ক্যাম্পে

আমার বরাবরই সন্দেহ ছিল আমেরিকানরা জাতি হিসেবে আধা পাগল। এদের রক্তে পাগলামি মিশে আছে। এমন সব কাণ্ডকারখানা করে যা বিদেশি হিসেবে বিস্মিত হওয়া ছাড়া আমাদের কিছু করার থাকে না। যেমন ওদের ক্যাম্পিংয়ের ব্যাপারটা ধরা যাক। আগে ক্যাম্পিং বিষয়ে কিছুই জানতাম না। কেউ আমাকে কিছু বলেওনি। নিজেই লক্ষ্য করলাম, সামারের ছুটিতে দলবল নিয়ে এরা কোথায় যায়। ফিরে আসে কাকতাড়ূয়া হয়ে, গায়ের চামড়া খসখসে, চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি, চুল উসকোখুসকো। ওজনও অনেক কমে গেছে। সেই কারণেই হয়তো সবাইকে খানিকটা লম্বা দেখায়। কোথায় গিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করলে বলে-ক্যাম্পে।
:সেটা কী?
:ক্যাম্পিং কি তুমি জানো না?
: না।
আমার ‘না’ শুনে তারা এমন একটি ভঙ্গি করে_ যেন আমার মতো জংলি এ দেশে কেন এলো তা তারা বুঝতে পারছে না।
খোঁজ নিয়ে জানলাম প্রত্যেক আমেরিকান পরিবার বছরে খানিকটা জঙ্গলে কাটায়। তাঁবু-টাবু নিয়ে কোনো এক বিজন বনে চলে যায়। একে তারা বলে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যাওয়া। ল্যাবরেটরিতে আমার সঙ্গে কাজ করে কোয়ান্ডাল। সে তার ছেলে বন্ধুকে নিয়ে ক্যাম্পিংয়ে গেল। ফিরে এলো হাতে এবং পায়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন নিয়ে। গিজলি বিয়ার [প্রকাণ্ড ভালুক] নাকি তাদের তাঁবু আক্রমণ করেছিল। ভয়াবহ ব্যাপার! অথচ রুথ কোয়ান্ডাল এমন করছে যেন জীবনে এ রকম ফান হয়নি। আমি মনে মনে বললাম, বদ্ধ উন্মাদ।
উন্মাদ রোগ সম্ভবত ছোঁয়াচে, কারণ পরের বছর আমি নিজেও ক্যাম্পিংয়ে যাব বলে ঠিক করে ফেললাম। দেখাই যাক ব্যাপারটা কী। আমার দ্বিতীয় মেয়েটির বয়স তখন তিন মাস। ফার্গো শহরে যে ক’টি বাঙালি পরিবার সে সময় ছিল, সবাই আমাকে আটকাবার চেষ্টা করল। তাদের যুক্তি_ এত বাচ্চা একটা মেয়ে নিয়ে এ রকম পাগলামির কোনো মানে হয় না। মানুষের উপদেশ আমি খুব মন দিয়ে শুনি, তবে উপদেশমতো কখনও কিছু করি না। কাজেই চলি্লশ ডলার দিয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে একটা তাঁবু ভাড়া করলাম, একটা অ্যালুমিনিয়ামের নৌকা ভাড়া করলাম, আর ভাড়া করলাম ক্যাম্পিংয়ের জিনিসপত্র। সেই জিনিসপত্রের মধ্যে আছে কুড়াল, ফাস্টএইড বক্স, সাপে কাটার ওষুধ এবং কী আশ্চর্য একটা হারিকেন। খোদ আমেরিকাতেও যে কেরোসিনের হারিকেন পাওয়া যায় কে জানত।
যথাসময়ে গাড়ির ছাদে নৌকা বেঁধে রওনা হয়ে গেলাম। গায়ে ক্যাম্পিংয়ের পোশাক_ হাফ প্যান্ট এবং বস্তার মতো মোটা কাপড়ের ফ্ল্যাপ দেওয়া শার্ট, মাথায় ক্রিকেট আম্পায়ারদের টুপির মতো ধবধবে সাদা টুপি। গাড়ি চলছে ঝড়ের গতিতে। বনে যাওয়ার এই হচ্ছে নিয়ম। স্পিডিংয়ের জন্য পুলিশ অবশ্যই গাড়ি থামাবে, তবে যখন বুঝবে এই দল ক্যাম্পিংয়ে যাচ্ছে তখন কিছু বলবে না। ক্যাম্পিংয়ের প্রতি সবারই কিছুটা দুর্বলতা আছে।
ফার্গো শহর থেকে দুশ’ দশ কিলোমিটার দূরে একটা ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে গাড়ি থামালাম। আমেরিকাজুড়ে অসংখ্য ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড আছে। ব্যক্তিমালিকানায় এসব পরিচালিত হয়। টাকার বিনিময়ে ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে ঢোকা যায়। সেখানে ছোটখাটো একটা অফিস থাকে। বিজন জংলি জায়গা হলেও অফিসটা খুব আধুনিক হয়। টেলিফোনের ব্যবস্থা থাকে, ছোটখাটো বার থাকে, গ্রোসারি শপ এবং বেশ কিছু ভেন্ডিং মেশিন থাকে। সাধারণত স্বামী-স্ত্রী মিলে অফিস এবং দোকানপাট দেখাশোনা করেন।
আমার গাড়ি ঢোকা মাত্রই ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের ওয়ার্ডেন বিশালদেহী এক আমেরিকান বের হয়ে এলো এবং অনেকটা মুখস্থ বক্তৃতার মতো বলল, তুমি চমৎকার একটি জায়গায় এসেছ। এর চেয়ে ভালো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড নর্থ আমেরিকায় আর নেই। আমরা তুলনামূলকভাবেই টাকা বেশি নিই, তবে এক রাত কাটালেই বুঝতে পারবে কেন নিই। এমন অপূর্ব দৃশ্য তুমি কোথাও পাবে না। তোমার সামনে সল্ট হ্রদের নীল জলরাশি, পেছনে গভীর বন। এ ছাড়াও তুমি পাচ্ছ আধুনিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ, যেমন খবরের কাগজ এবং ফ্ল্যাশ টয়লেট।
ভদ্রলোকের বক্তৃতায় মাঝখানেই আমি বললাম, কত দিতে হবে?
দেখা গেল টাকার পরিমাণ আসলেই অনেক বেশি। হ্রদে নৌকা ভাসানোর জন্য ফি দিতে হলো, মাছ কেনার জন্য পারমিট কিনতে হলো … নানান ফ্যাকড়া। ঝামেলা মিটিয়ে রওনা হলাম জায়গা বাছতে। কোথায় তাঁবু ফেলব সেই জায়গা। ওয়ার্ডেনের স্ত্রী [তার সাইজও কিংকংয়ের মতো] আমাকে সাহায্য করতে নিজেই এগিয়ে এলেন। হ্রদের পাশে চোখ জুড়িয়ে গেল। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। দশ ফুট নিচের পাথরের খণ্ডটিও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হ্রদ যত না সুন্দর পেছনের অরণ্য তার চেয়েও সুন্দর। যে কোনো সবুজ জিনিসের সঙ্গে খানিকটা বিষণ্নতা মেশানো থাকে। আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেল। গুলতেকিন বলছে_ এত সুন্দর! এত সুন্দর।
হ্রদের কাছাকাছি তাঁবু জায়গা ঠিক করে কিংকং ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানালাম। ভদ্রমহিলা যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ক্যাম্পিংয়ের যাবতীয় জিনিসপত্র নামমাত্র মূল্যে তাদের কাছে ভাড়া পাওয়া যাবে। তবে তারা চেক গ্রহণ করেন না। পেমেন্ট হবে ক্যাশে।
সকাল এগারোটার মতো বাজে। ঝকঝকে রোদ উঠেছে, বাতাসে ঘাসের বিচিত্র গন্ধ, চারদিকে নিঝুম। ফ্লাস্কভর্তি করে চা এনেছিলাম। চা শেষ করে প্রবল উৎসাহে তাঁবু খাটাতে লেগে গেলাম। তাঁবুর সঙ্গে একটা ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল আছে_ কোন খুঁটি কীভাবে পুঁততে হয়, তাঁবুর কোন আংটা কোন খুঁটিতে যাবে সব পরিষ্কার করে লেখা। কাজটা খুবই সহজ মনে হলো। ঘণ্টাখানেক পার হওয়ার পর বুঝলাম কাগজপত্রের কাজটা যত সহজ মনে হচ্ছিল আসলে তত সহজ নয়। তাঁবুর একটা দিক যখন কোনোমতে দাঁড়ায় তখন অন্যদিক ঝুলে পড়ে। সেটা ঠিক করতে যখন যাই, তখন গোটা তাঁবু মাটিতে শুয়ে পড়ে। আমার স্ত্রী এই দু’ঘণ্টায় পঞ্চাশবারের মতো ঘোষণা করল যে, আমার মতো অকর্মণ্য মানুষ সে আর দেখেনি। সে হলে দশ মিনিটের মাথায় নাকি তাঁবু ঠিক করে ফেলত। আমি তাকে তার প্রতিভা প্রমাণ করার সুযোগ দিলাম। এবং আরও এক ঘণ্টা নষ্ট হলো। দেখা গেল তাঁবু খাটানোয় তার প্রতিভা আমার মতোই।
আমাদের তাঁবু কেমন খাটানো হয়েছে দেখার জন্য ওয়ার্ডেনের স্ত্রী বিকেলের দিকে এলেন এবং বললেন, সামান্য ফিসের বিনিময়ে তাঁবু খাটানোর কাজটা তারা করে দেন। ফি দেওয়া হলো এবং চমৎকার তাঁবু তারা খাটিয়ে দিল। দুপুরে আমাদের কিছু খাওয়া হয়নি। খিদেয় প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। বন থেকে কুড়াল দিয়ে কাঠ কেটে এনে আগুনে মাংস ঝলসে খাওয়াই হচ্ছে নিয়ম।
কাঠ জোগাড় হলো, কিন্তু কিছুতেই আগুন ধরানো গেল না। কেরোসিন ঢেলে দিলে আগুন জ্বলে ওঠে, খানিকক্ষণ জ্বলে তারপর আর নেই। আমি ওয়ার্ডেনের স্ত্রীকে [মিসেস সিমসন] গিয়ে বললাম, আপনি কি সামান্য ফিসের বিনিময়ে আমাদের চুলাটা ধরিয়ে দেবেন? ভদ্রমহিলা আমার রসিকতায় খুবই বিরক্ত হলেন এবং গম্ভীর গলায় বললেন, কেরোসিন কুকার পাওয়া যায়। তার একটি নিতে পারো। দশ ডলার দিয়ে কেরোসিন কুকার ভাড়া করলাম। দুপুরে লাঞ্চ শেষ হলো সন্ধ্যার আগে আগে। আমাদের মতো প্রচুর ক্যাম্পযাত্রী এখানে এসেছে, তবে তারা সবাই চলে গেছে বনের দিকে। জলের দেশের মানুষ বলেই আমরাই একমাত্র জলের কাছাকাছি আছি। বনের চেয়ে জল আমাকে বেশি আকর্ষণ করে।
সন্ধ্যায় নৌকায় খানিকক্ষণ বেড়ালাম। আমেরিকান নিয়ম অনুযায়ী সবার জন্য লাইফ জ্যাকেট ভাড়া করতে হলো_ আরও কিছু টাকা পেলেন মিসেস সিমসন। নৌকায় থাকতে থাকতে চাঁদ উঠে গেল। বিশাল চাঁদ। পঞ্জিকা দেখে রওনা হইনি। পাকে চক্রে পূর্ণিমার মধ্যে পড়ে গেছি। হ্রদের নিস্তরঙ্গ জলে চাঁদের ছায়া, দূরে বনরাজি, পাখপাখালির ডাক, অদ্ভুত পরিবেশ। আমি চিরকাল শহরবাসী, কাজেই পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলাম। বারবার মনে হচ্ছে, স্বর্গের যেসব বর্ণনা ধর্মগ্রন্থগুলোয় আছে, সেই স্বর্গ কি এর চেয়েও সুন্দর?
তাঁবুতে ফিরলাম সন্ধ্যা মিলাবার অনেক পরে। গুলতেকিন রাতের খাবার রাঁধতে বসল। আমি বড় মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বের হলাম। সে বলল, এই বনে কি বাঘ আছে?
আমি বললাম, আছে।
সে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, বাঘ আমাদের কখন খেয়ে ফেলবে বাবা?
জগতের সত্যগুলো শিশুরা খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। কখনোই তেমন বিচলিত হয় না। শিশুদের কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
দূর্বাঘাসের চাদরে আদিগন্ত ঢাকা। বড় গাছগুলোর অধিকাংশের নাম আমি জানি না। উইলি, ওক এবং ইউক্যালিপটাস চিনতে পারছি। চাঁদের আলোয় চেনা গাছগুলোকেও অচেনা লাগছে।
একসময় আমাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। যে দৃশ্যটা চোখে পড়ল তার জন্য আমার প্রাচ্যদেশীয় চোখ প্রস্তুত ছিল না। একদল তরুণ-তরুণী বনের ভেতর ছোটাছুটি করছে। তাদের গায়ে কাপড়ের কোনো বালাই নেই।
আমি শুনেছি আমেরিকানরা গভীর বনে প্রবেশ করার পর সভ্যতার শিকল_ কাপড়চোপড় খুলে ফেলে। ফিরে যায় আদম এবং হাওয়ার যুগে। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা যার নাম। এই দৃশ্য নিজের চোখে কখনও দেখব তা ভাবিনি।
দৃশ্যটি আমার কাছে মোটেই অস্বাভাবিক বা অশ্লীল মনে হলো না। বরং মনে হলো এটাই স্বাভাবিক, এটাই হওয়া উচিত।
আমার মেয়ে বলল, বাবা ওদের কি খুব গরম লাগছে?
আমি বললাম, হ্যাঁ, চল আমরা ফিরে যাই।
আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইলাম। কত রাত তা জানা হলো না, ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করল না। মেয়ে দুটি তাঁবুতে ঘুমাচ্ছে। আমি এবং গুলতেকিন তাঁবুর বাইরে বসে আছি। স্বামী-স্ত্রীরা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ভালোবাসাবাসির কথা কখনও বলে না। সেই রাতে আমরা বিশ্বের আগের সময়ে কেমন করে যেন ফির গেলাম। পাশে বসা তরুণীটিকে অচেনা মনে হতে লাগল। বারবার মনে হচ্ছিল_ এত আনন্দ আছে পৃথিবীতে।
ভোরবেলায় সূর্যোদয় দেখা আমার কখনও হয়ে ওঠে না। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, অনেক রাতে ঘুমোতে যাওয়ার পরেও জেগে উঠলাম সূর্য ওঠার আগে।
সূর্যোদয়ের দৃশ্যটি এত সুন্দর কখনও ভাবিনি। আগে জানতাম না, সূর্যটাকে ডিমের কুসুমে মতো দেখায়, জানতাম না ভোরবেলায় সূর্য এত বড় থাকে। এই সূর্য আকাশে লাফিয়ে ওঠে, তাও জানা ছিল না।
সকালে নাশতা হলো দুধ এবং সিরিয়ালের। নাশতার পর দলবল নিয়ে মাছ ধরতে বের হলাম। আমেরিকায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে চাইলে স্টেট গভর্নমেন্টের কাছ থেকে লাইসেন্স করতে হয়। লাইসেন্সের ফি পনেরো ডলার। লাইসেন্স করা ছিল, তারপরও বড়ি সিমসনকে পাঁচ ডলার দিতে হলো। এটা নাকি লোক রক্ষণাবেক্ষণের ফি। বড়শি ফেলে মূর্তির মতো বসে থাকার কাজটি খুব আনন্দদায়ক হবে মনে করার কোনো কারণ নেই_ তবু যেহেতু লাইসেন্স করেছি কাজেই বসে রইলাম। শুনেছিলাম আমেরিকায় লেকভর্তি মাছ, টোপ ফেলতে হয় না, সুতা ফেললেই হয়, সুতা কামড়ে মাছ উঠে আসে। বাস্তবে সে রকম কিছু ঘটল না। আমি পুরো পরিবার নিয়ে মাছ ধরার আশায় ঝাঁঝাঁ রোদে তিন ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। মাছের দেখা নেই। এক সময় বড়ি সিমসন এসে উদয় হলেন এবং গম্ভীর গলায় বললেন, লেকের কোন জায়গায় মাছ টোপ খায় এবং কখন কীভাবে বড়শি ফেলতে হয় সেই বিষয়ে তাদের একটি বুকলেট আছে, সামান্য অর্থের বিনিময়ে তা সংগ্রহ করা যেতে পারে।
সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়? কিনলাম বুকলেট এবং সঙ্গে সঙ্গে ফল লাভ। বিশাল এক নর্দার্ন পাইক ধরে ফেললাম। এই আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ মৎস্য শিকার। আমার বড় মেয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, বাবা এটা কি তিমি মাছ? বাবা, আমরা কি একটা তিমি মাছ ধরে ফেলেছি?
দুপুরে লাঞ্চ হলো সেই মাছ। ওয়েস্টার্ন ছবির কায়দায় আগুনে ঝলসিয়ে লবণ ছিটিয়ে খাওয়া। অন্য সময় এই মাছ আমি মুখেও দিতে পারতাম না। কিন্তু পরিবেশের কারণে সেই আগুনে ঝলসানো অখাদ্যকেও মনে হলো স্বর্গের কোনো খাবার।
লাঞ্চ শেষ হওয়ার আগেই একটা দুঃসংবাদ পাওয়া গেল। জানা গেল ন’বছর বয়সী একটা ছেলে দলছুট হয়ে বনে হারিয়ে গেছে। ছেলেটির বাবা-মা, ভাইবোন হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। বনে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু না।
টিভি এবং খবরের কাগজে প্রায়ই এ রকম খবর আসে। গত বছর উনিশ বছর বয়সী একটা মেয়ে মন্টানার এক বনে হারিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করা হয় তেরো দিন পরে। সে এই তেরো দিন ব্যাঙ, সাপ-খোপ লতাপাতা খেয়ে বেঁচে ছিল। কেউ কেউ ইচ্ছে করেই বনে থেকে যায়। তেত্রিশ দিন পর হারিয়ে যাওয়া এক দম্পতিকে খুঁজে বের করার পর তারা বলেন_ নাগরিক সভ্যতায় অতিষ্ঠ হয়ে তারা বনে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা ভালোই আছেন। শহরে ফিরত চান না।
ন’বছর বয়সী শিশুটির নিশ্চয়ই এ রকম কোনো সমস্যা নেই। সে নিশ্চয়ই আতঙ্কে অস্থির হয়ে আছে। ক্যাম্পে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। স্টেট পুলিশকে খবর দেওয়া হলো। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দুটি হেলিকপ্টার বনের ওপর দিয়ে চক্রাকারে উড়তে লাগল। হেলিকপ্টার থেকে জানানো হলো বাচ্চাটিকে দেখা যাচ্ছে। একটা ফাঁকা জায়গায় আছে, নিজের মনে খেলছে। ভয়ের কিছু নেই।
বাচ্চাটিকে যখন উদ্ধার হলো, সে গম্ভীর গলায় বলল, আমি হারাব কেন? আমার পকেটে তো কম্পাস আছে।
দু’দিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিলাম, এক সপ্তাহ থেকে গেলাম। মিসেস সিমসন একদিন এসে বললেন, তোমরা আর থেকো না। বেশিদিন থাকলে নেশা ধরে যাবে। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে না। এই আমাদের দেখো, বছরের পর বছর এই জায়গায় পড়ে আছি। ঘণ্টাখানেকের জন্যও শহরে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মিসেস সিমসন বললেন, সতের বছর আগে আমিও আমার স্বামীর সঙ্গে ক্যাম্পিংয়ে এই জায়গায় এসেছিলাম। এতই ভালো লাগল যে, লিজ নিয়ে ক্যাম্পিং স্পট বানালাম। তারপর থেকে এখানেই আছি। বছরে তিনটা মাস লোকজনের দেখা পাই, তারপর দু’জনে একা একা কাটাই।
:কষ্ট হয় না?
:না। বনের অনেক রহস্যময় ব্যাপার আছে। তোমরা যারা দু’একদিনের জন্য আসো, তারা তা ধরতে পারো না। আমরা পারি। পারি বলেই …
মিসেস সিমসন তাঁর কথা শেষ করলেন না। আমি বললাম, রহস্যময় ব্যাপারগুলো কী?
:ওই সব তোমরা বিশ্বাস করবে না। ওই প্রসঙ্গ বাদ থাক।
তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বনের দিকে তাকালেন। রহস্যময় বন হয়তো কানে কানে তাঁকে কিছু বলল। দেখলাম তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মিসেস সিমসন বললেন, একট মজার ব্যাপার কী জানো? সমুদ্র মানুষকে আকর্ষণ করে। এত যে সুন্দর সমুদ্র তার পাশেও তিন-চার দিনের বেশি মানুষ থাকতে পারে না। আর বন মানুষকে আকর্ষণ করে। মানুষকে সে চলে যেতে দেয় না। পুরোপুরি গ্রাস করতে চেষ্টা করে। কাজেই তোমরা চলে যাও।
আমরা চলে গেলাম।
সব মিলিয়ে সাত দিন ছিলাম। মিসেস সিমসন তিন দিনের ভাড়া রাখলেন। শান্ত গলায় বললেন, তোমরা তিন দিন থাকতে এসেছিলে সেই তিন দিনের রেন্টই আমি রেখেছি। বাকি দিনগুলো কাটিয়েছ অতিথি হিসেবে। বনের অতিথি। বন তোমাদের আটকে রেখেছে। কাজেই সেই চার দিনের ভাড়া রাখার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।
[আত্মজৈবনিক ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ ১৯৮৭ গ্রন্থ থেকে]

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  একতারাটার মনের কথা

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হুমায়ূন আহমেদ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...