কবির হাতে সোনার ছাই

 

আব্দুল মান্নান সৈয়দ

সাঁইত্রিশ বছর আগের কথা।

৩ আগস্ট ১৯৭৫ সাল।

 প্রকাশিত  হলো আবদুল মান্নান সৈয়দের নির্বাচিত কবিতা। প্রকাশক মুক্তধারা। একই সঙ্গে একই তারিখে বের হলো রফিক আজাদেরও নির্বাচিত কবিতা। ষাট-দশকের প্রথমার্ধে আবির্ভুত সমকালীন বাংলা কবিতার দুই তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃৎ। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে মুক্তধারা এই দুই কবির নির্বাচিত কবিতা দিয়েই  কোনো ব্যক্তি-কবির এই ধরনের প্রতিনিধিত্বশীল রচনার একক সঙ্কলন প্রকাশের রীতি প্রবর্তন করে। আমার সৌভাগ্য, কিছুদিন পরে মুক্তধারা আমারও একটি অনুরূপ একক সঙ্কলন প্রকাশ করেছিলো। এ-ধরনের প্রকাশনার মূল কৃতিত্ব কিন্তু বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের কিংবদন্তী স্বর্গত চিত্তরঞ্জন সাহারই প্রাপ্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের সৃষ্টিশীল প্রকাশনায় তার সীমিত সম্পদ নিয়েও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। তার পথ ধরেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনায় নানা ধরনের উদ্ভাবনশীল পরিবর্তন ঘটেছে।  মান্নান সৈয়দ ও রফিক আজাদের সঙ্কলন দুটি বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে চিত্তদা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যুগল-প্রকাশনা উৎসব আয়োজন করে। এটিও কবি ও কাব্যামোদী মহলে বিশেষ আলোড়ন তোলে। তখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ছিল বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাশে, আর তার পরিচালক ছিলেন প্রবীণ কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দিন। প্রকাশনা উৎসবে আমি ছিলাম তরুণতম আলোচক। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, এই দুই কবিকে সম্পূরক কবি চিহ্নিত করে আমি তাদের দ্বন্দ্বমূলক প্রবণতা দৃশ্যকল্পনা (আ. মা. সৈ.) ও শ্রুতিকল্পনার (র. আ.) কথা বলেছিলাম। তারও কিছুদিন পরে আমি এই দুজনকে নিয়ে যে একক প্রবন্ধটি লিখেছিলাম তারও শিরোনাম ‘দুজন সম্পূরক কবি’। এই প্রবন্ধটি, যতদূর মনে পড়ে, মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত আমার রবীন্দ্রপ্রকৃতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ শীর্ষক প্রবন্ধগ্রন্থে সঙ্কলিত হয়েছে। এই স্মৃতিতর্পণের একটি কারণ এই যে, আমার ধারণা, পঞ্চাশোত্তর বাংলাদেশের কবিতায় বাঁকবদলের ক্ষেত্রে এই দুই কবির একটি নির্ণায়ক ভূমিকা আছে। দুজনের কবিতাই আত্যন্তিক কাব্যিক সচেতনতা প্রসূত। এই সচেতনতার প্রকাশ রফিক আজাদ প্রধানত তার কবিতাভাষ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও মান্নান সৈয়দ তার ব্যাখ্যা-বয়ান হাজির করেছেন যথাসম্ভব গদ্য-বিশ্লেষণেও। তিনি কবিতা কী, নতুন কবিতার প্রবণতা কী-কী হতে পারে, কবি কে, ইত্যাকার নানা প্রশ্নে বিদ্ধ হয়ে সদুত্তর খোঁজার চেষ্টাও করেছেন নিরন্তর। ফলে বারবার পাল্টে গেছে তার কাব্যবিশ্বাস, কবিতার চেহারা, কিংবা কবিরও অবয়ব। রফিক আজাদ তার ২-পৃষ্টার মুখবন্ধে যেখানে কবিতাকে ‘পদ্য-প্রবন্ধ’ বলে খালাশ, সেখানে মান্নান ৪-পৃষ্ঠার স্বীকারোক্তিমূলক বিশ্লেষণে কবি-সংজ্ঞা ও কাব্যপ্রক্রিয়ার মতো জটিল বিষয় নিয়েও অন্তর্ভেদী মন্তব্য করেছেন। কবিতা লেখার ব্যাপারটি তার কাছে প্রথমত ‘প্রাকৃতিক’, তারপর ‘মানবপ্রাকৃতিক’। সচেতনতাই এখানে মুখ্য। মান্নানের ভাষায়, ‘স্বসমুত্থান আর চেতনা– দুজনেই একসঙ্গে কাজ করে যায় কবিতায়– এরকম মনে হচ্ছে আজ। এই দুই নারী-পুরুষের কোনো-এক অসামান্য বিন্যাসই হয়তো কবিতা। বিষয়টি, তাহলে, বোধহয়, শুধু প্রাকৃতিক নয়– বলা চলে : ‘মানবপ্রাকৃতিক’।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  অন্ধকূপ থেকে

লক্ষ্য করার বিষয়, এই উদ্ধৃতাংশে ‘মনে হচ্ছে’, ‘বোধহয়’ শব্দগুচ্ছের ব্যবহারও সচেনতাপ্রসূত। কেননা কবিতা বা শিল্প সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা যায় না, কেননা পরিবর্তমান সমাজবিন্যাস বা মনোবিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে এই মন্তব্যও পাল্টে যেতে পারে। মান্নান শুধু এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না, বরং তার দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় তিনি বার বার পরিবর্তিতও হয়েছেন – বিশ্বাসে ও নির্মিতিতে।

নির্বাচিত কবিতায় মান্নানের মোট ৬টি কাব্য থেকে ৭১টি মৌলিক কবিতা ও ২৬টি অনূদিত কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। রচনাকাল ১৯৬০-১৯৭৫। আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করছি প্রথম কবিতায়। এই কবিতার নাম ‘কবি’। আসুন আরেকবার পাঠ করি এই সংলাপাশ্রয়ী তর্কাকুল ও আবেগবিদ্ধ কাব্যভাষ্য :

কোত্থেকে বেরিয়ে এলে?

 -তোমাদের ওই সূর্য থেকে।

 এখন কোথায় যাবে?

-অনন্তে; যেখানে অস্ত যায় না কোনো-কিছু। মাথায় কি?

 -স্বপ্নঘেরা কালো জামপাতার মুকুট।

হাতে? -চাঁদের খুলির মধ্যে-পাওয়া একমুঠো সোনার ছাই।

দূরে কি দেখছো? -চান্দ্রমাস বসেছে বিহারে।

বটে? ও-তো শ্রোণীভারে বেদম রমণী : কি রকম তড়পায় দেখেছো?

 -যেন ডাঙায় কাৎলা-মাছ, সদ্য পানি-থেকে-তোলা।

ওদিকে? -জেলের আতত জাল, ভুল করে সূর্যে পড়েছে।

 সঙ্গে আছে কেউ? -আছে : একটা পাগলা কুকুর, ঈশ্বর বলে ডাকি।

জানো, কি মাড়িয়ে চলেছো? -হ্যাঁ, জানি : বাস্তব।

 জানো, আমি কে? -তুমি-তো আয়না। তুমি কে? -একলা কবি।

২৩-পঙক্তির এই তর্ক-ভাষ্যে ১১টি প্রশ্ন আর তার উত্তর আছে, যার মধ্যে প্রায় প্রতিটি উত্তর চিত্রকল্পাশ্রয়ী ও স্বপ্নভারাতুর। যদি প্রশ্নোত্তর-বিন্যাস পাল্টে দিয়ে কেবল একরৈখিক বর্ণনায় আসি, তাহলে ‘কবি’র পরিচয় মোটিামুটি এভাবে বর্ণনা করা যায় : ‘কবি সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা একজন কেউ। সে যাবে অনন্তে, যেখানে কিছুই অস্ত যায় না। তার  মাথায় স্বপ্নঘেরা কালোজাম-পাতার মুকুট। তার হাতে চাঁদের খুলির মধ্যে পাওয়া একমুঠো সোনার ছাই। সে দেখছে অনেক দূরে চান্দ্রমাস বিহারে বসেছে। শ্রোণীভারে বিপর্যস্ত এক রমণীর মতো সে কাতরাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এই মাত্র পানি থেকে তোলা কাৎলা মাছ। অন্যদিকে জেলের কল্পিত বা অযৌক্তিক (আতত) জাল ভুল করে সূর্যে পড়েছে। তার সঙ্গে আছে একটা পাগলা কুকুর, যাকে সে ঈশ্বর বলে ডাকে। সে মাড়িয়ে চলেছে বাস্তব। তার সামনে আছে আয়না। আর সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার নাম কবি। সে একলা।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  সৃষ্টিশীলতার প্রতি

এই গদ্যভাষ্যেও যে কবির পরিচয় একরৈখিকভাবে আঁকা গেলো এমন নয়। তবে অন্তত এটুকু আন্দাজ করা গেলো যে, কবি নিজেই নিজের পরিচয় ভিন্ন ভিন্নভাবে দিতে আগ্রহী, যদিও সে একলা, আর তার সামনে একটিমাত্র আয়না। সহজভাবে বলা যায়, আত্মদর্পণে বিশ্বরূপ দর্শন  করার মতো এক মহাজাগতিক ব্যাপার ঘটিয়ে চলেছে কবি, বাস্তবতাকে পায়ে মাড়িয়ে আর ঈশ্বরকে পাগলা কুকুরের রূপকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে যার পথ চলা। এই প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিটি বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদলেয়ারের কবিতাসমগ্রের উৎসর্গ-কবিতার নির্মাণ-কাঠামোকে যেমন মনে করায়,  তেমনি লোকগল্পের অবাস্তব ও শেষহীন প্রশ্নোত্তর-পালার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। অর্থাৎ মান্নান তার পাঠ আর শ্রুতি থেকে সচেতনভাবেই গ্রহণ করেছেন এই পদ্ধতি। প্রথমে তা ‘প্রাকৃতিক’ মনে হলেও শেষাবধি তা হয়ে উঠেছে ‘মানবপ্রাকৃতিক’। তবে এর বড় তাৎপর্য হলো চিত্রময়তা, যা মান্নানের কবিতারও মুখ্য বৈশিষ্ট্য। আমি আগেই বলেছি, মান্নান মূলত দৃশ্যকল্পনার কবি এবং তর্কাকুল সচেতন পথে তার যাত্রা। এখানে, নির্বাচিত কবিতার এই শুরুর কবিতাতেই তার মুখ্য নমুনা সমুপস্থিত। কবিতা বলতে প্রাচীন মুনিঋষিরা যে অলীকদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, এখানে তার ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে জাদুবাস্তবতা আর সুররিয়ালিজমেরও মিশেল মায়া। আর প্রতিটি চিত্রকল্প মোটামুটি স্পষ্ট, যদিও তার ইন্টারলিঙকিং বা আন্ত:সম্পর্ক দূরান্বয়ী। কবিতাকে বহুতলীয় করার জন্যেই মূলত এই সচেতন প্রয়াস। মান্নান এই সচেতন কাব্যপ্রক্রিয়ারই এক চেতন সাধক।

সবশেষে বলবো কবির দৃষ্টির কথা। তার চোখের দৃষ্টির কথা। তার মনের দৃষ্টির কথা। আর যে আয়নায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ বস্তু ও অবস্তুকে পরখ করা হচ্ছে তার কথা। এভাবেই কবি তৈরি করেন এক অপরূপ রূপচিত্র, আর তিনি নিজে হয়ে যান এক অচেনা চিত্রক। আমার বিশ্বাস, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, অর্থাৎ স্বসৃষ্ট রূপচিত্রের এই অচেনা চিত্রক বাংলা কবিতায় বারংবার পঠিত, বিশ্লেষিত ও পুনর্মূল্যায়িত হবেন। আর উত্তরপ্রজ্রন্মের কাছে পুনর্ব্যাখ্যাত হতে থাকবে তাঁর নবায়নপ্রবণ কবিসত্তাও।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও

০৫.০৯.২০১২

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

মুহম্মদ নূরুল হুদা- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...