কবিতা

পাবলো নেরুদার কবিতা

52d83337b64f0-11অনুবাদ: মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
আর সেই বয়সে…কবিতা এসেছিল
আমার খোঁজে। আমি জানি না, আমি জানি না কোথা থেকে
তা এসেছিল, শীত না নদী থেকে।
আমি জানি না কেমন করে বা কখন,
না, তারা কণ্ঠস্বর নয়, তারা নয়
শব্দ বা নৈঃশব্দ্য।
কিন্তু আমাকে ডাক দেওয়া হয়েছিল এক রাস্তা থেকে
রাত্রির শাখাপ্রশাখা থেকে,
আচমকা অন্যদের মাঝখানে থেকে,
প্রচণ্ড আগুনের মাঝে,
বা একাই ফিরছিলাম,
আমি ছিলাম মুখাবয়বহীন,
আর তখন তা আমাকে স্পর্শ করল।

আমি কী আমি জানতাম না, আমার
মুখে কোনো নাম আসছিল না,
আমার চোখ ছিল অন্ধ,
আর হঠাৎ করে আমার আত্মায় কী একটা শুরু হলো,
জ্বর বা বিস্মৃত পাখিদের ডানা,
আর আমি আমার পথ করে নিলাম,—
অর্থোদ্ধার করে
সেই আগুন,
আর লিখে ফেললাম প্রথম অস্পষ্ট পঙিক্তটি
অস্পষ্ট, সারশূন্য বিশুদ্ধ
অর্থহীনতা,
বিশুদ্ধ প্রজ্ঞা
এমন একজনের যে কিছুই জানে না,
আর হঠাৎ আমি দেখলাম
আকাশ বিমুক্ত
এবং উন্মুক্ত,
গ্রহদের
স্পন্দিত উদ্যান,
ছিদ্রিত ছায়া,
ছিন্নভিন্ন
তীর, আগুন আর ফুলে,
ঘূর্ণায়মান রাত্রি, বিশ্ব।

আর আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক সত্তা,
মত্ত মহা তারকায়িত শূন্যতায়,
সাদৃশ্য, প্রতিকৃতি
রহস্যের
নিজকে মনে হলো এক বিশুদ্ধ অংশ
অতলের,
আমি তারকাদের সঙ্গে চক্রাকারে ঘুরঘুর ঘুরলাম,
আমার হূদয় মুক্ত হয়ে ভেসে গেল বাতাসে।

পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা (১২ জুলাই, ১৯০৪ – ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) ছিলেন চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। কৈশোরে তিনি এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম গ্রহণের পশ্চাতে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলি নিজের পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর পিতা ছিলেন কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চাইতেন তাঁর পুত্র কোনো "ব্যবহারিক" পেশা গ্রহণ করুক। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপায়ার-এর মতো কামোদ্দীপনামূলক কবিতা সংকলন, তেমনই রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহারও। ১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে "বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি" বলে বর্ণনা করেন।[১] ১৯৪৫ সালের ১৫ জুলাই, ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাকিম্বু স্টেডিয়ামে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা লুইস কার্লোস প্রেস্টেসের সম্মানে ১০০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেন নেরুদা।[২] নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর চিলিতে ফিরলে সালভাদর আলেন্দে এস্ত্যাদিও ন্যাশোনালে ৭০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।[৩] জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ট সহকারীতে পরিণত হন। চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পিনোচেট নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দেননি। যদিও হাজারে হাজারে শোকাহত চিলিয়ান সেদিন কার্ফ্যু ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টি পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে।