কবিতা

ভারত এক খোজ

বিশেষ কারনে আমি এতবছর পর আবার অযোধ্যায় এলাম
মাননীয় বিচারক এলাম আমার মায়ের জন্মভুমি খুজতে
না আমার কি ধর্ম আমি জানি না
জানি না আমার বাবা কে ?
আমার মাও জানতেন না এসব,
আমার মা মুন্নাবাঈ,
জন্মেছিলেন এখানে এক জোপড়ায় ,
কোন পুরুষের ঔরোষে তার জন্ম
তা ঠাহর করে বলতে পারেন নি আমার দাদীও
আর জাত পাতের কথা তো উঠেই না
মা শুধু জানতেন
কে তার মা ?
মাননীয় বিচারক
একে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার বলা যায় কিনা ভেবে দেখেবেন ।
যদিও পরিবার শব্দটির অর্থ আমার কাছে পরিস্কার নয়
বরং শুনুন বালক বয়সে বিনা টিকেটে ট্রেনে উঠার আগে কি আমি দেখেছিলাম ভাল মনে নেই আমার।
তবু সেই জলহীন,আলোহীন,পয়প্রনালীহীন অন্ধকার ঘুপছি জোপড়া ভিখেরী জোচ্ছোর দাগী মাতাল আসামী
আর কোন কোন মধ্যরাতে আচমকা হুইসেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়তো পেট মোটা খানেদার
মুখে মদের গন্ধ,পান খাওয়া কুৎসিত হাসি
মা আমাকে ঠেলে বের করে দিত জোপড়ার বাইরে
সেই রাত সেই সোনালী হ্যালুজিনের রাত ,সেই অসংখ্য নক্ষত্রের রাত
আমি একা কাঠিয়ে দিতাম রাস্তার পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে
অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারতাম ঠিক আবার কতদিন পর মা আবার বমি করতে শুরু করবেন
ব্যাস , এই তো জীবনের সব নষ্ট মরীচিকা
অযোধ্যা ছেড়ে আসার পর আমি কি কি করি তা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়
আমি শুধু শুনেছিলাম
মা আমার জোপড়া থেকে দালান,দালান থেকে শীষমহল
পর্যন্ত পৌঁছোতে পেরেছিলেন
তারপর,তারপর জীবনের লাথ খেতে খেতে
সেই জোপড়ায় পড়ে এসে মরে
চোখ জাপসা হয়ে উঠার জন্যে মাফ করবেন মাননীয় বিচারক ,
কিন্তু এত বছর পর মায়ের জন্মভুমি খুঁজতে এসে
কি আমি দেখলাম ?
কেউ কেউ বলছে এখানে জন্মেছিলেন
তাদের এক পৌরনিক রাজা।
কেউ বলছে
এখানে জন্মেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাড়া খাওয়া এক বাদশা ,
আমি জানি না পৌরনিক কোন চরিত্রের ফের জন্ম নেওয়া সম্ভব কিনা ?
আমি জানি না বহু বছর আগে আসা কোন সেনানীর পদ ছিন্ন নিশ্চিত করা সম্ভব কিনা ?
কিন্তু আমি জানি আমার মা এখানে জন্মেছিলেন ।
কেননা আমিও যে জন্মে ছিলাম এখানে ,
আমার ইন্তেকালের ভয় নেই,
আখেরাতের লোভ নেই
মঙ্গা বা মৃত্যু আমাকে আকৃষ্ট করে না
শুধু এই জোপড়ার জন্যে ,এই জন্মভুমির জন্যে
আমার রোজা আমার উপবাস অস্টপ্রহর প্রাথনা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ
মাননীয় বিচারক , মাননীয় বিচারক রহম করুন
আমার মাতৃভুমি আমাকে ফিরিয়ে দিন
ফিরিয়ে দিন আমি ভয়ংকর হয়ে উঠবার আগে ।

      ভারত এক খোজ

জয়দেব বসু
জয়দেব বসু
১২ মে ১৯৬২ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। তিনি ছিলেন বাবা-মার জ্যেষ্ঠ সন্তান। পিতা পরিতোষ বসু ছিলেন নড়াইল জেলার সিঙিয়া গ্রামের মানুষ। মাতা বেলা বসু টাঙ্গাইল জেলার সাজানপুর গ্রাম নিবাসী। জয়দেব শিক্ষালাভ করেন পাঠভবন (শান্তিনিকেতন), প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশা হিসেবে বেছে নেন অধ্যাপনা। ৫০ বছর বয়সে জয়দেব বসু হারিয়ে যাবেন কেউ ভাবেনি, কেউ কল্পনা করেনি। এ বয়সেও তিনি ছিলেন যেন তারুণ্যে উজ্জ্বল, রঙিন-আলোকময়। তাঁর শৈশব কাটে দার্জ্জিলিং এবং শান্তিনিকেতনে। স্কুল শেষ করে যোগ দেন কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে বাংলা নিয়ে। স্নাতকোত্তর পড়া শেষ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এর পর তিনি দমদম মোতিঝিল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত দীর্ঘ কবিতা “মেঘদূত” যা প্রকাশিত হয়েছিল । ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১২ জয়দেব বসু মৃত্যু বরন করেন ।

3 thoughts on “ভারত এক খোজ

Comments are closed.