রাশিয়ার চিঠি -৩

মস্কৌ
বহুকাল গত হল তোমাদের উভয়কে পত্র লিখেছিলুম। তোমাদের সম্মিলিত নৈ:শব্দ থেকে অনুমান করি সেই যুগলপত্র কৈবল্য লাভ করেছে। এমনতরো মহতী বিনষ্টি ভারতীয় ডাকঘরে আজকাল মাঝে মাঝে ঘটছে বলে শঙ্কা করি। এই কারণেই আজকাল চিঠি লিখতে উৎসাহ বোধ করি নে। অন্তত তোমাদের দিক থেকে সাড়া না পেলে চুপ করে যাই। নি:শব্দ রাত্রির প্রহরগুলোকে দীর্ঘ বলে মনে হয়; তেমনিতরোই নিশ্চিঠি কাল কল্পনায় অত্যন্ত লম্বা হয়ে ওঠে। তাই থেকে থেকে মনে হয় যেন লোকান্তরপ্রাপ্তি হয়েছে। তাই পাঁজি গেছে বদল হয়ে‚ ঘড়ি বাজছে লম্বা তালে। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো আমার দেশে যাবার সময়কে যতই টান মারছে ততই অফুরান হয়ে বেড়ে চলেছে। যেদিন ফিরব সেদিন নিশ্চিতই ফিরব– আজকের দিন যেমন অব্যবহিত নিকটে সেদিনও তেমনই নিকটে আসবে‚ এই মনে করে সান্তবনার চেষ্টা করি।
তা হোক আপাতত রাশিয়াই এসেছি– না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অসমাপ্ত থাকত। এখানে এরা যা কাণ্ড করেছে তার ভালোমন্দ বিচার করার পূর্ব সর্বপ্রথমেই মনে হয়‚ কী অসম্ভব সাহস। সনাতন বলে পদার্থটা মানুষের অস্খিয় মনে-প্রাণে হাজারখানা হয়ে আঁকড়ে আছে; তার কত দিকে কত মহল‚ কত দরজা কত পাহারা‚ কত যুগ থেকে কত ট্যাকসো আদায় করে তার তহবিল হয়ে উঠেছে পর্বতপ্রমাণ। এরা তাকে একেবারে জটে ধরে টান মেরেছে; ভয় ভাবনা সংশয় কিছু মনে নেই। সনাতনের গদি দিয়েছে ঝাঁটিয়ে‚ নূতনের জন্যে একেবারে নূতন আসন বানিয়ে দিল। পশ্চিমমহাদেশ বিজ্ঞানের জাদুবলে দু:সাধ্য সাধন করে‚ দেখে মনে মনে তারিফ করি। কিন্তু এখানে যে প্রকাণ্ড ব্যাপার চলছে সেটা দেখে আমি সব চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছি। শুধু যদি একটা ভীষণ ভাঙচুরের কাণ্ড হত তাতে তেমন আশ্চর্য হতুম না– কেননা নাস্তানাবুদ করবার শক্তি এদের যথেষ্ট আছে– কিন্তু দেখতে পাচ্ছি‚ বহুদূরব্যাপী একটা ক্ষেত্র নিয়ে এরা একটা নতুন জগৎ গড়ে তুলতে কোমর বেঁধে লেগে গেছে। দেরি সইছে না; কেননা জগৎ জুড়ে এদের প্রতিকূলতা‚ সবাই এদের বিরোধী– যত শীঘ্র পারে এদের খাড়া হয়ে দাঁড়াতে হবে– হাতে হাতে প্রমাণ করে দিতে হবে‚ এরা যেটা চাচ্ছে সেটা ভুল নয়‚ হাজার বছরের বিরুদ্ধে দশ-পনেরো বছর জিতবে বলে পণ করেছে। অন্য দেশের তুলনায় এদের অর্থের জোর অতি সামান্য‚ প্রতিজ্ঞার জোর দুর্ধর্ষ।
এই-যে বিপ্লবটা ঘটল এটা রাশিয়াতে বলেই অনেক কাল থেকে অপেক্ষা করছিল। আয়োজন কত দিন থেকেই চলছে। খ্যাত-অখ্যাত কত লোক কত কাল থেকেই প্রাণ দিয়েছে‚ অসহ্য দু:খ স্বীকার করছে। পৃথিবীতে বিপ্লবের কারণে বহুদূর পর্যন্ত ব্যাপক হয়ে থাকে‚ কিন্তু এক-একটা জায়গায় ঘনীভূত হয়ে ওঠে। সমস্ত শরীরের রক্ত দূষিত উঠলেও এক-একটা দুর্বল জায়গা ফোড়া হয়ে লাল হয়ে ওঠে। যাদের হাতে ধন‚ যাদের হাতে ক্ষমতা‚ তাদের হাত থেকে নির্ধন ও অক্ষমেরা এই রাশিয়াতেই অসহ্য যন্ত্রণা বহন করছে। দুই পক্ষের মধ্যে একান্ত অসাম্য অবশেষে প্রলয়ের মধ্যে দিয়ে এই রাশিয়াতেই প্রতিকারসাধনের চেষ্টায় প্রবৃত্ত।
একদিন ফরাসী-বিদ্রোহ ঘটেছিল এই অসাম্যের তাড়নায়। সেদিন সেখানকার পীড়িতেরা বুঝেছিল এই অসাম্যের অপমান ও দু:খ বিশ্বব্যাপী। তাই সেদিনকার বিপ্লবে সাম্য সৌভ্রাত্র ও স্বাতন্ত্র্যের বাণী স্বদেশের গণ্ডি পেরিয়ে উঠে ধনিত হয়েছিল। কিন্তু টিকল না। এদের এখানকার বিপ্লবের বাণীও বিশ্ববাণী। আজ পৃথিবীতে অন্তত এই একটা দেশের লোক স্বাজাতিক স্বার্থের উপরেও সমস্ত মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করছে। এ বাণী চিরদিন টিকবে কি না বলতে পারে না। কিন্তু স্বজাতির সমস্যা সমস্ত মানুষের সমস্যার অন্তর্গত‚ এই কথাটা বর্তমান যুগের অন্তর্নিহিত কথা। একে স্বীকার করতেই হবে।
এই যুগে বিশ্ব-ইতিহাসের রঙ্গভূমির পর্দা উঠে গেছে। এতকাল যেন আড়ালে আড়ালে রিহার্স্যাল চলছিল‚ টুকরো টুকরো ভাবে‚ ভিন্ন ভিন্ন কামরায়। প্রত্যেক দেশের চারি দিকে বেড়া ছিল। বাহির থেকে আনাগোনা করবার পথ একেবারে ছিল না তা নয়‚ কিìুæ বিভাগের মধ্যে মানবসংসারের যে চেহারা দেখেছি আজ তা দেখি নে। সেদিন দেখা যাচ্ছিল একটি-একটি গাছ‚ আজ দেখছি অরণ্য। মানবসমাজের মধ্যে যদি ভারসামঞ্জস্যের অভাব ঘটে থাকে সেটা আজ দেখা দিচ্ছে পৃথিবীর এক দিক থেকে আর-এক দিক পর্যন্ত। এমন বিরাট করে দেখতে পাওয়া কম কথা নয়।
টোকিয়োতে যখন কোরীয় যুবককে জিজ্ঞাসা করেছিলুম “তোমাদের দু:খটা কী” সে বললে‚ “আমাদের কাঁধে চেপেছে মহাজনের রাজত্ব, আমরা তাদের মুনাফা বাহন।” আমি প্রশ্ন করলুম‚ যে কারণেই হোক‚ “তোমরা যখন দুর্বল তখন এই বোঝা নিজের জোরে ঝেড়ে ফেলবে কী উপায়ে।” সে বললে‚ নিরুপায়ের দল আজ পৃথিবী জুড়ে‚ দু:খে তাদের মেলাবে– যারা ধনী‚ যারা শক্তিমান‚ তারা নিজের নিজের লোহার সিন্ধুক ও সিংহাসনের চার দিকে পৃথক হয়ে থাকবে‚ তারা কখনো মিলতে পারবে না। কোরিয়ার জোর হচ্ছে তার দু:খের জোর।১
দু:খী আজ সমস্ত মানুষের রঙ্গভূমিতে নিজেকে বিরাট করে দেখতে পাচ্ছে‚ এইটে মস্ত কথা। আগেকার দিনে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দেখেছে বলেই কোনোমতে নিজের শক্তিরূপ দেখতে পায় নি– অদৃষ্টের উপর ভর করে সব সহ্য করেছে। আজ অত্যন্ত নিরূপায়ও অন্তত সেই স্বর্গরাজ্য কল্পনা করতে পারছে যে রাজ্যে পীড়িতের পীড়া যায়‚ অপমানিতের অপমান ঘোচে। এই কারণেই সমস্ত পৃথিবীতেই আজ দু:খজীবীরা নড়ে উঠেছে।
যারা শক্তিমান তারা উদ্ধত। দু:খীদের মধ্যে আজ যে শক্তির প্রেরণা স—ারিত হয়ে তাদের অস্খির করে তুলেছে তাকে বলশালীরা বাইরে থেকে ঠেকাবার চেষ্টা করছে— তা দূতদের ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না‚ তাদের কণ্ঠ দিচ্ছে রুদ্ধ করে। কিন্তু আসল যাকে সব চেয়ে ওদের ভয় করা উচিত ছিল সে হচ্ছে দু:খীর দু:খ— কিìুæ তাকেই এরা চিরকাল সব চেয়ে অবজ্ঞা করতে অভ্যস্ত। নিজেদের মুনাফার খাতিরে সেই দু:খকে এরা বাড়িয়ে চলতে ভয় পায় না‚ হতভাগ্য চাষীকে দুর্ভিক্ষের কবলের মধ্যে ঠেসে ধরে শতকরা দুশো তিনশো হারে মুনফা ভোগ করতে এদের হৃৎকম্প হয় না। কেননা সেই মুনফাকেই এরা শক্তি বলে জানে। কিন্তু মানুষের সমাজে সমস্ত আতিশয্যের মধ্যেই বিপদ‚ সে বিপদকে কখনোই বাইরে থেকে ঠেকানো যায় না। অতিশয় শক্তি অতিশয় অপশক্তির বিরুদ্ধে চিরদিন নিজেকে বাড়িয়ে চলতেই পারে না। ক্ষমতাশালী যদি আপন শক্তিমদে উন্মত্ত হয়ে না থাকত তা হলে সব চেয়ে ভয় করত এই অসাম্যের বাড়াবাড়িকে-কারণ অসামঞ্জস্য মাত্রই বিশ্ববিধির বিরুদ্ধে।
মস্কৌ থেকে যখন নিমন্ত্রণ এল কখনো বলশেভিকদের সম্বন্ধে আমার মনে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। তাদের সম্বন্ধে ক্রমাগতই উল্টো উল্টো কথা শুনেছি। আমার মনে তাদের বিরুদ্ধে একটা খটকা ছিল। কেননা গোড়ায় ওদের সাধনা ছিল জবরদস্তির সাধনা। কিন্তু, একটা জিনিস লক্ষ্য করে দেখলুম‚ ওদের প্রতি বিরুদ্ধতা য়ুরোপে যেন অনেকটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আমি রাশিয়াতে আসছি শুনে অনেক লোকই আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। এমন-কি‚ অনেক ইংরেজের মুখেও ওদের প্রশংসা শুনেছি। অনেকে বলেছে‚ ওরা অতি আশ্চর্য একটা পরীক্ষায় প্রবৃত্ত।
আবার অনেকে আমাকে ভয় দেখিয়েছে; কিন্তু প্রধান ভয়ের বিষয়‚ আরামের অভাব; বলেছে‚ আহারাদি সমস্তই এমন মোটারকম যে আমি তা সহ্য করতে পারব না। তা ছাড়া এমন কথাও অনেকে বলেছে‚ আমাকে যা এরা দেখাবে তার অধিকাংশই বানানো। এ কথা মানতেই হবে‚ আমার বয়সে আমার মতো শরীর নিয়ে রাশিয়ায় ভ্রমণ দু:সাহসিকতা। কিন্তু পৃথিবীতে যেখানে সব চেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান সেখানে নিমন্ত্রণ পেয়েও না আসা আমার পক্ষে অমার্জনীয় হত।
তা ছাড়া আমার কানে সেই কোরীয় যুবকের কথাটা বাজছিল। মনে মনে ভাবছিলুম‚ ধর্মমক্তিতে দুর্জয় পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রাঙ্গণদ্বারে ঐ রাশিয়া আজ নির্ধনের শক্তিসাধনার আসন পেয়েছে সমস্ত পশ্চিম মহাদেশের ভ্রূকুটিকুটিল কটাক্ষকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে‚ এটা দেখার জন্যে আমি যাব না তো কে যাবে। ওরা শক্তিশালীর শক্তিকে‚ ধনশালীর ধনকে বিপর্যস্ত করে দিতে চায়‚ তাতে আমরা ভয় করব কিসের‚ রাগই করব বা কেন। আমাদের শক্তি বা কী‚ ধনই বা কত। আমরা তো জগতের নিরন্ন নি:সহায়দের দলের।
যদি কেউ বলে‚ দুর্বলের শক্তিকে উদ্বোধিত করবার জন্যেই তারা পণ করেছে‚ তা হলে আমরা কোন মুখে বলব যে‚ তোমাদের ছায়া মাড়াতে নেই। তারা হয়তো ভুল করতে পারে– তাদের প্রতিপক্ষেরাও যে ভুল করছে তা নয়। কিন্তু আমাদের বলবার আজ সময় এসেছে যে– অশক্তের শক্তি এখনই যদি না জাগে তা হলে মানুষের পরিত্রাণ নেই‚ কারণ শক্তিমানের শক্তিশেল অতিমাত্র প্রবল হয়ে উঠেছে— এতদিন ভূলোক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল‚ আজ আকাশকে পর্যন্ত পাপে কলুষিত করে তুললে; নিরুপায় আজ অতিমাত্র নিরুপায়– সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আজ কেবল মানবসমাজের এক পাশে পুঞ্জীভূত‚ অন্য পাশে নি:সহায়তা অন্তহীন।
এরই কিছুদিন পূর্বে থেকে ঢাকার অত্যাচারের কাহিনী আমার কানের মধ্যে তোলপাড় করছিল। কী সব অমানুষিক নিষ্ঠুরতা‚ অথচ ইংলন্ডের খবরের কাগজে তার খবর নেই– এখানকার মোটরগাড়ির দুর্যোগে দুটো-একটা মানুষ ম’লে তার খবর এ দেশের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে‚ কিন্তু আমাদের ধন প্রাণ মান কী অসম্ভব সস্তা হয়ে গেছে। যার এত সস্তা তাদের সম্বন্ধে কখনো সুবিচার হতেই পারে না।
আমাদের নালিশ পৃথিবীর কানে ওঠবার জো নেই‚ সমস্ত রাস্তা বন্ধ। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে বচন জগতে ব্যাপ্ত করবার সকলপ্রকার উপায় এদের হাতে। আজকের দিনে দুর্বল জাতির পক্ষে এও একটি প্রবলতম গ্লানির বিষয়। কেননা আজকের দিনের জনশ্রুতি সমস্ত জগতের কাছে ঘোষিত হয়‚ বাক্যচালনার যন্ত্রগুলো যে-সব শক্তিমান জাতির হাতে তারা অখ্যাতির এবং অপযশের আড়ালে অশক্তজাতীয়দের বিলুপ্ত করে রাখতে পারে। পৃথিবীর লোকের কাছে এ কথা প্রচারিত যে‚ আমরা হিন্দু মুসলমানে কাটাকাটি মারামারি করি‚ অতএব ইত্যাদি। কিন্তু য়ুরোপে‚ একদা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে কাটাকাটি মারামারি চলত– গেল কী উপায়ে। কেবলমাত্র শিক্ষাবিস্তারের দ্বারা। আমাদের দেশেও সেই উপায়েই যেত। কিন্ত শতাধিক বৎসরের ইংরেজ-শাসনের পরে দেশে শতকরা পাঁচজনের কপালে শিক্ষা জুটেছে‚ সে শিক্ষাও শিক্ষার বিড়ম্বনা।
অবজ্ঞার কারণকে দূর করবার চেষ্টা না করে লোকের কাছে প্রমাণ করা যে‚ আমরা অবজ্ঞার যোগ্য‚ এইটে হচ্ছে আমাদের অশক্তির সব চেয়ে বড়ো ট্যাকসো। মানুষের সকল সমস্যা সমাধানের মূল হচ্ছে তার সুশিক্ষা। আমাদের দেশে তার রাস্তা বন্ধ‚ কারণ ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ আর কোনো উপকারের জন্যে জায়গা রাখলে না‚ তহবিল একেবারে ফাঁকা। আমি দেশের কাজের মধ্যে একটি কাজকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছিলুম; জনসাধারণকে আত্মশক্তিতে প্রতিষ্ঠা দেবার শিক্ষা দেব বলে এতকাল ধরে আমার সমস্ত সামর্থ্য দিয়েছি। এজন্যে কর্তৃপক্ষের আনুকূল্যও আমি প্রত্যাখ্যান করতে চাই নি‚ প্রত্যাশাও করেছি‚ কিন্তু তুমি জান কতটা ফল পেয়েছি। বুঝতে পেরেছি‚ হবার নয়। মস্ত আমাদের পাপ‚ আমরা অশক্ত।
তাই যখন শুনলুম‚ রাশিয়াতে জনসাধারণের শিক্ষা প্রায় শূন্য অঙ্ক থেকে প্রভূতপরিমাণে বেড়ে গেছে‚ যখন মনে মনে ঠিক করলুম‚ ভাঙা শরীর আরো যদি ভাঙে তো ভাঙুক‚ ওখানে যেতেই হবে। এরা জেনেছে‚ অশক্তিকে শক্তি দেবার একটিমাত্র উপায় শিক্ষা– অন্ন স্বাস্খ্য শান্তি সমস্তই এরই ’পরে নির্ভর করে। ফাঁকা ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ নিয়ে না ভরে পেট‚ না ভরে মন। তার দাম দিতে সর্বস্ব বিকিয়ে গেল।
আধুনিক ভারতবর্ষে আবহাওয়ায় আমি মানুষ‚ তাই এতকাল আমার মনে দৃঢ় ধারণা ছিল‚ প্রায় তেত্রিশ কোটি মূর্খকে বিদ্যাদান করা অসম্ভব বললেই হয়; এজন্য আমাদের মন্দ ভাগ্য ছাড়া আর কাউকে বুঝি দোষ দেওয়া চলে না। যখন শুনেছিলুম‚ এখানে চাষী ও কর্মীদের মধ্যে শিক্ষা হু হু করে এগিয়ে চলেছে আমি ভাবছিলুম‚ সে শিক্ষা বুঝি সামান্য একটুখানি পড়া ও লেখা ও অঙ্ক কষা– কেবলমাত্র মাথা-গুনতিতেই তার গৌরব। সেও কম কথা নয়। আমাদের দেশে তাই হলেই রাজাকে আশীর্বাদ করে বাড়ি চলে যেতুম। কিন্তু এখানে দেখলুম‚ বেশ পাকা রকমের শিক্ষা‚ মানুষ করে তোলার উপযুক্ত‚ নোট মুখস্খ করে এম·এ· পাস করার মতন নয়।
কিন্তু, এ সব কথা আর-একটু বিস্তারিত করে পরে লিখব‚ আজ আর সময় নেই। আজই সন্ধ্যাবেলায় বর্লিন অভিমুখে যাত্রা করব। তার পরে ৩রা অক্টোবর আটলান্টিক পাড়ি দেব– কত দিনের মেয়াদ আজও নিশ্চিত করে বলতে পারছি নে।
কিন্তু‚ শরীর মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। তবু এবারকার সুযোগ ছাড়তে সাহস হয় না– যদি কিছু কুড়িয়ে আনতে পারি তা হলেই বাকি যে-ক’টা দিন বাঁচি বিশ্রাম করতে পারব। নইলে দিনে দিনে মূলধন খুইয়ে দিয়ে অবশেষে বাতি নিবিয়ে দিয়ে বিদায় নেওয়া সেও মন্দ প্ল্যান নয়; সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে রেখে গেলে জিনিসটা নোংরা হয়ে উঠবে। সম্বল যতই কমে আসতে থাকে মানুষের আন্তরিক দুর্বলতা ততই ধরা পড়ে–ততই শৈথিল্য‚ ঝগড়াঝাঁটি‚ পরস্পরের বিরুদ্ধে কানাকানি। ঔদার্য ভরাউদরের উপরে অনেকটা নির্ভর করে। কিìুæ যেখানেই যথার্থ সিদ্ধির একটি চেহারা দেখতে পাই সেখানেই দেখা যায় সেটা কেবলমাত্র টাকা দিয়ে হাটে কেনবার নয়– দারিদ্রের জমিতেই সে সোনার ফসল ফলায়। এখানকার শিক্ষাব্যবস্খায় যে অক্লান্ত উদ্যম‚ সাহস‚ বুদ্ধিশক্তি‚ যে আত্মোৎসর্গ
দেখলুম‚ তার অতি অল্প পরিমাণ থাকলেও কৃতার্থ হতুম। আন্তরিক শক্তি ও অকৃত্রিম উৎসাহ যত কম থাকে টাকা খুঁজতে হয় ততই বেশি।
ইতি ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০
১ দ্রষ্টব্য পরিশিষ্ট : কোরীয় যুবকের রাষ্ট্রীয় মত

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  শেষের কবিতা-১৬

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...