কবিতা

নীল জলের রান্না

কিছু লাল মোটা চাল ছুঁড়ে মারলে মুখে
‘যা, রেশনের দোকানে লাইন দে গে যা।’
হ্যাঁ, যাবোই তো। আমার কার্ডের যা প্রাপ্য
আমি তা নিয়েই ফিরবো, তা ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু এখনও যেহেতু তৈরি হয় নি
চিহ্নপত্র আমি তাই জানিও না
কতোটা বাতাস আছে আমার ভাগে,
কয় সের চিনির মতো শুভ্র তারার ফেনা,
সমুদ্রের নীল জল কয় পাইট!
শুনেছি রেশনের কাউন্টারের সেই ভীষণ বিক্রেতা
লোক বুঝে জিনিশ দেয়, কেউ পায়
সরু, মিহি, শাদা, কেউ শুধু
লাল, মোটা চাল — আমি তো তা-ই চাই
আমার হাতের তালুতে শ্বেত শুভ্র জ্যোৎস্না-কণার মতো
শাদা চাল নিমেষে শুকিয়ে যাবে। পাখির মাংসও আজ আর
পছন্দ করি না। প্রতিহিংসাপরায়ণপর দাঁত
আহ্লাদে লবণাক্ত হয়, লাল চক্ষু মহিষের মাংসময় ঊরু দেখে
আবাল্য অভ্যস্ত আমি—যাবো—রেশনের দোকানেই আমি যাবো।
আমারও ঘরে উনুনের উৎসব শুরু হবে। পড়শিদের সচকিত ক’রে
আমিও নীল জলে লাল চাল রান্না ক’রে নেবো।

শহীদ কাদরী
শহীদ কাদরী
জন্ম: ১৪ই আগস্ট, ১৯৪২ বাংলাদেশের একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।কবি শহীদ কাদরী ৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে তিনি এখন আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। পঞ্চাশ উত্তর বাংলা কবিতা ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম করা যায় কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং কোথাও কোন ক্রন্দন নেই এই তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি শহীদ কাদরী বাংলার কবিতায় একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে উঠে কবি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ঠিক তখনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমালেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কবি তাঁর ঠিকানাটি বেছে নিলেও দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা স্মৃতিগুলো সবসময় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, এক ধরনের নস্টালজিক আবেগ তাড়িত করে বেড়ায় ।