গল্প

সমরেশ

প্রায় কুড়ি বছর পরে সমরেশের সঙ্গে দেখা হল। সে আমাকে চৌরঙ্গীর একটা হোটেলে নিয়ে একটা নিরিবিলি কোণ বেছে বার করল। আমরা বসলাম দু’জনে।
সমরেশ বল্লে : মাঝে-মাঝে খেতাম। অনেক দিন তোমার সঙ্গে দেখা নেই। তুমি জান না আমি মদ ধরেছিলাম। খুব বেশি খেতাম না অবিশ্যি কখনও; কিন্তু নেহাৎ কমও খাওয়া পড়ত না। বাইরে গিয়ে মদ খেতাম না। ক্বচিৎ খেতাম হয়তো এক-আধ দিন। আমার মদ খাওয়া চলত আমার নিজের বাড়ীতেই- গোপনে। প্রকাশ্যে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলে- কিংবা হোটেল-কাফেতে দল ভারী করে মদ খাওয়া আমার পোষাত না। কেন জান? আমি মানুষটা হচ্ছি সাত্ত্বিক-
শুনে আমার হাসি পেল। ব্যাঙ্ক চলন্ত ট্রেন পোস্ট-অফিস-এর ভ্যান সমীহ করি- সমরেশ চুরুট জ্বালিয়ে নিয়ে বল্লে : কেউ যদি বলে ইন্দ্রনাথবাবুর ছেলের একটু মাল টানবার অভ্যাস আছে-
-ইন্দ্রনাথবাবুর ছেলের?
-হ্যাঁ, পৈতৃক সুনামে মাছি পড়বে সে আমি বরদাস্ত করতে পারি না।
-এবং সাত্ত্বিক মানুষ, তুমি হাসালে, সমরেশ।
সেই বিপ্লবী উদ্রিক্ত খুনে ডাকাতের একি পরিবর্তন! চাও খেত না, আজ চুরুট টানছে, মদ খাওয়া নিয়ে খিস্তি করছে। সাত্ত্বিক হয়েছে বলছে।
-তুমি হাসছ, কিন্তু সত্যিই আমি সাত্ত্বিক রুচির মানুষ; সহজে আমার রক্ত তাতে না। উত্তেজিত পিপাসিত হয়ে উঠি বলে আমি মদ খাই না। আমি খুব ঠাণ্ডা মনেই মদ খাই।
-তাই বুঝি? খেতে কেমন লাগে?
-খারাপ না।
-আজ একটু হবে?
-না। আমি ছড়ে দিয়েঝি। যখন খেতাম, তখনও অন্য কাউকে বখাতাম না।
-আজ বিশ বছর পরে তোমার সঙ্গে দেখা। পেটে একটু না পড়লে চলে?
কথাটা সমরেশের কানেই পৌঁছাল না। যেন চুরুটে এক টান দিয়ে সে বল্লে : কোনোদিন মাতলামো করিনি। অথচ অনেক মদ খেয়েছি। কিন্তু কোনোদিন খাব না আর। আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। এ কি, তুমি কাঁটা চামচ সরিয়ে রাখলে যে!
-কী আর খাব
-একটা রোস্ট খাও- ফাউল রোস্ট-
-না, না, আমার দাঁত টনটন করছে।
-তা হলে কফি খাও-
-এরা কফি কেমন করে?
-বেশ ভালোই। দু’তিন কাপ গরম কফি চলুক।
আমি যে মদ খেতাম, এ-কথা কেউই জানে না-আমার স্ত্রী অব্ধি না। অথচ দিশি বিলিতী এমন কোনো মালই নেই যা আমি পাচার করি নি।
সমরেশ কফি ঘাটছিল।
-তোমার স্ত্রীকে ফাঁকি দিলে কি করে? তাঁর তো জানা উচিত।
-জানে নি তো।
সমরেশ বল্লে- মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু যত দিন খেয়েছি আমি ইন্দ্রনাথবাবুর নাতি ও চন্দ্রনাথবাুর ছেলে হয়ে এ-কাজ করছি)এই ভেবেই মনে দুঃখ পেয়েছি; আমার চরিত্রের যে-শুদ্ধতা কোনো মেয়েমানুষই কোনোদিন তা কড়েকে দিতে পারে নি; সেইখানে মদ এসে ক[কাল এই ভেবে মাঝে-মাঝে অস্বস্তি বোধ করেছি। কিন্তু-
টেবিলে কফির পট, দুধ, চিনি এসে হাজির হল।
আমার পেয়ালায় কফি ঢালতে-ঢালতে সমরেশ বল্লে : তুমি বোস- আমি আসছি-
বলে আচমকা সে উঠে গিয়ে কোথায় দরব্জায় পরদার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। মিনিট পঁচিশেক পরে ফিরে এসে : মদ এক অপূর্ব জিনিস।
-তা বটে। কিন্তু খেতে কেন তুমি? এখনও তো খেয়ে এলে। মানুষের জীবন তো মদের চেয়েও অপূর্ব।
সমরেশ মাথা নেড়ে স্বীকার করল; বল্লে : সে-জীবন থেকে পালিয়ে যাবার প্রয়োজনে বাধ রে মদদ ধরি নি আমি। আমি আমার ছেলেকে ভালোবাসি, স্ত্রীকে ভালোবাসি; চাকরী করছি, চাকরীর উন্নতি হচ্ছে; আরো উন্নতির জন্যে প্রাণপাত করবার মত শক্তি আছে রুচি আছে আমার। আমি অসামাজিক নই। মানুসেল দলে ভিড়তে- ভালোবাসতে আমার ভালো লাগে। সমাজকল্যাণ চাই আমি। এ-সব জেনেশুনেও স্থির চোখে মদ খেতে শুরু করলাম-
আমি আবার কফির অর্ডার দিয়েছিলুম। বয় সারসরঞ্জাম সাজিয়ে দিয়ে গেছে। আমার কফির পেয়ালায় দুধ চিনি মিশিয়ে আমার কাঁধের উপর তার ডান হাতের থাবা বিন্যস্ত করে রাখল সমরেশ, নীরব নিস্তব্ধ হয়ে রইল।
-তুমি কফি খাবে না, সমরেশ?
-না
-কেন? দু’ পেয়ালা কি হবে?
-তুমি আস্তে-আস্তে খাও। তারিয়ে-তারিয়ে খাও। অপূর্ব- অপূর্ব- অপূর্ব বলতে লাগল সমরেশ।
-কাকে তুমি অপূর্ব বলছ
-অপূর্ব? আমি অপূর্ব এই পৃথিবী। অবিস্মরণীয় এই হোটেল- এই বিলিতী হোটেল- এই ক্লাইভ স্ট্রিটের সাহেবদের দম তো সময় মদ্যময়, নি-খি-লে-শ।
সবুর, আমাকে কফি খেতে দেবে না! আহা, করছ কি, সমরেশ- দিলে তো কফি ঢেলে, গেল ছিটকে সব- এখন পেয়ালাটাকেও না ভেঙে ছাড়বে না দেখছি-
আমাকে অচ্ছুত করবে তুমি! সে হাত সরিয়ে সটান হয়ে বসল।
-কারু সঙ্গে আমার মন কষাকষি নেই তো। সবই উজ্জ্বল। উজ্জ্বল-নিরুজ্জ্বল- পবিত্র। দেখেছ কী অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। কী জাজ্বল্যমান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। তুমি কফি খাচ্ছ পাগল নিখিলেশ, নি-খি-লে-শ, অথচ এই দুর্দ্দান্ত ব্রহ্মণ্ডটাকে দেখছ না- টার্নার মনিয়ন, বুলরু লাভিসে, শ’ওয়ালেস, জারডিন স্কিনার, হোরেস মিলার বাই বাই করে ঘুরছে সব। ঐ সিলিঙের দিকে তাকিয়ে দেখো! তাকিয়ে দেখো দেয়ালগিরির দিকে। কী অভাবনীয়- অনির্বচনীয় সব ফ্রেস্কো- দেখছ নিখিলেশ-
-দেখছি বৈ কি-
-কী বিরাট কারুকার্য্য এই একটা বিধাতার। চারদিকে দুর্দ্দান্ত মোজেয়িক জ্বলজ্বল করে উঠছে যেন আমেরিকা এক একটা স্কাইপোর-এ আগুন ধামচ্ছে- নি-খি-লে-শ-
-আচ্ছা!
-কফি খাচ্ছ? আগুন লেগেছে, না?
-কোথায়?
-বাঃ, এই হোটেলে- কলকাতা- প্রশান্ত মহাসাগর-আটলান্টিক- আঃ, কী অন্তহীন অন্তহীন আগুনের মোজেয়িকের ভিতর বসে আছি তুমি আর আমি। আঃ, কী আগুন, কী আরাম। ঐ যে দূর আকাশের তারাটি তড়পাচ্ছে- দেখছ তো-
হোটেলের গহ্বরের এক কোণের ঘেরাটোপের ভিতরে বসে তারা দেখবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, এক টুকরো আকাশও চোখে পড়ছিল না; বল্লাম- ঐ তারাটি? ঐ যে তোমার আঙুল বরাবর গ্যাসের ঢাউস বাতিটি? হ্যাঁ, ওকে আমি খুব সুনজরে দেখি। আমাদের পৃথিবীতে তারা- আমরা কি ছায়াপথের ভিতরে?
-হুই তারাটির নামই অনুরাধা। ও আমার স্ত্রী নয়- বলে আমার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল সমরেশ।
হোটেলে তখন বেশি কেউ ছিল না। কিন্তু যে দু’চারজন লোক খাচ্ছিল কিংবা পেগ টানছিল, তারা সমরেশের দিকে একবার ফিরে তাকাল কি না তাকাল, মুহূর্ত্তের মধ্যেই নিজেদের কাজে মন দিল তারা।
-বান মাছ দেখেছ
-দেখেছি বৈ কি
-দীঘির শ্যাওলার ভিতর কেমন শটকে বেড়ায় দেখেছ! ওকে বলে বান-শটকান্ শটকানো- হোঃ হোঃ হোঃ- হোঃ হোঃ হোঃ- আমার স্ত্রীর কাছ থেকে আমি শটকে পড়েছি, নিখিলেশ- এক পরস্ত্রীর হুদ্দায়।
-কবে থেকে?
-সেই পরস্ত্রীটি কে জান, নিখিলেশ?
-কে?
সমস্ত হোটেলটাকে বিপর্য্যস্ত করে হাউ-মাউ করে কেঁদে হেসে উঠল সমরেশ।
কিন্তু অল্পক্ষণের ভিতরেই খুব চুপ মেরে গেল।
বল্লে- আমি বিয়ে করিনি। এইবার করব। আমার নিজের স্ত্রীকেই বিয়ে করব আমি। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছি না তো।
পকেট থেকে একটা ফোটো বের করে সমরেশ। একটি স্ত্রীলোকের ফোটো- ফোটোর নিচে যা লেখা ছিল, তা পড়ে বুঝলাম, মহিলাটি সমরেশের তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী এবং অল্প কিছুদিন হল (সন্তান প্রসব করতে গিয়ে) মারা গেছেন।
হালে মদ ধরেছে হয়তো সমরেশ। কিন্তু না ধরলেও পারত। মানুসের যখন তৃতীয় পক্ষ গ্রহণের নসয় আসে জীবনে, তখন সে তো চতুর্থ পক্ষের হাত ধরে সকালে গঙ্গালাভ করবার জন্যে নিতান্তই প্রস্তুত।
-আমাকে বিশ্বাসন কর- আমি মদ ছেড়ে দিয়েছি- বলে সমরেশ। কিন্তু আমি অনেক সময়ই ভেবে অবাক হই যে, আমাদের দেশে এটা-একটা মানুসেল তিন-চারটে স্ত্রীর প্রয়োজন ঘুচল না কেন।
খানিতক্ষণ নিস্তেজ হয়ে বসে থেকে চুরুট জ্বালাল সমরেশ। চুরুটের আগুনে চুমকির জেল্লায় ভরে উঠল ক্রমে-ক্রমে তার চোখ।
এক বোতল হুইস্কির প্রয়োজন হয়ে পড়ল তার। আমাকেও খাওয়াবে।
-চারজর স্ত্রী পর-পর আসে- একসঙ্গে এসে হামলা করে না। সেই জন্যেই ঝুঁকি পোয়াতে পারি- বল্লে সমরেশ।
পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম যে বিয়েই করেনি- স্ত্রীলোকের প্রতিও আসক্ত নয়- মদ ভেলেও টাকা বেঁচেছে ঢের। তার নিজের ব্যক্তিগত জীবনে খানিকটা সুস্থতা শান্তি ও সমাজের কল্যাণের জন্যে নানা রকমভাবে টাকা খরচ করেছে সে; কিন্তু আমাদের এই আধুকি পৃথিবীর অগম গোলধাঁধার অন্ধকারে কেটা দেশলাইকাঠির আলোও ঠিকরে বেরুল না তাতে। অনেক কঠিন সমীচীন চিন্তার পর মধ ধরেছে তাই সমরেশ- পৃথিবীকে মাঝে-মাঝে অপূর্ব মনে হয় তার, নর-নারীর মুখ প্রদীপ্ত মনে হয়, উৎকৃষ্ট উজ্জ্বল রেণুপরমাণুর আলোড়নে মানবসমাজ ঝিকমিক করতে থাকে, অমৃত হয়ে ওঠে।
এরপর একদিন সমরেশের বাড়ীতে গিয়ে দেখা করলাম তার সঙ্গে। অন্ধকার ঘরে একা বসে ছিল সে। সমস্ত বাড়ীতে একটা চাকর আছে শুধু, আর কেউ নেই।
-তুমি আমাকে সেদিন একটা ফোটো দেখিয়ে ঠকাতে চাচ্ছিলে কেন, সমরেশ?
-সেদিনের কথা ছেড়ে দাও ভাই। যে-সময়টা মদ খাই না, বসে-বসে এই সব করি আর কি! যুদ্ধ করি আর বি! যুদ্ধ, অগণ্য, আন্দোলন, মন্বন্তর, দাঙ্গা, আরো দাঙ্গা, আরো যুদ্ধ, আরো মন্বন্তর আজকের পৃথিবীতে মানুষ কী করতে পারে আর- বলে দেবে আমাকে? এ ছাড়া কোথায় কে কি করছে আর- দেখিয়ে দেবে আমাকে!
যে বিয়ে করেনি, তার তৃতীয় পক্ষের ছবি অপরকে দেখানো ছাড়া আজকের পৃথিবী কি আর কিছুই করছে না? আধুনিক পৃথিবীর ভিতরের কথা কি এমনই অকিঞ্চিতকর? সমরেশের সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে কোনো লাভ হল না। সে যুক্তিতর্ক উপেক্ষা করে অন্যমনস্ক হয়ে রইল।
-এখন আমি হুইস্কি খাব। তুমি খাবে?
-না
-অতিরিক্ত মদ খেলে ট্যাঁক ও লিভার পচার হয়? আমি হিসেবী মানুষ, একা মানুষ, আমার ট্যাঁক কিছু আছে; লিভারও ভালো, এটা বাবার কাছ থেকে পেয়েছি- তিনি কোনোদিনও চাও খাননি। ভূদেব মুখুয্যের খাত ঝিল বাবার- ব্রাহ্মসমাজের ছোঁয়াচেও এসেছিলেন- ওদিকে ভিক্টোরিয়ার আমল চলছে; মানুষের মনে আশা ছিল ঢের- চা দিয়ে কী হবে। চা!
সমরেশ চুরুট জ্বালিয়ে বল্লে- তিনি এসে পড়েছেন। আচ্ছা, তাহলে এখন উঠি।
-তিনি এলেনই শেষ পর্য্যন্ত? হুইস্কির বোতলটার দিকে তাকিয়ে বল্লাম আমি।
-হ্যাঁ। তোমাকে আর টানব না। তুমি যাও। বাইরের বড় বড় সব দিলপাশে আরো কয়েকটা বছর পাক কেয়ে এসো। বৈজ্ঞানিক শুভবুদ্ধি, সমাজ, ইতিহাস- এই সবের টনক নিয়ে দেখো কোনো সুরাহা করতে পার নি আজকের দুর্দ্দিনে। আমি তোমাকে বলেছি, নিখিলেশ, পৃথিবীর মঙ্গল হই। সাদা চোখে পৃথিবীটাকে খারাপ দেখলেও এই বোতলের জিনিষ কিছু টেনে নিলে টের পাই কর্ম্মের পথ ছেড়ে আমি যে আজ সিদ্ধপুরুষ হয়েছি, সে তো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখবার জন্য। দেখছি- দেখাচ্ছি প্রথপ্রদর্শক হয়ে রয়েছি- তোমার বুক বেঁধে এগিয়ে চলো। নি-খি-লে-শ!-
সমরেশের ঘরে অনেক রাত অব্দি জেগে থেকে দেখলাম, লোকটা মদ খাচ্ছে- মদই খেয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন- বিষয় নিলেমে চড়েছে- প্রিয়নকে হারিয়েছে কিংবা ওম্নি কোনো গভীর অরুন্তুদ আঢ়াত পেলেছে বলে নয় (কিন্তু আঘাত তবুও আরো গভীরতর)- কিন্তু এম্নিই- হো হো করে হেসে উঠবার জন্যে- আমাকে, তার চাকরকে, বেড়ালটাকেও ধরে চুমো খাবার জন্যে, সমস্ত আকাশ বাতাশ পৃথিবী নক্ষত্রলোকের বিশ্বম্ভর সৌন্দর্য্যে উদ্বেল-উৎসারিত হয়ে উঠবার জন্যে।
তারপর কী ভীষণ নিস্তব্ধতা- কী অন্ধকার- কী অনমনীয় অন্তহীন মরণলুপ্তি। দেশে সমাজ জাতি- এবং ক্রমে-ক্রমে সমস্ত গোটা পৃথিবীরই মঙ্গল কি করে হয়, এ নিয়ে দির রাত মাথা-ঘামাতে ও পরিশ্রম করতে দেখেঠি সমরেশকে আমি। পৈতৃক সম্পত্তি ছিল তাদের- বড় জমিদারী ছিল- সমস্ত সে নিঃশোষিত করে ফেল্ল একটা অসম্ভব সজ্ঞাভাবিত স্বপ্নমঙ্গলের উত্তেজনায়। অনেক পড়াশুনা করল, পাশ করল, কত রকম দেশকল্যাণ ও সমাজ উন্নতির প্রতিষ্ঠান রচনা করল সে, ভাঙল, পুনর্গঠন করল, খাটল, জেলে গেলে, বিপ্লব করল, মানুষও খুন করেছিল হয়তো মানবতাকে কনে-দেখা আলো দেখাবার বদলে উদয়সূর্য্য দেখাবার জন্যে; কিন্তু কিছুই শেষ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি সে।
কেই বা দেখিয়েছে? অরুসূর্যের দেশকে উদররঞ্জিত অনুসূর্য দেখানো কি সহজ। তবুও মানুষ সাহস স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত চেষ্টা করে যায়- মহামানুষ যারা। সমরেশ কি রকম মানুষ ছিল? (জানি না।) সম্প্রতি অনেক দিন পর্য্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলাম না। সে চা খেত না সিগারেট খেত না, বিয়ে যে করবে না তো তো সকলেই জানত, মেয়েমানুষের দিকে ফিরেও তাকাল না কোনোদিন সমরেশ। তার মত সুদৃঢ় সুপুরুষের পক্ষে এই শেষোক্ত জিনিষটা কেমন অসঙ্গত ঠেকত আমার চোখে। সমরেশকে হাত করবার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টায় পরাস্ত হয়ে এক শরীরী নারী নিঃসহায় ভাবে আমার দিতে তাকাতে আমি বিরক্তি বোধ করতাম- কেন, আমার কথা প্রথম বুঝি মনে ছিল না তোমাদের? আমি কি করব? এই সৃষ্টির অন্তর্লীন বিরাট বেকুবির কাছে তোমাদের মত আমাকেও ধর্না দিতে হচ্ছে। সমরেশ আমাদের অতীত; একটি বালিকণার ভিতর সমস্ত সুন্দর সুষম ব্রহ্মাণ্ডকে দেখতে পেয়েছে সে- তারপর অন্য দিকে মুখ ফেরাবার নিদারণ আহ্বান এসে পড়েছে যখন, কেমন উজ্জ্বল নিবিষ্টভাবে তাকিয়ে আছে সে একটি পল-নিপলকণার ভিতর সমন্ত দেশকাল নিজের বুকের রোমের ভেতর ঘুমিয়ে-পড়া সারসের ঠোঁটের মতা ঠাঁই পেয়েছে অনুভব করে। (সংগৃহীত)

জীবনানন্দ দাস
জীবনানন্দ দাস
জীবনানন্দ দাশ (জন্ম: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯, বরিশাল - মৃত্যু: ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪, বঙ্গাব্দ: ৬ ফাল্গুন, ১৩০৫ - ৫ কার্তিক, ১৩৬১) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাংলা কবি। তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম কবিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা গ্রন্থ করেছেন যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি। তাঁর জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধকাল অনপনেয়ভাবে বাংলা কবিতায় তাঁর প্রভাব মুদ্রিত হয়েছে। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসাবে তিনি সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত। জীবন বৃত্তান্ত: শৈশব: জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলাশহর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণা নিবাসী। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৯৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে স্থানান্তরক্রমে বরিশালে নিবাস গাড়েন।সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্যে সমাদৃত ছিলেন।জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত সর্বানন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, তাঁর সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণীর পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান; তার ডাকনাম ছিল মিলু। তার ভাই অশোকানন্দ দাশ ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এবং বোন সুচরিতা দাশ ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কম বয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী ছিলেন ব'লে বাড়িতে মায়ের কাছেই মিলুর বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি ও মায়ের গান শুনতেন। লাজুক স্বভাবের হলেও তার খেলাধুলা, ভ্রমণ ও সাঁতারের অভ্যাস ছিল। ছেলেবেলায় একবার কঠিন অসুখে পড়েন। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্যে মাতা ও মাতামহ হাসির গানের কবি চন্দ্রনাথের সাথে লক্ষ্মৌ, আগ্রা, দিল্লী প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে আট বছরের মিলুকে ব্রজমোহন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তার বাংলা ও ইংরেজিতে রচনার সূচনা হয়, এছাড়াও ছবি আঁকার দিকেও তার ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। দু'বছর পর ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পূর্বের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটান ; অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার উদ্দেশ্যে বরিশাল ত্যাগ করেন। কলকাতা জীবন: প্রথম পর্ব: জীবনানন্দ কলকাতার নামকরা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ. পাশ করেন। ওই বছরেই ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল বর্ষ আবাহন। কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয়নি, কেবল সম্মানসূচক শ্রী কথাটি লেখা ছিল। তবে পত্রিকার বর্ষশেষের নির্ঘণ্ট সূচিতে তার পূর্ণ নাম ছাপা হয়: শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত, বিএ। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বিভাগসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কিছুকাল আইনশাস্ত্রেও অধ্যয়ন করেন। সে সময়ে তিনি হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন।তবে পরীক্ষার ঠিক আগেই তিনি ব্যাসিলারি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন, যা তার প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত করে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন ছেড়ে দেন। সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম: জীবনানন্দের সাহিত্যিক জীবন বিকশিত হতে শুরু করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তার স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, "এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা"। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দেই তার প্রথম প্রবন্ধ স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণ কাব্যসরিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে রয়েছে সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার উপাধি 'দাশগুপ্তের' বদলে কেবল 'দাশ' লিখতে শুরু করেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং আর্থিক অসুবিধায় পড়ে কলেজ তাকেই চাকরিচ্যুত করে। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস| শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না বিধায় কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করতেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়, ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে।বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন ইনশিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন; ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন;- তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত করেন নি। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একগুচ্ছ গীতিকবিতা রচনা করেন যা পরবর্তীতে তার রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ সালে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। বরিশালে প্রত্যাবর্তন: ১৯৩৫ সালে জীবনানন্দ তার পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন কলেজে ফিরে যান, যা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। তিনি সেখানকার ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সে সময়ে কলকাতায় বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সমর সেন একটি আনকোড়া নতুন কবিতাপত্রিকা বের করার তোড়জোড় করছিলেন, যার নাম দেয়া হয় কবিতা। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যাতেই জীবনানন্দের একটি কবিতা স্থান করে নেয়, যার নাম ছিল 'মৃত্যুর আগে'। কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবকে লেখা একটি চিঠিতে মন্তব্য করেন কবিতাটি 'চিত্ররূপময়'। কবিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে (পৌষ ১৩৪২ সংখ্যা; ডিসে ১৯৩৪/জানু ১৯৩৫) তার কিংবদন্তিতুল্য বনলতা সেন কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই ১৮ লাইনের কবিতাটি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। পরের বছর জীবনানন্দের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ এর মধ্যেই বরিশালে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ এর নভেম্বরে তার পুত্র সমরানন্দের জন্ম হয়। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেন, যার নাম ছিল বাংলা কাব্য পরিচয় এবং এতে জীবনানন্দের মৃত্যুর আগে কবিতাটি স্থান পায়। ১৯৩৯ সালে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয় আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হিরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়; এতে জীবনানন্দের চারটি কবিতা - পাখিরা, শকুন, বনলতা সেন এবং নগ্ন নির্জন হাত অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪২ সালে কবির পিতৃবিয়োগ হয় এবং ঐ বছরেই তার তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয়। বইটি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা-ভবন হতে 'এক পয়সায় একটি' সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ষোল। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন জীবনানন্দের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং তার সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের বহু সংখ্যক কবিতা ছাপা হয়। ১৯৪৪ সালে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ মহাপৃথিবী প্রকাশিত হয়। এর আগের তিনটি কাব্যগ্রন্থ তাকে নিজের পয়সায় প্রকাশ করতে হয়েছিল, তবে মহাপৃথিবীর জন্যে প্রকাশক পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশিত এই কবিতাগুচ্ছে যুদ্ধের ছাপ স্পষ্ট। কলকাতা জীবন: চূড়ান্ত পর্ব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান। এর ফলে বাংলা দ্বিখন্ডিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, কারণ এর পূর্ব অংশ ছিল মুসলমান সংখ্যাপ্রধান আর পশ্চিমাংশে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু। ১৯৪৭ এর দেশভাগ পূর্ববর্তী ঐ সময়টিতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিভৎসরূপে দেখা দেয়। জীবনানন্দ সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। কলকাতায় যখন ১৯৪৬ সালে আবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কবি তখন লেখেন ১৯৪৬-৪৭ কবিতাটি। দেশবিভাগের কিছু আগে তিনি বি.এম. কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতায় চলে যান। পরে তিনি আর পূর্ববঙ্গে ফিরে যাননি। কলকাতায় তিনি দৈনিক স্বরাজ পত্রিকার রোববারের সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনা করেন কয়েক মাস। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দে তিনি দু'টি উপন্যাস লিখেছিলেন - মাল্যবান ও সুতীর্থ, তবে আগেরগুলোর মতো ও দুটিও প্রকাশ করেননি। এ বছরের ডিসেম্বরে তাঁর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হয়। একই মাসে কলকাতায় তার মাতা কুসুমকুমারী দাশের জীবনাবসান ঘটে। ইতোমধ্যেই জীবনানন্দ কলকাতার সাহিত্যিক সমাজে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তিনি 'সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র' নামে একটি সংস্থার সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এই সংস্থার মুখপত্র দ্বন্দ্ব পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক নিযুক্ত হন। মাঝে তিনি কিছুকাল খড়গপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫২ খৃস্টাব্দে তাঁর জনপ্রিয় কবিতার বই বনলতা সেন সিগনেট প্রেস কর্তৃক পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকানুকূল্য লাভ করে এবং নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন-কর্তৃক ঘোষিত "রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার" জয় করে। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বইটি ১৯৫৫ খৃস্টাব্দে ভারত সরকারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। কর্মজীবন: অধ্যাপনার কাজে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ও সমাপ্তি। এমএ পাসের পর কলকাতায় কলেজের বোর্ডিংয়ে থাকার প্রয়োজন হলে তিনি আইন পড়া শুরু করেন। এ সময় তিনি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯২৮-এ সরস্বতী পূজা নিয়ে গোলযোগ শুরু হলে অন্যান্য কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও ছাঁটাই করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। জীবনের শেষভাগে কিছুদিনের জন্য কলকাতার একটি দৈনিক পত্রিকা স্বরাজ-এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনায় নিযুক্ত ছিলেন। অধ্যাপনা করেছেন বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যার মধ্যে আছে সিটি কলেজ, কলকাতা (১৯২২-১৯২৮), বাগেরহাট কলেজ, খুলনা (১৯২৯); রামযশ কলেজ, দিল্লী (১৯৩০-১৯৩১), ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৮), খড়গপুর কলেজ (১৯৫১-১৯৫২), বড়িশা কলেজ (অধুনা 'বিবেকানন্দ কলেজ', কলকাতা) (১৯৫৩) এবং হাওড়া গার্লস কলেজ, কলকাতা, (১৯৫৩-১৯৫৪)। তার কর্মজীবন আদৌ মসৃণ ছিল না। চাকুরী তথা জীবিকার অভাব তাকে আমৃত্যু কষ্ট দিয়েছে। একটি চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। স্ত্রী লাবণ্য দাশ স্কুলে শিক্ষকতা করে জীবিকার অভাব কিছুটা পুষিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে অকাল মৃত্যুর সময় তিনি হাওড়া গার্লস কলেজ কর্মরত ছিলেন। দুই দফা দীর্ঘ বেকার জীবনে তিনি ইন্সুরেন্স কোম্পানীর এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন এবং প্রধানত গৃহশিক্ষকতা করে সংসার চালিয়েছেন। এছাড়া ব্যবসার চেষ্টাও করেছিলেন বছরখানেক। দারিদ্র্য এবং অনটন ছিল তার কর্মজীবনের ছায়াসঙ্গী। সাহিত্যিক জীবন: সম্ভবতঃ মা কুসুমকুমারী দেবীর প্রভাবেই ছেলেবেলায় পদ্য লিখতে শুরু করেন তিনি। ১৯১৯ সালে তাঁর লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা। কবিতাটির নাম বর্ষা আবাহন। এটি ব্রহ্মবাদী পত্রিকার ১৩২৬ সনের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি জীবনানন্দ দাশ নামে লিখতে শুরু করেন। ১৬ জুন ১৯২৫ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর লোকান্তর হলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা বংগবাণী পত্রিকার ১৩৩২ সনের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তবে দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত কল্লোল পত্রিকায় ১৩৩২ (১৯২৬ খ্রি.) ফাল্গুন সংখ্যায় তাঁর নীলিমা শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হলে আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে তার অন্নপ্রাশন হয়। জীবদ্দশায় তাঁর ৭টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত ঝরাপালক শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রকৃত কবিত্বশক্তি ফুটে ওঠেনি, বরং এতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রকট প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়। তবে দ্রুত তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ ব্যবধানে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্য সংকলন ধূসর পান্ডুলিপি-তে তাঁর স্বকীয় কাব্য কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের ভূবনে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শেষের দিককার কবিতায় অর্থনির্মলতার অভাব ছিল। সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অপমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেই স্বীয় রচনার অর্থায়ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যদিও শেষাবধি তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশী কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। এমনকি রূপসী বাংলার সম্পূর্ণ প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি তোড়ঙ্গে মজুদ থাকলেও তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি জীবনানন্দ দাশ। তবে তিনি এ কাব্যগ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা যা তার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত এবং রূপসী বাংলা প্রচ্ছদনামে প্রকাশিত হয়। আরেকটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় মৃত্যু পরবর্তীকালে যা বেলা অবেলা কালবেলা নামে প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় তার একমাত্র পরিচয় ছিল কবি। অর্থের প্রয়োজনে তিনি কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া ষাট-পয়ষট্টিরও বেশী খাতায় "লিটেরেরী নোটস" লিখেছিলেন যার অধিকাংশ এখনও (২০০৯) প্রকাশিত হয়নি। স্বীকৃতি ও সমালোচনা: জীবদ্দশায় অসাধারণ কবি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি খ্যাতি অর্জন করে উঠতে পারেননি। এর জন্য তার প্রচারবিমুখতাও দায়ী; তিনি ছিলেন বিবরবাসী মানুষ। তবে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতার পথিকৃতদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবন এবং কবিতার উপর প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, বাংলা ভাষায়। এর বাইরে ইংরেজিতে তার ওপর লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি, আ পোয়েট আর্পাট‌‌ নামের একটি গ্রন্থে। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিনি যদিও কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঁর যে বিপুল পাণ্ডুলিপিরাশি উদ্ঘাটিত হয়েছে তার মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং গল্পের সংখ্যা শতাধিক। পুরস্কার: নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন ১৯৫২ খৃস্টাব্দে পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার লাভ করে। মৃত্যু: শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল, কলকাতা। ১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দূর্ঘটনায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়। গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে।তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি। এ সময় স্ত্রী লাবণ্য দাশকে কদাচিৎ কাছে দেখা যায়। তিনি টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশঃ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। আবদুল মান্নান সৈয়দ-সহ কেউ কেউ ধারণা করেছেন হয় আত্মহত্যা স্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ। জীবনানন্দ গবেষক ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কবির মাথায় দানা বেঁধেছিল। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। গত এক শত বৎসরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কোলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে এ সময় দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন কবি। আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে গৃহে ফেরার সড়কে ওঠার জন্য ট্রাম লাইন পারি দেয়া খুব গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়।