কবিতা

আমার ভিতরে কোনো দল নেই

আমার পিছনে কোনো দল নেই, আমার ভিতরে
দলবদ্ধ হবার আকাঙ্ক্ষা নেই, আমি
সাদা কালো লাল নীল গাং-গেরুউয়া জাফরান বাদামি
হরের রঙের খেলা দেখে যাই।
একলা-পথে হাঁটতে-হাঁটতে একলা আমি ঘরে
ফিরে যাব। যেতে-যেতে ধুলোবালি জঞ্জালে ও ঘাসে
খানিকটা প্রশংসা আমি রেখে যাই।
দেখি শুকনো পাতা উড়ছে হিলিবিলি সন্ধ্যার বাতাসে।
আমার পিছনে কেউ নেই এখানে। কস্মিনকালেও
কাউকে আমি ডাক দিয়ে বলিনি,
চলো যাই, রোদ্দুরে গলিয়ে নেব গিনি,
হাত বাড়িয়ে টেনে আনব অহঙ্কারী বটগাছের মাথা।
আমি বলি, দশজনে পঁচিশটা পথে যেয়ো,
প্রত্যেকে আড়াইটে করে পেয়ে যাবে শুকনো শালপাতা।
তার মানে কি এই যে, আমি রাখিনি বিশ্বাস
সঙ্ঘবদ্ধ কাজে?
দেখিনি কীভাবে কলে-কারখানায় বাঁধে ও ব্যারাজে
কিংবা পূর্তবিভাগীয় নির্মিতিমালায়
সভ্যতা নিষ্পন্ন হয়? বালিহাঁস
সরে গিয়ে জায়গা দেয় পৌরহিতসাধিনী সভাকে;
জলা ও জঙ্গল হটে যায়।
চৌষট্টি ফ্লাটের হর্ম্য মেঘের বালিশে মাথা রাখে।
সমস্ত দেখেছি আমি, বুঝেছি যে, মানুষের মিলিত উদ্যম
ব্যতিরেকে
এমন সহস্রফণা
উপরন্তু একই সঙ্গে এমন বিষাক্ত-মনোরম
উল্লাসের আবির্ভাব সম্ভব হত না।
কিন্তু এই সম্ভবপরতা তাকে কী দেয়, কতটা
দেয়, যে সভ্যতা অর্থে অন্য-কিছু বোঝে?
সভ্যতার ভিতরে যে খোঁজে
অন্য চরিতার্থতা, সে অন্য পথে যায়।
দলবদ্ধতার ঘটাপটা
দুই পায়ে মাড়িয়ে তাকে একবার নিজের মধ্যে উঁকি
দিয়ে কথা বলতে হয় নিজস্ব ভাষায়,
একবার দাঁড়াতে হয় নিজস্ব ইচ্ছার মুখোমুখি।
আমার ভিতরে কোনো দল নেই, দলবদ্ধতার
আনন্দ অথবা গ্লানি, কোনোটাই নেই।
আকাশে অজস্রবর্ণ খেলাধুলো সমাপ্ত হলেই
ফিরতি-পথে জঞ্জালে ও ঘাসে
খানিকটা প্রশংসা রেখে আমি দেখি, এন্তার…এন্তার
হিলিবিলি পাতা উড়ছে সন্ধ্যার বাতাসে।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯ অক্টোবর ১৯২৪-) একজন ভারতীয় বাঙ্গালি কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভুত আধুনিক বাংলা কবিদের অন্যতম। উলঙ্গ রাজা তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্হ। এই কাব্যগ্রন্হ লেখার জন্য তিনি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। কবি পশ্চিমবঙ্গে বাংলা আকাদেমির সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত। শৈশব ও কৈশোর তাঁর শৈশবের পুরোটাই কেটেছে পূর্ববঙ্গে যা বর্তমান [ [বাংলাদেশ]], ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে। কবির ঠাকুরদা কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। কর্মজীবন শেষে ৫০ বছর বয়সে কলকাতার পাট চুকিয়ে বাংলাদেশের ফরিদপুর বাড়ি চান্দ্রা গ্রামে চলে আসেন। তার বাবা কলকাতাতেই ছিলেন। কলকাতার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করতেন। দুই বছর বয়সে কবির মা বাবার কর্মস্থল কলকাতায় চলে যান। কবি থেকে যান ঠাকুরদার নাম লোকনাথ চক্রবর্তীর কাছে। গ্রামে কাটিয়েছেন মহা স্বাধীনতা—ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ করে। কখনো গাছে উঠছেন; কখনো আপন মনে ঘুরেছে গ্রামের এই প্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রাপ্তে। চার বছর বয়সে কবির কাকিমা বলছিলেন, ‌'তুই তো দেখছি কবিদের মতোন কথা বলছিস!' সেই সময়েই মুখস্থ করেছিল গ্রামে কবিয়ালরা, কবিগান,রামায়ণ গান। গ্রামের দিনগুলো খুব সুন্দর কেটেছেন তাই তিনি এ গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় যেতে চাইতেন না। তবে ঠাকুরদার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। এখন তিনি কলকাতায় থাকেন।