ফিরিবার পথ নাহি

বিকেলটা ভারী সুন্দর। বইমেলার মধ্যে হাজারখানেক পুষ্পপ্রেমিক মানুষের পায়ে চলার মধ্যে কেবল সুরভিত আনন্দের স্রোত। একদিকে বুক স্টলগুলো লেখক পাঠকদের ভিড়ে জমজমাট, অন্যদিকে ঘনায়মান বিকেলে একটা কুয়াশার আস্তরণ তৈরি হয়েছে। অবাক কা-! স্টলগুলোয় ক্রেতা, বিক্রেতার কথার ঝলমলে আয়োজনকে গ্রাহ্য না করে দুটো কোকিল সমানে ডেকে যাচ্ছে। ভারী উতলা হয়ে কী এক আনন্দে সাথীকে ডাক দিয়ে চলেছে পাখিরা। রাস্না আর মনজুর দুজনেই এখানে অনেকক্ষণ ধরে বেড়াচ্ছে। বইমেলায় মানুষগুলোকে দেখে যেন ভারী খুশি পাখিরা। মনজুর বললো- চলো, এবার যাই। অনেকক্ষণ বেড়ানো হলো।
– হ্যাঁ। আম্মা বলছে তাড়াতাড়ি ফিরতে। তুমি তো চা না খেলে আবার নড়বে না। চলো, গরম গরম চায়ে গলাটা ভেজাই।
বাইরে বেরিয়ে হোন্ডায় চেপে বসলো রাস্না। বললো একটু চক্কর দিয়ে আসি। আশুলিয়ার দিকে যাবে? হাতের ঘড়ি উল্টে দেখে নিলো সময়।
– যাবে? সত্যি? হাসি হাসি মুখে জানতে চায় মনজুর।
– শিওর! মাথার চুলগুলো একটা নরম ব্যান্ডে গুছিয়ে নিলো। বই কিনেছে অনেকগুলো। হোন্ডার লাগেজ কিটয়ে ঢুকিয়ে নিলো। তারপর অনুরোধের সুরে বললো, খুব তাড়াতাড়ি কিন্তু ফিরতে হবে। রাগ করো না। আম্মা তো ভিতুর একশেষ। দেরি হলে পুলিশে খবর দিয়ে বসে থাকবে। জানো তো!
আমার নাড়ি-নক্ষত্র উনি জানেন রাস্না! তোমার সঙ্গে দূরে গেলে সময়মতো নিরাপদে পেঁৗছে দেবো, তা উনি ভালো করেই জানেন।
– কী রকম? বুঝিয়ে বলো ঠোঁট কামড়ে হাসিমুখে জানতে চায় রাস্না।
হোন্ডাটা মনজুরের হাতে গরগর করে উঠলো পোষা বিড়ালের মতো। ঢাকার নাগরিক সীমা ছাড়িয়ে সোজা নরসিংদী, কোনাবাড়ি, আশুলিয়া ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে। হাসিতে বাতাস ভরিয়ে দিলো রাস্না। পাশ দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে ট্রাক, বাস, প্রাইভেট গাড়ি। দুবার রাস্তায় যখম হয়ে যাওয়া ভাঙা গর্তে হোঁটচ খেতে খেতে বেঁচে গেল হোন্ডা।
– এই, কী করছো? একটুখানি সরি বলে আবার হোন্ডা চালালো মনজুর।
এই, শুনছো? চলো না, কোথাও একটু বসি!
– বেশ তো। চলো! রাস্তা থেকে নেমে একটা চরপড়া রুক্ষ গেরুয়া রঙের জায়গা। হোন্ডাটা রেখে দু’জন বসলো একটা ইটের পাঁজার ওপরে। বসলো দুজন এই এলাকায় পাশাপাশি মরা-আধমরা বেশ ক’টা নদী আছে। এই সময়টা পানি সরে যায় দূরে। শুধু মাঝখানের স্রোতটুকু ঝির ঝির করে বয়ে যাচ্ছে। পানির ধারে শরবন। লম্বা লম্বা শরবন ঘেঁষে একটা ইটের পাঁজা। একসময়ে এখানে ইটের ভাঁটা ছিলো। এখন পরিত্যক্ত। কাছেই জনপদের সাড়া পাওয়া যায়। বেশকিছুটা সময় চলে গেল। ভালো লাগছে বসতে। হঠাৎ চোখে পড়ে কঠিন লালচে খরখরে জায়গায় ঘাসের জটলা। তার মধ্য থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে নীল রঙের ফুলের একটি মাত্র ডাঁটা। একবার কাছে গিয়ে চেষ্টা করলো টেনে তুলতে। ভারী শক্ত, ওঠাতে পারলো না।
– এই বুঝি তোমার গায়ের জোর! রাস্না গিয়ে ওটা টানলো। তার মুখে মৃদু হাসি। হাতে ধুলো লেগে আছে। ফুল তোলা ছেড়ে দিয়ে ধুলোটা ধুয়ে নিতে ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া স্রোতে হাতটা ছোঁয়ালো রাস্না। পানিটা শীতল শান্ত। কিন্তু একমুহূর্তে কী একটা দেখে আর্তচিৎকার করে উঠলো রাস্না। সেই চিৎকারে কী যেন একটা ছিলো, মনজুর ছুটে এসে রাস্নাকে জড়িয়ে ধরলো- কী হলো রাস্না?
– ওই পানির কাছে কী যেন, কী যেন! বোবা কান্নায় থরথর করে কাঁপছে রাস্না।
– আরে না, না, ওখানে তো খালি শরবন। কী দেখেছো রাস্না? চলো, আমি দেখছি।
– না, না! যেওনা, যেওনা মনজুর! … কান্নায় ভেঙে পড়লো রাস্না। আহা, তুমি ভয় পেও না রাস্না। আমি দেখছি।
ঝুঁকে দেখলো মনজুর। শিউরে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ধড়ফড় করে উঠলো সে। বড় বড় পা ফেলে এসে দাঁড়ালো রাস্নার কাছে। ভীত এবং চিন্তিতভাবে বললো, মনে হয় কেউ অন্য কোথাও মেরে এখানে ফেলে রেখে গেছে। এসো, তাড়াতাড়ি করো রাস্না, ব্যাপারটা পুলিশকে জানানো দরকার।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  একুশের ফুলগুলো

পুলিশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটা নোট ডাউন করলো, তবে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে পুঙ্খানুপুঙ্খ জেরার পর। দু’জনের মুখে কোনো কথা নেই। রাস্নার সারাশরীর কাঁপতে কাঁপতে মনজুরের পেছনে বসে রাস্তা পাড়ি দিতে দিতে কান্না সামলানোর চেষ্টা করতে করতে পরিচিত শহরে ঢুকলো। আম্মা এসে দরজা খুলে উদ্বিগ্নভাবে বললেন-
– কোথায় ছিলি তোরা? আমি ভেবে মরি। সঙ্গে মোবাইল ছিল না? রাস্না তাকালো মনজুরের দিকে।
– খালাম্মা, আমরা একটু রাইডে গিয়েছিলাম। রাস্না ওখানে একটু ভয় পেয়েছে। আচ্ছা, আমি আসি। তাড়তাড়ি বিদায় নিল মনজুর।
মেয়ের ঘরে ফিরে গেলেন মা। বললেন, কী হয়েছে তোর? ভয়ের কী ছিলো শুনি? বল্ আমাকে।
রাস্না কথা বললো না। চোখ ভিজে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়লো মায়ের কাঁধে মাথা রেখে কেবলই বলে চললো- ভয়, ভীষণ ভয় পেয়েছি আম্মা। আম্মা কিছুটা শঙ্কা, কিছুটা রাগ নিয়ে বললেন- আচ্ছা, সব কথা পরে শুনবো। বেড়াতে গিয়ে যদি এত কষ্ট পেতে হয়, বেড়াতে যাসই বা কেন শুনি? আচ্ছা, তোর বাবা এলে পরে কথা বলিস। এখন চুপচাপ একটু শুয়ে থাক।

সংবাদপত্রে খবরটা বেরিয়েছে। দুজন এনজিওকর্মী এক কিশোরের মৃতদেহ দেখতে পেয়ে এলাকার থানায় জানান। তারা ওখানে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন ছেলেটি বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিলো। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে একথা জানা গেছে, তার সঙ্গে থাকা দামি একটি মোবাইল পাওয়া যায়নি। সপ্তাহখানেক ধরে ছেলেটিকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তার পরিবার থানায় জিডি করেছিলেন। মৃত কিশোরের বয়স এগারো বছর। তারা বন্ধুরা মিলে বাসে করে ঘুরতে এসে দুর্ঘটনা ঘটায়। বন্ধুদের জেরা করে এ ঘটনা বেরিয়ে এসেছে।
– এই নে রাস্না, তোরা যে সেদিন সন্ধ্যায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলে, তার ডিটেইল খবর বেরিয়েছে। এখন তদন্ত চলছে। আব্বার গলায় নিশ্চিন্ত হওয়ার লক্ষণ।
রাস্না কোনো জবাব দিলো না। অফিসেও সে একেবারে নিশ্চুপ। লাঞ্চের সময় অফিসের ক্যান্টিনে মনজুর এসে পাশে বসলো। বললো, যাই বলো, ওরা আমাদের কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। আমাদের নাম উল্লেখ করেননি।
রাস্নাকে চুপচাপ দেখে খারাপ লাগলো মনজুরের। রাস্নার হাতে হাল্কাভাবে নিজের হাতটা রাখে মনজুর। রাস্না হঠাৎ একটু কেঁপে ওঠে। তারপর নিচু গলায় রাস্না বলে_ জানো, আমি পানির মধ্যে ছেলেটার দিকে তাকাতেই ও আমার আঙুলটা ছুঁয়ে বললো, আপা, ওসব কথা আর ভেবো না তুমি। দুর্ঘটনা তো রোজই ঘটছে। কতজনের কথা ভাববে বলো? ট্রাই টু ফরগেট ইট।
ট্রাই টু ফরগেট ইট! মনে মনে ভাবলো রাস্না। ভুলে যাবো? মানুষের পৃথিবীতে নিখোঁজ তালিকায় নাম লিখিয়ে আর একটি কিশোর হাসিমুখ হারিয়ে গেল। খবরের কাগজে তো শুধু একটি কিশোর নয়, একটি হাসিমুখ, সংসারের স্বপ্ন সাধ আর একটি সুখী জীবন নিমেষে খান খান হয়ে গেল। তার প্রতিকার কী হবে? কারা করবে প্রতিকার? একটা দামি মোবাইলের জন্য, সাইকেলের জন্য, অন্যায় আঘাত আসতেই থাকবে। শুধুমাত্র মুখের কথার জন্য, টাই টু ফরগেট ইট!

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  সূর্যের ফেরার অপেক্ষায়

অফিসের কোনো অনুষ্ঠান হলে সঞ্চালনের দায়িত্বটা রাস্নাই পালন করে। সেদিনও হচ্ছিল। শিশুদের যত্ন ও নিরাপত্তাবিষয়ক সেমিনার। একসময় মান্যবর গুণী-জ্ঞানীদের বক্তৃতার ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল রাস্না। এখানে সকালে শিশু-কিশোররা ছবি অাঁকার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। তাদের পুরস্কার দেয়া হবে। ব্যাক স্টেজে তারই প্রস্তুতি চলছে। আচমকা এক টুকরো খবরের কাগজে চোখ পড়লো তার। কোনো এক আবাসিক এলাকায় তিন তিনটি সদ্যজাত শিশুর মৃতদেহ পড়ে আছে। কুকুররা ঘোরাঘুরি করছিল দেখে কৌতূহলী মানুষরা গিয়ে সন্ধান পেয়ে পুলিশকে জানান। ছবির মধ্য থেকে শিশুরা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখছে যেন। অথবা অভিমানে চোখের পাতাই খোলেনি। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী দেখতে ইচ্ছে হয়নি ওদের।
সারা শরীর কেঁপে উঠলো রাস্নার। শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠান, তাই হলজুড়ে ফুলের মালা, বেলুন, হাস্যমুখ শিশুদের নিয়ে পোস্টার। তারই মাঝখানে মাত্র তিনটি মৃতশিশুর ছবি… চারপাশে আনন্দমুখর মানুষ, তারই মাঝখানে নিঃসঙ্গ একাকীত্বের যন্ত্রণায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে রাস্নার, মাথা ঘুরছে। পাশ থেকে কেউ ডাকলো রাস্না, টি-ব্রেক শেষ হয়েছে। গেস্টরা মঞ্চে ফিরেছেন, শুরু করুন। মাইকটা তার হাতে ধরিয়ে দিলো কেউ।
মাননীয় সুধীজন আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এত সুন্দর এ আয়োজন শিশুদের জন্য বলেই তো। এত ছবি, ফুলের মালা। কিন্তু আপনারা জানেন না, শিশুরা কত নিরাপত্তাহীন? এই নিষ্ঠুর শহরে, গ্রামেগঞ্জে প্রতিদিন এত মৃত্যুর অপহরণ, তাহলে এই দেবশিশুরা পৃথিবীতে আসবে কেন?
_আরে, রাস্না, তুমি কি নিজেই বক্তৃতা শুরু করলে? কানের পাশ থেকে ফিস ফিস করে তাকে ধাক্কা দিলো তার সহকর্মী।
_না। আমি বলতে চাই, এ আমরা চলেছি কোথায়? আজকের সংবাদপত্র দেখেছেন আপনারা? তিনটি সদ্যোজাত শিশুকে বাঁচতে দেয়নি। মাত্র ক’দিন আগেই আমি দেখেছি এক হারিয়ে যাওয়া কিশোরের লাশ। বলুন এসব হন্তারকদের কে শাস্তি দেয়ার জন্য আপনারা কি এগিয়ে আসতে চান না?
_এই রাস্না…তুমি… কী বলছো এসব? এসবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?
_না, আমাকে থামিয়ে দেবেন না। বলতে দিন। তীব্র কণ্ঠে বলে ওঠে রাস্না_
_আজ এই উৎসব, আয়োজনে আমরা আনন্দে দিন কাটাচ্ছি, কিন্তু যে কোনো সময় আমাদের ক্ষতি করতে পারে নিষ্ঠুর খুনিরা। তাদের কাছে জীবনের কোনো মূল্য নেই, শিশুর কোনো সৌন্দর্য নেই। আমরা কি বিশাল এক একটি মিছিল নিয়ে চিৎকার করে রাজপথকে কাঁপিয়ে দিয়ে বলতে পারি না_ আমাদের শিশুদের বাঁচান। মানুষ এখন মানুষ নেই। নরখাদক হয়ে গেছে। আপনারা বলবেন_ মানুষের পৃথিবীতে এমনটি ঘটেই থাকে, ট্রাই টু ফরগেট ইট। কিন্তু আপনাদের এই স্বার্থপর উপদেশের ফলে এর কোনো প্রতিরোধ না করলে, অন্যায়ের বিষাক্ত আঘাত আমাদের এই দেশ ও জাতিকে চুরমার করে দেবে। এখনই রুখে দাঁড়ান। নইলে কোনোদিন আমাদের ঘরগুলোও আক্রান্ত হবে। বলুন, আপনারা আমার কথাকে ধৃষ্টতা ভেবে এড়িয়ে যাবেন? অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন না?’ ক্লান্ত হাতে থেকে মাইক্রোফোনটি সহকর্মীর হাতে ফিরিয়ে দিলো রাস্না। সেই মুহূর্তে গোটা হলজুড়ে হাততালির আওয়াজ উঠলো। কর্তা ব্যক্তিদের মুখে দৃঢ় উচ্চারণ, মায়েদের মুখে সমর্থনের সমস্বর শিশুদের রক্ষা করতে হবে। আমরা সবাই একসঙ্গে অঙ্গীকার করছি, শপথ নিচ্ছি… সভার চেহারা বদলে গেল।
রাস্না কান্না লুকাতে চেষ্টা করলো না। পিঠের ওপরে সহকর্মীদের হাত। মনজুর এসে দাঁড়ালো পাশে। আবেগটা প্রতিহত করার কথাও মনে আসেনি কারো। মানুষের সমবেদনা, কর্মস্পৃহা যেন সাগরের মতো গর্জন করে উঠতে চায়। ‘শিশুদের রক্ষা করো’। মানুষের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এ এক অন্যরকম যুদ্ধ। রুখে দাঁড়াবে সবাই। এ যুদ্ধ কারো একার নয়। মানুষের এই দৃঢ় চেষ্টায় সবাই এক কাতারে। রাস্না মনে মনে বলে উঠলো, ভয় নেই। সারাদেশের মায়ের, পিতার, বোনের হাতে হাত রেখে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সবাই।’

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ভীষণ পাজি পিঁপড়া-ছেলে

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

জুবাইদা গুলশান আরা- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...