কবিতা

জীবন একটি নদীর নাম

জীবন একটি নদীর নাম,

পিতামাতার ঐ উঁচু থেকে

নেমে-আসা এক পাগলা ঝোরা—

ক্রমশ নিম্নাভিমুখী;

পাথুরে শৈশব ভেঙে

কৈশোরের নুড়িগুলি বুকে নিয়ে

বয়ে চলা পরিণামহীন

এক জলধারা—

গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে বেলে-এঁটেল-দোআঁশ

মাটি ভেঙে-ভেঙে সামনে চলা

এক ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী;

এই বয়ে চলা পথে

বিভিন্ন বৃক্ষের সঙ্গে চলে

দ্বিরালাপ;

একবার এক বৃদ্ধ অশ্বথের সঙ্গে

হয় তার অল্পক্ষণ স্থায়ী

আদাব-সালাম বিনিময়,

তাকে বলেছিলো সেই বুড়ো:

“এ্যাতো তাড়াহুড়ো করো না হে,

ধীরে বয়ে যাও, তোমার চলার পথে

পড়বে অনেক বৃক্ষ— সবুজ, সতেজ—

তাদের শাখায় আছে পাখিদের প্রিয় ঘরবাড়ি,

পাখিদের শাবকেরা আছে— তাদের রয়েছে খুব

নরম পালক,

যেন ঐ বৃক্ষ আর তার আশ্রিতজনের

কোনো ক্ষতি না হয় তোমার দ্বারা;

যদি পারো ঊষর মাটির মধ্য দিয়ে

বয়ে যেয়ো, সর্বদা এড়িয়ে যেয়ো

পাখির নিবাস…

আমি তাকে কোনো কথাই পারিনি দিতে;

নদীর ধর্ম তো অবিরাম বয়ে চলা,

বহমান তার স্রোতধারা ভেঙে নিয়ে চলে

পাড়ের সমৃদ্ধ মাটি,

গৃহস্থের আটচালা, মাটির উনুন,

প্রবীণ লাঙল, ধানী মরিচের টাল,

তরমুজের ক্ষেত, পোষা বেড়ালের মিউ,

ফলবান বৃক্ষের বাগান, কাঁথা ও বালিশসহ সম্পন্ন সংসার।

তেমন আহ্লাদ নেই তার ভেঙে ফেলতে দু’পাড়ের

সোনার সংসার;

সে তো খুব মনস্তাপে পোড়ে,

নিরুপায় অশ্রুপূর্ণ চোখে

দীর্ঘশ্বাস চেপে সে-ও দু’পাড়ে তাকায়:

এক পাড়ে দাঁড়ানো নারীকে বাঁচাতে গিয়ে

অপর পাড়ের নিরুদ্বিগ্ন পাখিদের বাসা

তছনছ করে ছোটে,

তাকে তো ছুটতে হয়, সে যে নিরুপায়

তার কষ্ট থাকে তার বুকে;

তারও বুক ভেঙে যেতে পারে— বুকভাঙা অভিজ্ঞতা

তারও তো রয়েছে— থাকতে পারে, থাকে…

সে কথা ক’জন জানে।

নদীকে তোমরা জানো ভাঙচুরের সম্রাট!

দু’কূল-ছাপানো তার আবেগে উদ্বেল

পলি তোমাদের জীবনে কি এনে দ্যায়নি কখনো

শস্যের সম্ভার?

রফিক আজাদ
রফিক আজাদ
জন্ম রফিক আজাদ(১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ - ১২ মার্চ, ২০১৬) ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। প্রকৃতার্থে তারা ছিলেন তিন ভাই-দুই বোন। কিন্তু তার জন্মের আগে মারা যায় সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই মাওলা ও তৎপরবর্তী বোন খুকি। রফিক আজাদ যখন মায়ের গর্ভে তখন অকাল প্রয়াত বড় বোন অনাগত ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘জীবন’। রফিক আজাদ ‘জীবনের’ই আরেক নাম। শিক্ষাজীবনঃ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রফিক ভাষা শহীদদের স্বরণে বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে মিছিল করেন। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে, আদর্শ মানুষ হিসেবে।১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে ম্যাজিক শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়িতে পাঠান। কৈশোরে লাঠি খেলা শিখতেন নিকটাত্মীয় দেলু নামক একজনের কাছে। তিনি সম্পর্কে রফিক আজাদের দাদা। দেলু দাদা ছিলেন পাক্কা লাঠিয়াল। গ্রামে নানা কিংবদন্তির প্রচলন ছিল তার নামে। সলিম উদ্দিনের চেয়ে তিনি বয়সে বড় হলেও গা-গতর দেখলে পালোয়ান বলেই মনে হতো। দেলু দাদা খুব আদর করতেন রফিক আজাদকে। বার-বাড়িতে শিক্ষা দিতেন লাঠি খেলা। এছাড়া গুণী গ্রামের পাশেই মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হলেন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার মাইল দূরত্বে স্কুল। কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গেরস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। হামিদপুরে আগের মতো আর সেই বিধিনিষেধ নেই। কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তার। এই মাঈনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু। হামিদপুরে তার সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে। সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন কিশোর রফিক আজাদ। অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণীতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে আসে। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল করে বসল। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা। অবশেষে ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। কর্মজীবনঃ রফিক আজাদ বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার এর সম্পাদক ছিলেন। রোববার পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলার লেকচারার ছিলেন। রফিক আজাদের প্রেমের কবিতার মধ্যে নারীপ্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে।রফিক আজাদ ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা৷ তিনি ১৯৭১ সালেকাদের সিদ্দিকীর সহকারী ছিলেন ।