বিকেলের বেহাগ

দশ
বিকালে চা-নাস্তা খেতে ঘর থেকে বের হয়ে আসবেন, এ সময় কানড়বার শব্দ শুনলেন এনায়েতুল্লা। এদিক-সেদিক তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করে বুঝতে পারলেন রান্না ঘরের দিক থেকেই আসছে কান্নার শব্দ। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলেন।তারপর ডাইনিংরুমে ঢুকলেন; জয়নাব টেবিলে চুপ করে বসে আছে, দাউদকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি জয়নাবের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। সে কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, কান্নার শব্দ শুনছি। কে কাঁদছে?
জয়নাব বলল, আমেনার মা।
আমেনার মা! সে কাঁদতে যাবে কেন? কী হয়েছে?অবাক চোখে তাকালেন এনায়েতুল্লা।
তার গ্রামের বাড়ি থেকে খবর এসেছে। বলে সে থেমে গেল।
এনায়েতুল্লা ভালো করে কান্নাটা শুনলেন। না,মড়া কান্না নয়। মড়াকান্না অন্যরকম শোনায়। তাহলে আমেনার মা কীসের জন্য কাঁদছে? তিনি জয়নাবের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেন? আমেনার মা কাঁদছে কেন?
জয়নাব বলল, আমেনার শ্বশুর-শাশুড়ি তার ওপর খুব অত্যাচার করছে। স্বামীও যোগ দিয়েছে বলে খবর এসেছে।
অত্যাচার করছে? স্বামীও যোগ দিয়েছে? কেন, তা করতে যাবে কেন তারা? আমেনা ভালো স্বভাবের মেয়ে। তা ছাড়া সে তো নতুন বউ নয়। চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে। আমরাই দিয়েছি বলতে গেলে।
এখন, এত বছর পর কী হতে পারে যার জন্য তার ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে?
জয়নাব মাথা নিচু করে বলল, যৌতুক চাচ্ছে তারা। ৫০ হাজার টাকা।
যৌতুক! ৫০ হাজার টাকা! বিয়ের চার বছর পর হঠাৎ যৌতুক চাচ্ছে কেন তারা? বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল। ওদের ডিঅ্যান্ড তাই ছিল।
আমি দিতে চাইনি, কেননা যৌতুক ব্যাপারটা আমি মোটেও সমর্থন করি না। কিন্তু ওই টাকা দিয়ে আমেনার স্বামী বাজারে একটা দোকান দেবে এ কথা শুনে রাজি হয়েছিলাম। এখন চার বছর পর হঠাৎ আবার ৫০ হাজার টাকা চাইছে কেন?
এ সময় ডাইনিংরুমে দাউদ ঢুকল। সে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। গলার টাই বাঁধতে বাঁধতে টেবিলে বসে থাকা আব্বা আর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। যেন বোঝার চেষ্টা করছে কী নিয়ে সিরিয়াস আলাপ হচ্ছে দুজনের।
এনায়েতুল্লা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনেছ দাউদ? অবাক কান্ড ! অন্যায় কথা! আমেনার শ্বশুরশাশুড়ি ৫০ হাজার টাকা চাচ্ছে। যৌতুক। মনে হচ্ছে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে বদমাশগুলো। ছেলেকে নিয়ে ব্যবসা করছে। শোনা যাচ্ছে হারামজাদা স্বামীটাও এর মধ্যে আছে। প্রশড়ব হলো চার বছর পর হঠাৎ এখন টাকা চাচ্ছে কেন?
দাউদ টাই বাঁধা শেষ করে বলল, মনে হচ্ছে আপনার দেয়া গরম স্যুটটা পেয়ে তাদের ধারণা হয়েছে আপনার অনেক টাকা। একটু চাপ দিলে আরো টাকা পাওয়া যাবে। আপনি দয়ালু মানুষ, না হলে প্রায় নতুন গরম স্যুট দিতে যাবেন কেন?
হুঁ- বলে এনায়েতুল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন, যেন কিছু ভাবছেন। তারপর বলেন, দয়ালু বলে ব্ল্যাকমেইল করবে নাকি? তারপর সজোরে মাথা নেড়ে বলেন, না, না। আমি এটা মেনে নেব না।কখনো না। অন্যায় মেনে নেয়া যায় না।
দাউদ বলল, যতক্ষণ না টাকা পাবে আমেনাকে মারধর খেতে হবে মনে হচ্ছে। এসব লোক এমনি করে থাকে।
এনায়েতুল্লা উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমেনার মাকে তখনই পই পই করে বলেছিলাম তার জামাই,জামাইয়ের বাপ-মা ভালো করে তত্ত্ব-তালাশ নিতে। সে তখন বলেছিল পরিবারটা ভালো। শ্বশুর-শাশুড়ি বিনয়ী মানুষ, সরল প্রকৃতির। লোভী নয়। এখন মনে হচ্ছে সে তাদের ভালো করে চিনতে পারেনি।
দাউদ বলল, লোকের আসল চেহারা বাইরে থেকে সহজে চেনা যায় না। মুখ তো নয়, যেন মুখোশ পরে আছে সবাই। আর লোভের কথা বলছেন? দেশে সবার মধ্যে লোভ এখন ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের লেলিহান শিখার মতো। প্রায়ই দেখেন না কাগজে খবর থাকে যৌতুকের জন্য গৃহবধূর আত্মহত্যা।অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা সাজানো হয়। আসলে পিটিয়ে মেরে ফেলে শ্বশুরবাড়ির লোক। দুঃখের বিষয় হলো এই পৈশাচিক আর ঘৃণ্য সব কান্ড শুধু গ্রামের অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত লোকেরাই করে না; শহরের শিক্ষিত ভদ্র পরিবারেও এমন হচ্ছে।
এনায়েতুল্লা শুনে গম্ভীর হয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলেন, চল আমরা আমেনার শ্বশুরবাড়ি যাই। নিজের কানেই শুনি তারা কী চায়, কেন চায়। আমেনার ওপর অত্যাচারের যে অভিযোগ তা কতটা সত্যি তাও যাচাই করে আসা যাবে।
আমরা আমেনার শ্বশুরবাড়ি যাব? বলেন কী?আমাদের কী দায় পড়েছে? দাউদ অবাক হয়ে তাকায় তার আব্বার দিকে।
এনায়েতুল্লা বলেন, বাহ। আমরাই তো আমেনার বিয়ে দিলাম। বিয়ের সব খরচও দিয়েছি। এ বাড়িতেই তো সে বড় হলো। তোমার আম্মা তাকে খুব আদর করতেন। নিজেদের মেয়ে নেই তো সে জন্য তাকে মেয়ের মতো দেখতেন। সুতরাং আমেনাকে তার শ্বশুরবাড়ির লোক অত্যাচার করছে শুনে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।
দাউদ ইতস্তত করে বলল, আব্বা আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় এর মধ্যে আমাদের জড়ানো ঠিক হবে না। গ্রামে আমাদের দেখতে পেলে ওর শ্বশুর ভাববে আমরা দুর্বল হয়েই উপস্থিত হয়েছি। যে যেমন ধড়িবাজ মনে হচ্ছে, তাতে তার পক্ষে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করার সুবিধা হবে। সে যাকে বলে পেয়ে বসবে।
ভাববে আমাদের খুব গরজ পড়েছে। না আব্বা আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না। এনায়েতুল্লা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে দাউদের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর উত্তেজিত স্বরে বললেন, শুনতে
পাচ্ছো?
কি? দাউদ অবাক চোখে তাকালো তার আব্বার দিকে।
আমেনার মা কাঁদছে। পাঁজর ভাঙা কানড়বা। অনেকক্ষণ থেকে কাঁদছে। সহ্য করা যায়? চোখের সামনে,শোনা যায় এমন কাছে থেকে একটা মানুষ হু হু করে কাঁদছে। আর আমেনার মা তো শুধু একটা মানুষ না। এই বাড়িতে সে ৩০ বছর ধরে আছে। আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গিয়েছে। তার বিপদে আমরা হাত গুঁটিয়ে থাকব, এ হয় না। একটা কিছু করতে হবে। ব্যাটারা ভেবেছে কি? চলো যাই,আমেনার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে।
জয়নাব টেবিল থেকে উঠে এসে বলল, বাবা আপনার এত পরিশ্রম করা ঠিক হবে না। একে তো এখন নিয়মিত নিজেদের গ্রামে যাচ্ছেন। বেশ পরিশ্রম হচ্ছে তাতে। এখন আবার আমেনার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে গেলে শরীরের ওপর চাপ পড়বে। মানসিকভাবেও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়বেন। কেবল খবর শুনেই ইতোমধ্যে উত্তেজিত হয়ে গিয়েছেন। বেশি রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না আপনার
পক্ষে।
এনায়েতুল্লা জয়নাবের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি মেয়ে মানুষ হয়ে একটা মেয়ের ওপর অন্যায়-অত্যাচার হচ্ছে শুনেও চুপ করে থাকতে পারো?হোক না গরিব, অশিক্ষিত। একটা মেয়েকে
অন্যায়ভাবে মারধর করছে, যৌতুক চাচ্ছে এর বিরুদ্ধে প্রম প্রতিবাদ তোমার কাছ থেকেই আসা উচিৎ। এরপর তিনি মাথা নেড়ে বললেন, তুমি আমাকে হতাশ করলে জয়নাব।
কত প্রতিবাদ করব বাবা? এত একটি-দুটি ঘটনা না,অজস্র। আর হচ্ছেই। এরপর বলল, প্রতিবাদ যাদের করার তারা করছে। সুশীল সমাজ। কাগজে তাদের কথা ছাপা হচ্ছে, টিভিতে তারা টকশোতে বক্তব্য রাখছেন। যৌতুক আর অন্যসব সামাজিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। আমাদের না করলেও চলে।
না। চলে না। প্রত্যেকেরই বিবেক আছে। বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে প্রত্যেককেই সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। জয়নাব, তোমার কাছ থেকে এমন উত্তর আশা করিনি। ভেবেছি তুমি আমাকে সমর্থন জানাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
জয়নাব মাথা নিচু করল শ্বশুরের কথা শুনে। বোঝা গেল সে লজ্জা পেয়েছে। এনায়েতুল্লা দাউদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আগামী শুক্রবার আমাদের গ্রামে না গিয়ে চলো আমরা আমেনার শ্বশুরবাড়ি যাই। চুপ করে থাকা যাবে না। আমাদের যা করার তা করতে হবে। না হলে বিবেকের কাছে আমরা দায়ী থাকব।
এরপর একটু থেমে বললেন, তোমার আম্মার আত্মা শান্তি পাবে না।
দাউদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ। চলেন। আগামী শুক্রবার আমরা আমেনার শ্বশুরবাড়ি যাব।
সে বলল বটে, কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হলো না যে সে খুব সন্তুষ্ট।
পরের শুক্রবার আমেনার শ্বশুরবাড়ি রওনা হলেন এনায়েতুল্লা, সঙ্গে দাউদ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পেছন থেকে জয়নাব বলল, ঝগড়া-ঝাটির মধ্যে যাবেন না বাবা। মেজাজ খারাপ করবেন না। উত্তেজিত হবেন না। এরপর দাউদের উদ্দেশ্যে বলল, ওদের যা বলার তুমিই বলো। বাবাকে বেশি কথা বলতে দিয়ো না।
জয়নাবের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তুলি। সে হেসে বলল,
দাদু উকিলের মতো এমনভাবে কথা বলবেন যে,  ব্যাটাদের মুখে কোনো কথাই আসবে না। মাফ  চাইবে হাতজোর করে।
গাড়িতে বসে তার কথা শুনে এনায়েতুল্লা হাসলেন।
দাউদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুলির ধারণা, আমি  ভালো উকিল হতে পারতাম।
দাউদ বলল, কেন মনে করে জানেন? ও দেখে তো  আপনার সঙ্গে কথা বলে কেউ পারে না। শেষ পর্যন্ত  আপনার কথাই টিকে থাকে।
শুনে এনায়েতুল্লা গম্ভীর হয়ে যান। সামনের দিকে  তাকিয়ে বলেন, পাঁজি লোকগুলো শুনবে কিনা, কে  জানে। হয়ত লোকজন জোগাড় করে আমাদের ওপর  চাপ দেয়ার চেষ্টা করবে।
দাউদ বলল, সেই আশঙ্কাও আছে। তবে ভরসা এই  যে, আমরা কোনো খবর না দিয়েই যাচ্ছি। এটা বেশ  বুদ্ধির কাজ হয়েছে।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। বনানী ছেড়ে গাড়ি এখন  এয়ারপোর্ট রোড হয়ে যাচ্ছে। আশুলিয়া হয়ে  মানিকগঞ্জের পথে যাবে একটু পর। ড্রাইভার সালাম  একটা বাস ওভারটেক করে বলল, আমেনার শ্বশুরটা  পাঁজি লোক। আমি প্রমদিন দেইখাই টের পাইছি।
এনায়েতুল্লা রেগে গিয়ে বললেন, তার পাঁজিগিরি বার  করছি। দরকার হলে থানা থেকে পুলিশ নিয়ে যাব। নারী নির্যাতন একটা বড় অপরাধ, ব্যাটা জানে না  বোধ হয়।
আমেনার শ্বশুর উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল, লুঙ্গি আর  গেঞ্জি গায়ে। তার স্ত্রী পাটখড়ি হাতে রানড়বাঘরে  যাচ্ছিল। তাদের দেখে দু’জনই খুব অবাক হলো।
মনে হলো, প্রমে চিনতে পারেনি, এরপর আমেনার  শাশুড়ি মাথায় ঘোমটা দিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে  ঢুকলো আর তার শ্বশুর ঘরে গিয়ে একটা পাঞ্জাবি  পরে হাসিমুখে বেরিয়ে এল। তাদের দু’জনের কাছে
এসে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিয়ে ডেকে  বলল, ও বউমা, আইসো উঠানে। দ্যাহো কারা  আইছেন। এরপর এনায়েতুল্লার দিকে তাকিয়ে বলে,  কি ভাগ্যির কথা। কিন্তু একটা খবর দিলেন না ক্যান?
এক্কেবারে আচমকা আইয়া পড়লেন। এ্যাহোন  ক্যামনে কি করি, মেহমানদারির কি ব্যবস্থা হইবো  ভাইবা অস্থির। বহেন, বহেন। বলে সে উঠোনে  দুটো টুলের দিকে তাকায়। তার কথা শেষ হতে না
হতে ভেতর থেকে আমেনা এসে এনায়েতুল্লা আর  দাউদের পা ধরে সালাম করে আর এরপরই কান্নায়  ভেঙে পড়ে। এনায়েতুল্লা ব্যস্ত হয়ে বলেন, কি হলো  আমেনা? কাঁদছো কেন?
আমেনার শ্বশুর হেসে বলে, আনন্দের কান্না।   অনেকদিন পর আপনাদের দেখছে তো। হের  লাইগা।
আমেনা মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরের  দিকে চলে যায়। তার শ্বশুর তার দিকে অসন্তুষ্ট  দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুখে হাসি এনে বলে, বউমাটা  খুব ভালো। অন্তরটা বড় নরম। সামান্যতেই গইলা  যায়।
এনায়েতুল্লা আর দাউদ উঠোনে রাখা দুটো টুলে  বসেন। জুলাই মাসের গরমে দু’জনেই ঘামছেন। রুমাল দিয়ে তিনি মুখ আর ঘাড় মুছলেন। উপরের দিকে একটা গাছের দিকে তাকিয়ে বললেন, আম ঝুলছে। এখনো গাছে আম? পাকে নাই?
আমেনার শ্বশুর বলে, এই গাছে দেরিতেই মুকুল ধরে। আম হইছে অনেক এইবার। ঝড় হয় নাই তো। বড় ভালো কিসিমের আম। আপনাদের দিমু যাওনের সময়। এরপর হাসিমুখে এনে বলে, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সাইরা যাইবেন তো?
এনায়েতুল্লা গম্ভীর মুখে বললেন, না খাবার সময় হবে না। আমরা একটু পরই চলে যাব। আমেনাকে দেখতে এলাম। দুপুরের খাওয়া কই খাইবেন? খাইতে তো হইব। গরিবের বাড়িতে না হয় ডালভাত খাইয়া গেলেন।
দাউদ বলে, আমরা সঙ্গে খাবার এনেছি। আব্বার বাইরে খাওয়া নিষেধ। যাওয়ার সময় রাস্তায় কোথাও থেমে খেয়ে নেবো। ও। তা ডাবের পানি খাইবেন তো? লগে খৈ আর খেজুরের পাটালি গুড়। আমেনার শ্বশুর মোলায়েম স্বরে বলে।
এনায়েতুল্লা বললেন, তা খাওয়া যায়। যা গরম পড়েছে। ডাবের পানি খাবো আমরা। বলে তিনি তাকিয়ে দেখেন রানড়বাঘরের পাশে ঘোমটা লম্বা করে টেনে আমেনা তখনো দাঁড়িয়ে। তার সামনে তিন বছরের একটা ছেলে, ন্যাংটো, কোমড়ে ঘুংটি বাঁধা।
আমেনার ছেলে, ভাবলেন তিনি। ছেলেটা মুখের ভেতর আঙুল পুরে দিয়ে তাদের দেখছে। আমেনা লম্বা ঘোমটার নিচে মুখ রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, নখ দিয়ে মাটিতে দাগ কাটছে। বোঝা যায় সে খুব অস্থির।
আমেনার শ্বশুর জানালো তার ছেলে সুরুজ বাজারে ছোট একটা দোকান দিয়েছে। সকালে সেখানে চলে যায়, এখনো সেখানেই আছে। এরপর বলল, খবর দেয়া হইছে। এহনি আইয়া পড়বো।
ডাবের পানি খাচ্ছেন এনায়েতুল্লা আর দাউদ। ডাব ওপরে তুলে খেতে খেতে তিনি তীক্ষè চোখে দেখছেন আমেনার শ্বশুরকে। দাউদও দেখছে। ঘড়েল। অতি বিনয়ী ভাব দেখাচ্ছে। ভাবলো দাউদ। আমেনার শ্বশুর একটু পর রান্না ঘরের পাশে ছনের ঘর দেখিয়ে বলল, আমেনা আর সুরুজ থাকে ঐহানে। ঘরটা হেইলা পড়ছে বাতাসে। মেরামতের দরকার। ভাবছি টিনের ছাদ কইরা দিমু। ভিটাটা পাকা হইবো। ঝড়বৃষ্টিতে কোনো ক্ষতি হইবো না।
এনায়েতুল্লা ঘরটার দিকে তাকালেন। ছনের মাচা,তরজার বেড়া কিন্তু বেশ সোজা হয়েই আছে, হেলে পড়েছে বলে দেখা গেল না। তিনি কিছু বলার আগেই উঠোনে ঢুকলো আমেনার স্বামী সুরুজ।
দৌড়ে আসার জন্য সে হাফাতে থাকল। এরপর তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ কাঁচুমাঁচু করে বলল, আগে খবর পাঠান নাই যে?
এনায়েতুল্লা গম্ভীর হয়ে বললেন, হঠাৎ আসতে হলো। তার মুখের ভাব আর গলার স্বর শুনে বাপ-বেটার মুখের হাসি চলে গেল। তারা কুণ্ঠিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সামনে। এনায়েতুল্লা বললেন, আমরা কেন এসেছি বুঝতে পেরেছ তোমরা।
সুরুজের বাবা খুশি হয়ে বলল, সুরুজদের ঘরটা মেরামতের লাইগা যে ৫০ হাজার টাকা লাগবো,হেইডা দিতে আইছেন মনে হয়। খবরটা পাইছেন মনে হয়। জানতাম টাকাটা দিবেন। তবে নিজেই যে আইবেন, ভাবতে পারি নাই। এরপর ছেলের দিকে তাকিয়ে সে বলে, বড় মানুষের কারবারই আলাদা।
তোমার মাথা। প্রায় গর্জে ওঠেন এনায়েতুল্লা। এরপর বলেন, আমরা টাকা দিতে আসি নাই। কেন দেব?
শুনে প্রমে একটু হকচকিয়ে যায় আমেনার ধূর্ত শ্বশুর। এরপর শেয়ালের মতো ধূর্ত চোখে তাকিয়ে বলে, ওই যে ভাঙা ঘরটা। কইলাম না এট্টু আগে,ঐটা মেরামতের লাইগা চাইছি টাকাটা। আপনার কানে পৌঁছাইছে সেই খবর। এরপর সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, নিজের লাগি টাকা চাই নাই। ক্যান চামু? আমার মান-মর্যাদা আছে না?আমেনার মান-মর্যাদা নাই? তাকে টাকার জন্য মারধর করছো তোমরা। সব শুনতে পেয়েছি। তুমি একটা বজ্জাত মানুষ। লোভী। শয়তান। এনায়েতুল্লা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
দাউদ বলে, আব্বা শান্ত হোন। যা বলার আমিই বলবো। আপনি চুপ করে থাকেন।
আমেনার শ্বশুর এবার নিজ মূর্তি ধারণ করে। গম্ভীর হয়ে কঠিন স্বরে বলে, বউ ঘরে তোলার সময় কিছু চাই নাই। হগগলেই কিছু চায়। আমি কিছু চাই নাই। আমারে লোভী কন?
এনায়েতুল্লা বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি বিয়ের সময়। ভুলে গিয়েছো সে কথা?
আমেনার শ্বশুর বলে, আমরা চাই নাই। আপনি খুশি হইয়া দিছেন।
বেশ। এখন কোনো হিসেবে টাকা চাচ্ছো? যৌতুক?এতদিন পর কেন? বিয়ের সময় বললেই পারতে।দাউদ বলে।
যৌতুক কন ক্যান? কইলাম না সুরুজরা যে ঘরটায় থাহে হেইডা নতুন কইরা বানায়া দিমু। হেই ঘরে তারাই থাকবো, আমরা বুড়াবুড়ি যেই পুরান ঘরে আছি, হেই ঘরেই থাকুম। তাই বউরে কইছি তোমার মার কাছে খবর পাঠাও ৫০ হাজার টাকা লাগবো।
এরপর এনায়েতুল্লা তার দিকে তাকিয়ে বলে, আমারে বিশ্বাস না করলে আমার হাতে টাকাটা দিয়েন না।নিজেই খরচ কইরেন। কি কও সুরুজ? বলে সে ছেলের দিকে তাকায়।
সুরুজ মাথা নিচু করে থাকে। কিছু বলে না। তাকে বেশ বিব্রত মনে হয়, লজ্জিতও।
এনায়েতুল্লা রেগে বলেন, একটা পয়সাও দেব না।তুমি আর তোমার বউ আমেনার গায়ে হাত তুলেছো। তোমরা ক্রিমিনাল। তোমাদের জেলে পাঠাবো।
আমেনার শ্বশুর নির্বিকার স্বরে বলল, আপনারা ক্ষমতাবান। জেলে পাঠাইলেও পাঠাতে পারেন। তাতে আমেনার কোনো লাভ হইবো?
শুনে এনায়েতুল্লা আরো খেপে যান। দাউদের দিকে তাকিয়ে বলেন, দেখেছো, ব্যাটা ব্ল্যাকমেইল করছে। আমেনার ওপর আরো অত্যাচারের হুমকি দিচ্ছে। দিস ইজ টু মাচ বলে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ান। এরপর রান্না ঘরের পাশে ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আমেনার উদ্দেশ্যে বলেন, আমেনা তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। তোমার মায়ের কাছে।
এই কষাইখানায় তুমি আর থাকবে না। এরা মানুষ না, পশু।
তার কথা শুনে আমেনা হকচকিয়ে যায়। সে একবার তার শ্বশুরের দিকে তাকায় আর একবার তার স্বামীর দিকে। বোঝা যায় সে ইতস্তত করছে, হয়তো ভয়ও পাচ্ছে। এনায়েতুল্লা সাহস দিয়ে বলেন, কোনো ভয় নাই তোমার। কিছু হবে না। এখানে যা হচ্ছে তার চাইতে খারাপ কিছু হতে পারে না। তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। তোমার মা অপেক্ষা করছে। এরপর তিনি তার শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলেন, না হলে এই পাষন্ড টাকার জন্য তোমাকে মেরে ফেলবে।
আমেনা আবার স্বামীর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়;সুরুজ তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার বাবা তার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, যেন আশা করছেন সে তার বউকে শাসিয়ে কিছু বলবে এবং ভয় দেখাবে।
এনায়েতুল্লা আমেনাকে আশ্বস্ত করে বলেন, সুরুজ যদি তোমাকে সত্যি ভালোবাসে, বউয়ের মতো ব্যবহার করে তাহলে সে ঢাকায় আমাদের বাড়িতে আসবে। তখন তার সঙ্গে তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। এখন তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। এই বর্বর লোকটার বাড়িতে তোমার আর একদিনও থাকা ঠিক হবে না। পাষ-, অমানুষ। তিনি কটমটিয়ে তাকান আমেনার শ্বশুরের দিকে।
আমেনার শ্বশুর রাগের সঙ্গে বলে, ঘরের বউ এই ভাবে যদি যায় গিয়া, লোকে কী কইবো স্যার? ইজ্জত থাকবো? ভাইবা-চিন্তা কাম করেন।
এনায়েতুল্লা ঘৃণার স্বরে বলেন, যখন তাকে মারধর করো সেই সময় লোকে কিছু বলে? তখন তার মান-ইজ্জত কোথায় থাকে?
আমেনার শ্বশুর বলে, যে মারধরের কথা কইছে আপনাদের একটু বেশিই কইছে। আদর কইরা বাপ মেয়েয় পোলা মাইয়ার ওপরে হাত তোলে। হেইডারে মারধর কয় না।
এনায়েতুল্লা তার কথা শুনে কাঁপতে থাকেন, কী বলবেন তা তার মুখে আসে না। তিনি আমেনার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমেনা তোমাকে যে মারধর করে, অত্যাচার চালায় টাকার জন্য, এটা কি মিথ্যা?লোকে বাড়িয়ে বলছে?আমেনা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকে। এরপর হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। তার দেখাদেখি ন্যাংটো ছেলেটাও কাঁদতে শুরু করে। এনায়েতুল্লা
আমেনার শ্বশুরের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, কেউ বাড়িয়ে বলেনি, যা সত্যি তাই বলেছে। এখন তার প্রমাণও পাচ্ছি। আমেনার কান্নাই সেটা প্রমাণ করছে। এরপর তিনি আমেনাকে বলেন, আর দেরি করো না। চলো আমাদের সঙ্গে। তোমার মা অপেক্ষা করছে। হ্যাঁ তোমার ছেলেও থাকবে তোমার সঙ্গে। এরপর দেখা যাক, তোমার কষাই শ্বশুর কী ঠিক করে। সুরুজ মিয়াই বা কী সিদ্ধান্ত নেয়।তাদের একটা সুযোগ দেয়া হবে, হাজার হোক তুমি সুরুজের বিয়ে করা বউ। তবে তোমার এখানে আর একদিনও থাকা ঠিক হবে না। এরপর ওরা তোমাকে
মেরেই ফেলবে।
সন্ধ্যার পর তারা ঢাকা পৌঁছলেন। জয়নাব তাদের দেখে অবাক হয়ে বলল, আমেনাকে নিয়ে এলেন দেখি? যাবার সময় তো তা বলেননি?
হ্যাঁ। নিয়ে এলাম। এ ছাড়া উপায় কি? ওর শ্বশুর ৫০ হাজার টাকা না পেলে ওকেই মেরেই ফেলবে এনায়েতুল্লা সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠতে উঠতে বললেন।
জয়নাব আমতা আমতা করে বলে, আমেনা তাহলে এই বাড়িতেই থাকবে? তার ছেলেও?
এনায়েতুল্লা ঘরের ভেতর যেতে যেতে বললেন, হ্যাঁ। আমাদের বাড়িতেই থাকবে। ওর মায়ের সঙ্গে। তার মাকে সাহায্য করবে বাড়ির কাজ করতে। এরপর নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরে বললেন,আমেনা তো এই বাড়িতে নতুন না। এখানেই বড় হয়েছে।
এনায়েতুল্লা নিজের ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর জয়নাব বসবার ঘরে দাউদকে বলল, আমরা ৩ জন মানুষ।আমাদের দেখাশোনা করবে ৪ জন। ড্রাইভার আর দারোয়ান তো আছেই। খুব ক্রাউডেড হয়ে গেল না?এত মানুষ এক বাড়িতে!
দাউদ বলল, আব্বাকে এখন একথা বলা যাবে না।
তিনি উত্তেজিত হয়ে আছেন। ইমোশনালও হয়ে আছেন।
এনায়েতুল্লা তাদের কথা শুনে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জয়নাবকে বলেন, বউমা সবসময় অতো হিসাব করলে চলে না। মাঝে মাঝে বেহিসাবি হতে হয়। না হলে মানুষ আর জীব-জন্তুতে কি তফাৎ? এরপর একটু থেমে বলেন, আমরা ক্যালকুলেটর না। আমাদের মন আছে, হৃদয় আছে।
জয়নাব কিছু না বলে দাউদের দিকে তাকায়। সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে তার দৃষ্টি এড়িয়ে।
এনায়েতুল্লা আবার তার ঘরে ঢুকে গেলেন। জয়নাব দাউদের কাছে গিয়ে বলল, এটা মেনে নেয়া যায় না। খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। ছেলেসুদ্ধ মেয়েটাকে এনে বাড়িভর্তি করে ফেললে তোমরা। চাকর-বাকরদের রাজত্ব চলবে এখন।
দাউদ অসহায়ের ভঙ্গিতে বলল, আমি কি করবো?আব্বার জেদ তো জানো। নিষেধ করলে শুনতেন না। আমেনাকে আর ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই আসতেন।
জয়নাব অসন্তুষ্ট স্বরে বলল, বাবা বেশ বাড়াবাড়ি করছেন। নিজের বেলায়। সবার বেলায়। বাড়িটার মালিক বলেই তার সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করতে হবে?
দাউদ বলল, মাথা ঠান্ডা করো। দেখো না কী হয়।এরপর আস্তে আস্তে বলল, টাইম ইজ দ্য গ্রেট হিলার।
জয়নাব শোনার ঘরে যেতে যেতে বলল, বাড়িতে লোক গিজগিজ করছে। আমি এখানে থাকতে পারবো না।
দাউদ পেছন থেকে বলল, কোথায় যাবে তাহলে?জয়নাব ঘরে ঢুকে বলল, আলাদা থাকবো। বাড়ি ভাড়া নাও। তোমার ইনকামে বেশ চলে যাবে।
দাউদ হেসে বলল, দূর তাই হয় নাকি? বুড়ো বাবাকে ফেলে যাওয়া যায় না। আমার একটা দায়িত্ব আছে।আমাদের সবার দায়িত্ব আছে।
জয়নাব ঘরের দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, বুড়ো বাবা যে এখন বুড়ো খোকামি করতে শুরু করেছেন।
দাউদ বলতে যাচ্ছিল, কয়েকদিন আর। বলল না,চেপে গেল। সেও তার আব্বার প্রতি বিরক্ত, কিন্তু তার ধৈর্য জয়নাবের চেয়ে বেশি। সে অপেক্ষা করতে পারে।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  বিকেলের বেহাগ

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হাসনাত আবদুল হাই- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...