সামরিক আইন ভাঙার পাঁচ রকম পদ্ধতি

তুমি তো জানোই ভালো ক’রে আমাদের বর্বর সমাজে
এক রকম সামরিক আইন চিরকালই আছে ।
দ্বাদশ শতকে ছিল,আছে আজো, হয়তো থাকবে আগামী শতকে ।

এতে কিন্তু আসলে সুবিধা সকলেরই- অর্থাৎ দালাল ও সুবিধাবাদীরা
অর্থাৎ সমস্ত বাঙালি এতে খুবই সুবিধা বোধ করে। শুধু অসুবিধা
তোমার আমার, প্রিয়তমা । আমরা কি তিলে তিলে বুঝতে পারছি না
সামরিক শাসনে সিদ্ধ সব কিছু; নিষিদ্ধ শুধু আমাদের প্রেম?

তাই প্রেমের নামেই বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমাদেরই ভাঙতে হবে
সামরিক সমস্ত বিধান ।

সামরিক আইন ভাঙার প্রথম পদ্ধতিটি এতোই নির্দোষ
যে কারোই মনে হবে না আমরা দুজনে মিলে একট বন্য আইন
অমান্য করছি। তুমি চৌরাস্তার মোড়ে বর্বর সব মানুষের সামনে
সভ্যতার প্রথম দীপের মতো তুলে ধরতে পারো তোমার অমল মুখ
আমার সামনে। আমি তার দুর্লভ আলোতে আলোকিত হয়ে
উঠতে পারি সমসাময়িক প্রচণ্ড আঁধারে। এভাবেই
আমরা দুজনে প্রকাশ্যে ভাঙতে পারি সামরিক কয়েকটি বিধান।

সামরিক আইন ভাঙার দ্বিতীয় পদ্ধতিটি আরেকটু স্পষ্ট আর
দৃষ্টিগ্রাহ্য । তুমি আর আমি এইসব প্রেমহীন প্রাণীর জঙ্গলে সব কিছু
অবহেলা ক’রে হাতে রাখতে পারি হাত । প্রকাশ্য রাস্তায় হাতে হাত ধ’রে
আমরা দুজনে ভাঙতে পারি সামরিক সমস্ত বিধি ও বিধান ।

সামরিক আইন ভাঙার তৃতীয় পদ্ধতিটি একটু তীব্র, কিছুটা মারাত্মক।
আমার উদ্দেশ্যে তুমি দৌড়ে আসতে আসতে পারো মালিবাগ থেকে আর
তোমার উদ্দেশ্যে আমি ছুটে আসতে পারি সমস্ত বস্তি আর
কলোনি পেরিয়ে । পিজি হাসপাতালের চৌরাস্তায় কোটি কোটি নোংরা
চোখের সামনে আমরা আলিঙ্গনে বাঁধতে পারি পরস্পরকে ।
আলিঙ্গনে জ্ব’লে উঠে অত্যন্ত প্রকাশ্যে আমরা ভাঙতে পারি ১৭৪
নম্বর সামরিক নির্দেশ ।

সামরিক আইন ভাঙার চতুর্থ পদ্ধতিটি ওইসব মিছিল, স্লোগান, পোস্টার,
বক্তৃতার চেয়ে বহুগুণে কার্যকর। আমরা দুজনে সমস্ত কামানবন্দুক
অবহেলা ক’রে ময়লার মতো বয়ে যাওয়া মানুষের আর যানবাহনের
মধ্যে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধ’রে সুদীর্ঘ চুম্বনে রঙিন ক’রে
তুলতে পারি সমগ্র বাঙলাকে । একটি প্রকাশ্য চুম্বনে আমরা খান খান
ক’রে ভেঙে দিতে পারি হাজার বছর বয়স্ক বাঙলার
সামরিক আইন ও বিধান ।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  আমাদের মা

সামরিক আইন ভাঙার পঞ্চম পদ্ধতিটি বিপ্লবের চেয়েও তীব্র, ও অত্যন্ত গোপন ।
তোমাকে তা শেখাতে পারি নিভৃতে গোপনে । প্রকাশ্যে কী ক’রে শেখাই,
তাতে শুধু সামরিক আইন নয়, সুশীল আইনও ক্ষেপে উঠবে
ভয়ঙ্করভাবে । দুপুরে আমার ঘরে এসো তুমি- আমরা দুজনে সমস্ত দুপুর ভ’রে
অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে চর্চা করবো গণতন্ত্র । আমাদের রক্তমাংস জপবে
এমন মন্ত্র, যাতে বাঙলার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে খ’সে পড়বে সামরিক শৃঙ্খল।
সবাই বিস্মিত হয়ে দেখতে পাবে বাঙলায় একটিও শিরস্ত্রাণ নেই ।

আমরা দুজনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে এক দুপুরেই এমনভাবে ভাঙতে পারি
সামরিক বিধি ও বিধান যে বাঙলায় আর কখনো সামরিক
অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা থাকবে না ।

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হুমায়ুন আজাদ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...