নানা রঙের ফাল্গুন

বসন্ত এসেছে আবার আমাদের মাঝে। বাংলার বসন্ত নিয়ে চর্যাপদের কবিদেরও যে দু’একটি পঙ্ক্তি নেই তা কিন্তু নয়। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনেও বসন্তের দেখা মেলে। আর পদাবলী তো আমার মনে হয় বসন্তের রাজা। সংস্কৃত শ্লোক জয়দেবেও আমরা পাই। এ ছাড়া আমাদের সাহিত্যে, গানে, নৃত্যে বসন্তবন্দনা হয়েছে নানা কারণে। এসব কারণ যাই থাকুক না কেন, আমার বারবার একটি কথাই মনে হয়। সেটা হলো_ মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রকৃতির রঙ, রস, রূপ টেনে-হিঁচড়ে নিংড়ে বের করে নিয়ে আসছে। এই বিষয়টি বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের মানুষরা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাওয়ার পর থেকেই এমনটা ঘটছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, বর্তমান সময়ে কেউ যদি চায় কৃত্রিমভাবে তার ঘরে বসন্তের দোলা দিতে তাহলে তার এয়ারকন্ডিশনের তাপমাত্রাটা কমিয়ে_ ঠিক যতটা আমি চাই, এয়ারফ্রেশনার বা যে ফুলের গন্ধটা আমি চাই তা দিয়ে ঘরের মধ্যেই বসন্তের আবহ নিয়ে আসা যায়। এভাবে প্রকৃতির রঙ, রস, গন্ধ আমরা কৃত্রিমভাবে নিজেদের করে তুলছি।
বাংলার প্রকৃতি অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে আলাদা। প্রকৃতি এখানে ঘন ঘন তার রূপ বদলায়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ নিয়ে অসংখ্য গান- কবিতা আছে। এবং এখনও আমরা লিখছি নতুন করে। আমার মনে হয়, এই সব রচনায় স্মৃতির ভূমিকা বেশি থাকে যতটা থাকার কথা ছিল বাস্তবের। বর্ষা তো আমাদের একেবারে নিজস্ব একটা ঋতু। রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের শেষদিকে বর্ষার গান লিখেছিলেন। আর বলা যায়, সেটা ছিল শৈলজা রঞ্জন মজুমদারের নির্দেশে। শৈলজাবাবু প্রায় সময় রবীন্দ্রনাথের সহকারীর হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলতেন কিংবা তার টেবিলে লিখে দিয়ে যেতেন_ এই সুরে এই বিষয়ে একটা গান লিখে সুর করে রাখতে। রবীন্দ্রনাথ তখন বলতেন_ এইভাবে এই সুরে কী গান লিখা সম্ভব? শৈলজাবাবু তখন তাকে তার পুরনো গান থেকে উদাহরণ দিয়ে বলতেন_ এমন গান তো আপনি আগেও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ মেনে নিয়ে লিখতেন। এভাবে লিখতে গিয়ে অবশেষে বছর দশেক পরে দেখা গেল যে, রবীনদ্রনাথ তার শেষ বয়সে ঈশ্বর-বিষয়ক গান লিখেছেন হাতেগোনা দু’তিনটি। আর বর্ষার গান লিখেছেন প্রায় চৌদ্দ থেকে পনেরটি। আমার মনে হয়, বর্ষা তখনকার দিনেও একটি আলাদা করে মনে রাখার মতো বিষয় ছিল। বর্ষা এবং নদীর কথা বলব আমি এখানে। তার কারণও আছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর আক্ষরিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য তিনি জোর দাবি রেখেছিলেন, গান বেঁধেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে জমিদারির হাল ধরতে হয়। এভাবে অনেক ঘটনা, ১৯০৮ সালের দিকে তিনি আবার চলে যান শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুর। এসব জায়গা তিনি ঘুরে দেখলেন। তিনি সেখানে অবস্থানকালে বারবার লিখছিলেন_ ‘আমি যেন আরোগ্য লাভ করিলাম।’ পদ্মার উদাম বুকে নৌকায় আকাশ পরিষ্কার করা অঝোর বৃষ্টিতে তিনি আরোগ্য লাভের আনন্দ পেয়েছিলেন। তিনি এই ভ্রমণে বাংলাকে, বাংলার মানুষকে, বাংলার কৃষককে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারলেন। তাদের সামাজিক অবস্থান এবং তাদের আর্থিক নানা দিক তিনি যেন নবরূপে চিনতে পারলেন। এবং আশ্চর্যভাবে আমরা লক্ষ্য করি যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্পে এবং চিঠি-পত্রে বাংলার প্রকৃতির উদার উপস্থিতি। যেই কথা বলার জন্য এত কথার অবতারণা তা হলো, এখন এই ২০১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যদি আমরা পদ্মায় যেতে বলি, একটি গানও কী তার পক্ষে এখন লেখা সম্ভব হতো? আমি গভীর সন্দেহ পোষণ করি, তিনি পারতেন না। যদি লিখতেও পারেন সেটা তার স্মৃতি থেকে লিখতেন তিনি। কারণ আমাদের প্রকৃতি, আমাদের নদী সবই বদলে যাচ্ছে। তারা তাদের চির চেনা রূপ বদলে নিচ্ছে আমাদের বিরূপ আচরণের ফলে।
প্রমথ চৌধুরী খুব সম্ভবত তার ‘ফাল্গুন’ নামে একটি প্রবন্ধে বাংলার প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্নভাবে ব্যঙ্গ করে এক পর্যায়ে লিখেছেন_ ‘পশ্চিমে ঋতু আসে প্রবলভাবে’। অর্থাৎ শীত যখন শুরু হয় সেখানে শীত আর তুষারের প্রাবল্য আর বসন্ত যখন শুরু হয় তখন সেখানে নানা রঙের ফুলের প্রাচুর্য। গাছে গাছে নতুন পাতার সমারোহ। আমাদের এখানে আমি দেখেছি শরৎকালে গাছে গাছে সবুজ পাতার আয়োজন। এত সবুজ যে চোখ ঝলসে যাওয়ার জোগাড়। আর নদীগুলো আল মাহমুদের ভাষায়_ ‘আভাসে_ ইঙ্গিতে কিছু জল’_ এই আভাসে ইঙ্গিতে কিছু জলের নদীগুলো তখন নাব্য। তখন নাইওরী আসত। মানুষজন সহজে চলাচল করতে পারত।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, বসন্তে আমাদের এখানে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচয়ে বড় পূজা দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। বসন্তেই তারা এই পূজা পালন করতেন। কিন্তু দেখা গেল যে, শরৎকালে নতুন ধানে গোলা ভরতো কৃষকরা। নদীগুলোও নাব্য। যাতায়াতে সুবিধা। আত্মীয়-স্বজনরা বেড়াতে আসত একে অন্যের বাসায়। মেয়েকে বাপের বাড়িতে আনতে সুবিধা হতো শ্বশুরবাড়ি থেকে। সব মিলিয়ে একটা উৎসবের ধুম লেগে যেত সবার প্রায় সবার ঘরে ঘরে। এসব কারণে আস্তে আস্তে দুর্গাপূজা শরৎকালেই স্থানান্তরিত হতো। আমি ঢাকার সবুজবাগে বসন্তকালে দুর্গাপূজার আয়োজন দেখেছি, দক্ষিণ ভারতে এখনও বসন্তে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোথাও আমার জানামতে বসন্তে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে দেখিনি। পূজার কথাটা আমি এ কারণেই বললাম, কারণ হিন্দুরা আমাদের চেয়ে বেশি সময় ধরে বাংলার স্থায়ী বাসিন্দা। এ ছাড়া আমাদের উপজাতীদের মধ্যে সাঁওতালরা বসন্তে যে প্রাচুর্য নিয়ে, ফুল আর খাদ্যের সমন্বয়ে নাচে-গানে বসন্তকে বরণ করে নেয়, সেটা অন্য কোথাও দেখা যায় না। চাকমাদেরও দেখা যায় বসন্ত এলে সাদরে বরণ করে নিতে। আর একটি কথা না বললেই নয়, সেটা হলো_ নবান্ন উৎসব। নবান্ন উৎসবে আমাদের উপজাতীয়দের আনন্দ-উৎসবের কোনো তুলনা হয় না। এই কথাগুলো বলছি এই কারণে, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একাত্মতা, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়ার বিষয়টি অনেক প্রাচীন এবং বিষয়টি আমাদের মানব মনের মূলে প্রোথিত। প্রকৃতি মানুষকে টানে প্রবলভাবে। আধুনিক জীবনে মানুষের যতই সময়ের কমতি থাকুক না কেন আমরা দেখি যে, হাজারো কাজের ভিড়ে আলাদা করে সময় বের করে, পরিকল্পনা করে মানুষ হাঁপাতে হাঁপাতে কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চলে ছুটে যাচ্ছে। কেন এই ছুটে যাওয়া? কারণ প্রকৃতি মানুষকে টানে। আর প্রকৃতির কাছে গিয়ে মানুষ নিজেকে বিশ্রাম দেয়। আমি অন্যদের কথা জানি না, ইদানীং পানি দেখলে আমার অনেক আনন্দ হয়, আমার চোখ জুড়ায়। নিজের আনন্দ নিয়ে তেমন একটা ভাববার সময় আমার ছিল না কখনো। বয়স বেড়ে যাচ্ছে বলেই হয়তো এসব ঘটছে এখন।
আবার বসন্তের কাছে ফিরে যাই। বসন্ত আমাদের শারীরিক একটা প্রশান্তি এনে দেয়। এই প্রশান্তি এখনও পাওয়া যায়। ফাল্গুনের বেশকিছু দিন চলে গেল। প্রায় শেষই বলা যায়। কিন্তু শেষ রাতের দিকে এখনও শীতের আমেজটা পাওয়া যায়। কিছু একটা গায়ে না জড়ালে ঠাণ্ডায় কুপোকাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো আমাদের এখানেও প্রকৃতি তার মূল রূপ বদলে ফেলছে। অর্থাৎ আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে জোরপূর্বক যা আদায় করে নিচ্ছি প্রকৃতিও সেই পরিমাণ নির্দয় হয়ে উঠছে আমাদের জন্য। মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতিবিমুখ হয়ে উঠছে। এটা আশঙ্কার কথাই বটে। বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের এখানকার তরুণ-তরুণীরা বিশেষ করে স্বাধীনতার পর আমাদের এখানে ঋতুকে বরণ করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। পহেলা বৈশাখ, পহেলা বসন্ত; [পহেলা বসন্ত বলে যদিও কিছু নেই। বিষয়টি হবে পহেলা ফাল্গুন। কাশিনাথ রায়ের একটি কবিতায় তিনি ‘পহেলা বসন্ত’ লিখেছেন। আমিও তার অনুসরণে বলছি] আষাঢ়ের প্রথম দিবসসহ প্রকৃতিকে বরণ করে নেওয়ার মতো সব উপলক্ষকে নিজেরা নিজেদের করে নিয়েছে। আমাদের সংস্কৃতিকর্মীরা, আমাদের তরুণ-তরুণীরা এসব উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির কাছে যেতে পেঁৗছাতে চান। এটার দরকার আছে বলে আমি মনে করি। আমরা যারা নগরবাসী, তাদের নিঃশ্বাস ফেলার মতো কোনো জায়গা নেই। পার্ক নেই। পার্ক থাকলেও সেখানে ফুলের গাছ নেই। অনুষ্ঠান এবং দিবসকেন্দ্রিক ফুলের ব্যবহারের প্রচলন আমাদের এখানে চালু হয়েছে বেশিদিন হয়নি। আগে দেখতাম শাহবাগের যেখানে এখন মানুষ লাইন দিয়ে ফুল কিনছে, সেখানে ইতস্তত দু’একটি চা-সিগারেটের দোকান ছিল। কিন্তু সেই শাহবাগ আর এই শাহবাগ দিন-রাতের তফাৎ। আমাদের ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের বাড়ির ফুল গাছ থেকে পাশের বাড়ির হিন্দু মেয়েরা ফুল তুলতো পূজার জন্য। তারা ফুল তুললে আমি আমার মায়ের কাছে গিয়ে বিচার দিতাম_ ফুল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে মাইয়ারা। মা আমাকে শুধরে দিয়ে বলতেন_ ‘ফুল চুরি করেছে এই কথা বলা ভালো না। বল যে, ওরা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। ‘ এই বিষয়টি আমার খুব ভালো লেগেছিল। ফুলের প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষ তাদের বাসা-বাড়ির ছাদে টবে ফুলের চাষ করছেন। আমি এটাকে বলব_ প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য মানুষের কৃত্রিম আয়োজন মাত্র।
ফাল্গুন নিয়ে শেষ কথাটা বলব এখন। আমাদের সাহিত্যের মহারথীরা বিদ্যাপতি, রবীন্দ্রনাথ, গোবিন্দ দাসসহ আরও যারা কোমল সম্ভাষণে বসন্তকে আপন করে নেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছিলেন তারা কেউই কল্পনা করতে পারেননি কখনও ৮ই ফাল্গুনে আমাদের দেশের ভাষা সংগ্রামের কথা। আমি ২১ ফেব্রুয়ারির কথা বলছি। ফাল্গুন আমাদের শারীরিক এবং মানসিক আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের শিখিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। সবাই প্রতিবাদ করতে জানে না। চায়ও না অনেকে। আমাদের শিক্ষিত তরুণসমাজ ভাষা রক্ষার জন্য সেই দিন যেভাবে প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের ভিত তারা স্থাপন করে দিয়েছিল সেই দিন। আমরা পেয়েছি আমাদের শক্তির জায়গা। আমরা পেয়েছি একটি শহীদ মিনার। পেয়েছি মাতৃভাষার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এ সবই পেয়েছি বায়ান্নর ফাল্গুনের আট তারিখে। ফাল্গুন আমাদের দিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা এবং এমনকি স্বাধীন দেশের পতাকা। ফাল্গুন শুধু তার রঙ, রস আর রূপের কারণে মোহিত করে না, ফাল্গুন আমাদের দিয়েছে প্রতিবাদ করার শক্তি এবং সাহস। আর সেই কারণেই আমার কাছে ফাল্গুন আলাদা গুরুত্ব বহন করে এসেছে সব সময়।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  ও বন্ধু আমার

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

আসাদ চৌধুরী- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...