প্রথম প্রবাস-২

০৩.

ফ্ল্যাটের বসবার ঘরের প্রকান্ড কাঁচমোড়া জানলা দিয়ে চোখে পড়ে একটা বিরাট গাছ। শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এই পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্টের লোকাল গার্জেনের মতো ঝুঁকে পড়ে এর রক্ষণাবেক্ষণ করছে যেন।

বড়ো গাছমাত্রই প্রতিষ্ঠান বিশেষ। এই কুয়াশা-ভেজা দূর দেশের গাছ আর আমাদের দেশের গাছের চেহারায় অমিল থাকলেও চরিত্রে কোনোই অমিল নেই। সেই কোটর, পাখি, লতিয়ে-ওঠা পরনির্ভর লতা, পাতা-ওঠা, পাতা-মরা, সেই তারুণ্য ও বার্ধক্যর আশ্চর্য অভিব্যক্তি এই গাছেও।

সেদিন খুব ভোরে উঠে জানলার পর্দা সরিয়ে তার পাশে বসে বাইরে চেয়ে অনেকদিন পর এক প্রভাতি পরজ মানসিকতার মধ্যে অনেকানেক কথা মনে আসছিল। ওই গাছে-বসা ও উড়ে-যাওয়া পাখিদের মতো আমার ভাবনাগুলোও আসা-যাওয়া করছিল।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে এখনও অনেক আশা আছে। দূরত্ব, কোনো দূরত্বই প্রকৃতিকে তেমন করে পৃথক করতে পারেনি। পারেনি মানুষকেও। বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভাষা ভিন্ন হয়েছে, এই পাখিদের ডাকেরই মতো, পোশাক বিভিন্ন হয়েছে এই পাখিদেরই পালকের মতো কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, মননের অধিকারে এবং মনুষ্যত্বের মূল পরিচয়ে এই বিপুলা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত গাঁথা রয়েছে একমালায়। যে-মালা মানুষ-সত্যর মালা। সে-সত্যর ওপর আর কোনো সত্য নেই। আর প্রকৃতি, তার গাছ-পালা, পাহাড়-নদী আকাশ-বাতাস সমেত এই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর অসীম অনন্ত অশেষ সত্তার প্রসন্ন ও বিরূপ প্রকাশে প্রকাশিত হয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন বারে বারে যে, একই অখন্ড অনন্তের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিঃশ্বাস-ফেলা ও প্রশ্বাস-নেওয়া অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন দাম্ভিক কীট আমরা। আমরা পথ, রথ ও মূর্তিকে দামি ভেবে নিয়ে আমাদের বুকের ভেতরের ন্যক্কারজনক, নুজ আত্মমগ্নতায় নিমজ্জিত থেকে অন্যক্ষেত্রে নিজেদেরই দেব বলে মনে করছি।

কুয়াশা-ভেজা আলতো-সবুজ আদুরে-নরম ঘাসে ঘাসে ভরা এই প্রান্তর, তার ওপরে চরে বেড়ানো নানা-রঙা টাট্ট-ঘোড়া, পাখির ডাকের সঙ্গে মিশে যাওয়া তাদের হে রব, প্রথম প্রবাসের ভোরের কুয়াশার গন্ধ, সব মিলিয়ে এই নিরিবিলি সকালে বড়ো একটা নিষ্পাপ দাবি-দাওয়াহীন আনন্দে আমার মনটা ভরে দিয়েছে। এমন আনন্দ হঠাৎ-হঠাৎ কিন্তু ক্কচিৎ অনুভব করা যায়। এ ভারি একটা গভীর আনন্দ, নিছক বেঁচে থাকার আনন্দ, চোখে দেখতে পাওয়ার আনন্দ, নাকের ঘ্রাণের আনন্দ ও সবচেয়ে বড়ো এক গা-শিরশির করা কৃতজ্ঞতার আনন্দ।

এই কৃতজ্ঞতা কার কাছে জানি না। কিন্তু এই কৃতজ্ঞতা বোধটা যে সত্যি সেকথা জানি। এই ক্ষণিক কৃতজ্ঞতার বোধের মধ্যে দিয়ে আমার মতো কতশত পাপী-তাপী মানুষ যে উত্তরণের সোনার দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে তা কে জানে? একজন নিশ্চয়ই জানেন। আর কেউ জানুন আর নাই-ই জানুন।

স্মিতা ঘরে এসে বলল, কী ব্যাপার? এত সকাল সকাল রবিরার ভোরে?

আমি বললাম, ক-টা দিনই বা আছি এখানে? যে-কটা দিন আছি, ভালো করে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি। বেশি ঘুমিয়ে কী হবে?

চা খেয়েছ?

না।

দাঁড়াও, করে আনছি।

ঘর থেকে চলে যাবার সময়ে স্মিতার ঠোঁটের কোণে একটু মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

বুঝলাম ঠোঁট বলছে, ভাসুর আমার বড়ো কুঁড়ে।

আসলে, এখানে আসা-ইস্তক স্মিতা আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে ভালো করে সব ট্রেনিং ট্রেনিং দিয়ে দিয়েছিল। সত্যি কথা বলতে কী, দেশ থেকে বিদেশের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধবরা হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাচ্ছে বলে আমাদের যে একটা ধারণা বরাবরই থাকে সেটা পুরোপুরি ভুল। এখানে রান্না করাটা আর রান্নাঘরে সময় কাটানো একটা আনন্দ বই নয়। এত সুন্দর সব বন্দোবস্ত, এত চমৎকার বহুবর্ণ বাসনপত্র, এবং কিচেন প্যানট্রির সাজ-সরঞ্জাম যে রান্না করতে সকলেরই ইচ্ছে করে।

একথা এই ভরসায় বলছি যে, এই অপদার্থ যে নিজে কুল্লে শুধু চা, ওমলেট এবং তেঁতুলের মধ্যে লেবুপাতা কাঁচালঙ্কা ফেলে ডলে-টলে নিয়ে বানানো দারুণ একটা শরবত ছাড়া কিছুই বানানো জানে না সেই তারও যখন রাঁধবার শখ হয়, তখন অন্য অনেকেরই বিলক্ষণ হবে।

এখানে চা বানানো একটা ব্যাপারই নয়। হিটারের ওপর সুন্দর কেটলিতে প্যানট্রির বেসিনের কল থেকে জল ভরে নিয়ে চাপিয়ে দিলেই হল। হাই করে দিলে, কিচেন থেকে বেরিয়ে একবার বসার ঘরে দাঁড়ালেই শোনা যাবে কেটলির জল ডাকতে শুরু করেছে। তখন ফিরে গিয়ে একটা করে টি-ব্যাগ সুতো ধরে কাপের মধ্যে ফেলে জল ঢাললেই চা। তারপর দুধ চিনি মিশিয়ে নিলেই হল।

কিন্তু আমার ভাদ্রবউ বড়ো ভালো। লানডানে থেকেও সে আমাকে একেবারে প্রাগৈতিহাসিক বাঙালি যৌথ-পরিবারের ভাসুরের মতো যত্ন-আত্তি করছে। পান থেকে চুনটি খসবার জো-টি নেই। ওদের সময় ও অবকাশ এতই অল্প এবং সেই অবকাশে এত কিছু করবার থাকে যে, তার মধ্যে অতিথি সেবা করা সত্যিই মুশকিল।

আমার পক্ষে উচিত ছিল যে ওদের বাসন-টাসন ধুয়ে অথবা অন্যান্য নানা ব্যাপারে ওদের একটু সাহায্য করা। সাহায্য যে করিনি এ নিয়ে আমার ভায়া শোবার ঘরের বন্ধ দরজার আড়ালে ভ্রাতৃবধূকে এই ইনকনসিডারেট দাদা সম্বন্ধে কিছু বলেছে কি বলেনি তা ভায়াই জানে।

কিন্তু বলে থাকলেও, দাদার চরিত্রের যে কিছুমাত্র পরিবর্তন সাধিত হত, তা দাদার মনে হয় না। আমার মতো কুঁড়ে ও আরামি লোক বাংলাদেশেও পাওয়া মুশকিল। হালের বাংলাদেশ নয়। পুরোনো পুরো বাংলার কথা বলছি। এই ব্যাপারে ছোটোবেলায় আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার এক বন্ধুর দাদামশায়। তিনি লাইব্রেরি ঘরে বই পড়তে পড়তে গড়গড়া খেতেন। কখনো যদি গড়াগড়ার নল অন্যমনস্কতার কারণে হস্তচ্যুত হত, তাহলে তিনি তা কখনো নিজে হাতে তুলতেন না। পুরো নাম ধরে কোনো খিদমদগারকে ডাকতেও তাঁর অত্যন্ত পরিশ্রম বোধ হত। এমনকি কে আছিসরে-এত বড়ো একটা বাক্য বলার নিষ্প্রয়োজনীয় মেহনতও তাঁকে কখনো করতে দেখিনি।

অন্যমনস্কতা ও কুঁড়েমিরও একটা দারুণ নেশা আছে। রইসিও আছে। সেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি যেন দূর জগৎ থেকে ডাক দিতেন–রে। শুধু রে।কে রে পর্যন্ত নয়।

ডাকামাত্র কেউ-না-কেউ দৌড়ে এসে তাড়াতাড়ি গড়গড়ার নলটা তুলে দিত তাঁর হাতে। নলটা আঙুলের মধ্যে পুনঃপ্রবেশ করার ঘটনাটাও তাঁর স্বর্গীয় আলস্য ও উদাসীনতাকে কিঞ্চিত্মাত্র ব্যাহত করত না। কিছুক্ষণ পর শব্দ শোনা যেত আবার ভুড়ুক ভুড়ক। খোলা দরজা দিয়ে এসে সারাবারান্দা ভরে দিত অম্বুরী তামাকের গন্ধ।

আমি তো দীনাতিদীন! বাঘা বাঘা লোকেরাও এই আলস্যর জয়-জয়কার করেছেন। বাট্রাণ্ড রাসেল তাঁর ইন প্রেইজ অফ আয়ডনেস বইয়ে কেমন যুক্তি-তক্কো দিয়ে ব্যাপারটার গুণাবলি বুঝিয়েছেন।

স্মিতা চা এনে দিয়েছিল।

আমি সবুজ মাঠে সম্পূর্ণ বিনা কারণে লক্ষমান ঘোড়াগুলোর দিকে চেয়ে চা খেতে খেতে আলসেমির চূড়ান্ত করছিলাম।

এখানের সবুজের সঙ্গে আমাদের দেশি মাঠঘাটের সবুজের তফাত আছে। ভালো করে কালি দিয়ে পালিশ-করা কালো চামড়ার জুতো আর কালো ক্যাম্বিসের জুতোর রঙে যে তফাত এই সবুজ ঔজ্জ্বল্যের তফাত অনেকটা সেরকম। তবে ম্যাটমেটে নয় ঠিক রংটা। ইংরেজি লাশ গ্রিন শব্দটাই এই সবুজত্বের একমাত্র অভিব্যক্তি। এ সবুজটা কেমন যেন নরম সবুজ, অনেকটা জাপানি চিত্রকরের ওয়াশের কাজের ছবির মতো ব্যাপারটা।

এই সবুজের বুকে লাফিয়ে-বেড়ানো টাটুঘোড়াগুলোকে দেখে মনে হয় ইংরেজি নার্সারি রাইমের ছবিওয়ালা বই থেকে সটান উঠে এসেছে ওরা। যে সব বইয়ে

রিঙ্গা রিঙ্গা রোজেস,
পকেটফুল অফ পোজেস

ইত্যাদি কবিতা ছাপা থাকে।

নার্সারি রাইমের কথা মনে হওয়ায় আমিও প্রায় ছোটোবেলায় ফিরে গেছিলাম, এমন সময়ে টবী উঠে এল এঘরে।

বলল, গুডমর্নিং রুদ্রদা। জানলার সামনে কী করছ?

আমি বললাম, এটা কী গাছ রে?

টবী বলল, এটা একটা গাছ।

কী গাছ?

টবী বলল, খী খারবার! আমি কি কবরেজ নাকি? গাছ-পাতা এসব চিনি না। গাছ; ব্যাস গাছ। পারোও বাবা তুমি।

তারপরই টবী বলল, প্রেমের গল্পে গাছের কোনো ভূমিকা আছে?

আমি চমকে উঠলাম। প্রথমে ভয় পেলাম, তারপর সপ্রতিভ গলায় বললাম নিশ্চয়ই আছে।

টবী অনেকক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে পুরু লেন্সের চশমার মধ্যে দিয়ে চেয়ে থাকল। একটা হাই তুলল মস্ত বড়া। রাতে বোধহয় আমার ভাদ্রবউকে খুব আদর-টাদর করেছে।

তারপর একেবারে হঠাৎই বলল, তোমার গল্পের নায়করা গাছে ঝোলে গলায় দড়ি দিয়ে?

আমি অত্যন্ত বিপন্ন মুখে টবীর দিকে চেয়ে রইলাম।

ম্যাদামারা বাংলা সাহিত্যের প্রতীক এক ম্যাদামারা প্রেমের গল্প-নিকিয়ের কপালে যে এমন বিপদও লেখা ছিল তা কি আমি জানতাম?

আসলে শুধু টবী নয়, গাছগাছালি সম্বন্ধে খুব কম লোকেরই আগ্রহ থাকে। জীবনের অন্যান্য অনেকানেক ক্ষেত্রে অসম্ভব কৃতী লোকদেরও এ বিষয়ে উদাসীনতা আমাকে প্রায়শই মর্মাহত করে। কিন্তু জীবনে মর্মাহত হবার এতরকম কারণ থাকে যে, গাছগাছালির কারণে বেশিক্ষণ মর্মাহত হয়ে থাকা যায় না।

লানডানের টিউব ট্রেন যেখানে মাটির ওপর দিয়ে গেছে সেখানেই অনেক জায়গায় চোখে পড়ে ম্যালাস্কিগঞ্জে শীতকালে ফুটে-থাকা হলুদ ফুলের মতো ফুলের ঝোঁপ। অসংখ্য ফুল ফুটে আছে এখানে ওখানে। এখানে এ ফুলগুলোকে কী বলে, তা জানি না। টবীর বাড়ির পাশের বড়ো গাছটার নামও জানি না। জানতে পেলে খুশি হতাম। অবশ্য পৃথিবীর তাবৎ গাছের নাম যাঁরা জানেন, তাঁরা উদ্ভিদবিজ্ঞানী। যাঁরা নাম-না-জেনেও তাবৎ গাছপালা ফুল লতাকে ভালোবাসেন তাঁরা কবি। তফাত হয়তো এইখানেই; এইটুকুই।

পথের পাশে খয়েরি ও গাঢ় লাল ওয়াইল্ড-বেরির ঝোপে ঝোপে ডালগুলো ভরে আছে। আমাদের কুমায়ু পাহাড়ের কাউফলের মতো। পাশে পাশে নুয়ে আছে উইপিং-উইলো। উইলো গাছদের দাঁড়িয়ে থাকা আর নুয়ে-পড়ার হালকা আলতো ভঙ্গির মধ্যে বড়ো একটা নারীসুলভ কমনীয়তা আছে। গা ঘেঁষে দাঁড়াতে ইচ্ছে যায়। ভালো লাগে।

ততক্ষণে দু-কাপ কফি খেয়ে ভায়া আমার মুডে এসেছিল।

বলল, এসব লেখক-ফেখক লোকদের বেশিক্ষণ একা থাকতে দিয়ো না স্মিতা। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, চলো বেরিয়ে পড়া যাক।

শুধোলাম, কোথায়?

যেখানে দু-চোখ যায়।

তারপর একটু ভেবে বলল, কোথায় যাবে এল? চলো স্ট্র্যাট-ফোর্ড-অন-অ্যাভন-এ ঘুরিয়ে আনি।

বললাম, তা মন্দ হয় না, শেক্সপিয়রের জন্মস্থান। না গেলে জংলিপনা হয়।

টবী বলল, শেক্সপিয়র? সেডা আবার কেডা?

বললাম, তা জানি না, ছোটোবেলায়, কট্টর বাংলা ভাষায় লেখা এক প্রবন্ধে পড়েছিলাম, শেক্ষপিয়র এবং মোক্ষমুলার।

স্মিতা হেসে উঠে বলল, মোক্ষমুলার কী?

আমি উত্তর দেবার আগেই টবী বলল, বুঝেছি, ম্যাক্সমুলার।

তারপর বলল, জ্বালালে দেখছি।

স্ট্রাটফোর্ড-অন-অ্যাভন মিডেকস থেকে ঠিক কত দূর এখন আমার মনে নেই। তবে গাড়িতে বেশ কিছুটা পথ।

পরিজ, জোড়া-ডিম, তামাটে কড়কড়ে-চুরমুরে করে বেকন ভাজা, একেবারে ক্রিসপ টোস্ট। তার ওপর সদয় হাতে মাখন মার্গারিন ও মধু মাখিয়ে জমজমাট খেয়ে উঠলাম। পুরোপুরি ইংরিজি কায়দায়।

স্মিতা বলল, কটেজ-চিজ আছে। খাবে রুদ্রদা?

আমি বললাম, না। ভালো লাগে না।

টবী বলল সে কী? কটেজ-চিজ ভালো লাগে না কীরকম? আমরা তো প্রতিবার দেশে ফেরার সময় সকলেই এই অনুরোধ করে যে, একটু কটেজ-চিজ নিয়ে এসো।

স্মিতা বলল, কেন? ভালো লাগে না কেন?

বললাম, গন্ধ লাগে। আমার মনে হয় বেশি চিজ খেয়ে খেয়েই সাহেবদের গায়ে বোকা পাঁঠার মতো গন্ধ হয়।

স্মিতা হাসল। বলল, মোটেই নয়।

টবী বলল, অবজেকশান। তুমি সাহেবদের গায়ের গন্ধ শুকলে কবে? আমার গায়ে তো শুনি লেবুপাতারই গন্ধ।

স্মিতা রাগের হাসি হেসে বলল, তোমায় কে বলেছে?

তুমিই বলেছ। আবার কে বলবে?

এত অসভ্য না!

বলেই ধরা-পড়া মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল স্মিতা, তৈরি হয়ে নিতে।

রবিবারের বাজার। ডাঁই-করা খবরের কাগজ ঘরের মধ্যে। রবিবাসরীয় সংখ্যা যে কী জিনিস নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। আগে যখন এখনকার থেকেও আমার বুদ্ধি কম ছিল তখন ভাবতাম যে, সায়েবরা কত পড়ে। যে জাত একরবিবারেই হাজার পাতা কাগজ পড়ে শেষ করে দেয়, সে-জাত পৃথিবীময় প্রতাপ খাটাবে না তো কারা খাটাবে?

এখানে এসে এদের কায়দাটা জানা গেল। একটা কাগজের রবিবাসরীয় সংখ্যায় তো থাকবে না এমন জিনিস নেই। ধরা যাক বিশেষ সংখ্যাটি পঞ্চাশ পাতার। তার মধ্যে সাহিত্য, গান-বাজনা, মারধর, গোয়েন্দা-গল্প, রোমাঞ্চ গল্প, শ্লীলতাহানির বিবরণ, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, ফুটবল, জাজ-মিউজিক, হিপিদের হিক্কাধ্বনি, এ-হেন বিষয় নেই যে নেই। সায়েবরা জমিয়ে ব্রেকফাস্ট ট্রেকফাস্ট খেয়ে কাগজের পাতায় পাতায় চোখ দুটোকে ফড়িং-এর মতো নাচানাচি করিয়ে কিছুক্ষণ পরেই নামিয়ে রেখে দেবেন। কেউ কেউ নিশ্চয়ই বেশিক্ষণও পড়বেন, কিন্তু শুধুই নিজের ভালোলাগার বিষয়টুকুই। স্বাভাবিক। কেউ দেখবেন সিনেমার পাতা, কেউ খেলা।

টবী টেলিভিশান খুলল। এখানে প্রায় সকলেরই রঙিন টেলিভিশান। শীতের দেশে টেলিভিশনের গুণের তুলনা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে টেলিভিশান লোকের ভালো যেমন করবে খারাপও করবে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনোর বিঘ্ন ঘটবে, এবং অনেকেরই মেদবৃদ্ধি, গেঁটে বাত এবং আরথ্রাইটিস হবে ঘরে বসে।

এইসব দেশে সন্ধের পর এত ঠাণ্ডা লাগে যে, বাইরে বেরিয়ে পায়জামা আর ফিনফিনে পাঞ্জাবির সঙ্গে চটি ফটাস ফটাস করতে করতে দু-খিলি অ-খয়েরি গুণ্ডিমোহিনী পান মুখে ফেলে যে অফিস থেকে ফিরে পথেঘাটে একটু সুন্দর মুখটুখ দেখে বেড়াবেন কেউ, সে উপায়টি নেই। বেঁচে থাকুক আমার দেশ। এদেশে ঘরের মধ্যে কুঁকড়ে-বসে টেলিভিশন দেখা ছাড়া আর কী করার আছে?

সামনেই ইংল্যাণ্ডের সাধারণ নির্বাচন।

টেলিভিশনে মি. হ্যাঁরল্ড ইউলসন, ইংল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী নিজের দলের বক্তব্য রাখলেন, তারপই মি. এডওয়ার্ড হিথ তাঁর দলের বক্তব্য রাখলেন।

হ্যারল্ড উইলসন ভদ্রলোকের বহুদিনের অ্যাডমায়ারার আমি। ভালো লাগে, তাঁর বাগ্মিতা, বুদ্ধিমত্তা, রসবোধ। তাঁর বুদ্ধিমাজা পাইপ-খেকো চেহারারও ভক্ত আমি খুব।

কিন্তু টবী বলল, সাধারণ ইংরেজের ধারণা এই-ই যে, এবার মি. উইলসনের দল জিতলে সর্বনাশ হয়ে যাবে, কারণ মি. উইলসন সাহেবের দয়ামায়ায় দেশের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে, চাকরি-বাকরির অভাব; প্রচন্ড মুদ্রাস্ফীতি। সাধারণ ইংরেজ নাকি আর পারছে না। এবারে মি. ইউলসনের দলের জারি-জুরি নাকি আর চলবে না।

টবীর কথা যে ভুল তা প্রমাণ করে মি. উইলসনই পুনর্বহাল হয়েছিলেন আমি ক্যানাডায় থাকাকালীন, কিছুদিন পরই। তাঁর দলই জিতল।

মি. উইলসন সম্বন্ধে একটা গল্প শুনেছিলাম একজন ভারতীয়র কাছে, ভিক্টোরিয়া স্টেশানে; ডেভারের ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে। মি. উইলসনের গাড়ি ট্রাফিক পুলিশের আলো অমান্য করেছিল বলে পুলিশ টিকিট দিয়েছিল তাঁকে। পরদিন কোর্টে গিয়ে জরিমানা দিয়েছিলেন তিনি। গণতন্ত্রে এবং প্রকৃত গণতন্ত্রে নাকি এমনই হওয়ার কথা!–সেই ভারতীয় বলছিলেন ওখানে নাকি অমনই হয়। সেটাই নাকি নিয়ম। এই আমি সেই গল্প শুনে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিলাম, আমাদের দেশে তো প্রধানন্ত্রী বড়ো কথা, রাজ্যের ছোটোখাটো মন্ত্রীদেরই আইন অমান্য করার বহর দেখলে আমাদের লজ্জা হয়। আমাদের হয়, কিন্তু ওঁদের হয় না। স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষে, লজ্জা থাকলে নেতা হওয়া যায় না।

প্রধানমন্ত্রী কলকাতা এলে বাস ট্রাম প্রাইভেট গাড়ির যাত্রীদের কপালে বহুদুর্ভোগ লেখা থাকে। আমার দেশে আইনের যাঁরা প্রকাশক তাঁরাই সবচেয়ে বেশি আইন ভাঙেন। পুলিশের গাড়ি যেখানে সবচেয়ে বেশি ট্রাফিক রুলস লঙ্ঘন করে, সরকারের সঙ্গে কোনোমতে যুক্ত থাকলেই যে দেশে আইন-শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানো যায়–সেই আশ্চর্য স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের স্তব্ধ ও মূঢ় নাগরিক হয়ে, ইংল্যাণ্ডের গণতন্ত্রের রকম দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। কবে যে আমাদের দেশেও ভোটের চেয়ে দেশসেবা বড়ো হবে, গদির চেয়ে আন্তরিকতা ও সততা উচ্চতার আসনে বসবে কে জানে? যাঁরা ভোট পান তাঁরা কবে ভোটদাঁতের সেবক বলে ভাবতে শিখবেন? কবে? আমাদের জীবদ্দশায় তা কি দেখতে পারব? নাকি এ জীবন এই হাস্যোদ্দীপক, ন্যক্কারজনক, দুঃখময় ভোটরঙ্গ দেখেই কেটে যাবে?

স্মিতা সেজেগুজে বেরিয়ে বলল, চলো। আমার হয়ে গেছে। ফ্ল্যাট বন্ধ করার আগে, ব্যাগের মধ্যে স্যাণ্ডউইচ বানিয়ে ভরে নিল। আপেল নিল ক-টা। বলল, অ্যাভন নদীর পাশে বসে গাছতলায় রাজহাঁসের সাঁতার কাটা দেখতে দেখতে লাঞ্চ খাব আমরা এই দিয়ে।

টবী বলল, সর্বনাশ করেছে! তুমি দেখি কবির মতো কথা বলতে আরম্ভ করলে?

স্বাভাবিক। আমি বললাম।

লিফটে ঢুকতে ঢুকতে টবী বলল, কেন? স্বাভাবিক কেন?

বললাম, উদ্ভিদবিজ্ঞানে একটা কথা আছে শুনেছি, অ্যাকোয়ার্ড ক্যারেকটারিস্টিকস। –মানে তুই যদি একটা কলাগাছকে আনারসের বনের মধ্যে পুঁতে দিস তাহলে দেখবি বছর। কয়েক বাদে কলাগাছের পাতাগুলো প্রায় আনারসের পাতার মতো চেরা-চেরা হয়ে যাচ্ছে।

টবী হো হো করে হাসল।

বলল, খী-খারবার।

তারপরই বলল, কী বুঝলে স্মিতা? বুঝলে কিছু?

স্মিতা বলল, হু।

টবী বলল, ঘোড়ার ডিম বুঝলে। গল্প-নিকিয়ে দাদার কায়দা বোঝোনি–ঘুরিয়ে তোমাকে কলাগাছ বলল।

কী খারাপ? বলে স্মিতা খুব গরম কফিতে আচমকা চুমুক দিয়ে ফেলার আওয়াজের মত একটা আওয়াজ করল।

আমি বললাম, যদি বলেই থাকি, তাহলেই বা আপত্তি কীসের? মাঙ্গলিক ব্যাপার রীতিমতো। কালিদাসের বর্ণনায় তো কদলীকান্ডবৎ ঊরু-টুরুর কথা লেখাই আছে। কলাগাছ কি খারাপ?

টবী গাড়ির দরজার লক খুলতে খুলতে বলল, খী-খারবার।

এ কীরকম ভাসুরঠাকুর? তুমি কি ভাদ্ৰবউ-এর ঊরু-টুরু এরই মধ্যে দেখে ফেলেছ নাকি?

এবার আমি আর স্মিতা একইসঙ্গে বললাম, অ্যাই টবী! কী হচ্ছে কী?

টবী নির্বিকার।

বলল, আজ সকাল থেকে হাওয়াটা বড়ো কনকনে। গাড়ি অবধি এসে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ঠাণ্ডা মেরে গেছি। সোয়েটারটাও ভীষণ পাতলা। তাই একটু উরু-টুরুর আলোচনা করে গা-গরম করছি এই-ই যা।

গাড়ির মধ্যে হিটার চালিয়ে দিল টবী।

হু-হু করে ছুটে চলল গাড়ি। সামনে মিয়া-বিবি। বিবির গায়ের সুন্দর পারফিউমের গন্ধে গাড়িটা ভরে আছে আর মিয়ার গায়ের নেবুপাতা গন্ধ।

পথের এপাশে অনেকগুলো লেন ওপাশে অনেকগুলো লেন। মুখোমুখি ধাক্কা লাগার কোনোই সম্ভাবনা নেই। যে-গাড়ি অপেক্ষাকৃত বেশি জোরে চলছে সে-গাড়ি সবচেয়ে বাঁ দিকের লেন দিয়ে যাবে। ইংল্যাণ্ডের পথের নিয়ম আমাদের দেশের মতো। রাইট-হ্যাণ্ড ড্রাইভ গাড়ি এবং কিপ টু দ্য লেফট নিয়ম। অ্যাসফাল্টের একটি লেন। বাঁ-দিকেও ওরকম আছে। একেবারে ডানদিকে পার্কিং-এর জন্যে বা থেমে থাকার জন্যে। এখানে বলে সফট শোল্ডার। লেনগুলো সব কংক্রিটের। এক লেন থেকে আরেক লেন পৃথক করা হয়েছে আগাগোড়া মাইলের পর মাইল রাস্তায় সাদা দাগ দিয়ে। তার ওপরে ওপরে ক্যাটস-আই। রাতের বেলায় হেডলাইটের আলোয় জ্বলে।

হু-হু করে গাড়ি ছুটছে। গাড়ির কাঁচ তোলা বলে বাইরের দৃশ্য ছাড়া গন্ধ-স্পর্শ কিছুই পাবার জো নেই। এইদিক দিয়ে আমাদের দেশ বড়ো ভালো। কেমন কাঁচ নামিয়ে দিব্যি হাওয়া-বৃষ্টি খেতে খেতে যাওয়া যায়।

একটা কালো রোলস-রয়েস গাড়ি টবীর গাড়ির সামনে সামনে যাচ্ছিল। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই–লেন চেঞ্জ করে বাঁ-পাশের লেন থেকে টবীর গাড়ি যে লেনে ছিল সেই লেনে এল।

হঠাৎ টবী হর্ন বাজাল, পিক। কিন্তু মাত্র একবারই বাজাল।

হর্ন বাজাতেই প্রথম খেয়াল হল যে, এতাবৎ এই স্লেচ্ছদের দেশে আসা ইস্তক একেবারেই গাড়ির হর্ন শুনিনি। ঠাণ্ডা দেশে এসে কানের কোনো গোলমাল হল কি না ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়লাম। তারপর লাজলজ্জার মাথা খেয়ে বাঙাল দাদা তালেবর ভাইকে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, আচ্ছা, হর্নটা বাজালি কেন? তোর গাড়ির হর্নই শুনলাম। এতদিন খেয়াল করিনি একেবারেই যে, এখানের কোনো ড্রাইভার হর্ন বাজায় না।

টবী বলল, তুমি লক্ষ করেছ দেখছি। আসলে এখানে কোনো গাড়ি অন্য কোনো গাড়িকে উদ্দেশ করে হর্ন বাজানো মানে, তাকে বকে দেওয়া।

আমি বললাম, বলিস কী? বকে দেওয়া মানে?

মানে আর কী! অ্যাই চোপ, বোয়াদপ–গাড়ি চালাবার নিয়ম-কানুন না মেনে অসভ্যর মতো ইনকনসিডারেটের মতো গাড়ি চালাচ্ছ কেন?

এতক্ষণে মানে বুঝলাম।

এখানে আসার পর কনিসিডারেশন কথাটার মানে বুঝছি। সত্যি কথা বলতে কী, ইংরেজি অভিধানে যেসব কথা লেখা আছে সেগুলোর অনেকগুলোই ইংরেজদের কাছে শুধু কথামাত্র নয়–তার চেয়েও বেশি। এক-একটা কথার পেছনে ঐতিহ্যময় এক-একটা ইতিহাস আছে। সে ঐতিহ্য অবহেলা করার নয়, যে-জাত এত শো বছর তামাম দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘোরাল–সেই জাত আজকে গরিব এবং কোণঠাসা হয়ে যেতে পারে হয়তো কিন্তু অনেক কিছু শেখার আছে এখনও তাদের থেকে।

আমার বাবা বলতেন, পৃথিবীতে কোনো লোকই খারাপ নয়। খারাপ বলে কিছুই নেই দুনিয়ায়। যা খারাপতম, অন্ধকারতম যা; তারও একটা ভালো অথবা আলোকিত দিক থাকে। বলতেন, সবসময়ে সেই আলোকিত দিকটার দিকে তাকিয়ে থেকো–অন্ধকার দিকটাকে উপেক্ষা কোরো, তবেই বুঝতে পারবে এ পৃথিবীতে খারাপমানুষ কেউই নেই। খারাপ ব্যাপারও বেশি কিছু নেই।

বাবার এই দশলাখ টাকা দামি উপদেশ জীবনে কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি জানি না, কিন্তু উপদেশটা মনে হয় একেবারে ফেলা যায়নি। নইলে যে জাত আমাদের এত বছর শুষে গেল, নেটিভ নিগার বলে গাল পাড়ল গাণ্ডেপিণ্ডে, সে জাতের ভালোটাই কেন চোখে পড়ে আগে? আগে আগে বইপত্রে যা পড়েছি তা পড়েছি; কিন্তু এখানে এসে বুঝতে পারছি প্রতিমুহূর্তে যে, গণতন্ত্র বলে যদি এখনও কিছু থেকে থাকে তবে তা সবচেয়ে বেশি আছে এই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জেই। জানি যে, আছে কথাটা আপেক্ষিক। কানা-মামা নাই-মামার চেয়ে ভালো বলেই জেনে এসেছি চিরদিন। তাই বলতে হয়, আছেই। না থাকলে এত বছর অলিখিত সংবিধান নিয়ে এরা কেমন করে দিব্যি হেসেখেলে চালিয়ে গেল! ভদ্রতাও আছে, যা আমাদের এখনও শেখার!

আমরা স্বীকার করি আর নাই-ই করি এই ঠাণ্ডা দেশের লোকগুলোর গণতান্ত্রিক বিশ্বাস, আদালতের প্রতি সম্মানবোধ এবং আদালত ও প্রশাসনের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবধানকে মেনে চলার দৃষ্টান্ত অনেক দেশের সংবিধান রচয়িতাদেরই অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই যখন দেখি যে অনেক দেশেই সংবিধানটা যেন বারোয়ারি হরিসভার চালাঘরের চাল হয়ে উঠেছে, যে পাচ্ছে, সে-ই একখাবলা খড় উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে উনোন ধরাচ্ছে, তখন ভারি আশ্চর্য ঠেকে।

স্মিতা হঠাৎ চিন্তার-জাল ছিঁড়ে দিয়ে বলল, চকোলেট খাবে রুদ্রদা?

আমি হাত বাড়িয়ে চকোলেট নিয়ে মুখে পুরে আবার ভাবতে লাগলাম–বাইরে তাকিয়ে।

স্মিতা মুখ ফিরিয়ে, যোগিনীর মতো শ্যাম্পু-করা চুল দুলিয়ে বলল, কী ভাবছ বলো না রুদ্রদা?

অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম আমি।

স্মিতা আবার বলল, বল না বাবা!

বাপীর সঙ্গে অনেকানেক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার দেশের সঙ্গে এদেশের তুলনামূলক আলোচনা। মনটা খারাপ লাগে দেশের কথা ভাবলে। তখন কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তবুও স্মিতার পীড়াপীড়িতে বললাম, অনেকদিন আগে আয়নার সামনে বলে একটা গল্প লিখেছিলাম আমি। সেই গল্পের যে নায়ক, তার বাবা ছিল জমিদার। আমাদের দেশের দশজন জমিদার যেমন হয়ে থাকে। বাবার মৃত্যুর পর সে সমবায়িক ভিত্তিতে তার সমস্ত জমি প্রজাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে একসঙ্গে চাষ করে ফসল ভাগ করে নিত সমান করে। তার ইচ্ছে ছিল, দেশের জন্যে অনেক কিছু করে, ভালোবাসত সে তার দেশকে; দেশের লোককে।

আমার গল্পের নায়ক, উত্তরপ্রদেশের ছেলে রাজির অনেক ভাবত-টাবত। তার বাবা যে জলসাঘরে বাইজি নাচাত সেই জলসাঘরে সে চারটে কালো অ্যালসেশিয়ান কুকুর পুষেছিল। একজনের নাম দিয়েছিল মালিক; অন্যজনের নোকর। আর দুজনের নাম দিয়েছিল আমির আর গরিব। এই চারটে কুকুরকে রাজিন্দর খাইয়ে রেখে, না-খাইয়ে রেখে নানাভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কুকুরের বাচ্চাদের মধ্যে থেকে বাঘের বাচ্চার মতো নেতা জন্মায় কি না তাই দেখবার চেষ্টা করছিল।

স্মিতা আর টবী একসঙ্গে বলে উঠল এল না, তারপর কী হল তোমার গল্পের। নেতা জন্মাল?

আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, গল্পটা অনেক বড়ো। পুরোটা বলা যাবে না। বলে লাভও নেই।

স্মিতা বলল, তবুও এল। শেষে কী হল, বল।

আমি বললাম, শেষটা বলার মতো নয়।

তারপর বললাম, দেশকে ভালো-টালো বেসে দেশের লোককে ভাই-বিরাদর ভেবে শেষকালে রাজিন্দর বুঝতে পারল–ধীরে ধীরে বুঝল যে তা নয়, হঠাৎ ধাক্কা খেয়েই বুঝল যে, দেশকে ভালোবাসার মতো বোকামি আর নেই। বুঝল যে, কুকুরের বাচ্চাদের নেতা কখনোই বাঘের বাচ্চার মতো হয় না। একথা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বুঝে রাজির সেই আমির, গরিব, নোকর ও মালিক চার কুকুরকেই গুলি করে মেরে ফেলে নিজেও আত্মহত্যা করে মরল। মরে যাবার আগে অত্যাচারী, প্রজার-ঘামে ফুর্তি ঝরানো, পায়রা-ওড়ানো জমিদার বাবার জলসাঘরের কাঁচের দেওয়ালে হাতাশার আলকাতরা দিয়ে লিখে গেল রাজিন্দর যে, কুকুরের বাচ্চাদের নেতা কখনোই বাঘের বাচ্চা হয় না।

স্মিতা বলল, ঈ-শ-শ-শ!

টবী বলল, খাসা গল্প তো! এমন গল্প বানাও কী করে? যাকগে, ছাড়ো তো দেখি! এই সামনেই একটা ভিলেজ-পাব আছে–চলো একটু বিয়ার খাওয়া যাক। তোমার গল্প শুনে তালু শুকিয়ে গেছে–অন্যসব দিশি লেখকদেরও কি তোমার মতো ভীমরতি ধরেছে নাকি? প্রেমের গল্প ছেড়ে এসব কী কুকুর-মেকুর নিয়ে লেখা? ছ্যা ছ্যা:!

আমি লজ্জা পেলাম।

হঠাৎ টবী বলল, এই যাঃ, তোমাকে বলতে ভুলে গেছিলাম আমাদের এপথে আসার সময়ে ইটন-এর রাস্তা দেখলে না? ইটন ইংল্যাণ্ডের সবচেয়ে নাম করা পালবিক স্কুল জানো?

বললাম, তাই তো শুনেছি।

স্মিতা বলল, কেন? হ্যারোও সেরকমই ভালো। লর্ড ফ্যামিলির ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বড়ো ঘরের বড়ো বড়ো লোকের ছেলেরা এসব স্কুলে পড়ে। চিরদিন পড়েছে।

টবী শুধোল, আমাদের পন্ডিতজি যেন কোনটাতে লেখাপড়া করেছিলেন?

স্মিতা বলল, দুটোর মধ্যে একটাতে। কোনটাতে ঠিক মনে নেই।

স্মিতা বলল, ছাড়ো, সে কি আজকের কথা?

টবী গাড়িটা পথের ওপরের ছোটোখাটো পাবটার পাশে রাখল। লতানো জংলি গোলাপে ছেয়ে আছে দেওয়াল। কুঁড়ি ধরেছে লাজুকলাজুক। আরও নানারকম লতাতে সমস্ত সামনের দিকটা ছেয়ে আছে ছোটো সরাইখানার।

গাড়ি লক করে আমরা পাবের ভেতর ঢুকলাম। ভেতরে কুসুমগরম। আজ ছুটির দিন। এখানে ওখানে কিছু অল্পবয়েসি ছেলে জোট পাকিয়ে বসে, বিয়ার খাচ্ছে। মাঝ-বয়েসি একদল নারী-পুরুষ গোলটেবিলে জমিয়ে বসে পরনিন্দা-পরচর্চা করছে।

টবী বলল, জানো তো; ছোঁড়াগুলো মহাপাজি। বাড়িতে বউকে বলে আসবে ফুটবল খেলতে যাচ্ছি। ফুটবল খেলাটা ছুতো। বলের পেটে গোটাকয়েক এলপাথাড়ি লাথি মেরে গুচ্ছের বিয়ার গিলে দেরি করে বাড়ি ফিরে বউকে বলবে, বড়ো ক্লান্ত। খেলে এলাম।

স্মিতা বলল, আহা! কোন দেশের লোকে বউকে গুল না মারে?

টবী সঙ্গে সঙ্গে বলল, কেন? আমি মারি না।

স্মিতা হো-হো করে হেসে উঠল, তুমি আবার মারো না!

টবী কী যেন যেন একটা পানীয় নিল।

আমাকে বলল, কী খাবে তুমি?

আমি বললাম, তুই ত্রিফলা-ভেজানো জলের মতো দেখতে ওটা কী খাচ্ছিস?

টবী বলল, খী খারবার! ত্রিফলার জল কেন হবে, এটা এল!

সমারসেট মমের উপন্যাস কেকস অ্যাণ্ড এল-এ প্রথম এল-এর কথা পড়ি।

ভাবলাম, এই অভাগার কপালে যখন এল চাখবার সুযোগ এসেছে তখন চেখেই দেখা যাক।

আমি বললাম, আম্মো খাব।

তারপর বললাম, স্মিতা তুমি?

স্মিতা বলল, অ্যাপল জুস।

বললাম, তুমি এল খাও না? টবী তো মনে হচ্ছে ভালোবাসে।

স্মিতা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, শুধু এল কেন? ও তো এ থেকে জেড পর্যন্ত সব কিছুই ভালোবাসে।

আমি হাসলাম।

মুখের হাসি শুকোতে না শুকোতেই স্মিতা বলল, এতক্ষণ তো হ্যারো আর ইটনের গল্প খুব হল। তুমি কোন স্কুলে পড়তে রুদ্রদা?

আমি হ্যারো এবং ইটনের সঙ্গে একটুও পার্থক্য না রেখে একনিশ্বাসে বললাম, তীর্থপতি ইনস্টিটিউশান।

টবী ফিক করে হাসল। ওর মুখ চলকে এল গড়িয়ে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে চট করে বিলিতি কায়দায় বলল, এক্সকিউজ মি!

আমি সোজা ওর চোখে তাকিয়ে বললাম, তোর হাসি দেখে মনে হচ্ছে তুইও বোধহয় ইটনে বা হ্যাঁরোতে পড়তিস? পড়তিস তো তুই চেতলা বয়েজ স্কুলে–সে কি আমার স্কুলের চেয়ে অনেক বেশি ভালো?

টবী তখনও হাসছিল।

বলল, তা নয়; তখন আমরা বলতাম :

যার নেই কোনো গতি।

সে যায় তীর্থপতি।

আমি বললাম, খবরদার স্কুল তুলে কথা বলবি না।

স্মিতা খিলখিল করে হাসছিল।

আমার খবরদার শুনে চারদিক থেকে অনেক মোটা-রোগা সাহেব-মেম ড্যাব ড্যাব করে। তাকাল আমার দিকে।

আমিও উলটে তাকালাম। মনে মনে বিড়বিড় করে বললাম, তোমাদের নিয়ম তোমাদের নিয়ম, আমাদেরটা আমাদের। তোমরা পাত্তারি গুটিয়ে চলে আসার পর আমরা যে কী জব্বর সায়েব হয়েছি তা যদি তোমরা একটিবার আমাদের দেশে গিয়ে দেখতে বাবুসায়েব তবে তোমাদের আত্মশ্লাঘার আর শেষ থাকত না। কিন্তু আমি তো বাঙাল। বাঙালই আছি। তোমরা ভুরুই কুঁচকোও আর যাই-ই করো।

আসলে সাহেব-মেমগুলো ভীতু হয়। চোখে চোখে কটমট করে তাকালে ভয় পেয়ে যায়। আফটার অল আমরা কাঁপালিকের দেশের লোক–চোখে চোখে চেয়ে ভস্ম করে দেওয়াই বা আশ্চর্যি কী?

ওরা একটু তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল।

হঠাৎ আমি টবীকে শুধোলাম, আচ্ছা কাঁপালিকের ইংরিজি কী রে?

টবী কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল, তারপর উত্তর জানে না বলে বলল, একটু পরই তো শেকসপিয়রের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি, তাঁকেই জিজ্ঞেস কোরো না বাবা!

স্মিতাকে বললাম, আচ্ছা সাহেবদের গাত্রবর্ণের সঙ্গে সাঁতরাগাছির ওলের তুলনা কোথায় আছে বলতে পারো?

স্মিতার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বলল, দাঁড়ান দাঁড়ান; ভেবে নিই একটু।

পরমুহূর্তেই উত্তেজিত হয়ে বলল, প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক বইয়েতে পড়েছি।

আমি বললাম, সাব্বাস! জিতা রহো ভাদ্দরবউ!

সেই গাঁয়ের পাবটা থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ আসার পরই অ্যাভন নদী পেরিয়ে এলাম আমরা। পেরিয়ে এসেই গাড়ি দাঁড় করাল টবী।

গাড়ি দাঁড় করাতে কম ঝামেলা পোয়াতে হল না। গাড়িতে গাড়িতে অর্থাৎ কারে কারে কারাক্কার। তিল ধারণের স্থান নেই।

ওঃ, বলতে ভুলে গেছিলাম, এখানে এসে পৌঁছোবার আগে টবী বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাবার মতো পথিপার্শ্বে অক্সফোর্ডে নিয়ে গেছিল।

আমার, অন্যান্য অনেকানেক বাঙালের মতোই ধারণা ছিল অক্সফোর্ডও শান্তিনিকেতন কি বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সমৃদ্ধ ও একীভূত ব্যাপার। কিন্তু টবী যা বলল ও দেখাল তাতে দেখলাম বহু ছড়ানো-ছিটানো কলেজ। মানে একটি প্রকান্ড কলেজ-পাড়া। বহু পুরোনো সব স্যাঁতসেঁতে হিমকনকনে ইমারত। সঙ্গে হোস্টেল-টোস্টেল বা গির্জাটির্জাও আছে। এই সব বিভিন্ন কলেজ-ছাত্রাবাস ইত্যাদি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি।

সত্যি কথা বলতে কী দেখে রীতিমতো হতাশ হলাম। কাশীর বিশ্বনাথের মন্দিরের ভেতরে যেমন একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভয় ভয় ভাব–এখানেও তেমন। পান্ডাদের অত্যাচার আছে কি নেই অত অল্প সময়ে বোঝা গেল না। তবে আমার যে পিসির মেজোজামাই অক্সফোর্ডের এম এ বলে আমাদের সঙ্গে ঠোঁট বেঁকিয়ে কথা বলে এসেছেন চিরটাকাল, এবং আমাদের মুনিষ্যি বলেই গণ্য করেননি, তাঁর প্রতি এক হঠাৎ-ধিক্কারে মনটা ছাতারে পাখির মতো ছ্যা: ছ্যা: করে উঠল।

অ্যাভন নদীটি বেশ। নদী বলা ঠিক নয়। আমাদের কলকাতার কেওড়াতলার গঙ্গার চেয়ে সামান্য চওড়া। তবে রূপটি ভারি শান্ত; স্নিগ্ধ।

টবী বলল, কেমন বুঝছ?

আমি বললাম, দারুণ।

কী দারুণ?

জায়গাটা।

লোকটাও দারুণ। স্মিতা বলল।

এমন জায়গায় না জন্মালে শেক্ষপিয়র যক্ষপিয়রও হতে পারতেন।

দুম করে টবী বলল।

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, মুনি-ঋষিদের সম্বন্ধে এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলতে নেই।

টবী চটে গিয়ে বলল, কেন? নেই কেন? রবিঠাকুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে না জন্মে যদি কাকদ্বীপের কাঁকড়া-ধরা জেলের বাড়ি জন্মাতেন, তাহলে কি এই রবিঠাকুর হতেন?

স্মিতা কথা কেড়ে বলল, এই রবিঠাকুর না হলেও কাকদ্বীপের সেরা কবিয়াল যে হতেন সে বিষয়ে তোমার কোনো সন্দেহ আছে?

আমি চটে উঠে বললাম, তোরা থামবি? শেক্সপিয়রের বাড়ি কোনটা তা দেখাবি?

টবী দার্শনিকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় থুতনি নাচিয়ে বলল, As you like it.

স্মিতা হেসে উঠল। বলল, বাঃ বাঃ, স্ক্র্যাট-ফোর্ড-অন-অ্যাভনে এসে একবারে শেক্সপিয়রি ভাষায় কথা বলতে শুরু করলে যে!

টবী অনাবিল ও সারল্যময় অজ্ঞানতার সঙ্গে বলল, মানে বুঝলাম না। স্মিতা আমার দিকে কটাক্ষে চেয়ে বলল, কান্ডটা দেখলে রুদ্রদা। বুঝতে পারছ কী অকালকুষ্মন্ডকে বিয়ে করেছি?

টবী সেই নিষ্পাপ মুখেই বলল, খী খারবার! এ কী হেঁয়ালি রে বাবা।

স্মিতা কিণ্ডারগার্টেন ক্লাসের দিদিমণির মতো গলায় বলল, As you like it, শেক্সপিয়রের একটি বইয়ের নাম।

টবী একটুও অপ্রতিভ না হয়ে বলল, অ! তুমি পড়েছ বুঝি? তা পড়ে থাকবে। সাহিত্যের ছাত্রী ছিলে তুমি। কিন্তু Break-even point? মানে, না তুমি বলতে পারো, না তুমি পড়েছ। নাকি তোমার শেক্ষপিয়রই পড়েছিলেন?

বলেই বলল, অমন তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে লোককে হেয় কোরো না। সবাই সব জানে না।

আমি বললাম, এবারে কিন্তু সত্যিই তোরা ঝামেলা করছিস।

টবী কথা ঘুরিয়ে বলল, এসো, আমার সঙ্গে এসো। তোমাকে বাড়ি দেখাই।

কিন্তু সেই সরু রাস্তার ছোটোখাটো দোতলা কাঠের বাড়িতে ঢোকে কার সাধ্যি!

ট্যুরিস্ট বাসের পর ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা লাইন পড়েছে দর্শনার্থীদের।

টবী বলল, দাঁড়িয়ে পড়ো লাইনে। এখানে ইট পাতার সিসটেম চালু হয়নি এখনও।

আমি বললাম, নাঃ।

টবী বলল, এই জন্যেই তোমাকে ভালো লাগে রুদ্রদা। এ কী আদিখ্যাতা এল দেখি! তিনি কোথায় শুতেন, কোথায় বসতেন, কোন বাথরুমে যেতেন এসব দেখবার জন্যে এই যে গুচ্ছের সব মোটা মেমসায়েব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখছ তাদের বেশির ভাগের বিদ্যেই আমার মতো। তবু, শেক্সপিয়রের শোওয়ার ঘর না দেখলে যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত এদের। এও যেন নীলের ব্রত। না মানলে শাশুড়ি চটে যাবে। খী খারবার!

টবীর কথায় পুরোপুরি সায় না দিতে পারলেও একেবারে যে ওর কথা উড়িয়ে দেওয়ার তাও নয়। আমি অন্তত কখনো অমন বাথরুমে উঁকি দেওয়া ঔৎসুক্য বা ভক্তিতে বিশ্বাস করিনি। তার চেয়ে বরং চারপাশটা ঘুরে দেখা ভালো।

অ্যাভন নদীতে রাজহাঁস চরছিল। ছোটো ছোটো নৌকো ছিল চড়ার জন্যে। আজ থেকে বহুদিন আগের, শেক্সপিয়রের ছোটোবেলায় এই নদী, নদীর পারের উইলো গাছ এখন না দেখতে-পাওয়া উইণ্ডমিল সব কেমন ছিল তা কল্পনায় অনুমান করতে ভালো লাগে। এই ভালোলাগাটুকুই, পুরোনো অতীতের বেলজিয়ান কাঁচের আয়নার ভেঙে-যাওয়া টুকরো টুকরো কল্পনার আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তাকে দেখতে যত সুন্দর লাগে, আজকের সস্তা কাঁচের বর্তমানে তাকাতে ততখানি সুন্দর আমার কখনোই লাগে না। হয়তো নগ্ন বর্তমানের চেয়ে অস্পষ্টতার কুয়াশা-ঘেরা অপ্রতীয়মান অতীতই আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয় বলে।

তা ছাড়া সত্যি কথা বলতে কী, যদিও ভয়ে ভয়েই বলছি, শেক্সপিয়রকে আমি কখনোই রবিঠাকুর বা টলস্টয়ের সঙ্গে একাসনে বসাতে পারিনি। তিনি প্রকান্ড প্রতিভা ছিলেন সন্দেহ নেই। বহুমুখিনতা–তাতেও তাঁর জুড়ি পাওয়া ভার। কিন্তু যেহেতু আমরা ইংরেজশাসিত ছিলাম, সেইহেতু, ব্রিটিশ সার্জেন্ট-মেজর, স্কচ-হুঁইস্কি, কটেজ পিয়ানো গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক শেক্সপিয়রের চূড়ান্ত উৎকর্ষ সম্বন্ধে কারও কোনো দ্বিমত থাকতে পারে যে, একথা মনে করার মতো দুঃসাহস হয়তো আমাদের রক্তকণিকাতে কখনো সঞ্চারিত হয়নি।

আমার এই ধৃষ্টতায় যদি কোনো জ্ঞানীগুণী পাঠক ক্রুদ্ধ হন তাহলে পূর্বাহ্নেই মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। নিজগুণে তাঁরা মার্জনা করবেন আশা করি। যেটা বললাম, সেটা আমারই একান্ত মত। অর্বাচীন মূর্খের মতামতে পন্ডিতজনের উম্মার কারণ ঘটা উচিত নয়।

পথের দু-পাশে দোকান-পাট। ইংরেজ বেনেরা যেখানে পাচ্ছে বোকা ট্যুরিস্টদের পকেট কাটছে। এদের পকেট-কাটার নমুনা দেখে ইঁদুরের বালিশ ও কাগজ কাটার কথা মনে পড়ে যায়। ইঁদুরদের একটা দাঁত থাকে আত্মঘাতী দাঁত। প্রতিনিয়ত কাটাকুটি করে–সেই দাঁতকে তাদের ক্ষইয়ে ফেলতে হয়। নইলে সেই দাঁত তাদের মগজ ফুটো করে তাদের মরার পথ বাঁধিয়ে দেয়। অতএব প্রয়োজন থাকুক কি নাই-ই থাকুক, নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের অবিরাম লেপ, তোষক এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ইত্যাদি তাবৎ কাটিতব্য বস্তুকে কেটে যেতে হয়। ইংরেজদেরও বোধহয় এমন কোনো গুপ্ত দাঁত-টাঁত আছে। অন্যের পকেট অবিরাম না কাটলে তাদের মরার সময় যে ত্বরান্বিত হবে একথা তারা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে জেনে এসেছে। এতএব ঘরে-বাইরে কুটুর কুটুর কেটে যাচ্ছে ইংরেজ। খিদে থাক আর নাই-ই থাক।

হঠাৎ আমার সামনে দিয়ে একজন সায়েব কার্জন-পার্কের কান পরিষ্কার করনেওয়ালা বাহাদুরদের মতো একটা থলে-মতো নিয়ে, ককনী ভাষায় কী যেন কঁকিয়ে কঁকিয়ে বলতে বলতে চলে গেল।

আমি থমকে পড়ে টবীকে শুধোলাম, কী ও? কীসের ফেরিওয়ালা? হজমিগুলির?

টবী হাসল।

বলল, ওরা কি সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশ খায়, না বিরিয়ানি পোলাউ? খায় তো আলুসেদ্ধ, কপিসেদ্ধ। তারই গালভরা নাম ডিনার। বদ-হজমের ব্যারাম এদের নেই। এ পোকা-মাকড়, তেলাপোকা মারার কোনো ওষুধ-টষুধ হবে।

আমি বললাম, আসার আগে আমার খেয়াল হয়নি একবারও নইলে পেটেন্ট অ্যাণ্ড ট্রেডমার্কের পৃথিবীখ্যাত স্পেশ্যালিস্টস ডি. পেনিং এণ্ড ডি. পেনিং-এর পার্টনার রবার্ট ডিপেনিংকে বলে সুনির্মল বসুর ছারপোকা মারার ওষুধটা পেটেন্ট করে নিতাম।

স্মিতা বলল, ওষুধটা কীরকম?

বললাম, ওষুধটা হোমিওপ্যাথির শিশিতে বিক্রি হত। লাল-নীল-ওষুধ। সঙ্গে ব্যবহার বিধিও লেখা থাকত। নাম ছিল, ছারপোকা বিধ্বংসী পাঁচন। সঙ্গে ব্যবহারবিধিও থাকত। তাতে লেখা থাকত, সাবধানে ছারপোকা ধরিয়া মুখ হাঁ করাইয়া একফোঁটা গিলাইয়া দিবেন। মৃত্যু অনিবার্য।

ভাদ্রবউ-এর ছুটি শেষ হয়ে গেছে।

টবী তাকে যে কর্তব্য দিয়েছিল তা সে সুষ্ঠুভাবে সমাধা করেছে। বাঙাল ভাসুরঠাকুরকে পথঘাট চিনিয়ে দিয়েছে, লানডানারদের রাহানসাহান খাল-খরিয়াৎ সমঝিয়ে দিয়েছে। এবার সে তার কমপিউটারের কাজে ফিরে গেছে।

অফিস যাওয়ার আগে সেদিন সে শুদ্ধ ও পরিমার্জিত বাংলায় যা বলল তা খারাপ ভাষায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় যে টাটা-বাই-বাই, খোদার ষাঁড় এবার চরে-টরে খাও।

ফ্ল্যাটের একটা চাবি আমার কাছে আর একটা স্মিতা নিয়ে গেছে। টবী দেরিতে ফেরে। টবী ফেরার আগেই হয় আমি নয় স্মিতা ফিরে আসব বা আসবে।

টবী অফিস বেরোবার আগে ফিসফিস করে বলল, বেডরুমটা বন্ধ থাকবে তবে তোমার ঘর এবং ড্রইং রুম খোলা। ড্রইং রুমের মেঝেতে পুরু কার্পেট পাতা আছে–নরম সাদাটে সোনালি-রঙা বড়ো বড়ো রেশমি লোমওয়ালা ছাগলের চামড়াও পাতা আছে–তোমার শুধু কাউকে ধরে আনতে হবে। তারপর কোনোই কষ্ট হবে না। হাঁটু ছড়ে যাবার সম্ভাবনা নেই। ফার্স্ট ক্লাস বন্দোবস্ত।

আমি বোকার মতো হাসলাম।

আমার ভায়া তো জানে না যে আমার এলেম কতদূর। আমার সব গল্পের নায়কই একেবারে ওয়ার্থলেস। গল্পের নায়ক যখন নায়িকার বাড়ি যায় তখন নায়িকার স্বামী প্রায়শই অনুপস্থিত থকে। তবুও আমার নায়ক এমনই মরালিস্ট যে নায়িকার সুন্দর হাতে হাত রেখে নায়িকার বানানো চা শিঙাড়া-সহযোগে খেয়ে দুপুরবেলায় উদোম টাঁড়ে চড়ে বেড়ানো গরুর মতো প্রচন্ড শব্দ করে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সে নায়িকার বাড়ি থেকে চলে আসে। আমার গল্পের নায়কদেরই যখন এতটুকু সাহস নেই তখন গল্পকারের সাহস যে কতটুকু তা তো গল্পকারই জানে।

ওরা চলে গেলে ধীরে সুস্থে চা করলাম। চা বানালাম বার দুই। একার জন্যে আর ব্রেকফাস্টের ঝামেলা করলাম না।

নর্থ ওল্ট টিউব স্টেশান থেকে পিকাডিলি সার্কাসে পৌঁছেই একটা কান্ড হল। এক বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি হঠাই নার্ভাস আমাকে ধরে কেয়ারিনক্রসে কী করে যাবেন তা জিজ্ঞেস করলেন। ছাত্রাবস্থায় কেয়ারিনক্রসের ইকনমিক্সের বই পড়েছিলাম। সেই লেখকের সঙ্গে এ জায়গার সম্পর্ক আছে কি না বুঝলাম না?

অত্যন্ত বিজ্ঞের মতো তাদের সমঝিয়ে-টমঝিয়ে দিলাম।

ভদ্রলোক বিস্তর থ্যাঙ্ক-উ ট্যাঙ্ক-উ বলার পর ভোলা চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ তুলে শুধোলেন, হোয়ার উ ফ্রম?

পরবর্তী দিনগুলোতে এ প্রশ্ন বহুবার শুনতে হয়েছে।

কিন্তু প্রথমবার অবাক লাগল।

বললাম, ইণ্ডিয়া।

ভদ্রলোক বললেন, আমি তাই অনুমান করেছিলাম।

আমি বললাম, মশায়ের নিবাস?

ভদ্রলোক বললেন, আয়ারল্যাণ্ড। আমার বয়েস বাহাত্তর। সারাজীবন কাজ-কর্ম করে সস্ত্রীক এই প্রথম লানডানে এলাম। শহর দেখতে।

সেকথা শুনে বররমপুরের লোকের মতো আমার আবারও বলতে ইচ্ছে হল, বলেন কী গো আপনি?

কিন্তু বলা হল না।

নিজেকে খুব খুশি খুশি লাগল। আমি এই বয়েসেই যদি কলকাতা থেকে লানডান দেখতে এসে থাকতে পারি তাহলে এই বাহাত্ত্বরে আইরিশ বুড়ো-বুড়ির চেয়ে আমি যে বেশি ভাগ্যবান সে বিষয়ে সন্দেহ কী?

লানডানে টুরিস্টরা এসেই যা-কিছুকে প্রধান করণীয় কর্তব্য বলে মনে করে আমি তার কিছুই করলাম না। কারণ, আমার ভালো লাগে না। সবাই যা করে তা করতে আমার কখনোই ভালো লাগেনি।

রানির বাড়ির গার্ড বদল দেখতে গেলাম না, মাদাম তুসোর মোমের গ্যালারি দেখতে গেলাম না, বাকিংহাম প্যালেস, দশনম্বর ডাউনিং স্ট্রিট এমনকি শার্লক হোমসের বাড়ি পর্যন্ত না। কিছুই না করে পিকাডিলি সার্কাসের পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে এক ফিরিওয়ালার, যে একটা বন্ধ দোকানের শো-কেসের রকে বসে জাম্পিং-বিনস বিক্রি করছিল, পাশে থেবড়ে বসে পড়ে তার সঙ্গে গল্প জমালাম।

মানুষ সে যে-দেশের মানুষই হোক না কেন আমাকে যত আকৃষ্ট করে, তাদের সঙ্গে যত সহজে একাত্মতা বোধ করি; তেমন কোনো বাড়িঘর স্মৃতিসৌধ কিছুর সঙ্গেই কখনো করিনি। ইতিহাসের প্রতি আমার অবজ্ঞা নেই–কিন্তু অতীত-ইতিহাসের চেয়ে বর্তমানের একজন সাধারণ অজ্ঞাতকুলশীল মানুষ আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে। মানুষের চেয়ে বেশি ইন্টারেস্টিং মনুমেন্ট অথবা জীব-জন্তু আমার আজও চোখে পড়েনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি আমি অচেনা অজানা মানুষদের মধ্যে। তারা যত সহজে আমাকে আপন করে নিতে পারে অথবা আমি তাদের; সেটা খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।

সকলে বলেন যে, ইংরেজ জাতটা খুব রিজার্ভড়। কেউ পরিচয় না করিয়ে দিলে তারা কারও সঙ্গেই পরিচিত হতে চায় না। আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে যে কথাটা সর্বৈব ভুল। ওদের দম্ভ ও গাম্ভীর্যটা পুরোপুরি বাইরের মুখোশ। আমার মতটা নির্ভুল না-ও হতে পারে।

এ বিষয়ে ঠাণ্ডা মাথায় অনেক ভেবে-টেবে এই সিদ্ধান্তেই শেষপর্যন্ত উপনীত হওয়া গেল যে পৃথিবীর তাবৎ স্ত্রী-পুরুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একইরকম। রঙের কিছু হের-ফের আছে। সে নিছকই প্রাকৃতিক কারণে। যে-কারণে সুন্দরবনের বাঘের রং আর হাজারিবাগের বাঘের গায়ের রঙের তারতম্য ঘটে সেই একই কারণে মানুষদের গায়ের রং-তারতম্য ঘটে। তা ছাড়া মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে ধূসর-রঙা যে পদার্থটি ব্ৰহ্মসাহেব মগজে ইনজেকশান দিয়ে প্রত্যেক মানুষকে পৃথিবীতে পাঠান তাতে সাহেব ও বাঙালির মধ্যে কোনোরকম তারতম্য রাখেন না। পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষের বেসিক ইমোশান একইরকম। সে কারণে আফ্রিকান ওকাপীর পক্ষে, সাউথ আমেরিকার বাঁদরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমানো যতখানি কঠিন তার তুলনায় আমার পক্ষে একজন অপরিচিত ইংরেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমানো ঢের সহজ।

তবে সায়েবগুলো ছোটোবেলা থেকে যাত্রাটা ভালো করতে শেখে। ওদের বুদ্ধিসুদ্ধি সব বোগাস। ওরা বেনের জাত বটে কিন্তু কলকাতার বড়োবাজারের যে-কোনো মাড়োয়ারি ব্যাবসাদার বা নদিয়া জেলার পলাশিতে শিকড় গেড়ে বসা পূর্ববঙ্গের যে-কোনো সাহাবাবু এদের কানে ধরে বেনে-বুদ্ধি শিখিয়ে দিতে পারে।

সত্যি কথা বলতে কী এদের খুব কাছ থেকে দেখার পর আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে কি করে এরা আমাদের ওপর এতদিন প্রভুত্ব করে গেল!

মনে হয় প্রভুত্ব করাতে তাদের যতটুকু বাহাদুরি ছিল, দাসত্ব স্বীকারে আমাদের বাহাদুরি তার চেয়ে প্রবলতর ছিল। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক আছেন যাঁর ধমনিতে মাতৃকুল পিতৃকুলের জমিদারি নীল রক্ত বাহিত হচ্ছে বলে সকলে জানে। একদিন আমারই সামনে তাঁর বুড়ো আঙুলে পিন ফুটে যাওয়ায় রক্তপাত ঘটে। বিশেষভাবে লক্ষ করার পরও তাঁর রক্তের সঙ্গে কচ্ছপের রক্তের রঙের কোনো পার্থক্য আমার নজরে আসেনি।

তিনি এক সাহেবি কোম্পানিতে কাজ করেন। সাহেবরা পান খাওয়া অপছন্দ করেন বলেই তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও পান খান না। সেই কারণেই তাঁর অফিসে আমার যখনই যেতে হয় আমি ধর্মীয়ভাবে চারখিলি পান মুখে পুরে তাঁর কাছে যাই। তাঁর বাড়ির বারান্দায় এখনও ইংল্যাণ্ডেশ্বর ষষ্ঠ জর্জের গুফো ছবি টাঙানো আছে এবং তাঁর অন্নপ্রাশনের সময়ে বাংলার লাটসাহেব এসে যখন তাঁর ঊর্ধ্বতন চোদ্দপুরুষকে উদ্ধার করেছিলেন তখনকার সেই অনুষ্ঠানের ছবিও জ্বলজ্বল করছে। লাটসাহেব সেদিন না এলে সেই চোদ্দপুরুষের যে কী গতি হত তা ভাবলে মাঝে মাঝে শিহরিত হয়ে উঠি আমি।

এই সব দুষ্প্রাপ্য কিছু কিছু নিদর্শন কলকাতার নামকরা ক্লাবে মাঝে মাঝে দেখতে পাই। ভারতীয় গণ্ডার দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে এ যেমন দুঃখের খবর এই সব ক্ষণজন্মা পুরুষও যে শনৈঃ শনৈ: এদেশে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছেন এটা একটা সুখের খবর যে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে, বাংলাদেশে নেতাজি, বিধান রায়, বিনয়-বাদল-দীনেশ ক্ষুদিরাম, বীণা দাস যেমন ছিলেন তেমন এরকম পা-চাটা লোকেরও কখনো অভাব ঘটেনি। তাঁদের চরিত্রের প্রধান গুণ পদলেহন। এখন শ্বেতাঙ্গদের পা চাটতে পাচ্ছেন না সেই দুঃখ অন্যান্য অনেক পা চেটে পুষিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। যেদিন এই সব পদলেহনকারীদের মুখে জুতোসুদ্ধ লাথি মারার লোক জন্মাবে সেদিন এ দেশের বড়োই সুদিন আসবে।

অস্ট্রিয়ান এমব্যাসি খুঁজে বের করে ভিসা নেব এই অভিপ্রায়ে বেরিয়ে বাঁই বাঁই করে চক্কর খাচ্ছিলাম। এদেশে আমাদের দেশের মতো ভ্যাগাবণ্ড ভলান্টিয়ার নেই যে আকছার বিনি পয়সায় পথ-বাতলানোর লোক পাবেন।

একজন মহিলাকে সামনে পেয়ে পথ শুধোলাম। মহিলা সুন্দরী। আমারই সমবয়েসি। আমার প্রশ্ন শুনে থমকে দাঁড়ালেন। হাসলেন একটু। তারপর বললেন, একসেকেণ্ড দাঁড়ান। বলেই হাতব্যাগের মধ্যে থেকে লানডানের রোড ম্যাপ বের করে আমাকে পথ বাতলে দিলেন।

আমি ধন্যবাদ দেওয়ার আগেই উনি আবারো মিষ্টি হাসলেন। তারপর মেয়েলি লজ্জান গলায় বললেন, আমিও ট্যুরিস্ট। আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি কাল।

লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেল।

আসলে আমরা ছোটোখাটো ব্যাপারেও বড়ো অলস, পরর্নিভর। এটা আমাদের ভারতীয় চরিত্রের একটা বড়ো দোষ। যখন ওরা কোনো ব্যাপারেই কারও ওপরে নির্ভরশীল হওয়াকে লজ্জাকর বলে মনে করে আমরা আমাদের সব দায়িত্ব এমনকী পথচলার ও পথখোঁজার দায়িত্বটুকুও অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে শুধু নিশ্চিন্ত নই; আশ্বস্ত বোধ করি।

দূর থেকে দেখলাম একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। লানডানের পুলিশের নাম শুনেছি অনেক। এগিয়ে গিয়ে দেখি সাড়ে ছ-ফিট চেহারার মলাটে একটি বালখিল্য। ভালো করে দাড়ি-গোঁফ ওঠেনি। মাকুন্দও হতে পারে।

সাহেবরাও কি মাকুন্দ হয়? কে বলতে পারবে? জানি না। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা দেখলে হয়।

ছেলেটিকে গিয়ে পথ শুধোতেই সে তার সাড়ে ছ-ফিট জিরাফের মতো ঘাড় আমার পাঁচ সাড়ে-দশ মুখের কাছে নামিয়ে এনে মেলায়েম গলায় বলল, ইয়েস স্যার? হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ স্যার?

শুনে সুড়সুড়িতে মরে গেলাম। সায়েবরা স্যার স্যার করলে কী যে সুড়সুড়ি লাগে, কী বলব!

তাকে বললাম, আমার জিজ্ঞাসার কথা।

সে অত্যন্ত সপ্রতিভতার সঙ্গে বলল, সার্টেনলি স্যার। আই উইল শো ইউ দ্য ওয়ে স্যার। বলেই আমার কেনা গোলামের মতো আমার সঙ্গে সঙ্গে এক ফার্লং হেঁটে গিয়ে অস্ট্রিয়ান এমব্যাসি দেখিয়ে দিল। দিয়ে বলল, হিয়ার ইউ আর স্যার!

আমি বললাম, দেখো বাপু তোমাদের কথা ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি। আজ দেখে চক্ষু কর্ণ সার্থক হল। তোমার সোনার বেটন হোক, লাল টুকটুকে বউ হোক।

মনে মনে আরও অনেক কিছু বললাম, ছেলেটি শুনতে পেল না। কিন্তু সত্যিই বড়ো ভালো লাগল। পাবলিক সার্ভেন্ট এদেরই বলে; পাবলিক এদের সার্ভেন্ট নয়, এরা সত্যিই পাবলিকের সার্ভেন্ট।

পৃথিবীতে একমাত্র লানডানেই পুলিশের কাছে কোনো অস্ত্র থাকে না। অস্ত্রের মধ্যে একটা ছোটো বেটন আর বাঁশি। অন্যান্য সব দেশের পুলিশের কাছে রিভলবার বা পিস্তল থাকে। কখনো একাধিকও।

আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি দেশের প্রতিটি লোকের কতখানি সম্মান থাকলে খালি হাতে লানডানের পুলিশ ঘুরে বেড়াতে পারে রাত্রি-দিন তা সহজেই অনুমেয়।

ইংল্যাণ্ডে আসার আগে টবী বহুদিন জার্মানিতে ছিল। ওর সেই প্রথম দিককার কষ্টের দিনগুলোরকথা শুনলে সত্যিই চোখে জল আসে।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কী করবে মনস্থির করতে না পেরে ওর কয়েকজন অদূরবর্তী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বন্ধুদের সঙ্গে ও পশ্চিম জার্মানিতে পাড়ি দিয়েছিল।

বাঙালির স্কুলে পড়েছে, ফ্রেঞ্চ, ল্যাটিন দূরে থাক, ইংরেজিটা পর্যন্ত তেমন বলতে পারে না তখন। লিখতে পারে মোটামুটি।

তখনকার দিনে কলকাতার হগবাজারে একরকম বাঙালি দোকানি দেখতে পাওয়া যেত। এখন সিন্ধী দোকানদারের ভিড়ে তারা প্রায় হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাদের খদ্দেররাও। তাদের প্রত্যেকেই প্রায় কাজ-চালানো ইংরেজি বলতেন-টেক তো টেক, নো টেক নো টেক, একবার তো সি গোছের।

টবীর এবং শুধু টবীর কেন, অনেক বাঙালি পন্ডিত ইংরেজির অধ্যাপকদের কথ্য ইংরেজিও তখন তদনুরূপ ছিল। আজকের ভারতবর্ষে, তথা বাংলাদেশে কথ্য ইংরেজির মান অনেক উঁচু হয়েছে। এর কারণ ইংরেজ-প্রীতি যতটা নয়, ততটা স্বাধীনতোত্তর যুগে এক প্রদেশীয় শিক্ষিত লোকেরা অন্য প্রদেশীয় লোকেদের অনেক কাছাকাছি আসাতে ইংরেজি ভাষাটার অনেক বেশি চল হয়েছে। কথ্য ভাষা হিসেবে।

যাই-ই হোক, এইরকম ইংরেজির এবং কোনোরকম জার্মান ভাষার জ্ঞান ব্যতিরেকেই টবী এক শীতের দিনে জাহাজ থেকে নেমেছিল পশ্চিম জার্মানিতে।

ভাবলেও, দুটো হাত ওভারকোটের পকেটে ঢোকাতে ইচ্ছে করে আমার।

প্রথম চাকরি টেলিগ্রাফের তারে জমে থাকা বরফের স্কুপে সাত-সকালে মইয়ে চড়ে উঠে নুন ছিটানো। বরফ গলাবার চাকরি। জার্মানির শীতের সম্বল চাঁদনিতে কেনা একটি কম্বলের গরম কোট।

সেইসব দিনের কথা বলতেও টবীর চোখ জ্বলজ্বল করে–আমার শুনতে চোখ ছলছল করে।

যাই-ই হোক, সেই টবী, জীবন আরম্ভের টবী। আজকের টবীকে দেখে সেই টবীর কথা ভাবা যায় না।

পাশ্চাত্যের এই জিনিসটা আমাকে বড়ো মুগ্ধ করে। আমাদের দেশে রাজার ছেলে প্রায়শই রাজা হয়, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী, মসৃণভাবে না হলে এই ঘটনা অমসৃণভাবে ঘটানো হয়। এবং চাষার ছেলে চাষা। পাশ্চাত্যের মতো উত্থান-পতন, ডিগবাজি-অভ্যুত্থান আমাদের দেশে এখনও তেমন আকছার নয়। তাই-ই হয়তো ওদের জীবন এত ইন্টাররেস্টিং, ওরা জীবনকে এত ভালোবাসে; এত সম্মান করে।

সেদিন অফিস থেকে ফিরেই টবী বলল, রুদ্রদা, আজ আমরা একটা অস্ট্রিয়ান রেস্তোরাঁয় খেতে যাব অস্ট্রিয়ান ভিসা যখন হলই।

আমি বললাম, যথা আজ্ঞা।

স্মিতা সাজুগুজু করতে করতে টবী বসার ঘরের বুকশেলফের মধ্যবর্তী ছোট্ট সেলার খুলে টকাটক দুটো নিট লাল-রঙা স্কটল্যাণ্ডের জল মেরে দিল।

দাদাকেও প্রণামী দিল।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। দাদা বিশেষ গাঁই-ছুঁই না করে ছোটোবেলায় মায়ের হাত থেকে নিয়ে যেমন বিনা প্রতিবাদে ক্যাস্টর অয়েল খেত, তেমনি বিনা আপত্তিতে হুইস্কি খেল। একটু খুশিও হল খেয়ে।

স্মিতার হয়ে গেলে সকলে মিলে নীচে এসে, গাড়িতে ওঠা গেল।

লানডানের বেজওয়াটার পাড়াটা খুব রমরমে পাড়া। একেই বলে, এককথায় বেড-সিটার পাড়া। অর্থাৎ, এক-কামরার সব ঘর ভাড়া পাওয়া যায় এখানে। বেডরুম-কাম-সিটিং-রুম– এককথায় : বেড-সিটার।

এ পাড়ার বাসিন্দা বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ছাত্রছাত্রী, বকা-বাউণ্ডুলে, হিপি হিপিনি। সারারাত এ পাড়ায় দোকানপাট খোলা। সোহোর মতো, নিউইয়র্কের ব্রডওয়ের মতো, প্যারিসের মতো; এখানে রাতে-দিনে বিশেষ তফাত নেই। এইসব বেড-সিটার ঘরে থেকেই বহু ছেলেমেয়ে থিসিস সাবমিট করে ডক্টরেট হচ্ছে, অনেকে বেবাক বকে যাচ্ছে, কেউবা হাসিস, মারিজুয়ানা, এল এস ডি খেয়ে ঝুঁদ হয়ে রয়েছে, কেউ বা গর্ভবতী হচ্ছে, কেউ গর্ভপাত ঘটাচ্ছে। মোট কথা, এমন তালেবর স্বাধীন স্বর্গ-নরক জায়গা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে খুব কমই আছে।

টবীর গাড়িটা এসে ওয়েস্টবোর্ন রোডে দাঁড়াল।

গাড়ি পার্ক করে আমাদের নিয়ে টবী রেস্তোরাঁ নামক যে অতিসন্দেহজনক গর্তটার সামনে দাঁড় করাল, তাতে প্রথমে মনে হল যে ভাই আমার গরিব দাদাকে কলকাতার কোনো ক্লাস থ্রি, গ্রেড থ্রি স্ট্যাণ্ডার্ডের রেস্তোরাঁয় এনে ডিমের ডেভিল বা ভেজিটেবল চপ-টপ কিছু খাইয়ে সস্তায় সারবে বলে মনস্থ করেছে।

সেই সুড়ঙ্গ বেয়ে গর্তে ঢোকা পর্যন্ত খারাপ লাগলেও ভেতরে পৌঁছে একেবারে জমে গেলাম।

জমে গেলাম না বলে, সেঁটে গেলাম বলা ভালো।

ভাই সব, যদি ও তল্লাটে ধাওয়া-টাওয়া হয়ে ওঠে কখনো, তাহলে এই গর্তে একবার ঢুকতে ভুলবেন না। এই ছোটো অস্ট্রিয়ান রেস্তোরাঁর নাম Tyroller Hut : ২৭ নম্বর ওয়েস্টবোর্ন রোড, বেজওয়াটার, ডবলু : ২, লানডান। সোমবার বন্ধ থাকে। মঙ্গলবার থেকে রবিবার অবধি খোলা।

আমি কমিশন পাই না।

অস্ট্রিয়ার মতো জায়গা এবং অস্ট্রিয়ান লোকেদের মতো লোক হয় না। Tyrol-অস্ট্রিয়ার ছবিসদৃশ ইনসব্রুক প্রভিন্স-এর একটি জায়গা। Tyrol-এ যাবার সুযোগ ঘটেছিল এই লেখকের। সেকথা পরে কোনো সময়ে বলা যাবে।

সেই গর্তে ঢুকতেই দেখি গুচ্ছের জার্মান ও অস্ট্রিয়ান নারী-পুরুষ ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে কনুইতে কনুই ঠেকিয়ে বসে খানাপিনা করছে।

জার্মান ভাষায় ইংরেজি Hut (উচ্চারণ হাট) কে হুট বলে। আমাদের বাংলায় হুট করে এল বা হুট করে চলে এলর সঙ্গে এই হুটের কেমন একটা প্রকৃতিগত মিল খুঁজে পেলাম।

কাঠের তৈরি লগকেবিন যেমন হয় রেস্তোরাঁর ভেতরটাও তেমনি। অ্যাকর্ডিয়ান ও গোরুর গলার ঘণ্টা বাজিয়ে টরলের লোকেরা নানারকম গান গায়। একজন লোক সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে কাউবেল বাজিয়ে ও অ্যাকর্ডিয়ান ঝাঁকিয়ে জব্বর গান ধরেছেন। তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন প্রায় সব খদ্দেররা। বেশির ভাগই প্রৌঢ়। বিপুল-বিপুলা।

এদের এত প্রাণ, এত ফুর্তি, এত আনন্দের ফোয়ারা, এত হাসি কোত্থেকে আসে তা ভাবলেও অবাক লাগে।

আমার বারেবারেই মনে হয়েছে যে, এই আনন্দ শুধুমাত্র আর্থিক সচ্ছলতা থেকেই আসতে পারে না। ওদের মধ্যে আরও যেন কী আছে। হয়তো চিন্তা-ভাবনাহীনতা, হয়তো দেশ ও সমাজ ওদের বেশির ভাগ দায়িত্ব থেকেই মুক্ত করেছে, এবং ওরাও দেশকে মুক্ত করেছে বলে। দেশ থেকে সাধারণ বিযুক্ত নয় বলেই বুঝি ওরা এমন করে হাসতে পারে, গাইতে পারে; বাঁচতে পারে।

অন্যভাবে দেখতে গেলে বলতে হয় এবং ওদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে যা-কিছুই পেয়েছে তার জন্যে বুঝি অনেক মূল্য দিয়েছে। একদিন অনেক চোখের জল, বুকের রক্ত ঝরিয়েছে; তাই আজকের হাসি ওদের এমন দ্বিধাহনি সাবলীল।

ভালো করে জমিয়ে বসে, টবী প্রথমে Lager Beer-এর অর্ডার করল।

বলল, এটা স্টার্টার।

আমি বললাম, এটা কি ফোর-ফর্টি রেস নাকি? কী সব স্টার্টার-ফার্টার বলছিস, মানে বুঝছি না।

টবী বলল, দেখোই না তুমি।

ইউনিয়ন জার্মান Lager Beer-এর সঙ্গে কী যেন খাদ্যও একটা অর্ডার দিল। বলল, সেটাও নাকি স্টার্টার।

আমি ভাবলাম, এবার পিস্তলের আওয়াজ-টাওয়াজ শুনতে পাব।

কিন্তু কিছুই না হয়ে, একটি সুন্দরী অস্ট্রিয়ান মেয়ে পেঁপের মতো দেখতে কিন্তু দারুণ স্বাদ ও পেঁপের চেয়ে শক্ত মধ্যিখান দিয়ে চেরা একটি ফলের মধ্যে Prawn Cocktail দিয়ে গেল। তার বাইরে বাঁধাকপির পাতা।

টবীকে ভয়ে ভয়ে শুধালাম, এটারে কী কয়?

স্মিতা হেসে উঠল।

বলল, এই শুরু করলে রুদ্রদা।

টবী গম্ভীর মুখে জার্মান উচ্চারণে বলল, Avacadomit Garmeen।

প্রথমে ভাবলাম, জার্মান ভাষায় আমাকে গালাগালি করল বুঝি।

কিন্তু না, পরক্ষণেই রীতিমতো মেনুকার্ড খুলে দেখাল নামটা।

যে ছেলেটি অ্যাকরডিয়ান বাজাচ্ছিল তার কাছাকাছিই ভিড় বেশি। যাঁরাই খেতে এসেছিলেন তাঁরাই প্রায় এই গানে গলা দিচ্ছিলেন।

জার্মান ভাষা ও রাশিয়ান লোকদের চেহারা আমার মোটেই পছন্দ হয় না। কিন্তু এই প্রথম জার্মান ভাষার গান বাজনা শুনে প্রত্যয় হল যে গান গাইলে মিষ্টিই লাগে।

টবী জার্মানদের মতোই জার্মান বলে। এখানে এসে পড়ে ও ওর মন্ত্রমুগ্ধা স্ত্রী ও ক্যাবলা দাদাকে ওর জার্মান ভাষায় স্তম্ভিত করে রাখল। যে-দুজন ওর টেবিলে বসে ছিল (অর্থাৎ আমরা দুজন) তাদের কেউই জার্মানের জও জানি না, অতএব ও আদৌ জার্মান ভাষায় কথা বলছিল কি না তাও ধরার উপায় ছিল না।

ইতিমধ্যে Steinhager Schnapps দু-ঢোক খেয়ে অবস্থা কাহিল। এই সাদাটে তরলিমা কবে আবিষ্কৃত হয়েছে জানি না, তবে সময়মতো এর গুণাবলি সম্বন্ধে অবহিত হলে হিটলার সাহেব ফ্লাইং-বম্বস না পাঠিয়ে এই দিয়েই ইংল্যাণ্ড ধ্বংস করতে পারতেন।

টবী বলল, এ একরকমের লিকার ব্র্যাণ্ডি। টিপিক্যালি জার্মান।

কথাবার্তা বলতে বলতে খেতে খেতে হঠাৎ এক বিপত্তির সৃষ্টি হল। আমার পাশের টেবিলে-বসা এক বর্ষীয়সী, স্থূলাঙ্গী কিন্তু ভারি হাসিখুশি মিষ্টি জার্মান মহিলা আমার এক হাত সজোরে আকর্ষণ করলেন।

বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি গানের সঙ্গে সঙ্গে ওই ছোটো রেস্তোরাঁর প্রত্যেকে হাতে হাত রেখে গান গাইছেন এবং একবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন আর একবার বসছেন। আপস অ্যাণ্ড ডাউনস বলতে বলতে।

ভর-সন্ধেবেলায় খেতে খেতে এমন ডন-বৈঠকি মারার তাৎপর্য না বুঝলেও এটুকু বুঝতে অসুবিধা হল না যে ও-জাতটার মধ্যে প্রাণপ্রাচুর্য বড়ো বেশি। এদের যা-ইচ্ছে-তাই না করতে দিলে এরা আবার কবে কার সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে দেবে তার ঠিক নেই। জার্মানদের মতো এমন দিল-খোলা হাসিও বুঝি ইউরোপের আর কোনো দেশের লোক জানে না। ওদের হৃদয়ের কাছে যত সহজে পৌঁছোনো যায় তত সহজে বোধহয় খুব কম দেশের লোকের কাছেই।

কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে হলেও হাত ধরাধরি করে ওদের সঙ্গে, ভারি ভালো লাগল ওদের এই সপ্রাণ গান-বাজনা, এই হাসি, অপরিচিত বিদেশিকে বিনাদ্বিধায় মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের একজন করে নেওয়ার ক্ষমতা দেখে।

হঠাৎ চোখ পড়ল, আমাদের সামনেই এক টেবিলে একটি মেয়ের দিকে। তার বয়েস বেশি না। আমার সঙ্গে স্বচ্ছন্দে বিয়ে হতে পারত। কিন্তু হয়নি। ভাবও হতে পারত। কিন্তু তাও হয়নি।

তাহলে কেন হয়নি বলি।

মেয়েটি একটা কালো কার্ডিগান পরেছিল। ভারি সুন্দর চাঁপা-রঙা ডান হাতে সোনালি রিস্টওয়াচ। বাঁ-হাতে একটা বালা। এমন সুন্দর ও বুদ্ধিভরা মুখ বড়ো একটা দেখা যায় না। তার চোখের দিকে চাইলে মনে হয় কোনো অভ্রখনির অতলে তলিয়ে যাচ্ছি, আর কখনো উঠতে পারব না বুঝি।

তার দিকে অপলকে চেয়ে থাকতেই টবী বলল, কী গো রুদ্রদা, ভালো লেগেছে তো গিয়ে আলাপ করো। তোমার দিকেও বার-বার চাইছে মেয়েটি। আজ শুক্রবারের সন্ধেবেলা আজকেই তো বন্ধুত্ব করার সময়।

আমি চুপ করে রইলাম।

Schnapps ও এই মেয়েটির চোখে, আমার নেশা ধরে গেছিল।

আমি আবারও ওদিকে চাইতে টবী বলল, খী খারবার।

তার পরেই বলল, এ কি আমাদের দেশ পেয়েছ না কি? চোখে চোখে কথা কও মুখে কেন কও না? ওসব আমাদের দেশের জিনিস। এই স্পিডের দুনিয়ায় কারোই চোখের শোনার মতো সময় ও সময় থাকলেও নির্ভুলভাবে বোঝার এলেম নেই। মুখে না বললে এখানে কোনো কিছুই ঘটবে না। এবং নিজ মুখেই বলতে হবে। বন্ধু-বান্ধব, বোন, বউদি এখানে সব বেকার। বাঙালিরা প্রেম করার ব্যাপারেও পরের সাহায্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকে–বাঙালির কি কিসসু হবে? তুমিই এল?

আমি বললাম, এই মুহূর্তে আমি রামমোহন রায় বা বিবেকানন্দ হতে চেয়ে তাবৎ বাঙালির ভাগ্য-নির্ধারণ করতে চাই না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার যে কিছুই হবে না তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছি।

স্মিতা বলল, অত নিরাশ হবার কী আছে? তোমার প্রতি ভীষণ ইন্টারস্টেড মনে হচ্ছে মেয়েটি। বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলছে কিন্তু চেয়ে আছে তোমার দিকে।

বুঝলাম। আমি বললাম।

তারপর বললাম, ঢাকাই কুট্টিদের একটা গল্প চালু ছিল ছোটোবেলায়।

কী গল্প?

ঢাকাই কুট্টি দাঁড়িয়ে আছে অন্যদের সঙ্গে ঘোড়ার-গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে–এমন সময়ে অতীব সুন্দরী হিন্দুর মেয়ে চলে গেল পাশ দিয়ে।

কুট্টি অনেক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থাকল।

কিছু করল না বা বলল না? অবাক হয়ে স্মিতা শুধোল।

না। আমি বললাম।

তখন কিছুই বলল না। কিন্তু সম্পূর্ণ চোখের আড়াল হলে বলল, এহনে গ্যালা, হাঁইটা গ্যালা গিয়া হুন্দরী; যাও। কিন্তু হপ্নে?

মানে? স্মিতা ও টবী একইসঙ্গে শুধোল।

মানে? এখন তো চলে গেলে সুন্দরী, হেঁটে হেঁটে চলে গেলে।

–এখন গেলে, তো যাও। কিন্তু স্বপ্নে? স্বপ্নে যাবে কোথায়?

খী-খারবার, বলে টবী চেঁচিয়ে উঠল।

স্মিতা শীতের সকালের হাসির মতো শী-শী করতে লাগল।

চারপাশের জার্মানরা গান থামিয়ে চেয়ে রইল আমাদের দিকে।

কিন্তু আমি চোখ তুলে দেখলাম, সেই সুন্দরীর বয়-ফ্রেণ্ড এসে গেছে।

স্বপ্নই সার। বাঙালির স্বপ্নই সার।

ইতিমধ্যে টবী যা খাওয়ার অর্ডার দিয়েছিল, তা এসে হাজির। মেইন-ডিশ।

তিনজনে তিনরকম খাবার অর্ডার দিয়েছিলাম–জার্মান মেনুকার্ড দেখে। বলাবাহুল্য আমি অচেনা ঘোড়ার নাম দেখে, তাদের চেহারা না-দেখেই রেসের টিকিট কাটার মতো মেনুকার্ডে তর্জনী ছুঁইয়েছিলাম। খাবার না এসে স্বচ্ছন্দে ফিঙ্গার-বোল অথবা টুথপিকও আসতে পারত।

কিন্তু খাবার যখন এল, তখন রীতিমতো উত্তেজনার কারণ ঘটল।

আমাকে দিয়েছিল, Eisbeinmit Saurkaraut.

নাম শুনে বাঙাল আমি ঘাবড়েছিলাম বলে, পাঠকের ঘাবড়াবার কোনোই কারণ দেখি না। ব্যাপারটা হচ্ছে শুয়োরের নরম পা–টক টক বাঁধাকপির সঙ্গে সার্ভ করেছে। খেতে জব্বর।

স্মিতা নিয়েছিল Paprikahuhn Nact Ungarisher Art Mit Rice.

ব্যাপারটাকে পাঁপড় অথবা পাপড়ি ইত্যাদি বলে ভুল করবেন না। জার্মান নামের ওরকমই ছিরি! অর্থাৎ, হাঙ্গারিয়ান প্রথায় রান্না চিলি-চিকেন ভাতের সঙ্গে সার্ভ করেছে।

আর টবী নিয়েছিল Rinds Roulade Mit Nudlen-অর্থাৎ স্টাফড বিফ, সঙ্গে ব্যাকন; শশা আর সর্ষে।

এ তো গেল খাদ্য। মেইন ডিশের সঙ্গে খাওয়ার জন্যে পানীয়ও এল। রেডওয়াইন। নাম তার ষাঁড়ের রক্ত। বুলস ব্লাড়। তা পান করে শরীরে ষাঁড়ের বল বোধ করতে লাগলাম প্রায়। তার সঙ্গে মাঝে মাঝেই জার্মান স্ন্যাপস।

স্ন্যাপস জিনিসটা সত্যিই অতিসাংঘাতিক। এমনি গ্লাসে ঢেলে রাখলে দেখে মনে হবে রিফাইনড ক্যাস্টর অয়েল, কিন্তু খেলে মস্তিষ্কর কোষে কোষে কে রে-কে রে রব উঠবে।

যাই-ই হোক, ভায়ার ঘাড়ে ভালো করে খাদ্য-পানীয় সব কিছু রীতিমতো রেলিশ করে খাওয়া গেল।

যখন টিয়োলার হুট থেকে বেরুলাম তখন অনেক রাত। কিন্তু বেজওয়াটারে রাত চিরদিনই সব প্রহরেই সন্ধে থাকে। সায়েবরা বলে, নাইট ইজ ভেরি ইয়াং। কথাটা এখানে সর্ব সময়েই খাটে।

কতরকম স্পোর্টস-কার যে দাঁড়িয়ে আছে পথের দু-পাশে তা বলার নয়। যেমন গাড়ির চেহারা, তেমনই সুন্দর যাত্রীদের চেহারা। অর্থ, বিত্ত, স্বাধীনতা এবং নিজ-নিজ জীবনকে প্রতিমুহূর্তে নিংড়ে নিংড়ে উপভোগ করার অসীম আগ্রহ এদের এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, চোখ মেলে দেখলে ঈর্ষা হয়।

ভাবতে ভালো লাগে যে, একদিন আমাদের এমন সুন্দর ভারতবর্ষের লোকেরাও এমনি করে ভালোবাসতে শিখবে জীবনকে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে। চিনে নেবে নিজের দেশকে। অন্তরের গভীরে জেনে গর্বিত হবে যে, এমন দেশ পৃথিবীতে আর দুটি নেই–শুধু নিজেদের প্রত্যেককে যোগ্য করে তুলতে হবে, এই দেশ নিয়ে দেশের ও দেশের লোকেদের সত্যিকারের ভালোর জন্যে কী করণীয় এবং অকরণীয়, তা একদিন প্রাঞ্জলভাবে সকলেই বুঝবে।

বুঝবে কি?

দেখতে দেখতে আমরা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়লাম। জোরে গাড়ি চলেছে মিডেকসের দিকে। হলদে স্বপ্নের মতো দেখাচ্ছে পথ-ঘাট মার্কারি ভেপার ল্যাম্পের আলোয়।

স্ন্যাপস-এর নেশা কেটে গিয়ে হঠাৎ-ই আমাকে এক হীনমন্যতা, অপারগতার বোধ রাতের কুয়াশার মতো ঘিরে ফেলল। আমার মনে হল, ভারতবর্ষ বলতে যা বোঝায় সেই কোটি কোটি সরল, সাদা স্বল্লবিত্ত, গ্রাম ও বন-পর্বতবাসীদের সম্বন্ধে আমরা কতটুকুই বা জানি, বুঝি বা বোঝবার চেষ্টা করি? আমরা এ ভারতবর্ষের ক-জন? তারাই তো সব। কিন্তু তাদের কি আমরা ভালোবেসেছি, জেনেছি যেমন করে জানার তেমন করে? কিছু কিছু লেখক তাঁদের নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এমন ক-জন বলিষ্ঠ দরদি সাহিত্যিক আছেন যাঁরা নিজের চোখের দৃষ্টি এবং কল্পনা মিলিয়ে দেশের সাধারণ লোকদের কথা লিখেছেন, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কষ্টের স্বরূপকে উদঘাটিত করেছেন কবজির সমস্ত জোর ও হৃদয়ের সমবেদনা দিয়ে? হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছেন কজন?

এই ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যক্ষ সংযোগটাই বোধ হয় বড়ো কথা। কল্পনার বোধ হয় তেমন দাম নেই। যে, সে-জীবন নিজের চোখে না দেখেছেন অথবা যাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ও মননে সে দরদ ও অন্তদৃষ্টি দূরদৃষ্টির সঙ্গে বিশেষভাবে ওতপ্রোতভাবে মিলেমিশে যায়নি তাঁর পক্ষে তিনি যে-সমাজের লোক নন সেই অন্য সমাজের কথা তেমন করে লেখা বা তুলে ধরা বড়োই কঠিন কাজ।

তা যদি না হত তাহলে রবীন্দ্রনাথের মতো কালজয়ী বহুমুখী প্রতিভাও এমন খেদোক্তি কেন করবেন? যদি কল্পনা দিয়েই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনের কথা জানা যেত, শুধুমাত্র স্বার্থপ্রণোদিত নিজ নিজ উদ্দেশ্যসাধনের বক্তৃতা করেই তাদের হৃদয় হেঁওয়া যেত, তাহলে রবীন্দ্রনাথের পক্ষেও তা অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হল কেন? কেন তাঁর মতো লোকও লিখতে বাধ্য হলেন :

কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।
সাহিত্যের আনন্দের ভোজে
নিজে যা পারি না দিতে, নিত্য আমি থাকি তারই খোঁজে
সেটা সত্য হোক, শুধু ভঙ্গি দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ
সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি।
ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজদুরি।

কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা, মাটির কাছাকাছি থাকা এবং শুধু ভঙ্গি দিয়ে চোখ না ভোলানোর কথা আজকে ভাবতেও কষ্ট হয়। শুধু সাহিত্য কেন, অন্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমাদের এমন সুন্দর সোনা-ছড়ানো দেশটাতে কর্ম ও কথার মধ্যে কোনোরকম সাযুজ্যই আজ আর না দেখি না, দেখি না কথা অথবা কর্মের মধ্যে মাটির গন্ধ। শুধু ভঙ্গিই আজকে সব। ভান ও ভন্ডামির তীব্র লজ্জাকর প্রতিযোগিতা দেখে দেখে যারা অসহায় নিরুপায় দর্শক হয়ে তা দেখেন তাঁরা নিজেরাই অন্যদের নির্লজ্জতায় লজ্জা পান। অথচ নির্লজ্জতায় কর্ম কী কঠিন। কিছুতেই, কোনো কিছুতেই, তাতে ফাটল ধরে না।

রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে। কিন্তু নিজেদের এমনই এক তুরীয় অবস্থায় উন্নীত করেছি আমরা নিজেদের এবং একমাত্র নিজেদেরই স্বার্থপরতায়, নিজ নিজ চাকরি ও ব্যবসায়ের কারণে যে, ঘৃণাবোধ বুঝি আর আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। যদি তা থাকত, তাহলে নিজেদের প্রতি নিজেদেরই ঘৃণা আমাদের জ্বালিয়ে এতদিনে অঙ্গার করে দিত।

বাড়ির কাছাকাছি এসে গাড়ি হঠাৎ পথে একটা ছোটো গর্তে পড়ে লাফিয়ে উঠল। ইংরিজিতে যেরকম গর্তকে পট-হোল বলে।

সঙ্গে সঙ্গে টবী বলল, এখুনি গিয়ে কাউন্সিলরকে ফোন করতে হবে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন?

রাস্তায় গর্ত হয়েছে কেন? আমরা রোড-ট্যাক্স দিই না?

আমি বললাম, তাহলেও এত রাতে ভদ্রলোকের ঘুম ভাঙানোর কী দরকার?

টবী বলল, ঠিক আছে। না হয় কাল সকালেই করব।

করলে কী হবে? আমি শুধোলাম।

টবী বলল, দু-ঘণ্টার মধ্যে গর্ত মেরামত হয়ে যাবে।

তারপর কী ভেবে বলল, না কাল মনে থাকবে না, এখুনি করব। পাবলিক সার্ভেন্ট ওঁরা। কিছু মনে করবেন না।

আমি ও স্মিতা ওকে অনেক করে নিবৃত্ত করলাম।

পরদিন সকালে যখন প্রাতরাশ খেয়ে আমরা চরাবরায় বেরোলাম, তখন দেখি সত্যি সত্যিই গর্তটা মেরামত হয়ে গেছে।

আসলে ইংরেজরা বেনের জাত বলে দেনা-পাওনা সম্বন্ধে জ্ঞান এদের বড়োই টনটনে। যা দিল তা দিল, তা রোড ট্যাক্সই হোক কি ইনকাম-ট্যাক্সই হোক কিন্তু বদলে যা পেল তাও তারা বাজিয়ে নিতে ভোলে না। অ্যাকাউন্ট্যান্সিতে যে ডাবল-এন্ট্রি বলে কথাটা আছে তা ইংরেজদেরই সৃষ্টি। এ ডেবিট মাস্ট হ্যাভ আ ক্রেডিট। সিঙ্গল এন্ট্রিতে ইংরেজ বিশ্বাস করে না। তাই পাবলিক সার্ভেন্ট কাউন্সিলরকে দিয়ে দু-ঘণ্টার মধ্যে তারা পথের একটা সামান্য গর্ত সারিয়ে নিতেও ছাড়ে না। নিজের নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে যেমন এরা সচেতন, নিজের নিজের পাওনা সম্বন্ধেও তেমনি।

টবী সেদিন অফিস থেকে ফিরেই বলল, রুদ্রদা, তোমার কন্টিনেন্ট বেড়াবার সব বন্দোবস্ত করে এলাম আজ।

কীরকম?

টবী বলল, কসমস ট্যুরস-এর টিকিট কেটে এনেছি। তবে এটা কমোনারদের ট্যুর। তোমার বেশ কষ্ট হবে। কলকাতার জাদুঘরের সামনে সার দেওয়া ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে রঙিন-শাড়ি পরা দক্ষিণ ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের দেখেছ নিশ্চয়ই–এ ট্যুর অনেকটা সেরকম। ড্রাইভার-কামার-ছুতোর-সবজিওয়ালা মায় সবাই এই ট্যুরে বেরিয়ে পড়ে কন্টিনেন্ট দেখে আসে। আমি আর স্মিতা তোমাকে ভিক্টোরিয়া স্টেশনে তুলে দিয়ে আসব। সেখান থেকে ট্রেনে যাবে ডোভার। ডোভার থেকে জাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে বেলজিয়ামের অস্টেণ্ড। অস্টেণ্ড থেকে কসমসের কোচ করে বারো দিন সারা ইয়োরোপ প্রায় চরকি-বাজির মতো ঘুরবে।

আমি বললাম, ক্যানাডায় যাবার টিকিট কাটা আছে যে আমার!

আহা! ক্যানাডায় তো যাচ্ছই। আমি সে-সব বুঝে কেটেছি। ওই ট্যুর সেরে ফিরে এসে আরও দিন কয় এখানে থেকে গা-গতরের ব্যথা কমিয়ে নিয়ে তারপর টরোন্টো যেয়ে এখন। মাসতুতো ভাই কি পিসতুতো ভাই-এর শত্রু হতে পারে? তোমাকে আমি তার কাছে বিলক্ষণ পাঠাব।

তাহলে আমি আর ক-দিন আছি এখানে?

আরও সাতদিন আছ। টবী বলল।

তারপর বলল, তোমাকে আরও যা-যা দেখাবার তা দেখিয়ে দেব। তুমি তো আবার কারও হাত ধরে কিছুই দেখতে চাও না। নিজেই চরে-বরে যতটা পারা দেখে নাও সারাদিন। আমি সন্ধের পর তোমাকে রোজ কম্পানি দেব। আর ছুটির দিনে।

তথাস্তু। বললাম আমি।

আজ সন্ধেয় কী প্রোগ্রাম?

আজ তোমাকে Oh Calcutta দেখাতে নিয়ে যাব।

স্মিতা বলল, আমিও যাব।

টবী বলল, তুমি ভীষণ অসভ্য হয়েছ। শুধু এই সবই বোঝো। নিজের মগজে স্ক্র ঢোকালেও তো আর্ট-কালচার গলবে না। যার মন যেরকম।

টবী বলল, তুমি যাই-ই এল–তোমাকে ভাসুরঠাকুরের সঙ্গে ওই শো দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি না।

স্মিতা বলল, তুমি ভীষণ গোঁড়া ও সেকেলে। এত বছর বাইরে থেকেও এত ওডোনাইজার মেখে এত সুগন্ধি সুগন্ধি সাবান ঘষেও তোমার গায়ের চেতলার গন্ধ মুছল না।

টবী দু-হাত ওপরে তুলে বলল, খবরদার ডার্লিং আর যাই করো চেতলা তুলে কথা বলবে না। চেতলা আমার কৈশোরের স্বপ্ন, যৌবনের উপবন…।

তারপর কী বলবে ভেবে না পেয়ে আমার দিকে ফিরে বলল, কিছু এল না রুদ্রদা! বিপদ থেকে ভাইকে একটু সাহিত্যিক বুকনি ছেড়ে উদ্ধার করো!

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াতে কখনো মাথা গলাতে নেই। আমাকে আমার এক অভিজ্ঞ বন্ধু বলে দিয়েছিল যে, ইচ্ছে করলে পথের দুই বিবদমান কুকুরের ঝগড়া মেটালেও মেটাতে পারো। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া-নৈব নৈব চ। ওর মধ্যে গিয়ে পড়লেই দেখবে কিছুক্ষণ পর মিয়া বিবি দুজনের ঝগড়া মিটে গেছে–দুজনের মধ্যে গলাগলি–আর তোমার জন্যে যুগপৎ গলাধাক্কা।

অতএব চুপ করে থাকলাম।

Oh Calcutta সম্বন্ধে দেশে থাকতেও অনেক পড়েছিলাম ও শুনেছিলাম। তাই উৎসাহ নিয়েই দেখতে গেছিলাম, কিন্তু অগণ্য সম্পূর্ণ নগ্ন মানব-মানবী ছাড়া এর মধ্যে চমকপ্রদ আর কিছুই দেখলাম না।

আরম্ভটায় চমক আছে নিঃসন্দেহে। সেন্স অফ হিউমার আছে। টিপিক্যালি ব্রিটিশ সেন্স অফ হিউমার। কিন্তু যতই সময় যেতে লাগল ততই মনে হতে লাগল যে সাদা-মাটা কুদৃশ্য যৌন-বিকারকে একটা ইন্টেলেকচুয়াল পোশাক পরিয়ে দুর্বোধ্যতার গোঁফ লাগিয়ে যেন বাইরে আনা হয়েছে।

আজকালকার এই নব্য দুনিয়ায় যা-কিছু সরল সত্য ও সুন্দর এবং শাশ্বত তার সব কিছুই ফ্ল্যাট-সাদামাটা। তার মধ্যে যেহেতু সস্তা নতুনত্বের ভঙ্গুর চমক নেই সুতরাং এসব একেবারেই গ্রাহ্য নয়। পুরোনো যা-কিছু তা খারাপ, নতুন সব কিছুই যেন ভালো। যা-কিছু সহজে বোঝা যায়, হৃদয় দিয়ে ছোঁওয়া যায়, যা-কিছু বুকের মধ্যে আলোড়ন তোলে আমাদের মূল ভাবাবেগের কেন্দ্রে ঢেউ জাগায় তার সব কিছুই মূখামি, ছেলেমানুষি; সেন্টিমেন্টাল। এর বিপরীতটাই আজকালকার ফ্যাশান। ভোরের সূর্যের রং লাল বলেই তাকে নীল করে দেখানোটার নাম আধুনিকতা। যা-কিছুই সমস্ত বুদ্ধি জড়ো করেও বোঝা যায় না সেইটে না বুঝেও বোঝার ভান করাটাই বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ।

একসঙ্গে অসংখ্য নগ্ন নারী-পুরুষ দেখতে এবং তাদের মিলনের দৃশ্য দেখতে সকলের ভালো লাগে না। আমার তো নয়ই। হয়তো কারও কারও ভালো লাগে। যাদের লাগত তাদের চিরদিনই লাগত। পৃথিবীর সব দেশেই যারা তা দেখতে চাইত এবং যাদের তা দেখার ইচ্ছা ও সামার্থ্য ছিল তা দেখে এসেছে কিন্তু গোপনে, লজ্জার সঙ্গে; হয়তো অপরাধবোধের সঙ্গেও। সেটায় কোনো আধুনিকতা নেই। কখনো ছিলো না। কিন্তু আজকে সেই লজ্জাবোধ ও শালীনতাবোধকে নষ্ট করাটাই, যা ছিল মুষ্টিমেয়র রুচি তাকে অপ্রত্যক্ষভাবে সার্বজনীন রুচিতে পরিণত করার এ চেষ্টাই সপ্রতিভ। আর এর বিরুদ্ধাচরণ করাটা প্রাগৈতিহাসিকতা, জড়ত্ব; স্থবিরতা।

Oh Calcutta ব্যাপারটা পুরোপুরি ন্যাক্কারজনক মনে হল। তবে এদের উদ্দেশ্যটাই খারাপ ছিল না। আমি যতটুকু বুঝেছি তাতে মনে হয়েছে যে পুরাতন সমাজের ও সমাজপতিদের ভন্ডামির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু মুখোশটার প্রকৃতি যদি যথেষ্ট দৃঢ় হয় তাহলে তা ছিঁড়তে হলে দৃঢ় কবজির প্রয়োজন। শুধু তাই-ই নয়, মুখোশ ঘেঁড়ার প্রচেষ্টার মধ্যেই সমস্ত চেষ্টাটা ফুরিয়ে গেলে পুরো প্রচেষ্টাটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য যদি না সেই মুখোশের আড়ালে প্রকৃত মুখকে প্রকাশ করা যায়। মুখোশের আড়ালে যদি কঙ্কালের মুখ দৃশ্যমান হয় বা জাদুঘরের যবনিকা রঙের মতো ঘন কৃষ্ণবর্ণ রং-ই চোখে পড়ে তাহলে মুখোশ ছেঁড়ার প্রয়োজনীয়তাটা কী তা বুঝি না। পূর্বসুরীদের ভন্ডামির মুখোশ ছিঁড়ে যদি নব্যদিনের ইন্টেলেকচুয়ালদের ভন্ডামির নতুন মুখোশই নতুন করে পরানো হয় তাহলে মুখোশ ঘেঁড়ার কোনো সার্থকতাই দেখতে পাই না।

তবুও বলব এদের উদ্দেশ্যর গভীরে মহৎ কিছু একটা ছিল। কিন্তু গভীরে কিছু উৎখাত করতে হলে যে বা যাঁরা উৎখাতের চেষ্টা করেন তাঁদেরও মূলত গম্ভীর হতে হয়। গভীরে যেতে হয়। বিদ্যা-বুদ্ধির অস্পষ্ট নখ দিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে পুরাতন সংস্কার এবং ভন্ডামির মহীরূহকে রাতারাতি উৎপাটন করা যায় না–তার জন্যে সেই মহীরূহর শিকড় যতদূর অবধি পৌঁছেছে ততদূর অবধি পৌঁছোনোর মতো দীর্ঘ তীক্ষ্ণ প্রত্যয়ের নখরের প্রয়োজন।

এ ছাড়াও উদ্যোক্তারা এই অনুষ্ঠানের নাম যে কেন Oh Calcutta দিলেন তা ভেবে পেলাম না। অসলংগতাই অপ্রয়োজনীয় নিয়মবদ্ধতার একমাত্র প্রতিষেধক নয়। অসংলগ্ন নব্যতার মধ্যেও একটা নিয়মানুবর্তিতা থাকা দরকার। কারণ, চরম নব্যতাও অচিরে পুরাতন হয় যদি না সেই নব্যতার প্রয়োজনীয়তা ও অবিসংবাদিতা বিশেষ নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে দিয়ে প্রতিভাত হয়।

Oh Calcutta-অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আমরা পৌঁছোলাম গিয়ে পিকাডিলি সার্কাসে। এখানে রাত-দিনের তফাত নেই। বরং দিনের চেয়ে রাত যেন বেশি উজ্জ্বল। এরই পাশে পাশে Soho। লানডানের তরল আনন্দের উৎসস্থান। এখানে এমন এমন সব দোকান আছে। যে একজন সাধারণ ভারতীয়র চোখে তা আশ্চর্য ঠেকে। এসব জিনিস একটু রেখে-ঢেকেও করা চলতে পারত। কিন্তু সমস্ত পশ্চিমি পৃথিবী এখন তাবৎ ভন্ডামির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে। মনে হয় এরা এখনও সম্যক বুঝতে পারেনি যে বাঘের পিঠে চড়ে বেড়ালে প্রথম প্রথম মজা যে লাগে না তা নয়; কিন্তু তার শেষ পরিণাম সুখপ্রদ নয়।

দোকানে লেখা আছে Sex Shop।

টবীর সঙ্গে ঢুকে চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গেল।

দোকানের জিনিসপত্র দেখে আমাদের থ হয়ে যেতে হয়। আমাদের ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে পুষ্ট হবার পর এমন সুন্দর ও পবিত্র ব্যাপারটাতে এমন কদর্যতার রং লাগানোর তাৎপর্য আমাদের পক্ষে বোঝা মুশকিল। আনন্দ যখন সৌন্দর্য, গোপনীয়তা ও শালীনতার মধ্যে দিয়েও পাওয়া যেতে পারে তখন সেই আনন্দর এমন বটতলা সংস্করণের কী প্রয়োজন তা বুঝে উঠতে পারলাম না।

এই সব সেক্স-শপ-এ নানাবিধ রাবার বা ওই জাতীয় জিনিসে তৈরি স্ত্রী-অঙ্গ বা পুরুষাঙ্গ বিক্রি হচ্ছে। নানা মাপের। রতিক্রিয়ার বিভিন্ন সাজ-সরঞ্জাম সার দিয়ে সাজানো আছে। স্ত্রী ও পুরুষের আত্মরতির যন্ত্রপাতিও আছে। যেন নারী ও পুরুষের মিলনে এবং একটি লেদ বা ড্রিলিং মেশিনের চলার প্রক্রিয়ায় কোনো তফাত নেই। মানুষের যেন শরীরটাই সব, সমস্ত কিছু; মন বলে যে পদার্থটি মানুষকে এত হাজার বছর পৃথিবীর অন্যান্য জীবদের থেকে মহত্তর করেছে সেই মনটির কোনো দামই ধরে না আজ মানুষ।

কালের ইতিহাসে একদিন আমরা এই পশ্চিমিদের থেকে অনেক বিষয়ে এগিয়ে ছিলাম। মাঝে এরা যান্ত্রিক সভ্যতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের পেছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর আমরা এবং অন্যান্য অপর অনুন্নত দেশের লোকেরা তাদের সমকক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি দেখেই বোধহয় তারা এমন এমন ব্যাপারে আমাদের চমকে দিতে চাইছে যে, সে চমক থেকে চোখ ফেরানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

আমরা এদের চেয়ে অনেক গরিব। ছেঁড়া কাপড় পরি আমরা, ভালো খেতে পাই না, কিন্তু অনেক ব্যাপারে যে আমরা এদের চেয়ে অনেক বেশি ধনী এটা ওদের আজকের যুগের ছেলে-মেয়েরা খোঁজ রাখে না। দুঃখ তাতেও ছিল না। বড়ো দুঃখ হয় যখন দেখি যে, আমাদের নিজের দেশের ছেলে-মেয়েরাও একথা ভুলে গিয়ে ওদের এই সস্তা চটকের অনুকরণে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে রাখে। বর্তমানে আমাদের দেশের বিত্তবান শ্রেণির ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাক মানসিকতা ইত্যাদির সঙ্গে এই দেশের ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাক মানসিকতার বিশেষ তফাত দেখি না। দেশের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ এটা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো দুর্যোগই এই নৈতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান একবার পি-ই-এন কংগ্রেসের বক্তৃতায় লেখকদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন :

It is a familiar conception of Indian thought that the human heart is the scene between good and evil. It is assailed by weakness and imperfection but is capable also of high endeavour and creative effort. Man is a composite of life giving and death-dealing impulses. As the Wrig Veda puts it.

যস্য ছায়া অমৃতম যস্য মৃতম।

The Mahavarata says : Immortality and Death are both lodged in the nature of man. By the pursuit of Moha or delusion he reaches death, by the pursuit of truth he attains immortality. We are all familiar with the verse in Hitopodesa that hunger, sleep, fear and sex are common to men and animals. What distinguishes man from animals is the sense of right and wrong, life and death, love and violence, are warring in every struggling man.

হিতোপদেশের সেই শ্লোকটি উনি উদ্ধৃত করেছিলেন :

আহার নিদ্রা ভয় মৈথুনম,
কা সামান্যমে তাৎ পশুভিরনরানাম
ধর্ম হি তেষাম অধিকো বিশেষো,
ধর্মেনা হীনা পশুভি সমানাঃ।

এই ধর্মই হচ্ছে মানুষের ধর্ম। পশুর ধর্ম নয়।

পিকাডিলি সার্কাসের পিছনে অনেক গলি খুঁজি। কেমন একটা থমথমে ভাব। বেসমেন্টে ও ওপরে নানারকম ঘোঁৎ-ঘোঁৎ। বেটন হাতে লানডানের পুলিশরা কোটের কলার তুলে ঠাণ্ডায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

নানারকম রং-এ রং-করা চুল নিয়ে সেজে-গুঁজে উগ্র সুগন্ধি মেখে সুন্দরী অসুন্দরী মেমসাহেব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক পুরুষ বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে নানারকম লোভনীয় সব অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করছে।

টবী বলল, বুঝলে রুদ্রদা, এই-ই হল গিয়ে Soho পাড়া।

বুঝলাম, বললাম আমি।

হঠাৎ টবী একটা বড়ো দামি কথা বলল। লাখ কথার এককথা। এ কথাটা আমার মনেও ছিল ছোটোবেলা থেকে কিন্তু মনের অভ্যন্তরেও কখনো এমন করে একথাটার প্রাঞ্জল অভিব্যক্তি প্রস্ফুটিত হয়নি।

টবী বলল, এসব জায়গায় কারা আসে জানো রুদ্রদা?

কারা? আমি শুধোলাম।

যারা, সোশ্যালি কনডেমড।

কথাটা বড়ো জুতসই মনে হল। সত্যিই তো। সমাজ থেকে যাদের কিছুমাত্র পাওয়ার আছে, আশা করার আছে, তারা নিজেদের এমনভাবে ছোটো করবে কেন? যা তারা এমনিতে পেল না, নিজের রূপে পেল না, গুণে পেল না, মানে-সম্মানে কিছুতেই পেল না তারা পয়সার বিনিময়ে এমন ঘৃণার সঙ্গে ঘৃণার মধ্যে তা পেতে যাবে কেন? যা নরম গোপন সহজ আনন্দর দান তা আবরণহীন নির্লজ্জতার দেনা-পাওনার মধ্যে আশা করবে কেন?

টবীকে বললাম, জব্বর বলেছিস টবী।

টবী বলল, কী জানি? আমার চিরদিনই এমন মনে হয়েছে। বিশেষ করে যত বছর ইয়োরোপে আছি। এখানে এসব ব্যাপারে এতখানি স্বাধীনতা–প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী-পুরুষ এতখানি স্বাধীন যে সুস্থতার মধ্যেই তারা সব কিছু সহজে পেতে পারে, চুরি করে অসুস্থতার মাধ্যমে কিছু পাওয়ার তাদের দরকার কী? তবুও, সব দেশেই বোধহয় এক ধরনের লোক থাকেই–অসুস্থতা ও বিকারগ্রস্ততাই বোধহয় তাদের ধর্ম। যা মাথা উঁচু করে পাওয়া যেতে পারত, তা মাথা হেঁট করে পেতেই বোধহয় তারা ভালোবাসে।

টবীর গাড়িটা পার্ক করানো ছিল দূরে। আমরা সেখানে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ঠাণ্ডাটা বেশ ভালো পড়েছে। আমার পক্ষে তো বটেই।

টবী বলল, চলো তোমাকে প্লে-বয় ক্লাবে নিয়ে যাই।

আমি বললাম, সেটা কী ক্লাব?

ও অবাক হল। বলল হিউ-হেফনারের নাম শোনোনি?

না। আমি বোকার মতো বললাম।

প্লে-বয় ম্যাগাজিন দেখেছ কখনো?

আমি বললাম, হ্যাঁ। তা দেখেছি। নানারকম গা-গরম করা ছবি-টবি থাকে।

টবী বলল, তাহলে তো দেখেছ। হিউ-হেফনার অ্যামেরিকান। প্লে-বয় ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। পৃথিবীর বহুজায়গায় এই ক্লাব আছে। খুব একসকুসিভ ক্লাব। মেম্বারশিপ বেশ লিমিটেড। চলো তোমাকে দেখিয়ে আনি।

দেখতে দেখতে আমরা লানডানের অভিজাত পাড়া মে-ফেয়ারে এসে পড়লাম। মে ফেয়ারের পার্ক লেনে প্লে-বয় ক্লাব।

ক্লাবটা যে খুব বড়ো তেমন নয়। ছোট্ট এনট্রান্স–বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায় না যে ক্লাব।

ভেতরে ঢুকতেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। দেখি অতিসুন্দরী অল্পবয়েসি মেয়েরা প্যান্টির ওপর সুইম স্যুটের চেয়েও অনেক হ্রস্ব গরম পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেম্বারদের খাদ্যপানীয় সরবরাহ করছে। তাদের প্রত্যেকের পশ্চাৎদেশে একটি সাদা ফারের বল মাথায় খরগোশের কানের মতো ভেলভেটের কান। তাদের নাম Bunny.

Bunny Girl-রা সারাপৃথিবীতে বিখ্যাত।

টবী ওপরে নিয়ে গেল আমাকে। দেখি সেখানে সিগারেট আর পাইপের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। আর নানারকম টেবিলের চারপাশে নারী-পুরুষ ভিড় করে ঝুঁকে রয়েছে। বিভিন্ন আকৃতির বিভিন্ন প্রকৃতির জুয়াখেলার বোর্ড।

এ ব্যাপারটা আমি কখনো ভালো বুঝি না। ভালো মানে, একবারেই বুঝি না। ঘরের মধ্যে বসে যেসব খেলা যায় সেসব খেলা ছোটোবেলা থেকেই বাবার কড়া শাসনে শেখা হয়নি। শেখা যে হয়নি তার জন্য নিজের বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই বরং স্বস্তি আছে। পাঠক হয়তো শুনলে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন যে তাস পর্যন্ত চিনি না আমি–খেলা জানা তো দূরের কথা। জুয়া তো আরও দূর।

সে-কারণেই এখানে এসে বিশেষ বুঝতে পারলাম না চতুর্দিকে কী ঘটছে না ঘটছে। তবে সমবেত জনমন্ডলীর মুখ-চোখের ভাব দেখে মনে হল তাঁদের উৎসাহের অন্ত নেই।

এক জায়গায় দেখি কয়েকজন আমাদেরই মতো কালো-কালো লোক গালে হাত দিয়ে তন্ময় হয়ে বসে দানের পর দান দিয়ে যাচ্ছে। উঁকি মেরে দেখি যে-চাকাটা ঘুরছে তার ওপর লেখা আছে–মিনিমাম স্টেক–দুশো পাউণ্ড।

দেখেই আমার মাথা ঘুরে গেল। বুঝলাম না এরা কারা? কোন গ্রহের লোক? শুনেছি অ্যামেরিকানরা ও জাপানিরা খুব বড়োলোক। কিন্তু এদের চেহারা প্রায় আমারই মতো দিশি দিশি–কিন্তু এক এক দানে চারহাজার টাকা নষ্ট করছে এরা কারা? শুধু তা-ই নয়, দেখি Bunny গার্লরা তাদের ক্রমাগত রয়্যাল-স্যালুট স্কচ হুইস্কি পরিবেশন করে যাচ্ছে। যে হুইস্কির একবোতলের দাম স্কটল্যাণ্ডেও কম করে হাজার টাকা। আমার মুখ-চোখ লক্ষ করে, পাছে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই–তাই তাড়াতাড়ি টবী বলল, এরা সব তেল-দেওয়া লোক।

আমি বুঝলাম না। বললাম, মানে?

টবী বলল, আবু দাবি, দুবাই এসব জায়গার অয়েল-ম্যাগনেট এরা–লানডানে ফুর্তি করে যাচ্ছে।

আমি উত্তেজিত গলায় বললাম, তেল-বেচা টাকা দিয়ে? কোনো মানে হয়? আর তেলের খরচের জন্যে আমি টেনিস খেলা বন্ধ করে দিয়েছি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে।

টবী বলল, এখন তো এদেরই দিন।

সে-রাতে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল।

টবীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল যে স্কটল্যাণ্ড দেখা হল না।

টবী বলল, তুমি দু-মাসে তামাম পৃথিবী দেখবে বলে বেরিয়েছ তার আমি কী করব? পরের বছর আবার চলে এসো। শুধু টিকিটের খরচ তোমার। শুধু একমাসের জন্যে এসো। আমি যতদিন পারি আগে থেকে ছুটি ম্যানেজ করব। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ব। তোমাকে স্কটল্যান্ড আর জার্মানি ভালো করে ঘুরিয়ে দেখাব। বহু বন্ধু-বান্ধব আছে। তোমার তো কোনোই খরচ নেই–শুধু ছুটি নিয়ে আসা।

আমি হাসলাম। বললাম, এবারই বা কী খরচ? দেশে দেশে এমন সব রেস্তদার ভাই বিরাদর থাকতে আমার আর ভাবনাটা কী?

টবী বলল, স্কটল্যাণ্ড তোমার খুব ভালো লাগবে। স্কটিশ মুরস, লেকস আর পাহাড়গুলো। ভেজা ভেজা মেঘ-মেঘ।

আমি বললাম, আমার কলকাতায় এক স্কচ বন্ধু ছিল, সে ব্রিটিশ এমব্যাসিতে ছিল– বরাবর আমায় নেমন্তন্ন করত হ্যাগেস দেখতে। পুরোপুরি স্কটল্যাণ্ডের পোশাক পরে ওরা ওদের বাড়িতে যে হুল্লোড় করত তা বলার নয়। স্কচ লোকেরা কিন্তু ভারি দিলখোলা হয়, তাই না?

টবী বলল, যা বলেছ। কিন্তু কিপটে হয়।

স্মিতা বলল, রুদ্রদা, তোমার দিন তো ফুরিয়ে এল। এবার তুমি মাদাম তুসোর গ্যালারি আর ব্রিটিশ মিউজিয়মটা ভালো করে দেখে নাও।

বললাম, হ্যাঁ। লাইব্রেরিতেও যেতে হবে। তারপর বললাম, আসলে কী জানো লাইব্রেরি, মিউজিয়ম এমন করে দেখা যায় না। দেখলে ভালো করেই দেখতে হয়। নইলে কলকাতা ফিরে আম্মো দেখেছি বলা ছাড়া আর কোনো লাভ হয় না। আমি বিদেশে এসেছি অন্য কাউকে বিন্দুমাত্র ইমপ্রেস করার জন্যে নয়–নিজে ইমপ্রেসড হতে। নিজে যা ভালো করে দেখতে পেলাম তা দেখে লাভ কী? কলকাতার ককটেল পার্টিতে হুইস্কির গ্লাস হাতে করে দাঁড়িয়ে অনেকে যেমন দেশ বেড়ানোর গল্প করেন আমি সেইরকম দেশ বেড়ানোতে বিশ্বাস করি না। তাই তো এই স্বল্প সময়ে যতটুকু পারছি লোকজনের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করছি। দু চোখ দু-কান ভরে ওদের কাছে কী শেখার আছে তাই-ই শেখার চেষ্টা করছি এই সময়ের মধ্যে। এ সময়ে কিছুই হবে না জানি, তবুও যতটুকু হয়। নাই-মামার চেয়ে কানা-মামা ভালো।

আমরা বসে ড্রইংরুমে গল্প করছি। খাওয়া হয়ে গেছে আমাদের। টেলিভিশনে একটা ফিচার-ফিল্ম দেখাচ্ছে। স্মিতাই দেখছে একা। এমন সময়ে টেলিফোনটা বাজল।

টবী ফোন ধরেই বলল, রুদ্রদা, সানুর ফোন, টরোন্টো থেকে।

সানু বলল, মুশকিল হল। আমার ছুটির দরখাস্তটা মঞ্জুর হয়েছে কিন্তু আগে থেকে। তারপর আমাদের ইয়ার-ক্লোজিং। ছুটি পাব না। তোমার প্রোগ্রামটা একটু অ্যাডভান্স করে চলে এসো।

আমি বললাম, টবী যে কসমস-এর টিকিট কেটে ফেলেছে।

সানু বলল, লানডানে বসে বোরড হচ্ছ কেন? এক্ষুনি চলে যাও কন্টিনেন্টাল ট্যুরে। যে। তারিখে বলছি সে তারিখে চলে এসো। ফ্লাইট-নম্বরটা টবীকে বোলো ফোন করে জানিয়ে দেবে। আমি এয়ার-পোর্টে থাকব।

আমি বললাম, আছিস কেমন?

ও বলল, ফাইন। তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি এসো-নইলে ক্যানাডাতে ঠাণ্ডা পড়ে যাবে–ঘোরাঘুরির অসুবিধা।

বললাম, ঠিক আছে।

টবী বলল, নো প্রবলেম! তাই-ই করো।

স্মিতা বলল, সে হলে তো রুদ্রদাকে এর মধ্যে একদিন সাফারি পার্কে নিয়ে যেতে হয়। শিকারি মানুষ। ভালো লাগবে।

আমি হাসলাম। বললাম, দেখো স্মিতা, টবীর মতো শহরের শিকারে আনসাকসেসফুল বলেই জঙ্গলের শিকারি আখ্যা পেয়ে এলাম চিরদিন। তা বলে কি তুমি শিকারি বলে হেলা করবে?

স্মিতা বলল, ও যা শিকারি, জানা আছে। শিকার একটাই করেছে জীবনে–এই আমি। তাও আমি প্রায় আত্মহত্যা করলাম বলেই পারল, বাঁচতে চাইলে পারত না।

টবী উত্তর দিল না, সঙ্গে সঙ্গে কসমসের অফিসে ফোন করার জন্যে ডায়াল ঘোরাল।

সেদিন শনিবার ছিল। ছুটি। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সাফারি পার্ক-এর উদ্দেশে।

ইটনের পথে কিছুদূর গিয়ে আমরা ঘুরে গেলাম। আধ ঘণ্টাটাক লাগল পৌঁছোতে। বিরাট এলাকা জুড়ে একজন সার্কাসের মালিক এই ওপেন-এয়ার চিড়িয়াখানা বানিয়েছে। বেবুন, বাঘ ও সিংহ আছে। সব ভোলা। তাদের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে দেখতে হয়। বাইরে নোটিশ দেওয়া আছে যে, যার যার নিজের দায়িত্বে আগন্তুকরা ভেতরে ঢুকছেন –মাল-জানের দায়িত্ব যার-যার তার-তার। কতৃপক্ষ দায়ী থাকবেন না কিছু অঘটন ঘটে গেলে।

বেবুনগুলো বেশ বড়ো বড়ো। পশ্চাৎদেশ রক্তিমবর্ণ–সম্মুখভাগে দাঁত খিচোনো ভঙ্গি। গাড়ি দেখলেই গাড়ির মাথায় ফ্রি-রাইডের জন্য চড়ে বসে।

বেবুনদের এলাকা পেরিয়ে বাঘেদের এলাকায় এলাম। ছোটোবেলা থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জঙ্গলে ঘুরেও কখনো এমন এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। কখনো দেখা যেত বলে মনেও হয় না। কারণ, বাঘ স্বাধীনচেতা ও রাজারাজড়া জানোয়ার। তারা যুথবদ্ধতায় কখনোই বিশ্বাসী নয়। তাই একসঙ্গে পনেরো-কুড়িটা বাঘকে একটি ছোটো এলাকার মধ্যে দেখে অবাকই হতে হয়।

জঙ্গলে একসঙ্গে কেন এত বাঘ দেখা যায় না তা একটু প্রাঞ্জল করে বলি। প্রথমত আগেই বলেছি বাঘ যুথবদ্ধ জানোয়ার নয়। দ্বিতীয়ত বাঘ ও বাঘিনি বছরের পুরো সময় কখনোই একসঙ্গে থাকে না। বছরে তাদের দুবার মিলনকাল। সেই সময়ে সঙ্গী জুটিয়ে নেয়। খুব একটা বাছবিচারের সুযোগ পায় বলে মনে হয় না। যে-বছর যার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সে-ই সঙ্গী বা সঙ্গিনী হয়। সেই সময়ও প্রায়শই দেখা যায় যে, বাঘ ও বাঘিনি সন্ধে হতে না হতেই শৃঙ্গার শুরু করে রাত্রিশেষ অবধি মিলিত হয়। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে আলাদা-আলাদা হয়ে ঘুমোয়। কেউ গুহায়, কেউ-বা নালার নরম বালিতে। গরমের দিনে ছায়াচ্ছন্ন জায়গায়, শীতের দিনে রোদে, কিন্তু আড়ালে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম যে হয় না এমন নয়।

বাঘেদের দাম্পত্যজীবন ভালোভাবে লক্ষ করলে অনেক কিছু শিখতে পারে মানুষ। বিবাহিত ব্যক্তিমাত্রেরই পাখা জোরে চালানো অথবা আস্তে চালানো, অথবা মশারি টানানো কিংবা না-টানানো নিয়ে বিস্তর মনকষাকষি হয় স্বামী অথবা স্ত্রীর সঙ্গে। বাঘেরা বুদ্ধিমানের মতো এসব ঝামেলা এড়িয়ে চলে।

হঠাৎ একটি বাঘিনি চটে উঠে ঘাড়ের লোম ফুলিয়ে ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ার্ডেনের গাড়ি এসে আমাদের পাশে দাঁড়াল। খোলা ছোটো ভ্যান। তাতে জনচারেক ওয়ার্ডেন–দু কোমরে হেভিববারের দুই পিস্তল গুঁজে রয়েছেন প্রত্যেকে। হাতে লম্বা চাবুক।

কিন্তু তাঁদের হাবভাব দেখে মনে হল প্রত্যেক বাঘকেই তাঁরা চেনেন এবং নাম ধরে ডাকেন। তাঁরা এসে বাঘেদের বোধ্য ও আমাদের কাছে সবিশেষ দুর্বোধ্য কী ভাষায় বিস্তর অনুরোধ-উনুরোধ করায় বাঘিনি সরে গেল।

স্মিতা অস্ফুটে বলল, ইশ, তোমার কী সাহস, রুদ্রদা! এইরকম বাঘ তুমি পায়ে দাঁড়িয়ে মারতে পারো?

টবী বলল, রুদ্রদা আর কী সাহসী? আমি এর চেয়েও হিংস্র বাঘিনি নিয়ে দিনরাত ঘর করছি।

খবরদার! বলে স্মিতা ফোঁস করে উঠল।

আমি মাঝে পড়ে বললাম, বাঘ-বাঘিনি থাক, এবার সিংহের কাছে যাওয়া যাক।

এই সাফারি পার্কেও গত ইংরিজি বাহাত্তর সাল থেকে চুয়াত্তর সালের মধ্যে বাষট্টিটি সিংহের বাচ্চার জন্ম হয়েছে। ষাট, ষাট। মা-ষষ্ঠীর এমন দয়া! অনেক বাচ্চা নিশ্চয়ই বিক্রি হয়ে গেছে। অনেক বাচ্চা সার্কাসে ভরতি হয়ে এখন টুলের ওপর দাঁড়িয়ে খেলা দেখাচ্ছে। বর্তমানে পার্কে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশটি সিংহ-সিংহী আছে।

টবী বলছিল, সিংহগুলো মাঝে মাঝে গাড়ির ছাদে চড়ে পড়ে।

বলিস কী, বলতে বলতেই, একটা প্রকান্ড বড়ো ঘাড়ে-গর্দানে কেশর-ঝোলানো সিংহ আমাদের সামনে সামনেই যে একটা বাদামি-রঙা ফরাসি দেশীয় সিমকা গাড়ি যাচ্ছিল, তার বনেটের ওপর লাফিয়ে উঠল। যে ভদ্রলোক চালাচ্ছিলেন, তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। পাশে সুন্দরী সঙ্গিনী–গাড়িটাও নতুন। সিংহ বোধহয় বেছে বেছে সে-কারণেই তার ওপর চড়ল। কিছুক্ষণ বনেটের ওপর দাঁড়িয়ে ভার সয় কি না দেখে নিয়ে বনেট থেকে আস্তে আস্তে গাড়ির ছাদে সামনের দু-পা বাড়িয়ে সাবধানে উঠল। যাতে পা না পিছলোয় সেই জন্যে। তারপর চাইনিজ ফিলসফারের মতো মুখভঙ্গি করে নট-নড়নচড়ন নট কিছু হয়ে বসেই থাকল।

আমরা দেখলাম, আস্তে আস্তে চকচকে সিমকা গাড়িটার ছাদ বসে যাচ্ছে। একটা প্রমাণ সাইজের হৃষ্টপুষ্ট সিংহের ওজন কম নয়।

চতুর্দিক থেকে পটাপট ছবি উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ পোজ দিয়ে বসে থেকে তিনি একলাফ দিয়ে নেমে পড়লেন। তখন আমরা আস্তে আস্তে সিংহের এলাকা ছেড়ে গেটের দিক যেতে লাগলাম।

এদিকে-ওদিকে অনেক শকুন দেখলাম। এই বাঘ-সিংহদের যে খাবার দেওয়া হয়, সেই হাড়-গোড় ও তৎসংলগ্ন মাংসর সদ্ব্যবহার করে তারা।

সাফারি পার্কের ক্যান্টিনে এককাপ করে কফি খেয়ে আমরা বাড়ির দিকে ফিরলাম।

দুপুরটা সেদিন ভালো আড্ডা মেরে কাটল। স্মিতা পাবদা মাছের ঝোল বেঁধেছিল ধনেপাতা দিয়ে। রান্না ফার্স্ট ক্লাস হয়েছিল কিন্তু টাটকা পাবদা মাছ আর ডিপ-ফ্রিজে রাখা পাবদা মাছের স্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা। তা ছাড়া বোধহয়, ইংল্যাণ্ডে বসে পাবদা মাছ ঠিক জমে না। যেখানকার যা; যখনকার তা।

বিকেল হতে-না হতে স্মিতা বলল, আমার এক বান্ধবী আসবে আজ সন্ধের সময়ে। তোমরা থেকো কিন্তু।

টবী শুধাল, কে বান্ধবী?

সুসান। স্মিতা বলল।

টবী বলল, আমি মোটেই থাকছি না। তা ছাড়া মেয়েটার সঙ্গে তোমার এত ঘনিষ্ঠতা ভালো নয়।

কেন? স্মিতা রাগত স্বরে শুধাল। টবী বলল মেয়েটা সুবিধের নয়। তোমাকে বলেছে। স্মিতা বলল।

তারপর বলল, এরকম মেয়ে আমি আমার পুরো অফিসে একজনও দেখিনি–কী ছেলেমানুষ আর কী যে ভালো!

টবী কথা ঘুরিয়ে বলল, থাক বাবা, আই উইথড্র। তবে, তোমার বন্ধু আসবে ভালো কথা, তুমি entertain করো। সুসান আসলে বোলো, আমি আমার কাজিনকে নিয়ে ডেন্টিস্ট-এর কাছে গেছি। দাঁতে রুদ্রদার খুব ব্যথা।

স্মিতা খুব মনমরা হয়ে বলল, সে কী? সুসান যে রুদ্রদার সঙ্গে আলাপ করার জন্যই আসছে। লেখক শুনে ও খুব আলাপ করতে উৎসুক। ও মাঝে মধ্যে ছোটো গল্প-টল্প লেখে।

টবী বলল, তাহলে লেখক বলে কি দাঁতে ব্যথা হতে পারে না?

তারপর একটু থেমে বলল, সুসানকে এক্ষুনি ফোন করে এল যে, লেখকের দাঁতে ব্যথা; যন্ত্রণায় কাত্রাচ্ছে কাটা-কইয়ের মত!

রিসিভারটা তুলে স্মিতা বলল, কাটা-কই-এর মতোর ইংরিজি কী?

টবী স্মিতার মুখের দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ চেয়ে বলল, কাটা-কই-এর মতো বলার দরকার নেই।

আমরা তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলাম।

কিন্তু সুসান তবুও আসবে বলল। আজ সন্ধেতে ও আর কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখেনি। স্মিতার সঙ্গে গল্প করবে আর খাবে–লেখকের সঙ্গে নাই-ই বা দেখা হল।

বলাবাহুল্য, একথাতে অধম লেখক মোটেই খুশি হল না। উত্তম লেখক হলেও সুসান আসার অনেক আগেই টবী আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

লিফট থেকে নেমে গাড়িতে উঠতে উঠতে টবীকে বললাম যে, যতদুর মনে পড়ে তোর সঙ্গে কখনো কোনো শত্রুতা করিনি। কিন্তু একজন সুন্দরী সাহিত্যরসিকা উৎসুক তরুণীর সঙ্গে আমার আলাপে তোমার এহেন আপত্তি কেন?

টবী বলল, আই অ্যাম সরি। কিন্তু না-পালিয়ে উপায় ছিল না। আমি বাড়ি থাকলে কেস গড়বড় হয়ে যেত।

ব্যাপারটা কী? আমি শুধোলাম।

আরে ওর বড়ো বোন আমার গার্ল ফ্রেণ্ড ছিল। আমি সুসানের নাম শুনে এবং ওর বাবা মা কোথায় থাকে তা শুনেই বুঝেছি প্রথম দিন থেকে। ও আমাকে ভালো চেনে।

আমি বললাম, তুই নিশ্চয়ই কিছু অপ্রীতিকর কাজ করেছিলি।

টবী বলল, বিশ্বাস করো, আমি কোনো কিছুই করিনি। কিন্তু সুসানের দিদি আইলীন যে এমন ইমোশনাল, এত বেশি সেনসিটিভ তা বুঝতে পারিনি। ওদের পরিবারটি খুব ভালো। যেমন মা, তেমন বাবা। বাবা ইংরিজির অধ্যাপক ছিলেন এক মফসসল কলেজে। মেয়েরা সকলেই একটু কবি-প্রকৃতির। কী বিপদে যে পড়েছিলাম, কী বলব। আমি তাকে বিয়ে করব না, করা সম্ভব নয় বলাতে তার মাথার গোলমাল হয়ে গেছিল। এখন অবশ্য সব ঠিক-ঠাক হয়ে গেছে।

আমি বললাম, বিয়ে করলি না কেন? খুবই অন্যায় করেছিস।

টবী বলল, তুমি তো আজব লোক; বাবা খড়ম-পেটা করতেন না? মা কি মেমসাহেব ঘরে তুলতেন? তা ছাড়া বিয়ে করলে দিশি মেয়েই ভালো। এদের নিয়ে হিমসিম খেতে হয়।

এতই যদি জানিস তাহলে ইংরেজ মেয়ের সঙ্গে তেমনভাবে মিশলি কেন? প্রেম করলি কেন?

গাড়িটা সোয়ান-ট্যাভার্ন বলে একটা পাব-এর সামনে দাঁড় করাল টবী। গাড়ি পার্ক করে আমরা নামলাম।

টবী বলল, জানো এ পাবটা দুশো বছরের পুরোনো পাব। বিখ্যাত পাব এটা।

আমি বললাম, রাস্তাটা চেনা চেনা লাগছে যেন!

টবী বলল, লাগবেই তো। এটাই তো বেজওয়াটার স্ট্রিট। খুব লম্বা রাস্তা। বিয়ার মাগে গিনেস। কালো বিয়ার নিয়ে আমরা বাইরের খোলা আকাশের নীচের কাঠের তৈরি বসার জায়গায় এসে বসলাম।

চারপাশে ফুটফুটে সব ছেলে-মেয়ে। হুল্লোড় করছে, জোড়ায়-জোড়ায় ফিরে যাচ্ছে–মনে হচ্ছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এই বুঝি ফুরিয়ে গেল ভেবে প্রচন্ডভাবে উপভোগ করে নিচ্ছে। আঁজলা গড়িয়ে যেন ছিটেফোঁটাও না পড়ে যায় জীবন। সবসময়ে সেদিকে নজর।

এদেশে এসে অবধি বারবারই মনে হয়েছে বয়েসটা কেন পঁচিশের নীচে হল না, কেন এদেশে পড়াশুনো করলাম না।

এসব কেন সকলের মনেই ওঠে–কিন্তু এসব কেনর কোনো উত্তর হয় না। হবে না। জানি, তবুও মনটা হঠাৎ হঠাৎ খারাপ লাগে। ভীষণ খারাপ।

কিন্তু জীবনে আর সবই হয়, কিন্তু জীবনের গাড়ির কোনো ব্যাক-গিয়ার নেই। এ গাড়ি শুধু সামনেই চলে। শুধুই সামনে।

ব্ল্যাক-বিয়ারের মাগ-এ একটা বড়ো চুমুক লাগিয়ে টবী হঠাৎ পথের দিকে চেয়ে চুপ করে গেল।

পথ দিয়ে বেশি গাড়ি যাচ্ছে না। শনিবারের রাত। এখন ভিড় বেশি হয় শুক্রবার রাতে। ফাইভ-ডেজ উইক হয়ে গিয়ে জীবনযাত্রার পুরোনো প্যাটার্ন বদলে গেছে।

আমিও পথের দিকে চেয়েছিলাম। ভাবছিলাম, বেশ কটা দিন কেটে গেল লানডানে টবীদের আতিথেয়তায়। ছোটোবেলায় কখনো ভাবিনি যে বেড়াতে আসব এখানে। ভেবেছিলাম কি না মনে পড়ে না। কিন্তু আমি বড়ো কৃতজ্ঞ লোক। এ জীবনে যা-কিছু পেয়েছি, যতটুকু পেয়েছি, অর্থ, যশ, ভালোবাসা, প্রীতি সব কিছুর জন্যেই সৃষ্টিকর্তার কাছে বড়ো কৃতজ্ঞ থাকি। যখনই একটু একা বসে ভাবার অবকাশ ঘটে, তখনই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলি, ঈশ্বর! তুমি সত্যিই করুণাময়। যা পেয়েছি তার জন্যে আনন্দিত থাকি। যা-পাইনি সেইসব অপ্রাপ্তিজনিত নিখাদ দুঃখ দেওয়ার জন্যেও তাঁর কাছে বড়ো কৃতজ্ঞ থাকি। শুধু আমার একার কেন, সকলের সব খাদ তো দুঃখের আগুনেই ঝরে। যে দুঃখ পেল না, দুঃখকে আপন অন্তরের অন্তরতম করে জানল না, তার কাছে তো সুখের স্বরূপও অজানা। যে দুঃখকে জেনেছে, সেই-ই তো সুখকে জানতে পারে।

ভাবছিলাম দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাব। আবার আসতে পারব কি না কে জানে? এসে যে ভারত উদ্ধার অথবা নিজেকে উদ্ধার করলাম এমন নয়। তবে, কত কী দেখলাম দু-চোখ ভরে, মানুষ দেখলাম, তাদের সমস্ত মন দিয়ে বোঝবার চেষ্টা করলাম, কথা শুনলাম। এটা একটা বড়ো শিক্ষা হল। পৃথিবীটা এতদিন যেন ম্যাপের মধ্যেই, গ্লোব-এর গোল বলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হঠাৎ নীল রঙে আঁকা সমুদ্র, ছোটো ছোটো অক্ষরে লেখা পৃথিবীর বিভিন্ন শহরগুলোর নাম আমার মতো এই সামান্য জনের জীবনেও সত্যি হয়ে উঠল। পৃথিবীটা এতদিনে ম্যাপ থেকে, গ্লোব থেকে ছাড়া পেয়ে আমার চেতনার মধ্যে, দৃষ্টির মধ্যে নড়ে-চড়ে উঠল জীবন্ত হয়ে। স্মৃতির মধ্যে এল।

হঠাৎ টবী বলল, রুদ্রদা, তুমি বলছ তাহলে আমি আইলীনের প্রতি অন্যায় করেছি?

পরক্ষণে নিজেই বলল, আসলে জানো, এখানে ভারতীয় সাধারণ ছাত্র যারা পড়তে আসে, বা চাকরি নিয়ে আসে, তাদের সঙ্গে যত মেয়েরই দেখা সাক্ষাৎ হয়, তাদের সঙ্গে ঠিক প্রেম বলতে আমরা দেশে যা বুঝি তেমন সম্পর্ক হয় না। তোমাকে কি বলব বুঝিয়ে বলতে পারছি না–সম্পর্কের বেশিটাই শরীরনির্ভর–অর্থনির্ভর।

তারপর বলল, সত্যিকারের প্রেম বলতে যা বোঝায় তা কি আজকাল আছে? দেশেও কি আছে? মনে হয় সমস্ত ব্যাপারটাই বদলে গেছে অনেক।

আমি বললাম, তুই কিন্তু যা বললি, তাতে আইলীন তোকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল। তোর কাছে তো তার প্রত্যাশার কিছু ছিল না।

কিছু না। কিছু না। টবী বলল।

তারপর বড়ো আরেক ঢোক বিয়ার গিলে বলল, আজ না হয় দু-পয়সার মুখ দেখেছি নিজের ফ্ল্যাট কিনেছি–গাড়ি চড়ছি–ভালো ভালো ক্লাবের মেম্বার হয়েছি, কিন্তু সেদিন? সেদিন আইলীন শুধু ভালোই বাসেনি আমাকে–অনেকরকম সাহায্যও করেছিল।

আমি বললাম, তুই পালিয়ে না এসে সুসানকে মিট করলে পারতিস। আইলীনের সব খবরাখবর পেতিস।

ও চোখ বড়ো করে বলল, স্মিতা জানে না যে।

জানলেও বা কী? আমি বললাম।

টবী আশ্চর্য চোখে আমার দিকে তাকাল।

তারপর বলল, আমার সন্দেহ হয় তুমি আদৌ লেখক কি না। মেয়েদের তুমি কিছুই বোঝোনি! তোমার ধারণা স্মিতা বুঝত কিছু? কিছুই সে বুঝত না। মেয়েরা, সে যে-দেশের মেয়েই হোক না কেন, কতগুলো ব্যাপার কখনো বোঝেনি। বুঝবেও না। যতই তুমি বোঝাতে যাও। বোঝাতে চাওয়াও মূর্খামি।

তারপর টবী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আইলীনের ব্যাপারটাকে আমি কখনো আমল দিইনি। নিজেকে নিজে চিরদিন জাস্টিফাই করে এসেছি। ভেবেছি, আই ওজ ওলওয়েজ রাইট। অ্যাণ্ড শী ওজ অলওয়েজ রং। তোমার কথায় এখন দেখছি ভেবে দেখতে হবে। অবশ্য করার কীই বা আছে এখন। ভাবনাই সার। কিন্তু দাদা-প্রেম-টেম এসব সুক্ষ্ম ব্যাপার সকলের জন্যে নয়। তোমরা লেখক-টেখক তোমাদের এসব মানায়–মানে তোমরা এসবের ফাইনারিজগুলো বোঝো–আমি ডাহা মিস্ত্রি–এঞ্জিনিয়র এল আর যাই এল–আমি এসব ঠিক বুঝিনি কখনো। ভুলটা আইলীনেরই। ও ভুল করে ভুল লোককে ভালোবেসেছিল। ওসব ভালোবাসা-টাসা আমার আসেনি। হিন্দুমতে বাবা-মায়ের দেখে দেওয়া মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি–বউ আমার বেঁচে থাক–সব সাদা চামড়ার মেয়ের মুখে ছাই।

টবীর কথার ভাষা ও রকম দেখে মনে হয় টবী একটু হাই হয়ে গেছে। অথচ ও এত সহজে হাই হওয়ার ছেলেই নয়। মানুষের মন বড়ো দুয়ে ব্যাপার। মনই বোধহয় শরীরকে চালায়। মন বেসামাল হলে শরীরের বেসামাল হতে দেরি সয় না।

আমি চুপ করে পথের দিকে চেয়েছিলাম। ওর পুরোনো দিনের ভুলে যাওয়া ও ভুলে-থাকা ভাবনাকে ফিরিয়ে আনার পেছনে আমার অপরাধ হয়তো কম নয়। কিন্তু মুখে ও আজ যাই বলুক, টবীর ভেতরেও যে একটা আশ্চর্য নরম মানুষ ছিল, যার খোঁজ দেশে কি বিদেশে কেউই রাখেনি, এই মানুষটাকে জানতে পারলাম আমি–এই-ই মস্ত লাভ।

ওইখানে বসে, চতুর্দিকের হই-হই, গাড়ির আওয়াজের মধ্যে আমার হঠাৎই মনে হল যে, সারাজীবন বড়ো কাছাকাছি থেকেও আমরা একে অন্যের বহিরঙ্গ দিকটাকেই জানি জানতে পাই–অন্তরঙ্গ রূপ তত সহজে প্রকাশিত হয় না–প্রকাশিত হলেও সেই রূপের দেখা পেতে দেবদুর্লভ ভাগ্যের দরকার হয়। তাই বহিরঙ্গকেই অন্তরঙ্গ বলে ভুল করতে করতে সেইটাই একমাত্র ও অমোঘ রূপ বলে বিশ্বাস জন্মে যায়। তখন ভেতরের গভীর জলের বাসিন্দা আসল মানুষটা কখনো বাইরে রোদ পোয়াতে এলে–তাকে রোদ পোয়ানো জল-ঢোঁড়া সাপের মতো আমরা ইট-পাটকেল মেরে উত্যক্ত করি। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার ঝুপ করে জলে নেমে অদৃশ্য হয়ে যায়।

কতক্ষণ যে আমরা ওখানে বসেছিলাম, কতবার বিয়ার মাগ ভরতি করে এনেছিলাম মনে নেই। বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল বাইরে হিমে বসে থেকে।

বললম, টবী, এবার চলো ওঠা যাক।

টবী আমার দিকে তাকাল। কথা বলল না।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, চলো রুদ্রদা! তোমাকে আইলীনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইউ উইল লাইক হার। ভেরি নাইস গার্ল ইনডিড। ও কাছেই থাকে।

আমি বললাম, টবী, বাড়ি চলল।

টবী বলল, নো। নট ন্যাউ।

তারপর বলল, তুমি একটা ক্যাব নিয়ে চলে যাও রুদ্রদা। আইলীনের সঙ্গে অনেক কথা জমে আছে। ও যদি বাড়ি থাকে, তাহলে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা চাইব ওর কাছে।

টবী কোনো কথা না শুনে আমাকে বলল, তুমি এগোও। আমি আইলীনের বাড়ি ঘুরে যাচ্ছি।

কোটের কলার তুলে বেজওয়াটার স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছিলাম। ঝুরুঝুরু করে হাওয়া দিয়েছে একটা। আর দিনকয়েক পরই ফল শুরু হবে। প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে একটা ক্যাব পেলাম।

বাড়ি পৌঁছেছি, দেখি টবীও ওর গাড়ি পার্ক করছে।

গাড়ি লক করে টবী এগিয়ে এল।

আমি কথা না বলে ওর দিকে তাকালাম।

টবী বলল, আইলীন ও ঠিকানায় নেই। বহুদিন হল চলে গেছে।

মনে মনে আমি খুশি হলুম। খুশি হলাম আইলীনের জন্যে এবং টবীর জন্যেও। মুখে। কিছুই বললাম না।

লিফটের দরজা খুলে ধরলাম টবীর জন্যে।

.

বুদ্ধদেব গুহ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...