অন্যান্য

ঘরে ফেরা না-ফেরা

8_19311পাখির আছে নীড়, মানুষের রয়েছে ঘর। মানুষ তার ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশে ওই কাজটা সহজ নয়। অনেকের তো ঘর কী, বসবাস করার মতো একটি কামরাও নেই। তবু ঘরের আকাক্সক্ষার মতো, ঘরে ফেরার আকাক্সক্ষাও থাকে। সেটা বেশ প্রবল হয় ঈদের সময়। মানুষ ব্যাকুল হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার জন্য। আর তখনই বেশ ভালোভাবে টের পাওয়া যায় যে কাজটা সহজ নয়। অভিজ্ঞতাটা অবশ্য প্রতিদিনের; যেমন দরিদ্রের তেমনি ধনীর। দরিদ্রদের জন্য যানবাহন অত্যন্ত অপ্রতুল, মধ্যবিত্তের জন্যও তা সত্য। ধনীদের আয়ত্তে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকে, গাড়ি নিয়ে তারা বের হয় কিন্তু বের হওয়াটা সহজ হয় না, কঠিন হয় ফেরাটাও। গাড়িই আটকে দেয় গাড়িকে; একের গতি প্রতিবন্ধক হয় অনেকের গতির, অনেকের গতি প্রতিরোধ করে একের গতিকে।ঈদে যে উপচে পড়া ব্যাকুলতা দেখি ঘরে ফেরার তাতে বোঝা যায় বিস্তর মানুষের ঘর নেই শহরে। হয়তো তারা কামরায় ভাগাভাগি করে মুখ গুঁজে বসবাস করে। যাদের কামরাও নেই তাদের কথা উঠছে না, তারা বাস, ট্রেন, লঞ্চের টিকিট খোঁজে না, যেমন ছিল তেমনই থাকে। শহরে বাসা আছে, ঠিক এক কামরায় নয়, তার চেয়ে প্রশস্ত একটু জায়গায়, তারাও কেউ কেউ ভাবে বাড়িতে ফিরবে, যে বাড়ি থেকে দূরে তাদের বসবাস।ঘরে ফেরা মানে বাড়িতে ফেরাই। কিন্তু ঘর তো বাড়ি নয়, তফাৎ আছে। ‘ঘরবাড়ি’ কথাটা একসঙ্গে যায় বটে, কিন্তু ঘরের সঙ্গে যে বাড়ি যুক্ত হয়ে আছে তাতেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, ওই দুটি আলাদা জিনিস। ঘর যেমন কামরা নয়, তেমনি আবার বাড়িও নয়; অনেক ক’টি ঘর নিয়েই একটি বাড়ি। ব্যাপার আরও আছে; সেটা এই যে বাড়িতে আছে আশ্রয়, রয়েছে আÍীয়তা। থাকে ইতিহাস এবং পড়শিদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে তবেই একটি বাড়ি, যেটি ঘরের চেয়ে বড়, অনেক দিক দিয়েই।কত মানুষ আছে যারা ঘরবাড়ি ফেলে বিদেশে কাজ করে। ঈদেও তাদের ফেরা হয় না। তারা ইচ্ছে করেই বিদেশে গেছে। পরিশ্রম করে, উপার্জন করতে পারছে বলে কিছুটা সন্তুষ্টই থাকে, তাদের তুলনায় যারা যেতে চায় কিন্তু যেতে পারে না। না পারার বেদনাটা হা-হুতাশ হয়ে দেখা দেয়, এমনকি ঈদের দিনেও। দক্ষ মানুষ যায়, অদক্ষরা যায় আরও বেশি। মেধাবানরাও চলে যায়। আমরা বলি মেধা পাচার হচ্ছে; ব্যক্তিগতভাবে মেধাবানদের লাভ হচ্ছে হয়তো, কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে দেশের। কিন্তু না গিয়ে তো উপায় নেই। জায়গা অল্প, সুযোগ কম, ঠাসাঠাসি, ঠেলাঠেলি অবস্থা। ঘরবাড়ি ভালো নেই, ভালো করা চাই।মেধাবানদের পক্ষে বিদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ আছে। তবু কেউ কেউ ফিরে আসেন, যেমন এসেছিলেন তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। অত্যন্ত মেধাবান দু’জন মানুষ। খুবই সৃষ্টিশীল। একজন গিয়েছিলেন আমেরিকায়, অপরজন কানাডায়। সেখানেই থাকতে পারতেন ভালোভাবে। কিন্তু চলে এসেছেন। বাড়ির টানে নয়, দেশের টানে। দেশ অনেক বড়, বাড়ির তুলনায়। দেশের টান বাড়ির টানের তুলনায় তো দুর্দমনীয়। ওই টানের মুখে যে পড়েছে তার পক্ষে ফিরে আসা ছাড়া উপায় নেই।কিন্তু থাকতে পারলেন কই! সড়ক দুর্ঘটনায় দু’জনই প্রাণ হারালেন। একত্রে। তারা ছবি তৈরি করছিলেন। সে কাজেই ঢাকার বাইরে গেছেন। পথিমধ্যে জীবনঘাতি ওই দুর্ঘটনা। ছবিটির বিষয়বস্তু ছিল মানুষের আশ্রয়হীনতা। সাতচল্লিশে স্বাধীনতার নামে দেশ ভাগ হয়েছে। পরিণামে আশ্রয়হীন হয়েছেন বহু মানুষ। উৎপাটন ঘটেছে। ভেঙে গেছে পরিবার। দেশভাগের সেই মর্মবিদারী ঘটনাকে সেলুলয়েডে তুলে আনতে চেয়েছিলেন দুই বন্ধু ও সহকর্মী।তারেক মাসুদ পরিকল্পনা করেছেন, পরিচালনাও তিনিই করবেন। মিশুক মুনীর তার দক্ষ ক্যামেরায় ছবি ধারণ করবেন। এই ছিল আয়োজন। তারেক এর আগেও একাধিক ছবি করেছেন, ওই আশ্রয়হীনতা নিয়েই। যেটা ঘটেছে একাত্তরে। সেবার আমরা স্বাধীন হয়েছি দ্বিতীয়বারের মতো। প্রথম স্বাধীনতা নিয়ে ছবি করবেন আশা করেছিলেন তারা। পারলেন না। চলে গে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (জন্মঃ ২৩ জুন, ১৯৩৬) একজন বাংলাদেশী লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। বাক্‌স্বাধীনতা, মানবিক অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক আন্দোলনের পুরোধা। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষা ও সহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য যাদের নিরলস অবদানে সমৃদ্ধ তিনি তাদের অন্যতম। তিনি মার্ক্সিস্ট চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ, প্রগতিশীল ও মুক্তমনা। নতুন দিগন্ত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৮০-এর দশকে "গাছপাথর" ছদ্মনামে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। প্রাথমিক জীবন তিনি ২৩ জুন, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ঢাকার বিক্রমপুর উপজেলায় বাড়ৈখালীতে। তাঁর বাবার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শৈশব কেটেছে রাজশাহীতে ও কলকাতায় বাবার চাকরি সূত্রে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস্‌ এবং লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে। কর্মজীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দুবার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। সম্পাদনা করেছেন ‘পরিক্রমা’, ‘সাহিত্যপত্র’, ‘সচিত্র সময়’, ‘সাপ্তাহিক সময়’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিস’ প্রভৃতি।তার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ত্রৈমাসিক সাহিত্য সংস্কৃতির পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’। ‘নতুন দিগন্ত’ প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য খোলাজানালা।ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তেরও প্রতিবাদ করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।