আমি দশবার আফ্রিকা গেলেও একটা চাঁদের পাহাড় লিখতে পারব না

অরুণাভ রাহারায় : শৈশবের দিনগুলোর কথা কিছু বলুন।
বুদ্ধদেব গুহ : ছোটবেলা কেটেছিল দক্ষিণ কলকাতার লেকমার্কেট এলাকায়। রাসবিহারীর কাছে। আমার বড় মামা ছিলেন খুব নামকরা কবি সুনির্মল বসু। মামাবাড়ির সবাই ছিলেন গুণী- কেউ বেহালা বাজাতেন, কেউ গান গাইতেন, আমার মাও খুব ভালো কবিতা লিখতেন। ছোটবেলার দিনগুলো এসবের মধ্যেই কেটেছিল।
অরুণাভ রাহারায়: লেখালেখিতে এলেন কীভাবে?
বুদ্ধদেব গুহ : মামাবাড়িতে যখন যেতাম, বড় মামার লেখার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। টেবিলে ছড়িয়ে থাকত নানা রকমের কলম, বইপত্র। পাকানো প্রুফ। এসব দেখে সেই ছোটবেলাতেই লেখক হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল। প্রথম জীবনে কবিতা লিখতাম, কবিতার বইও বেরিয়েছে। নাম- যখন বৃষ্টি নামলো। এখনও আমাকে অনেকে বলেন- আপনার অনেক গদ্যই কবিতার মতোন। এটা অবশ্য গদ্যকারের পক্ষে খুব প্রশংসার কথা নয়। গদ্য আর কবিতা আলাদাই হওয়া উচিত।
অরুণাভ রাহারায় : জঙ্গল আপনার প্রিয় বিষয়। প্রথম বইয়ের নামও রেখেছিলেন জঙ্গলমহল
বুদ্ধদেব গুহ : জঙ্গলে তো যাচ্ছি ১০ বছর বয়স থেকে। বাবার হাত ধরেই প্রথম জঙ্গলে যাওয়া। মা বারণ করতেন, বাঘ খেয়ে নেবে বলে। বইটা উৎসর্গ করেছিলাম বাবা আর মাকে। বাবা আর মার জন্যই প্রথম জঙ্গলে যেতে পেরেছিলাম। এই বইয়ের বেশিরভাগ গল্পই প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজারের ববিবাসরীয়তে। সেই গল্পগুলোকে একসঙ্গে জঙ্গলমহল নাম দিয়ে বের করেছিলাম।
অরুণাভ রাহারায়: আপনি তো প্রপার সাহিত্য লিখতে চেয়েছিলেন, তবু প্রথম জীবনে শিকারই হয়ে উঠেছিল আপনার লেখার প্রধান বিষয়…
বুদ্ধদেব গুহ : আসলে রমাপদ চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন আপনি শিকার নিয়েই লিখুন, লোকে ভালো বলছে। আগে সবাই নামটা জানুক। পরে না হয় অন্য বিষয়ে চলে যাবেন। ফলে প্রপার সাহিত্য লিখতে চাইলেও, বছর দুয়েক শিকারের পটভূমিতে নানা গল্প লিখেছি। প্রেমের গল্পও ছিল। মজার গল্পও ছিল। কিন্তু মূল উপজীব্য সেই শিকার। একটা মজার ঘটনা বলি, একবার সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে ফোন করে বললেন, শিকারি বুদ্ধদেব গুহ কথা বলছেন? আমি তো শুনে অবাক! বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই, অদ্য সয়ে ব-ফলা, দীর্ঘ ইকার (হাসি)।
অরুণাভ রাহারায় : তারপর কীভাবে অন্য বিষয়ে গেলেন?
বুদ্ধদেব গুহ : তখন আনন্দবাজারের দোল সংখ্যা বেরোত। সেই সংখ্যার জন্য রমাপদ চৌধুরী আমাকে একটা বড় গল্প লিখতে বললেন। তখন লিখলাম হলুদ বসন্ত। খুব সাড়া পড়ে গেল। সন্তোষকুমার ঘোষ রাত্রি দেড়টার সময় ফোন করে ভালোলাগার কথা জানালেন। বললেন, আপনি রমাপদ বাবুর কাছে আসেন, আমার কাছে কখনও আসেন না। একদিন আসবেন। সবার ভালোলাগার জন্য হলুদ বসন্ত আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বের হল। তারপর আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। রমাপদ চৌধুরী আমাকে ডেকে বললেন, আপনাকে এতদিন চেপে রেখেছিলাম। আপনি যে এত ভালো লিখবেন আমার ধারণা ছিল না। আনন্দবাজারের পুজো সংখ্যার জন্য তিনি আমার কাছে লেখা চাইলেন।
অরুণাভ রাহারায় : হলুদ বসন্ত আপনাকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিল।
বুদ্ধদেব গুহ : হ্যাঁ। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম হলুদ বসন্ত বেরোনোর পর সত্যিই লেখক হয়ে গেলাম। পর পর লিখলাম খেলা যখন- গানবাজনা নিয়ে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ নিয়ে। তারপর নগ্ন নির্জন, বাতিঘর ইত্যাদি পাঠকমহলে সমাদৃত হল। কোয়েলের কাছে লিখলাম। নিজের হাতে ৫/৬ বার কপি করেছিলাম, বর্ষার চ্যাপ্টার বর্ষাকালে লিখেছি, গ্রীষ্মর চ্যাপ্টার গ্রীষ্মকালে লিখেছি- এত সিনসিয়র ছিলাম। কোয়েলের কাছে লিখে রমাপদ বাবুকে দিলাম। কিন্তু রবিবাসরীয়তে ধারাবাহিকভাবে বেরোল না। স্ক্রিপ্টটা রবিবাসরীয়র আলমারির মাথায় অযত্নে পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন পড়েছিল। অন্যদিকে অমৃত নামের পত্রিকাটি জন্মাল। আমার এক মক্কেল মনীশ বসু, তার ছেলে ময়ুখ বসু- আমার ভাইয়ে বন্ধু, ও এসে বলল- দাদা একটা নতুন কাগজ বেরোচ্ছে মনীন্দ্র রায় সম্পাদক। আপনি যদি কোয়েলের কাছে লেখাটা এই কাগজে দেন, ওটা তো পড়ে রয়েছে। আমি বললাম নাও, কোয়েলের কাছে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হল অমৃত সাপ্তাহিকে। সেটা পড়ে গজেন মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বনফুল প্রমুখ দিকপাল সাহিত্যিকরা প্রশংসা করলেন। ব্যাস, আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
অরুণাভ রাহারায় : কোয়েলের কাছের পর লিখলেন একটু উষ্ণতার জন্য। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মহলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে গেলেন।
বুদ্ধদেব গুহ : একটু উষ্ণতার জন্য এখনও বেস্ট সেলার। মনে আছে উপন্যাসটা পড়ে স্বয়ং রমাপদ চৌধুরী খুব প্রশংসা করেছিলেন। ভগবানের আশীর্বাদে আমি জনপ্রিয়তা পেলাম। আসলে কি জানো, লাকও একটা বড় ফ্যাক্টর। আমার চেয়ে অনেক পাওয়ারফুল লেখক, একই সময় লেখা আরম্ভ করেছি হয়তো, তাদের অনেরেকই জনপ্রিয়তা জোটেনি। এটা ভেবে আমার খারাপ লাগে।
অরুণাভ রাহারায় : এ তো গেল পাঠকদের কথা। আপনার সমসাময়িক লেখকরা কতটা প্রশংসা করতেন?
বুদ্ধদেব গুহ : সমসাময়িক লেখকরা কেউ আমার লেখার প্রশংসা করেনি। সুনীল (গঙ্গোপাধ্যায়) মাঝে মাঝে বলত কোয়েলের কাছে খুব ভালো হয়েছে। আমি সবারই প্রশংসা করতাম। আমি নিজের প্রফেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। যেহেতু আমার অফিস আনন্দবাজারের অফিসের কাছে। তাই লাঞ্চের পরে একটু রমাপদ বাবুর কাছে যেতাম- অন্য পরিবেশ, সাহিত্যের কথাবার্তা হতো। আমার অফিসে মারোয়ারিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। আনন্দবাজারে অফিসেই অন্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। সুনীল লেখা দিতে আসত, শক্তি লেখা দিতে আসত, মাধুকরী তিনটে চ্যাপ্টার লিখে নিয়ে গেলাম সুনীলের বাড়িতে একদিন। সুনীল দেখে বলল- এটা কিছুই হয়নি, ফেলে দাও,। মাধুকরী ফেলে দিতে বলল। পরবর্তী সময়ে পাঠকমহলে মাধুকরী ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তো মাধুকরী দেশে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করল। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ একদিন ডেকে বললেন- উপন্যাসটা কবে শেষ করছো? আমি তো শুনে থঃ। বললাম- এখনও চরিত্রই এল না, আর আপনি শেষ কবে হবে জানতে চাইছেন! এ ঘটনার পর আমারও জেদ চেপে গেল, অফিস কামাই করে, ভদকা খেতে খেতে, কাঁদতে কাঁদতে উপন্যাসটার চ্যাপ্টার লিখতাম। আমার সমসাময়িক লেখকরা আমার লেখা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি। পাঠক আমার লেখা গ্রহণ করেছে, এটাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
অরুণাভ রাহারায় : শোনা যায় আপনার শিকারের হাত খুব ভালো ছিল…
বুদ্ধদেব গুহ : হ্যাঁ, আমি বন্দুক চালাতাম আর গুলি গিয়ে লাগত বাঘের কপালের ঠিক মাঝখানে। বাবা আমাকে সাবাস বলত। একসময় প্রচুর শিকার করেছি। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে কত পাখি যে মেরেছি। এই বৃদ্ধ বয়সে সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে অনুতাপ হয়। ১৯৭২-এ শিকার বেআইনি হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি আর বন্দুক-রাইফেলে হাত দিইনি। শিকারের অনেক ভালো দিক আছে। এই যে অজন্তা, ইলোরা, তারপর নৈনিতালের লেক- সবই তো শিকারিদের আবিষ্কার। শিকারি ছাড়া কে ওইসব দুর্গম জায়গার যাবে? আদিবাসীদের নিয়ে যে আমার এত লেখা, শিকারে না গেলে তাদের সঙ্গে মিশতে পারতাম নাকি! শিকারে গিয়ে তাদের সঙ্গে মিশেছি, কলকাতায় ফিরে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করেছি, তারপর মোটা মোটা উপন্যাস লিখতে পেরেছি।
অরুণাভ রাহারায় : জঙ্গল আপনার প্রিয় বিষয়। বিভূতিভূষণও অরণ্যপ্রেমী ছিলেন…
বুদ্ধদেব গুহ : বিভূতিভূষণের সঙ্গে আমার একটু তফাৎ আছে, উনি প্রকৃতিকে দেখেছিলেন একজন রোমান্টিকের চোখে। আমি দেখেছি অন্যভাবে। লেখক হিসেবে ওর সঙ্গে আমার কোনো তুলনা হয় না। কারণ তিনি অনেক উঁচুমানের লেখক। আমি আফ্রিকা গিয়েছি। কিন্তু বিভূতিভূষণ আফ্রিকা না গিয়েও চাঁদের পাহাড় লিখেছিলেন, তার কল্পনাশক্তি এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল। আমি দশবার আফ্রিকা গেলেও একটা চাঁদের পাহাড় লিখতে পারব না।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ছোট ছোট ভুলগুলো

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সেতুবন্ধন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...