৗছবে না। মতিচ্ছন্ন হলেও জননী তো সন্তানের কথা কখনোই ভোলে না। সন্তানের জন্যে মায়ের বুকে একটা সুরাখ মানে ছিদ্র হয়ে থাকে চিরকালের জন্যে।
আরো একজন আছে মতিচ্ছন্ন, সেই দূর হস্তিবাড়িতে। তার কানে না কিছু পশায়। মুখে না কিছু উচ্চারণ করতে পারে। বজ্রপাতে তার শ্রবণ ও জিহ্বা অসাড় হয়ে গেছে কবেই। কিন্তু তারও বুকে এখন একটি সুরাখ, একটি ছিদ্র।
খাম্বা সামাদ নাসিরকে বলে, মানুষটারে খরচ করতে হইলো। ইচ্ছা ছিলো হালার পুতেরে খাম্বার লগে বাইন্ধা পিটাই। কম ট্যাকা ঢালছি নি তার পিছনে। ম্যাডামেরও মনে বহুৎ ধরছিলো। আমারও কামটা হয়া আসছিলো। কয়েক কোটি! এলা বুইঝা দ্যাখ! শ্রীপুর থিকা রাইতেই ফোন। উঠায়া আনলাম। মাথার পিছনে পিস্তলের একখান গুলি্ল। শ্যাষ!
তো আমাগো মানে আপনের কামটা হইবো না? নাসির অস্থির হয়ে জানতে চায়।
ম্যাডাম কইছে হইবো! বুঝোস তো, তারও একটা ছুনাম আছে না? পোলা খাওনের খায়েশ তার দুনিয়া জানলে, বদনাম না? আমার কাছে কথাটা লোয়ার ছিন্দুকে থাকবো, ম্যাডাম তা ভালো কইরাই জানে। হের লাইগ্গাই আমার কামটা কইরা দিবো। নাইলে আমিও নাই হয়া গেতাম গা!
তাইলে অহন লাছটা? নাসিরের আবার প্রশ্ন।
নাহ্, মোছলমানের লাছ, ঘাটে পইড়া থাকবো, কুত্তায় খাইবো? এলাকায় আমাগো একটা পজিশন আছে না। বিপদ আপদে মাইনষের পাশে খাড়াই না আমরা? লাশ হইলেও মানুষ তো! বেওয়ারিশ লাছ! ল, যাই সরকারী কব্বরখানায় লিয়া দাফন করি গা।
পুলিশ?
আরে পুলিশের লাইগা ডরাছ? ম্যাডাম আছে না? আর, আর কুরো পরমান আছে নি ক্যাঠা লাছ বানাইছে! ল, আগাই।
সদরঘাটে লোকেরা বলাবলি করে, খাম্ভাই আছিলো বইলাই মানুষটার কবর হইলো।
কবর হয়। আজিমপুরে কবর দিয়ে নাসির আর দলবল যখন লালবাগ মহল্লা ছাড়িয়ে গলির ভেতরে প্লাস্টিকের কারখানা, তারপরে জলা, জলার ওপারে মাটিতে পড়ে থাকা বিজলির থামগুলো পেরিয়ে কাঠগুদামে যায়, খাম্বা সামাদ মুরগীর কাবাবে রানের হাড় চিবোতে চিবোতে বলে, হইছে?
হ, খাম্ভাই। কমপ্লিট।
কথাটা শুনে খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে তারপর নিজের ঊরূতে জবর একটা চাপড় মেরে খুব তীক্ষষ্ট গলায় খাম্বা সামাদ বলে, কমপ্লিট কিয়ের? একখান সাইনবোর্ড ভি ফিট কইরা দিয়া আইতি যে, এই হালার ক্যারানি ভি দৌড়ে আছিলো!
মগর পইড়া গ্যাছে!
নাসিরের এ কথায় দারুণ একটা মজা পেয়ে সবাই হা হা করে হেসে ওঠে।
এখানেও কাক! বিজলির থামে বসা একটি কাক কর্কশ ডেকে উঠে উড়ে যায়। না, কাকটি বুঝে গেছে হাড়মাংস এরা খুব শিগগির ছুড়ে ফেলবে না। চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। না, অতটা অপেক্ষা করবার ধৈর্য তার নাই ।
[শেষ]
উপন্যাসটি একুশে বইমেলায় আজই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  নন্দিনী পাখিরা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সৈয়দ শামসুল হক- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...