কবিতা

নিঃসঙ্গ মৃত্যু

অনুবাদঃ অসিত সরকার

নির্জন কবরখানা
স্মৃতিস্তম্ভগুলো নিঃশব্দ অস্থিতে পরিপূর্ণ,
অন্ধকার সংকীর্ণ গুহার মধ্যে দিয়ে হৃদয় আসে যায়ঃ
যেন জন্মলগ্ন এক জাহাজের খোলের মধ্যে আমরা মারা গেলাম
যেন হৃদয়ের অতলান্তে আমরা তলিয়ে গেলাম
যেন সত্তার আপন অস্তিত্বে আমরা মিশে গেলাম।

অজস্র মৃতদেহ
ক্লেদাক্ত হিমেল পা,
পাঁজরে পাঁজরে জড়ানো মৃত্যু,
পবিত্র একটা শব্দের মতো
কুকুরবিহীন তীক্ষ্ণ চিতকারের মতো
অশ্রু কিংবা বৃষ্টির আর্দ্রতায় ফুলে ওঠা কবরে নানা ঘন্টাধ্বনির মতো।

কখনও কখনও, একা, আমি দেখি
কফিনগুলো খোলা পালে বিবর্ণ মৃতদের বয়ে নিয়ে চলেছে,
মৃত কুন্তলে জড়ানো নারী, দেবদূতের মতো শুভ্র রুটিওয়ালা,
বিষণ্ন কেরানীবধূ,
কফিনগুলো নেমে গেলো মৃত্যুর খাড়াই নদীতে,
মদিরার মতো রক্তবর্ণ গাঢ় নদী, দারুণ খরস্রোতা,
মৃত্যুর শব্দে পালগুলো ফুলে উঠছে
পালগুলো ফুলে উঠছে মৃত্যুর নিঃশব্দ ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে।

মৃত্যু এসে পৌঁছালো কলশব্দমুখর নদীবেলায়
পা-বিহীন একটা জুতোর মতো, মানুষবিহীন একটা পোশাকের মতো
আংটি আর আঙুলবিহীন হাতে কড়া নাড়বে বলে সে এসে পৌঁছালো
এসে পৌঁছালো মুখবিহীন জিভবিহীন কন্ঠস্বরবিহীন কন্ঠে চিতকার করবে বলে।
কখনও প্রতিধ্বনিত হয় না তার পদপাতের শব্দ।
গাছের পাতার মতো তার পোশাকের খস্‌খস্‌ শব্দ।
আমি ঠিক জানি না, আমি খুব অল্পই বুঝি, আমি খুব কমই দেখি
তবু আমার মনে হয় তার গানের রঙ তরল বেগুনে,
যে রঙ মাটির সঙ্গে মিশে যায়,
কেননা মৃত্যুর মুখ
মৃত্যুর অপলক চোখের দৃষ্টি অবিকল সবুজ,
বেগুনে পাতার বিদীর্ণ আর্দ্রতায়
উন্মত্ত শীতের রঙ বিষণ্ন ধূসর।

অথচ পল্লবের ছদ্মবেশে মৃত্যু পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে যায়
মৃতের খোঁজে মাটি থেকে লাফিয়ে ওঠে,
মৃত্যু পল্লবে মুখ ঢাকে,
মৃত্যুর জিভ খোঁজে শবদেহ,
মৃত্যুর ছুঁচ খোঁজে সুতো।

মৃত্যু আমাদের দোলনার আশেপাশে
সস্তা মাদুরে, কালো কম্বলে মৃত্যু মাথা গুঁজে থাকে,
তারপর সহসা উধাও-
বিষণ্ন শব্দে চাদর দুলিয়ে সে চলে যায়
আর বিছানাগুলো পাল তুলে ভেসে যায় বন্দরের দিকে
যেখানে সম্রাটের মতো সুসজ্জিত পোশাকে অপেক্ষা করে থাকে মৃত্যু।

পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা (১২ জুলাই, ১৯০৪ – ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) ছিলেন চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। কৈশোরে তিনি এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম গ্রহণের পশ্চাতে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলি নিজের পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর পিতা ছিলেন কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চাইতেন তাঁর পুত্র কোনো "ব্যবহারিক" পেশা গ্রহণ করুক। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপায়ার-এর মতো কামোদ্দীপনামূলক কবিতা সংকলন, তেমনই রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহারও। ১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে "বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি" বলে বর্ণনা করেন।[১] ১৯৪৫ সালের ১৫ জুলাই, ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাকিম্বু স্টেডিয়ামে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা লুইস কার্লোস প্রেস্টেসের সম্মানে ১০০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেন নেরুদা।[২] নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর চিলিতে ফিরলে সালভাদর আলেন্দে এস্ত্যাদিও ন্যাশোনালে ৭০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।[৩] জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ট সহকারীতে পরিণত হন। চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পিনোচেট নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দেননি। যদিও হাজারে হাজারে শোকাহত চিলিয়ান সেদিন কার্ফ্যু ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টি পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে।