কবিতা

তোমাকে বলি নি

আকাশে তুলকালাম মেঘে
যেন বাজি ফোটানোর আওয়াজে
কাল
তোমার জন্মদিন গেল।
ঘরে বৃষ্টির ছাট এলেও
জানালাগুলো বন্ধ করি নি—
আলো-নেভানো অন্ধকারে
থেকে থেকে ঝিলিক-দেওয়া বিদ্যুতে
আমি দেখতে পাচ্ছিলাম তোমার মুখ।
আর মাঝে মাঝে
হাওয়া এসে নড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল
তোমাকে ভালবেসে দেওয়া
টেবিলে রাখা
গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল।
কাল কেন আমি ঘুমোতে পারি নি
তোমাকে বলি নি—
আমার ফেলে-দেওয়া লেখার কাগজটা নিয়ে
শয়তান বেড়ালটা
কাল সারারাত খেলেছে।
তোমাকে বলি নি—
দজ্জাল ঘড়িটা
একদিন আমাকে বাজিয়ে দেখে নেবে ব’লে
টিকটিক শন্দে শাসিয়েছে।
তোমাকে বলি নি—
মাটিতে মিশে যাবার পর
আমরা দুজনে কেউই কাউকে চিনব না।
আর দেখ,
তোমাকে বলাই হয় নি
এবার রথের মেলায়
কী কী কিনব—
মেয়ের জন্যে তালপাতার ভেঁপু
তোমাত জন্যে ফ্লফুলের চারা
আর বাড়ির জন্যে
সুন্দর পেতলের খাঁচায়
দুটো বদরিকা পাখি।।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় বাঙালি কবি ও গদ্যকার। কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা বাংলায় অনুবাদও করেছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর কবিতা চড়া সুরে বাঁধা হলেও ছিল অনেক সহজবোধ্য। কথ্যরীতিতে রচিত তাঁর কবিতায় ছিল ব্যঙ্গ, সংহত আবেগের প্রকাশ ও নিপূণ শিল্পকলার অভিপ্রকাশ। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অ-রোম্যান্টিক অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। সমাজের তৃণমূল স্তরে নেমে গিয়ে সেই সমাজকে প্রত্যক্ষ করে তবেই কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হতেন তিনি। আদর্শ তাঁর কবিতাকে দিয়েছিল অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। তবে কবিতার মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি কবিতাকে রসহীন ও সৌন্দর্যহীন করে ফেলেননি; এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর হিমালয়প্রতিম অবদান অনস্বীকার্য। “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্যএসে গেছে ধ্বংসের বার্তা” বা “ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত” প্রভৃতি তাঁর অমর পংক্তি বাংলায় আজ প্রবাদতুল্য। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতা মেট্রো নিউ গড়িয়া স্টেশনটি কবির নামে উৎসর্গ করে, এই স্টেশনটি বর্তমানে "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" নামে পরিচিত।