কবিতা

স্বর্গে যা নেই – হাফিজ

অনুবাদ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়

গালে-কালো- তিল সেই সুন্দরী
স্বহস্তে ছুঁলে হৃদয় আমার,
বোখারা তো ছার, সমরখন্দ ও
খুশি হয়ে তাকে দেব উপহার ।

স্বর্গে যা নেই, আমি যেন পাই
হে সাকি, বানাও এমন বিধান,
রুকনাবাদের নদীর কিনার,
মুসল্লার সে ফুলের বাগান ।

খন্ডিত এই প্রেম দিয়ে আমি
পারি না বাঁধতে সে অপরূপাকে ;
রং তিল চুল – কিছুই কিছু না
যদি লাবণ্য চোখেমুখে থাকে ।

দিনে দিনে ইউসুফের যে রূপ
বাড়ছে চন্দ্রকলার সমান
সতীসাধ্বীর পর্দা সরিয়ে
জুলেখাকে দেবে সবলে সে টান ।

গানে আর মদে জমাও আড্ডা
ভবরহস্য হাতড়ে কী লাভ ?
বুদ্ধির পথে চললে কখন ও
পাবে না কেউ এ ধাঁধার জবাব ।

কান দাও, প্রিয়া, আমার কথায় :
ঘা দিয়ে যতইশেখাক জীবন,
নওজোয়ানেরা জানে, তার চেয়ে
ঢের বেশি দামী প্রাজ্ঞবচন ।

আকথা-কুকথা বলেছ অনেক
তবু কোনো ক্ষোভ রাখি নি কো প্রানে ;
তুমি ঠিকই কলো : বিম্বাধরের
কটু কথাটাও মিঠে লাগে কানে ।

বানিয়েছ তুমি এমন গজল
কথা দিয়ে গাঁথা মুক্তোর হার,
হাফিজ, তোমার ছত্রে ছত্রে
যেন ঝিকিমিকি তারার বাহার।।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় বাঙালি কবি ও গদ্যকার। কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা বাংলায় অনুবাদও করেছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর কবিতা চড়া সুরে বাঁধা হলেও ছিল অনেক সহজবোধ্য। কথ্যরীতিতে রচিত তাঁর কবিতায় ছিল ব্যঙ্গ, সংহত আবেগের প্রকাশ ও নিপূণ শিল্পকলার অভিপ্রকাশ। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অ-রোম্যান্টিক অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। সমাজের তৃণমূল স্তরে নেমে গিয়ে সেই সমাজকে প্রত্যক্ষ করে তবেই কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হতেন তিনি। আদর্শ তাঁর কবিতাকে দিয়েছিল অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। তবে কবিতার মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি কবিতাকে রসহীন ও সৌন্দর্যহীন করে ফেলেননি; এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর হিমালয়প্রতিম অবদান অনস্বীকার্য। “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্যএসে গেছে ধ্বংসের বার্তা” বা “ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত” প্রভৃতি তাঁর অমর পংক্তি বাংলায় আজ প্রবাদতুল্য। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতা মেট্রো নিউ গড়িয়া স্টেশনটি কবির নামে উৎসর্গ করে, এই স্টেশনটি বর্তমানে "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" নামে পরিচিত।