কবিতা

সাড়ে তিন হাত ভূমি

১১

আর আমি!
মা, আমি!
আমি বারবার ফিরে আসতে চেয়েছি তোমার কাছে। বাবাকে যেমন ভালোবাসি আমি, তোমাকে কি তার চেয়ে কম ভালোবাসি!
না মা, না।
একদম না। একদম না।
তোমাদের দুজনার জন্যই আমার ভালোবাসা এক রকম। ছোটবেলায় হয়তো আমার আচরণে, বাবার জন্য অস্থিরতা দেখে তোমার মনে হয়েছে আমি আমার বাবার জন্য পাগল, তাঁকেই বেশি ভালোবাসি। তোমার জন্য টান কম।
না মা, না।
সেই যে মায়ের আত্মার গল্পটা তুমি বলেছিলে, সেদিন থেকে আমি তোমার জন্য ভিতরে ভিতরে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার কোলে সেই যে মুখ রেখে কেঁদেছিলাম সেই কান্নাটা তোমার কাছ থেকে দূরে গেলেই আমার বুক ঠেলে উঠতো। মুন্সীগঞ্জে পরীক্ষা দিতে গিয়ে উঠেছে। ঢাকায় থাকার সময় উঠেছে, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়ার সময় উঠেছে। তোমাকে আর আমার দেশকে আমি একাকার করে ফেলেছি। দেশের জন্য যুদ্ধ করা মানে আমার মায়ের জন্য যুদ্ধ করা। মায়ের মুখের হাসির জন্য যুদ্ধ করা।
আমার চোখজুড়ে তুমি, মা।
আমার হৃদয়জুড়ে তুমি।
তুমি আর বাবা। বকুল আর মায়া। আর মায়ার গর্ভে আমার সন্তান। এই কজন মানুষ নিয়েই তো আমি!
একটা সময়ে এ রকম ভাবনাই ছিল মা। মুক্তিযুদ্ধ এই ভাবনা বদলে দিল। মা, শুধু এই পাঁচজন মানুষই আমার না, দেশের প্রতিটি মানুষ আমার। শুধু আমার মায়ের মুখের হাসির জন্য আমি যুদ্ধ করছি না, আমি যুদ্ধ করছি দেশের প্রত্যেক মায়ের জন্য, প্রত্যেক বাবার জন্য। দেশের প্রতিটি বোনের জন্য। শুধুই আমার স্ত্রী আর সন্তানের জন্য না, সব সন্তানের জন্য, প্রত্যেক স্বামী এবং স্ত্রীর জন্য। সাত কোটি মানুষের জন্য।
আমার মা দেশের প্রত্যেক মায়ের প্রতীক।
আমার বাবা দেশের প্রত্যেক বাবার প্রতীক।
বকুল হচ্ছে দেশের প্রতিটি বোনের প্রতীক।
মায়া স্ত্রীর প্রতীক।
আর আমার ছেলে, যার শরীর এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি সে হবে অনাগত সব সন্তানের প্রতীক।
দেশের বুড়ো মানুষরা, শিশু-কিশোররা, সব মানুষ আমার। আমি তাদের সবার জন্য যুদ্ধ করবো। যুদ্ধ জয় করবো, দেশ স্বাধীন করবো।
কিন্তু আমার যুদ্ধ শুরুর আগেই তুমি চলে গেলে মা। বাবা, বকুল, মায়া আর মায়ার গর্ভে আমার সন্তান কাউকে ওরা বাঁচতে দিল না।
এই দুঃখ নিয়ে আমি বাঁচবো কেমন করে?
যুদ্ধ করবো কেমন করে?
আমি বোধ হয় একটু দুর্বল হয়ে যাচ্ছি মা। বেশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
না, না দুর্বল আমি হতে পারি না।
যোদ্ধাদের দুর্বল হতে নেই।
একদম দুর্বল হতে নেই। যোদ্ধারা সব রকমের পরিস্থিতির জন্য তৈরি। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনই তো তাদের কাছে তুচ্ছ।
না, না দুর্বল আমি হতে পারি না।
বারেকের কথা বলি। এবার বারেকের কথা বলি। এক মা এবং ছেলের কথা বলি।
মোসলেম মিয়ার নৌকায় চড়ে বারেক পাড়ি দিল অন্য এক জগতে। দশ বছরের বালকটির বুক ভরা অভিমান। মা তাকে মারলো কেন? ওই অভিমান নিয়ে অচেনা মানুষের সঙ্গে অজানা গন্তব্যে রওনা দিল বারেক।
একের পর এক মিথ্যা কথা বলে মোসলেম মিয়ার মন গলিয়ে ফেলেছিল সে। নারায়ণপুরে মোসলেম মিয়ার বাড়িতে এসে তাঁর স্ত্রী আর বিধবা বোনের মনও গলিয়ে ফেলল। বাড়ির বাইরের দিকে একটা একচালা টিনের ঘর। সেই ঘরে দুখানা সেলাই মেশিন নিয়ে শিশু-কিশোরদের জামাকাপড় তৈরি করে দুজন দর্জি। মধ্যবয়সী মানুষ। ওই গ্রামেরই লোক। মোসলেম মিয়া মাসিক বেতনে তাদের রেখেছে। একজনের নাম হাতেম, আরেকজন গাজী।
কী আশ্চর্য মা, দেখো, কোথাকার কোন হাতেম আর গাজী এইসব নামও আমার মনে আছে। কত আগে বারেকের মুখে শোনা নাম, তাও ভুলিনি।
কেন ভুলিনি মা?
স্মৃতি এত প্রখর হয়ে গেছে কেন?
আবার ভুলেও যাচ্ছি কোনও কোনও ঘটনা।
পরিস্থিতি মানুষকে সত্যি খুব বিচিত্র করে তোলে। মোসলেম মিয়ার বেতনভুক্ত দর্জি হাতেম আর গাজীর নাম যেমন মনে আছে, মাঝি দুজনের নামও মনে আছে। একজনের নাম বদর, আরেকজন হচ্ছে কাদের।
কারণ আছে মা, সবার নাম মনে থাকার কারণ আছে। মানুষগুলো তো আমার দেশের! দেশের মানুষের নাম আমার মনে থাকবে না কেন? আমি কেন ভুলে যাবো আমার দেশের মানুষের নাম!
আমার মা-বাবার নাম কি আমি ভুলে যেতে পারি?
বকুল বা মায়ার নাম ভুলে যেতে পারি!
সেই সন্ধ্যায় বারেক বলল, নৌকায় চড়নের পর থিকা তিনারে আমি খালুজান ডাকতে শুরু করছি। মাঝি দুইজনরে ডাকি ভাই। বাড়িতে আইসা তিনার স্ত্রীরে ডাকলাম খালাম্মা, বিধবা বইনরে ডাকি ফুবুম্মা। আর দর্জি দুইজনরে ডাকি মিয়াভাই। এক দিনেই বাড়ির বেবাক মানুষ আমার আপন হইয়া গেল।
দেখি, আরে এই বাড়ির বেবাক মানুষই তো ভালো। বেবাকতেই আমারে আদর করে। বোঝলাম বাড়ির কর্তা যদি ভাল মানুষ হয়, তাইলে অন্যরাও তার দেখাদেখি ভাল মানুষ হইয়া যায়। খারাপ মানুষও ভাল মানুষের লগে থাইকা ভাল হয়।
তয় খালুজান পরহেজগার মানুষ। তাঁর বাড়ির মানুষরাও পরহেজগার। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে সবাই। নামাজের ওয়াক্ত হইলে অজু কইরা আজান দেন খালুজান। কারখানা ঘরে মাদুর বিছাইয়া হাতেম আর গাজীরে নিয়া নামাজ পড়েন। ভিতর ঘরে নামাজ পড়েন খালাম্মা আর ফুবুআম্মা।
আমারে নিয়া বাড়িতে আসার পরই খালুজানে খালাম্মা, ফুবুআম্মারে বললেন, এইবার আমি বাড়িতে থাকুম মাসখানেক।
খালাম্মা বললেন, এত দিন থাকবেন?
হ। মোবারকরে মানুষ করতে হইবো।
মোবারক নামটা শুনে আমরা চমকালাম। অন্য কেউ কথা বলবার আগেই পারুল বলল, মোবারক কেডা?
বারেক হাসল। এই নামটা কইতে ভুইলা গেছিলাম। খালুজানে হাটে বইসাই আমার নাম জিজ্ঞাসা করছিলেন। সত্য নামটাও আমি কই নাই। বারেক নামটারে বানাইয়া কইছি মোবারক।
কদম বলল, ওই বয়সে এত পাকনা তুই পাকছিলি!
মা, তুমি বললে, আইচ্ছা ক, তারপর কী হইল?
খালুজানের কথা শুইনা খালাম্মায় হাসলেন। এক মাসের মইধ্যে এইটুকু একটা পোলারে মানুষ বানাইয়া ফালাইবেন?
হ বানামু।
ফুবুম্মা বললেন, কেমনে বানাইবেন মিয়াভাই?
দেখ কেমনে বানাই।
পরদিন থিকা খালুজানে আমারে দোয়া-দরুদ মুখস্থ করাইতে লাগলেন। কায়দা, সিপারা পড়াইতে লাগলেন, আদর্শলিপি পড়াইতে লাগলেন।
আমি বললাম, পড়ালেখার জন্য বুয়া তোকে মারলো আর তুই মোসলেম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে পড়ালেখা করতে শুরু করলি?
হ করলাম।
বকুল বলল, কেন?
খালুজানে এত মায়া কইরা, এত আদর কইরা সুরা মুখস্থ করাইতেন, এত আদর কইরা পড়াইতেন, সিলেট-পেনসিল দিয়া লেখাইতেন, কী কমু আপনেগো। ভুল করলে একটুও রাগ করেন না। হাসেন। হাসিমুখে আবার পড়ান। রাগ বলতে কিছু নাই মানুষটার।
এক মাসের মইধ্যে আমি অজু কইরা আজান দেই। খালুজানের লগে ফজরের নামাজ পড়ি। অন্য ওয়াক্তের নামাজে মিয়াভাইরাও থাকে। এক গেরামের মানুষ। সকাল দশটার দিকে কাজে আসে, যায় রাত্র নয়টার দিকে। দুপুরে খালুজানের বাড়িতে খায়, রাত্রে খায়।
খালুজানের অবস্থা বেশ ভাল। বাড়িটা বড়। চকে ফসলের জমি ম্যালা। ধান যা পায়, বছরেরটা তো চলেই, বিক্রি করেন অনেক। আর লগে আছে কাপড়ের ব্যবসা।
ওই বাড়িতে থাকতে থাকতে, খালুজানের লগে থাকতে থাকতে দেখি আমি কেমুন জানি বদলাইয়া যাইতাছি। নামাজ পড়তে ভাল লাগে, লেখাপড়া করতে ভাল লাগে। স্বভাবটাই আমার বদলাইয়া যাইতাছে।
মা, তুমি বললে, তোর মার কথা মনে হইতো না?
হইতো। কিন্তু মার ওপরের রাগটা কমতো না। যখনই মনে হইতো, মনে মনে কইতাম, তোমার কাছে আর কোনও দিন ফিরত আসুম না। দুনিয়াতে আমার মা-বাপ কেউ নাই। খালুজানেই আমার বাপ, খালাম্মাই আমার মা। আমি আর কেউরে চিনি না।
আইচ্ছা ক, তারপর?
মাসখানেক পর আবার নৌকা নিয়া বাইর হইলো খালুজানে। লগে আমি আছি। আমারে লইয়া হাটে হাটে যান তিনায়। দোকানদারি করেন। নামাজের সময় আগে তিনায় নামাজ পড়েন, আমি দোকান চালাই। তার বাদে তিনায় আইসা বসেন, আমি নামাজে যাই।
তয় এত বিশ্বাস তিনায় আমারে করেন, আমিও তার বিশ্বাসের বরখেলাপ করি না। টাকা-পয়সার প্রতি আমার কোনও লোভ নাই। ওই যে কইলাম আমি অন্যমানুষ হইয়া গেছি। ভিতরে ভিতরে বদলাইয়া গেছি।
বকুল বলল, আমাদের কাঞ্চনপুর বাজারে আসতি, কিন্তু এই বাড়িতে আসতি না কেন?
না না, কাঞ্চনপুর বাজারে আর কোনও দিন আসি নাই।
তাই নাকি?
হ। তিনায়ই আর এইদিকে আসেন নাই।
কেন?
এইদিকে আসলে পুরান দিনের কথা মনে হইতে পারে আমার। মন খারাপ হইতে পারে। কোনও বাড়িতে যাইতে ইচ্ছা করতে পারে, এই জন্য।
বুঝেছি।
মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর এলাকায় আমরা আসতাম। শ্রীনগর, গোয়ালিমান্দ্রা, ভাগ্যকূল, ষোলঘর ওই সব দিকে। এই দিকে আসতাম না। তবে ওই জীবনটা আমার বহুত ভাল লাইগা গেল। কিছুদিন বাড়িতে, কিছুদিন নৌকায় করে হাটে-বাজারে। নৌকায় যখন থাকি খালুজানে সকালবেলা, সন্ধ্যাবেলা আমারে আরবি পড়ান, বাংলা পড়ান। সকালবেলার আলোয় আরবি পড়া শিখি, সন্ধ্যাবেলা হারিকেনের আলোয় শিখি বাংলা পড়া। দিনে দিনে দিন গেল। আমি কোরান শরিফ পড়তে শিখলাম। ফজরের নামাজ পইড়া কোরান তেলাওয়াত করি। আর দিনে-রাইত্রে যখন সময় পাই হাদিস পড়ি, ইসলামী বই পড়ি। হাটবাজারে গেলেই এই সব বই কিনা আনি।
তখন মাঝে মাঝে মার কথা মনে হইতো।
কোরান-হাদিসে মায়ের কথা এমনভাবে লেখা, পড়ি আর বুকটা মোচড়ায়। মনে হয়, আমার মায় কি বাঁইচা আছে, নাকি আমার শোকে মইরা গেছে!
কিছুদিন ধইরা এই সব কথা খুব মনে হয়। যখন মনে হয় তখনই বুক ফাইটা কান্দন আসে। রাত্রে গোপনে গোপনে কান্দি। মারে স্বপ্নে দেইখা দেইখা কান্দি।
খালুজানে বুড়া হইছেন। আগের মতন কাজকাম করতে পারেন না। নৌকার জীবন তাঁর আর ভালো লাগে না। নারায়ণপুর বাজারে দোকান দিলেন। ওই কাটা কাপড়ের দোকান। দোকান চালাই আমি। মাঝে মাঝে তিনি বসেন। দোকান বন্ধ কইরা রাত আটটার দিকে আমি বাড়ি ফিরা আসি। আমার আলাদা ঘর হইছে। রাত্রে খাওয়াদাওয়া শেষ কইরা আমি আমার ঘরে হারিকেন জ্বালাইয়া ইসলামী বই পড়ি। বুখারি শরিফ পড়ি।
একদিন নবীজির সাহাবা আলকামার ঘটনা পড়তাছি। পড়তে পড়তে মনে পড়ছে আমার মার কথা। নিজে টের পাই নাই, চোখের পানিতে গাল ভাসতাছে। তখন কী কাজে খালুজানে আসছেন আমার ঘরে। দরজা খোলাই আছিল। আমারে কানতে দেইখা চমকাইলেন। কী হইছে রে বাজান, কান্দছ ক্যান?
নবীজির সাহাবা আর তাঁর মার কথা পইড়া কানতাছি, মনে পড়ছে নিজের মায়ের কথা। এই অবস্থায় মিছা কথা বলি কেমনে।
সত্য কথাই বললাম।
পারুল বলল, কী কইলি?
কইলাম আলকামার আর তার মার ঘটনা পইড়া নিজের মার কথা মনে পড়ছে খালুজান। মা-বাপ লইয়া আমি আপনের লগে মিছা কথা কইছি।
কী? কী কইলি তুই?
হ।
খালুজানে আমার বিছানায় বসলেন। আমার কান্দে হাত দিলেন। সব আমারে খুইলা ক।
আমি কানতে কানতে তাঁরে সব কইলাম। শুইনা তিনায় আমারে বললেন, এইটা তুই কী করছস বাজান? এইটা তুই কী করছস? মারে এমুন কষ্ট দিছস? কাইলই তুই যা। তোর মার খবর ল। তিনায় বাঁইচা থাকলে তাঁর পাও ধইরা মাফ চা। মায়ে মাফ না করলে তোর জায়গা হইবো জাহান্নামে। যা বাজান যা, কাইল বিয়ানেই রওনা দে।
পরদিন আমি রওনা দিলাম। এই বাড়িতে আসতে দেড় দিন লাইগা গেল। নারায়ণপুর থিকা আইলাম মতলব। মতলব থিকা চাঁদপুর, চাঁদপুর থিকা মুন্সীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ থিকা কাঞ্চনপুর।
বারেক একটু থামলো। তারপর কাঁদতে লাগল। কিন্তু আইসা আমার কী লাভ হইল। মায় তো আমারে মাফ করলো না। মায় তো আমারে বুকে টাইনা নিল না। মার কাছে আমি মরা। ঠিক আছে আমি আমার মার কাছে এগারো বছর আগে মইরা যাওয়া পোলাই থাকলাম। কাইল বিয়ানে চইলা যামু, আমার এই মুখ আমার মায় আর কোনও দিন দেখবো না।
তখন, তোমার মনে আছে মা, তখন, আমরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুয়া ঠাস করে বারেকের গালে একটা চড় মারলো। এত জোরে মারলো, আমরা চমকে উঠলাম। কেউ কিছু বলার আগেই দেখি বুয়া দুহাতে বারেকের মাথাটা জড়িয়ে ধরেছে বুকে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, এত পাষাণ তুই হইলি কেমনে? এত কষ্ট আমারে তুই দিলি কেমনে? এগারোটা বছর তোর লেইগা আমি কত কান্দন কানছি, তুই জানচ? একটা রাতইও আমি ঘুমাইতে পারি নাই। খালি তোর কথা মনে হইছে। পেটের পোলা হইয়া আমারে তুই এত কষ্ট দিলি।
বুয়াকে জড়িয়ে ধরে বারেকও তখন হাউমাউ করে কাঁদছে। আমারে তুমি মাফ কইরা দেও মা। আমারে তুমি মাফ কইরা দেও। [চলবে]

ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন (জন্ম সেপ্টেম্বর ৮, ১৯৫৫) বাংলাদেশের একজন কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। তিনি গল্প, উপন্যাস এবং নাটক এই তিন শাখাতেই জনপ্রিয় রচনা উপহার দিয়েছেন। কিশোর বাংলা নামীয় পত্রিকায় শিশুতোষ গল্প লিখে তার সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৭ খৃস্টাব্দে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় '‍সজনী‌'‍ নামীয় একটি ছোট গল্প লিখে পাঠকের দৃষ্টি আর্কষণ করতে শুরু করেন। জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম গিয়াসুদ্দিন খান এবং মার নাম আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৭২ সালে পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৭৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকেই স্নাতক (সম্মান) সম্পূর্ণ করেন। কর্মজীবনঃ ইমদাদুল হক মিলন লেখক হিসেবে এপার-ওপার দুই বাংলায়ই তুমুল জনপ্রিয়। দুই বাংলায়ই তার 'নূরজাহান' উপন্যাসটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কন্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। সাহিত্যকৃতিঃ তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২ শত। অধিবাস, পরাধীনতা, কালাকাল, বাঁকাজল, নিরন্নের কাল, পরবাস, কালোঘোড়া, মাটি ও মানুষের উপাখ্যান, পর, কেমন আছ, সবুজপাতা, জীবনপুর প্রভৃতি তার বিখ্যাত বই। নাটকঃ তার লেখা দেড়শতাধিক নাটকের মধ্যে কোন কাননের ফুল, বারো রকম মানুষ, রূপনগর, যুবরাজ, কোথায় সেজন, আলতা, একজনা, নীলু, তোমাকেই, ছোছা কদম, আঁচল, খুঁজে বেড়াই তারে, কোন গ্রামের মেয়ে, মেয়েটি এখন কোথায় যাবে, বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ ১৯৮৬: বিশ্ব জ্যোতিষ সমিতি পুরস্কার। ১৯৮৭: ইকো সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২: হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯২ : বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৩: পূরবী পদক। ১৯৯৪: বিজয় পদক। ১৯৯৫: মনু থিয়েটার পদক। ১৯৯৫: যায়যায়দিন পত্রিকা পুরস্কার। ১৯৯৬: ঢাকা যুব ফাউণ্ডেশন পদক। ২০০২: বাচসাস পুরস্কার। ২০০৪ : জিয়া শিশু একাডেমী কমল পদক। এস এম সুলতান পদক জাপান রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড মাদার তেরেসা পদক এছাড়াও, কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদান রাখায় 'চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক' লাভ করেন।এছাড়া ২০০৬ সালে জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'তাকেশি কায়েকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটারস লেকচার সিরিজে' বাংলাভাষার একমাত্র লেখক হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। জাপানের চারটি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য এবং তার নিজের লেখা নিয়ে বক্তৃতা করেন। এশিয়ার লেখকদের জন্য এ এক বিরল সম্মান। পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার আইআইপিএম-সুরমা চৌধুরী মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড।