উক্তির মুক্তি ও নজরুল

nazrul-5বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম কবিদের শীর্ষে থেকেও সবচেয়ে সহজবোধ্য নন যিনি, তাঁর নাম নজরুল। তাঁর কবিতার ধ্বনি ও শ্রুতিমাধুর্য় শ্রোতাকে যতটা কাছে টানে, তার বাণী ততোটা টানে কিনা প্রশ্নসাপেক্ষ। এ-কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা শ্রোতাপাঠকের কাছে যতোটা শ্রুতিসিদ্ধ, ততোটা স্বতঃবোধ্য নয়। ফলে যে নজরুল মূলত যুক্তিসিদ্ধ উক্তির কবি, তিনি প্রায় সব একপাঠের পাঠক-পাঠিকার কাছে অধরাই থেকে যান।

এই বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি প্রথম অনুভব করি বছর দুএক আগে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নজরুল গবেষক ড. রেচেল ম্যাকডারমট নজরুলের কিছু কবিতার ব্যাখ্যা নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি এ-সময়ে নজরুলের কবিতায় ব্যবহৃত ঐতিহ্যিক পটভূমি, পুরাণ-প্রসঙ্গ ও তার নবায়ন, তার সমকালের সঙ্গে এই নবায়নের যৌক্তিকতা আর এই নবায়নের নান্দনিক বৈধতা নিয়ে কাজ করছিলেন। আর এই কাজটি সম্পন্ন করে নজরুল-মানসকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করার জন্য নজরুলের কবিতা নতুনভাবে নিজে অনুবাদ করছিলেন। এই অনুবাদ তিনি অক্সফোর্ড বা অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রন্থাকারে বের করবেন বলে আমাকে জানিয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল মৎসম্পাদিত ও নজরুল ইন্সটিটউট থেকে প্রকাশিত ‘পোয়েট্রি অব কাজী নজরুল ইসলাম ইন ইংলিশ ট্রানশ্লেশন’ নামক বৃহৎ গ্রন্থটি। আমি তাকে বললাম, তুমি যদি নজরুলের কবিতার বাণীসত্য বুঝতে চাও, তাহলে এই গ্রন্থের মূল কবিতা ও তার অনুবাদ পড়লেই তো চলে। বলা বাহুল্য, ‘বিদ্রোহী’সহ একাধিক কবিতার একাধিক ইংরেজি অনুবাদ এখানে আছে। রেচেল একটু হেসে বললো, তুমি যা বলছো তা প্রায় ঠিক, এ-পর্যন্ত আমি আমার যৎসামান্য বাংলা-জ্ঞান নিয়ে ইংরেজি অনুবাদগুলো মিলিয়ে দেখেছি, প্রায় সব অনুবাদেই মূলের সঙ্গে কিছু গরমিল আছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবিতার অংশবিশেষ বাদও পড়েছে। মূল কবিতাটি অনুবাদে পুরোটা বুঝে তার বাণীসত্য বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে। কাজেই আমি আগে মূল বাংলাতেই কবিতাটি বুঝতে চাই্। যতোটা তার নান্দনিক গঠনশৈলী, ততটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নজরুলের অন্তর্বয়িত উক্তি, যা তার শব্দচিত্রের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ছায়ার বাঁশি

তার সঙ্গে বসে কয়েকটি কবিতার পাঠ ও অনুবাদ-ভাষ্য মিলিয়ে দেখার পর আমিও বুঝতে পারলাম তার কথার সত্যতা। যাঁরা অনুবাদ করেছেন তাঁরা সবাই প্রাজ্ঞজন, কিন্তু প্রায় সকলেই নজরুলের বাণীর এমন সব অংশ বাদ দিয়েছেন, যা তার কাছে অনুবাদযোগ্য মনে হয়নি কিংবা অনুবাদে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এমন একটি উদাহরণ অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন অনূদিত ‘বিদ্রোহী’, যেখানে তিনি এই কবিতার প্রতিটি পঙক্তি অনুবাদ না করে তার বোধগ্রাহ্য সংক্ষেপিত ভাষ্যটি অনুবাদ করেছেন। এতে কবিতাটির নান্দনিক কাঠামো তো অটুট থাকেইনি, অধিকন্তু তার বাণীসত্য বা উক্তিও বিকৃত হয়েছে। প্রফেসর কবীর চৌধুরীসহ অন্যান্য অনেক বাঙালি অনুবাদকও এই কাজটি করেছেন কম-বেশি। কিন্তু রেচেল ম্যাডারমট এই কাজটি করতে নারাজ। তাই তিনি নতুন করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন নজরুলের কবিতার যথাযথ বাণীসত্য।

এই কাজ করতে গিয়ে তিনি বাংলা-ভাষার প্রায় সব নজরুল-গবেষকের কাছে গেছেন এবং তাদের কাছে তাঁর নির্বাচিত কবিতার বাণী-ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। এই কাজটি করতে হলে তিনি লক্ষ্য করেছেন নজরুলের কবিতা আগে ইংরেজি বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করারও আগে সুবোধ্য বাংলা ভাষাতেই অনুবাদ করা জরুরি। নজরুলের কবিতার অন্তর্বয়িত উক্তিকে নিজের কাজে সুবোধ্য করতে হলে এই কাজটি করতে হবে আমাদের প্রত্যেকেকে। আর এটি অধুনিকতম অনুবাদকলারও একটি স্বীকৃত প্রথা। কোনো টেক্সট বা ভাষ্য দ্বিতীয় ভাষায় অনুবাদ করার আগে, বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রে, প্রথম ভাষাতেই সহজভাবে অনুবাদ করা জরুরি হয়ে পড়ে। এটি ইন্ট্রালিংগুয়াল অনুবাদ বা স্বভাষিক অনুবাদ। এই অনুবাদ না করা গেলে কবিতাটি স্বভাষার পাঠকপাঠিকার কাছেও অবোধ্য থেকে যাবে। ফলে তা ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা যাবে না। কবিতার অনুবাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একবার প্রফেসর কবীর চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন, হুদা, কোনো কবিতা অনুবাদ করতে গেলেই বোঝা যায় কবিতাটি কতোটা বোধগম্য বা বোধাতীত। তিনি বোধাতীত কবিতাকে ভালো কবিতা বা অনুবাদযোগ্য কবিতা ভাবতেন না।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  বসন্তে লেগেছে তো সুর

আজ নজরুলের কবিতার ক্ষেত্রে এ্ই কথাটিই বিশেষ গুরুত্ববহ বলে মনে হয়। প্রতিবছর নজরুলকে নিয়ে আমারা যে উৎসব করি, তার যথার্থতা তখনি গ্রহণযোগ্য হবে, যদি আমরা তার কবিতার উক্তি আমাদের সচেতন পাঠের মাধ্যমে মুক্তি দিতে পারি।
নজরুলের অনন্যতা ও স্বাতন্ত্র্য শুধু তার সামাজিক বিদ্রোহে নয়, বরং তার আলঙ্কারিক ভিন্নতা ও নান্দনিক ভিন্নতায়ও। এই কারণেই তিনি সুশ্রাব্য ও আপাত-সহজ কবি হয়েও কঠিন কবি। সেই কাঠিন্য ভাষিক কাঠিন্য ও কবিতার সাংগঠনিক ভিন্নতার কাঠিন্য। আমাদের অতিসাম্প্রতিক নতুন কবিরাও যে নজরুল-পাঠে কিছুটা বিমুখ, তার প্রধান কারণও নজরুলের কবিতাপাঠে তাদের এই শ্রমবিমুখতা। তা নাহলে প্রথাগত শব্দ, ছন্দ বা বিবৃতি-বয়ানের বাইরেও নজরুলের কবিতায় যে অসামান্য রূপক, চিত্রকল্প, পুরাণ ও শব্দক্রীড়া আছে তা সচেতন নতুন কবিকে আকৃষ্ট করবে না কেন? একজন নতুন কবি তো শুধু সাধারণ পাঠকের মতো তাৎক্ষণিক ভালো-লাগা নিয়ে কবিতাচর্চা করতে করতে পারেন না। তাঁকে জানতে হবে অন্ততপক্ষে তার ভাষার সকল তাৎপর্যকপূর্ণ কবির নির্মাণকলা। তা না হলে তিনি তার পথ বের করে নিতে পারবেন না।

নজরুলের বেলায় আরেকটি বিষয়ও সত্য বলে মনে হয়। সেটি হচ্ছে তিনি অনুকরণযোগ্য কবি নন। যারাই তার কবিতার শ্রুতিভাষ্যকে অনুকরণ করেছেন তাদের প্রায় সকলেই নজরুল-প্রভাব বলয়ের কবি-বন্দি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন; নিজে স্বতন্ত্র ও অনন্য কবি হতে পারেননি। এর একটি কারণ এই যে, নজরুল সেই সব বিরল কবির একজন যারা তাদের কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্যকে নিজেরাই চূড়ায় তুলে দিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধি অর্জন করেছেন, যা নজরুলের পক্ষেও পরে আর অতিক্রম করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাষিক নির্মিতি। সমগ্র বাংলা ভাষায় ‘বিদ্রোহী’-র মতো শিখরস্পর্শী কাব্যভাষা তার আগে বা পরে আর পাওয়া যায় না। তাই নজরুলকে পাঠ ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নতুন যুগের নতুন দৃষ্টির কবিদের সতর্কতা আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  দখলীস্বত্বের বাড়ি

নজরুলের সমকালীন কবিদের মধ্যে যিনি এই সতর্কতা সর্বাধিক প্রদর্শন করে পরবর্তীকালের কবিদের জন্যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তিনি নকজরুলেরই সমবয়সী জীবনানন্দ দাশ। ভাবতে অবাক লাগে, বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবিও কাব্যজীবনের শুরুতে অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই নজরুলে মজেছিলেন। নজরুলীয় কাব্যভাষা ও বাণীময়তাকে প্রাধান্য দিয়ে মকশো করেছিলেন কবিতা-রচনা। শব্দ-ছন্দ-ঝঙ্কার-হুঙ্কার ইত্যাদি আয়ত্তের পাশাপাশি রপ্ত করেছিলে চিত্রকল্প সৃষ্টির স্বতন্ত্র কৌশল আর মিথের আধুনিকায়নের বা ব্যক্তিগত মিথ-সৃষ্টির কৌশল। নজরুলের কাব্যকৌশলকে রপ্ত করেই নতুন-মৌলিক জীবনান্ন্দ শুরু করলেন নিজের পথে হাঁটা। সেই হাঁটার আর বিরাম নেই। দ্রুততার বিপরীতে মন্থরতা, প্রত্যক্ষের বিপরীতৈ পরোক্ষ, বাস্তবতার বিপরীতে পরাবাস্তবতা, বজ্র-সরবতার বিপরীতে মগ্ননীরবতা ইত্যাকার নান্দনিক বৈপরীত্যে নিষিক্ত হলেন তিনি। নজরুলে সিদ্ধ হয়েও আবদ্ধ থাকলেন না। নজরুলের উক্তিকে বোধের ভিতরে নিয়ে খুঁজলেন নিজের মৌলিক মুক্তি। নজরুল তথা অতীতের কোনো সিদ্ধ কবিকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের এই দৃষ্টান্ত আমাদের জন্যে পরম শিক্ষণীয়ও বটে।

বাংলা তথা সমসাময়িক পৃথিবীর সবচেয়ে আসাম্প্রদায়িক মানুষ নজরুল স্বধর্মে দীক্ষিত হয়েও মানবধর্মে নিষিক্ত। মানুষই তার কাছে সর্বসত্য, মানুষের অভিন্নতাই তার কাছে ‘অভেদসুন্দর’। তার কবিতার সচেতন পাঠ মানবিক পাঠকপাঠিকোর কাছে সর্বাগ্রে উন্মোচিত করবে এই মুক্তিবাণী। কাকতালীয়ভাবে বলা যেতে পারে, তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নামও ‘মুক্তি’। তাই বলবো, তার সংক্ষিপ্ততম উক্তির নাম ‘মুক্তি’। প্রতিদিন নজরুলের একটি পঙক্তির নতুন পাঠ মুক্তি দেবে আমাদের বোধের বন্দিত্ব। প্রসারিত হবে আমাদের দৃষ্টি। নজরুলের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিও তারই অনন্য দৃষ্টিজাত। এই দৃষ্টি থেকেই উৎসারিত মাত্র বাইশ বছর বয়সী তরুণ কবির আত্মদর্শী উক্তি, “আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ’।
২৪.০৫.২০১৬

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

মুহম্মদ নূরুল হুদা- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...