কবিতা

কালবেলার সংলাপ

সুজাতা। কতকাল অন্ধকার আমাদের শাসাবে, গৌতম?
বলো, আর কতকাল? কেবলি হোঁচট খাই, ভয়
পাই প্রতি পদক্ষেপে; দূরন্ত বইলে হাওয়া, ভাবি-
এই বুঝি এলো তেড়ে মাস্তানের দল, পথ খুঁজি,
চৌকাঠে কপাল ঠেকে, পায়ে কালো পাথরের ভার।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত যেন আমি, পারি না কোথাও ছুটে
যেতে, এই অন্ধকার এত বিষ লুকিয়ে রেখেছে
নিজের থলিতে, আগে কখনো জানিনি। ভয় যাপি
সর্বক্ষণ; হবে কি সন্ত্রম লুট? হবে কি বিলীন
হলমায়্য সিঁথির সিঁদুরচিহ্ন? গৌতম, আমায়
বলে দাও। ওই শোন, ‘গৃহস্থের ঘোর অমঙ্গল’
শব্দ ছুঁড়ে উড়ে যায় ছন্নছাড়া পেঁচা।
গৌতম।
বিচলিত
হয়ো না সুজাতা অন্ধকার অধিপতি নয়, কিছু
আলো আমাদের অস্তিত্বের দিকে ঝুঁকে আছে আজো
গাঢ় চুম্বনের মতো; আছে সম্প্রীতির চন্দ্রাতপ।
সুজাতা। না, গৌতম, আশঙ্কার ভূতপ্রেত কী ভীষণ নাচে;
বাঘ-ভালুকের ভয় নেই, বিষাক্ত সাপের চেয়ে
ঢের বেশি বিষধর মানুষ এখন। আমাদের
বসতবাড়িকে ওরা বানিয়েছে চিতা; স্বপ্নগুলো
ভস্ম হয়ে ধূলায় মিশেছে। অসহায় মানবতা
কাঁটার মুকুট প’রে নুয়ে থাকে ক্রুশ কাঁধে নিয়ে;
অনেক হৃদয় আজ লাঞ্ছিত গোলাপ দিগ্ধিদিক।
গৌতম। থাক থাক সুজাতা, আগুনে ঘর পুড়ে গ্যাছে, যাক;
আত্মাকে পুড়িয়ে খাক করে দেবে এমন আগুন
নেই কোনো উন্মত্ত মশালে। বর্বরের হুঙ্কারের
মধ্যে জেগে থাকে কিছু মানুষের দীপ্ত বাণী, থাকে
তাদের গভীর চালচিত্র, যারা কখনো ধর্মের
অন্তরালে অধর্মের বাঘনখ সযত্বে পোষে না,
যারা ধ্যানে ও মননে মনুষ্যত্বকেই করে ধ্রুবতারা
চিরকাল। সুজাতা তোমার দুটি রাঙা পদতলে
চুমু খায় পুণ্য দুর্বাদল, তোমার আঁচল
ধরে রাখে চারাগাছ, মুখ ছোঁয় জবা। পুনরায়
নতুন আকাঙ্খা নিয়ে এসো ঘর বাঁধি দুজনায়।
ঘাতক শানাক তার ছুরি, মাথা নত করবো না,
শেখাবে বাঁচার মন্ত্র চিরদনকার পূর্বপুরুষের মৃত্তিকায়।
সুজাতা।। এসো হাতে হাত রাখি পূর্বপুরুষের মৃত্তিকায়,
ভাঙাচোরা স্বপ্নসমূহকে ভালোবেসে জড়ো করি।

      Kalbelar Songlap - Kamrul Hasan Monju And Sharmin Nahar Laki;
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান (জন্মঃ অক্টোবর ২৪, ১৯২৯, মাহুতটুলি, ঢাকা - মৃত্যুঃ আগস্ট ১৭, ২০০৬ ) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাঃ জন্ম নানাবাড়িতে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পিতার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। কবিরা ভাই বোন ১৩ জন। কবি ৪র্থ। পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। পেশাঃ শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১] নভেম্বর, ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক দৈনিক পাকিস্তান এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকেঁ পদত্যাগ বাধ্য করা হয়।অতঃপর তিনি অধুনা নামীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুঃ কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, তাঁর মায়ের কবরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।